ব্লগার ও বাক-স্বাধীনতা

ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১২ আষাঢ় ১৪২৪

ব্লগার ও বাক-স্বাধীনতা

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৩:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৬

print
ব্লগার ও বাক-স্বাধীনতা
কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নিজের মত প্রকাশে বাধা দেওয়া হবে না, এমনটাই স্বাভাবিক। দেশ ও সমাজ নিয়ে আলোচনা বা যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা হবে, গণতান্ত্রিক দেশে এটাই বাস্তবতা। প্রশংসা যেমন কোনো মানুষ বা গোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করে, তেমনই সমালোচনা তার ভুলকে ধরিয়ে দিয়ে আরও সংশোধনের মাধ্যমে সেরা ফলটি পেতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নিজের মত প্রকাশে বাধা দেওয়া হবে না, এমনটাই স্বাভাবিক। দেশ ও সমাজ নিয়ে আলোচনা বা যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা হবে, গণতান্ত্রিক দেশে এটাই বাস্তবতা। প্রশংসা যেমন কোনো মানুষ বা গোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করে, তেমনই সমালোচনা তার ভুলকে ধরিয়ে দিয়ে আরও সংশোধনের মাধ্যমে সেরা ফলটি পেতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

কোনো মানুষই ভুলক্রটির ঊর্ধ্বে নয়। কাজেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা গণতান্ত্রিক দেশে করা যেতেই পারে। তবে তা যেন কারও অনুভূতিতে আঘাত না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই বলেছি, কোনো মানুষই ভুলক্রটির ঊর্ধ্বে নয়। বলেছি একারণে যে, যে বা যারা অপরজনের বা গোষ্ঠীর ভুল ধরছেন, তারা নিজেরাও কিন্তু তার ঊর্ধ্বে নন।

যে প্রসঙ্গে এত কথা, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ভার্চুয়াল জগতে পদচারণা এখন দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর। এদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সরব। একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি জানাতে গিয়ে একসময় অনেকেই দেশ ও দশের কথা বলে ফেলছেন। মতামত প্রদানের এই ধারা পুরো বিশ্বেই বিস্তার ঘটেছে। বাইরে নই আমরাও। তবে মত প্রকাশের কারণে বিরোধী মতবাদীদের হাতে প্রাণ দেওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা, যা আমাদের দেশে ঘটছে। যতো না ব্যতিক্রম, তার থেকেও বেশি উদ্বেগের। একুশের বই মেলায় ২০০৪ সালে হুমায়ুন আজাদ স্যারের উপর হামলার ঘটনা এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। সেটিকে বাদ দিয়ে ধরা হলেও গত দু’তিন বছরে মুক্তমনাদের জীবনের উপর যে ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে তা দেশে ও বিদেশে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তার উপর এমন হামলার তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে।    

কেননা, বিচারের নজির না থাকায় এ ধরনের হামলা চলছেই। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভার্চুয়াল জগতে মত প্রকাশের কারণে প্রথম প্রাণ যায় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের। মুক্তচিন্তা ও মতের চর্চার কারণে ৯০-এর দশকে ব্লগারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ব্লগারদের প্রচেষ্টাতেই নানা বিষয়ে পূর্ণতা পায় বাংলার ভার্চুয়াল জগৎ। বাংলায় নানা তথ্যবহুল বিষয় যোগ হতে থাকে। তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুমাত্র নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশের পথ বেছে নেন। Comment blog কে Establish করার জন্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও সেখানে প্রাধান্য পেত। মতের ভিন্নতায় আলোচনা তর্কেও রূপ নিত। তবে সেটি যে প্রাণহানির শত্রুতায় রূপ নেবে তা কোনো যুক্তিতেই গ্রাহ্য নয়।

বাস্তব জীবনে নীরব তবে ভার্চুয়াল জগতে সরব ব্লগারদের পরিচিতি অবশ্য রাজিব হত্যার মাধ্যমে নয়। বরং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তাদের শাহবাগে অবস্থানে তা উচ্চকিত হয়। ব্লগারদের ডাকা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে সেবার সাধারণ মানুষেরও স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। বিশ্বে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ব্লগারদের গণজাগরণ মঞ্চ। স্থান পায় বিশ্বের গণমাধ্যমের শিরোনামে। অবশ্য এই অরাজনৈতিক আন্দোলন একসময় রাজনৈতিক চোরাপাঁকে পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বলা যেতে পারে, ব্লগারদের প্রাণের শঙ্কা তখন থেকেই দেখা দেয়। ধর্মীয় চেতনায় আঘাতের অপরাধে জীবন যেতে থাকে একের পর এক ব্লগারের। এ হত্যাধারার রাশ টানতে ব্যর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও এই দায় থেকে ব্লগারেরাও মুক্ত নন। কোনো জাতি বা ধর্মের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অবস্থান প্রদর্শন সভ্য সমাজে কোনোভাবেই কাম্য নয়। অপরের অনুভূতিতে আঘাত করাও অপরাধের শামিল।  

তবে নাজিম হত্যাকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি যে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে তা ব্যতিক্রম হলেও উদ্বেগের মাত্রাই বরং বাড়িয়ে তুলছে। খবরের পাতায় দেখা যাচ্ছে, নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যার দায় স্বীকার করে আল কায়েদার এক কথিত বার্তায় তাকে ইসলাম বিরোধী ব্লগার উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, তার নামের সাথে ব্লগার শব্দটি যায় না। কেননা, তার কোনো ব্লগ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ফেসবুকে তিনি নিয়মিত লিখতেন। অবশ্য সেখানেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মত কিছু মেলেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কী শুধুই হত্যাকাণ্ডকে অন্যখাতে প্রবাহের চেষ্টা। একসময় শোনা যেত, প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি তার শত্রুকে চোর সাজিয়ে রাস্তায় গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলেছেন। পরে আসল সত্য প্রকাশ পেলেও হত্যাকারীকে আর পাওয়া যেত না। যেহেতু গণপিটুনিতে তার মৃত্যু, কাজেই মামলা হলে অজ্ঞাত পরিচয় শতাধিক ব্যক্তির নামে মামলা হবে। ফলে পুলিশ কাকে ধরবে আর কার বিচার করবে?.. এ প্রশ্ন, প্রশ্ন হয়েই থাকে।

সামাদ তো বটেই, এযাবৎ হত্যাকাণ্ডের শিকার সব ব্লগারের খুনিদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের শুধু দায়িত্বই নয়, চ্যালেঞ্জ। নতুবা এই অপরাধ চলতেই থাকবে। ব্যাপার আরও আছে, বাক স্বাধীনতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ- বিরোধীরা বরাবরই দিয়ে আসছে। মজার ব্যাপার হল, এই অভিযোগ সব আমলেই বিরোধী অবস্থান থেকে আসে। এখনও আসছে। তবে ভেবে দেখার যেটি বিষয় তা হল, গণমাধ্যমের চাইতে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কম শক্তিশালী নয়। স্বভাবতই সরকার এখানেও তার নিয়ন্ত্রণ আনতে চাচ্ছে।

এখন নিন্দুকেরা যদি বলেন, ‘ব্লগার হত্যাকাণ্ডের বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা মূলত ভার্চুয়াল জগতের মুক্তমত প্রকাশকদের উপর একধরনের রাজনৈতিক চাপ? শুধু ব্লগারই নয়, ফেসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারকারীরাও এই হুমকির বাইরে নয়। নাজিম হত্যাকাণ্ড তাই প্রমাণ করে!’ এমন অভিযোগ যদি নিন্দুকেরা তোলেন তবে কী উত্তর আসবে? জানি উত্তর অনেক আছে। তবে তা শুধু কথায় প্রকাশ করলে চলবে না। নিন্দুকের প্রতি উচিত জবাব দিতে হলে সরকারকে এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমেই তা দিতে হবে।

 

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আলোচিত সংবাদ