শোষিতের জীবন ও ইতিহাসের সংরক্ষণসূত্র

ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১২ আষাঢ় ১৪২৪

শোষিতের জীবন ও ইতিহাসের সংরক্ষণসূত্র

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৬

print
শোষিতের জীবন ও ইতিহাসের সংরক্ষণসূত্র
অনেক কথাই বলা যায় না। না বলার ‘চাপ থাকে’। ক্ষমতায় যারা থাকেন, কোনো কথা তাদের বিপক্ষে গেলেই তারা নাখোশ হন। প্রথম বিশ্বে এর স্বরূপ একরকম। তৃতীয় বিশ্বে এর স্বরূপ অন্যরকম। বিশ্ব এখন যেভাবে শোষকদের দখলে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার দরকার আছে বৈকি! একটা ঘটনা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, ‘পানামা পেপারস’; এখন বিশ্বের আলোচিত বিষয় এটি।

অনেক কথাই বলা যায় না। না বলার ‘চাপ থাকে’। ক্ষমতায় যারা থাকেন, কোনো কথা তাদের বিপক্ষে গেলেই তারা নাখোশ হন। প্রথম বিশ্বে এর স্বরূপ একরকম। তৃতীয় বিশ্বে এর স্বরূপ অন্যরকম। বিশ্ব এখন যেভাবে শোষকদের দখলে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার দরকার আছে বৈকি! একটা ঘটনা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, ‘পানামা পেপারস’; এখন বিশ্বের আলোচিত বিষয় এটি।

এতে অনেকেরই নাম এসেছে। যাদের নাম এসেছে তাদের কেউ সমাজতন্ত্রী, কেউ গণতন্ত্রী। কেউ সাদা, কেউ কালো। কেউ বাদশাহ, কেউ আমীর। ব্যবসায়ী-খেলোয়াড়-নায়ক-তারকা অনেকের নাম- বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের। এরা মূলত কারা? কি করছেন তারা গণমানুষের জন্য? কি করছেন নিজ নিজ ভূখণ্ডের মানুষের জন্য? তা ওই দেশগুলোর মানুষেরাই বলতে পারবেন। বলতে পারবেন বাংলাদেশের মানুষেরাও। বাংলাদেশের মানুষ যাকে কিংবদন্তী ব্যবসায়ী বলে সনদ দিল, তার নামই যদি এমন ‘তালিকা’য় দেখা যায়, তবে ব্যথিত তো হতেই হবে!

আমার কাছে একটা বিষয় ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো, আসলে শোষণ সবদেশেই একই প্রকারের। শোষিতের জীবন সবদেশেই একই রকম। তা প্রথম কিংবা তৃতীয় বিশ্ব, যেখানেই হোক। আর যে বিষয়টি সবচেয়ে মারাত্মক তা হলো, ক্ষমতাসীনদের পক্ষের লোককে বাঁচিয়ে দেয়া। যাদের কেউ নেই, যারা নিরীহ তাদের উপর আরো হামলে পড়া।

আমাদের মনে আছে, কিশোরী ইয়াসমিনকে ১৯৯৫-এর ২৪ আগস্ট দিনাজপুর সদর থানার কয়েকজন পুলিশসদস্য ধর্ষণের পর হত্যা করে। তখন তার বয়স ছিল ১৪। ঘটনাটি আমরা স্মরণ করতে পারি। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজ নৈশ কোচের সুপার ভাইজার ইয়াসমিন নামে এক তরুণীকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামিয়ে দেয়। এক চায়ের দোকানদারকে বলে সকাল হলে তরুণীটিকে যেন দিনাজপুর শহরগামী বাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌঁছায় নৈশ-টহল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা তরুণী ইয়াসমিনকে নানা প্রশ্ন করে একপর্যায়ে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে জোরপূর্বক পুলিশভ্যানে তুলে নেয়। এরপর তারা দশমাইল সংলগ্ন সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায়।

এই ঘটনাটি দেশে-বিদেশে তোলপাড় তোলে। ইয়াসমিন হত্যার পর দিনাজপুরসহ সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষ যখন পুলিশকর্তৃক অসহায় দরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিনকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দলে। এবং দলটি গণমানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে শরিক হয়েছিল আন্দোলনে। হত্যার তিন দিন পর আন্দোলনরত মানুষের উপর পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর নির্মমভাবে গুলি চালালে সাজু, কাদেরসহ অন্তত ৭জন আন্দোলনকারী নিহত হন।

আমরা ভুলে যাই নি ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি ৩টি আদালতে ১শ ২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপভ্যান চালক অমৃতলাল বর্মণের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন। আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই মঈনুলকে আরো ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর, অর্থাৎ ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

এই হলো বাংলাদেশের শোষিত মানুষের একটি জীবনচিত্র। এমন ঘটনা কি আর ঘটেনি কিংবা ঘটছে না? হ্যাঁ, ঘটছে। কিন্তু কোথায় যেন থমকে গেছে সবই। আইন যেন কোথায় স্তব্ধ! বিচার কোথায় যেন থমকে থাকছে! কেন? বাংলাদেশে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সেই তুলনায় আইনের কঠোরতা বাড়ে নি। বাড়ে নি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সীমারেখা। যদি তা-ই হতো, তাহলে তনুহত্যা মামলায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলো না কেন?

আরেকজন ব্লগার-এক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার অপরাধ, তিনি মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। নিজে চাইলে বিদেশে চলে যেতে পারতেন। যান নি। তার মাঝে ছিল একাত্তরের সেই শাণিত চেতনা। এই চেতনাই তার জন্য কাল হয়েছে। তার কণ্ঠ চিরতরে রোধ করে দেয়া হয়েছে। খুব অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এসব হত্যার কোনো বিচার হচ্ছে না। তদন্তেই থেকে যাচ্ছে আইনের পথচলা। অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো হয়নি। হয়নি নীলাদ্রি, অনন্ত বিজয়সহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার।

যে বিষয়টি বলা দরকার, এই যে ঘটনাবলী, তা কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের আর্কাইভে জমা হচ্ছে। ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা থেকে হালের রিজার্ভ হ্যাকিং কিংবা সামাদ-অভিজিৎ-তনু হত্যাকাণ্ডগুলোর ইতিবৃত্তও জমা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো অক্ষরের মোটা দাগে।

১৯৭১ থেকে ২০১৬—এই সময়ের অনেক ঘটনাই বাংলাদেশের প্রবীণরা দেখেছেন। যারা নবীন, তারা ইতিহাস পড়ে জানতে পারছেন, কেমন ছিল বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস। জাতির জনকের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সাক্ষী দেয়, একটি শোষণমুক্ত জাতি গঠনের জন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল ত্যাগে রাজি ছিলেন। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করেই তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তির দূত নেলসন ম্যান্ডেলা বঙ্গবন্ধুকে আখ্যায়িত করেছিলেন শোষিত-নিপীড়িত মানুষের ‘অকৃত্রিম বন্ধু’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বরণের খবরে মুষড়ে পড়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারালো তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে’। সেই নেতার দলটি আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কি নির্মম শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে? না, পায় নি। কেন পায় নি, কিংবা পাচ্ছে না—এই প্রশ্নটি আমরা বার বার করছি।

এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সোনালি অক্ষরে সংরক্ষিত হতে পারতো; তা হয়নি। বরং একটি  বিষবাষ্প আমাদের চারপাশকে বিষাক্ত করে তুলছে। অরক্ষিত সমাজ আমাদের প্রজন্মকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি ঘটনা থেকে চোখ ফেরাতে আরেকটি ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এর নেপথ্যে কার হাত? কেউ হয়তো বলবেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য অপচেষ্টা চলছে! হ্যাঁ, তা হতে পারে। কিন্তু সরকার কি করছে? সরকার ওই চক্রকে ধরতে পারছে না কেন?

আমরা একটি স্বাধীন ন্যায়বিচারিক রাষ্ট্র চেয়েছিলাম। জাতির জনকও সেটাই চেয়েছিলেন। না; আমরা তা পাইনি, পাচ্ছি না। বিষয়গুলো ক্ষমতাসীনদের ভাবতে হবে। আমার বিশ্বাস সরকার চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে। তবে কেন চাইছে না? যারা শীর্ষে আছেন, তারা কি কোনো মহলবেষ্টিত? যে মহল সরকারপ্রধানকে প্রকৃত অবস্থা জানতে দিচ্ছে না? আবারও বলি, শোষণমুক্তির জয়গান গেয়েই কিন্তু এদেশে একাত্তর এসেছিল।

নিউইয়র্ক, ৮ এপ্রিল ২০১৬

ফকির ইলিয়াস : কবি, লেখক, কলামিস্ট। 
BAUL98@aol.com

print
 

আলোচিত সংবাদ