অ্যান্টিবায়োটিকের ঢালাও ব্যবহার, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০১৭ | ৮ ভাদ্র ১৪২৪

অ্যান্টিবায়োটিকের ঢালাও ব্যবহার, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৩:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৬

print
অ্যান্টিবায়োটিকের ঢালাও ব্যবহার, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
উন্নতদেশে অস্ত্রোপচারের রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ঢালাওভাবে না হলেও বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে, রোগী, চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং ব্যবস্থাপত্র পর্যবেক্ষণ করে এই চিত্রই দেখা গেছে। চিকিৎসকরা বিষয়টি স্বীকার করে বলছেন, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে প্রতিরোধক হিসেবে অনেকটা বাধ্য হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক দেন তারা। 

উন্নতদেশে অস্ত্রোপচারের রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ঢালাওভাবে না হলেও বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে, রোগী, চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং ব্যবস্থাপত্র পর্যবেক্ষণ করে এই চিত্রই দেখা গেছে। চিকিৎসকরা বিষয়টি স্বীকার করে বলছেন, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে প্রতিরোধক হিসেবে অনেকটা বাধ্য হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক দেন তারা।

রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি রোগীর অপারেশন হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ও এর আশপাশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে।  সরকারি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান অবলম্বন শাহবাগে অবস্থিত এই হাসপাতালটি। তাই এই এলাকাতে ওষুধের খুচরা বিক্রির হারও অন্যান্য জায়গার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

শাহবাগের ওষুধ বিক্রেতাদের অন্যতম ইউনাইটেড ড্রাগ। এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী সবুজের সঙ্গে কথা হয়।

সবুজ বলেন, ‘অপারেশনের যত প্রেস্ক্রিপশন আসে তাতে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া থাকবেই। অপারেশন হলে অ্যান্টিবায়োটিক লাগবেই। ৫দিন, ৭দিনের ডোজ না খাইলে তো ঘা শুকাবে না।’

এ কথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় সবুজের প্রতিবেশী ওষুধ বিক্রেতা আমিনুল ইসলামের কণ্ঠে। তাকে যখন জানানো হলো, বিদেশে তো সব অপারেশনের রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না, কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমিনুলের মন্তব্য, ‘ভাইরে, আমরা তো ডাক্তার না। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, জীবনে যত অপারেশনের প্রেসক্রিপশন পাইছি, সবগুলাতে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া ছিল। ওনারা ডোজ দেন আর আমরা বিক্রি করি।’

শুধু শাহবাগ না, মিটফোর্ড হাসপাতাল, কলেজগেট ও শ্যামলীর ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেও এই বক্তব্যের সমর্থন মেলে।

কৃষ্ণ বসাক নামের এক রোগী জানান, এক দুর্ঘটনায় তার হাত কেটে যায়। পরে হাসপাতালে গেলে তা সেলাই করে চিকিৎসক একটি ব্যবস্থাপত্র দেন। বলেন, ৫ দিনের অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ দেওয়া। দিনে তিনবার।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানান, তার ছোট ছেলের জন্ম ইংল্যান্ডে। সিজারের পর তার স্ত্রীকে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই দেননি সেখানকার চিকিৎসক।

‘অথচ দেশে কাটা-ছেঁড়া, মচকা, জ্বর, কাশি সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক!’, ক্ষোভ আর উদ্বেগ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে।

ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রধান বিজ্ঞানী ড. কায়সার মন্নুর অ্যান্টিবায়োটিকের এই সর্বব্যাপী ব্যবহারকে খরাপ লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। ড. মন্নুর বায়োকেমিস্ট্রি ও মেডিসিন নিয়ে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০ বছর গবেষণা করেছেন।

এই গবেষক বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হলে আমাদের মতো দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন। কেননা, ক্রমাগত ব্যবহারে এগুলো একসময় কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে জীবাণুগুলো হয়ে উঠবে শক্তিশালী।’

‘জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধ জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ না করলে দরকার হবে আরও দামি অ্যান্টিবায়োটিকের। একসময় তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে মহামারি হতে পারে গরিব দেশগুলোতে’, যোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে, চিকিৎসকদের দাবি, মূলত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই অ্যান্টিবায়োটিকের এই বহুল ব্যবহার।

এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ড. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণেই অনেক চিকিৎসক প্রতিরোধক হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক দেন।’

তার দাবি, দেশের হাসপাতালগুলো জীবাণু-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শতভাগ সফল নয়। ফলে সংক্রমণের হার অনেক বেশি।

ড. বড়ুয়া বলেন, ‘নিয়ম হলো, একজন রোগীকে অপারেশনে নেওয়ার আগে তাকে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। যে থিয়েটারে অপারেশন হবে তাও জীবাণুমুক্ত হতে হবে। অপারেশনের সরঞ্জামও লাগবে জীবাণুমুক্ত। কিন্তু আমাদের এই সিস্টেমতো এখনো ডেভেলপ করে নাই।’

তাই দেশের হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণের হার অনেক বেশি বলে দাবি করেন তিনি।

এজন্য দেশের প্রত্যেকটি হাসপাতালে একটি করে জীবাণু বা ইনফেকশন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট চালু করা দরকার বলে মনে করেন ড. বড়ুয়া। একই সঙ্গে কিছু অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার সংযোজন করার পরামর্শও তার, যেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবাণুকে থিয়েটার থেকে বের করে দেবে।

তবে আশার কথা হলো দেশের জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে এইরকম একটি অপারেশন থিয়েটার চালু হয়েছে। যেটি মূলত অরবিস ইন্টারন্যাশনালের সৌজন্যে শিশু চক্ষু বিভাগে সংযোজন করা হয়েছে।

এই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হোসেন জানান, এখানে প্রায় কয়েকশ রোগীর অপারেশন করা হয়েছে। যাদের প্রায় শতভাগই সংক্রমণমুক্ত ছিল।

ডা. ফরহাদ জানান, এই থিয়েটারটি মূলত ভেতরে থাকা জীবাণুগুলোকে বাতাসের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের করে নিয়ে যায়। কাজেই একজন রোগী যদি এখানে জীবাণু নিয়েও আসে, তা বাতাসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।

তিনি যোগ করেন, ‘একজন রোগী যখন ইনফেকশনমুক্ত থাকে, তখন তার যন্ত্রণা কম হয়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারও কমে আসে। আর্থিক ক্ষতি কম হয়। রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারে। হাসপাতালে বেশিদিন থাকতে হয় না।’

কাজেই দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার হলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহার এমনিতেই কমে আসবে বলে মত চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অধ্যাপকের।

এসপি/এসজে

 

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad