সাকিবের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা দেখি

ঢাকা, রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩ পৌষ ১৪২৪

সাকিবের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা দেখি

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৬

print
সাকিবের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা দেখি
গৌতম ভট্টাচার্য কলকাতার জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান থেকে শুরু করে ম্যারাডোনা, নেলসন মান্ডেলা, অমিতাভ বচ্চন, আশা ভোঁসলের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এবার তিনি নিজেই দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমকে।মুখোমুখি হয়েছেন আপন তারিক। 
.

গৌতম ভট্টাচার্য কলকাতার জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান থেকে শুরু করে ম্যারাডোনা, নেলসন মান্ডেলা, অমিতাভ বচ্চন, আশা ভোঁসলের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এবার তিনি নিজেই দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমকে।
মুখোমুখি হয়েছেন আপন তারিক।

মাশরাফির মতো সাকিব আল হাসানকেও আপনি খুব কাছ থেকে দেখছেন?
আমার এক সময় মনে হয়েছে, সাকিব আল হাসান ভুল দেশে জন্মেছেন। ভুল সময়ে জন্মেছেন। সাকিবকে বাংলাদেশের মিডিয়া ঠিকঠাক বোঝে নি। আবার সাকিবও মিডিয়াটা ঠিক বুঝে ওঠেন নি। আমাদের দেশেও একই সমস্যা ধোনিকে নিয়ে। শেবাগকে নিয়েও অনেক সময় হয়েছে। বিশেষ করে ধোনিকে নিয়ে এই ব্যাপারটা নিয়মিত হচ্ছে। সাকিবের অবদান বাংলাদেশ ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি। ওর সমস্যাটা হচ্ছে, বোধহয়, ও খুব আত্মকেন্দ্রিক। ও নিজের পারফরম্যান্সের জন্য দলকে সেভাবে সবসময় উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি। তিনি নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে দলটাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের এই যে সোনার একটা সময় ক্রিকেটে, সেখানে সাকিবের অত্যন্ত বড় একটা অবদান আছে। আমার মনে হয় যে, বাংলাদেশের মিডিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর না; এ কারণেই সাকিবকে সেভাবে আলোকিত করা হয় না। সাকিবের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। দেখুন, আমি তার ক্রিকেটের খুব অনুরাগী। সাকিবকে দেখলে আমার মনে হয় যে, পেছনে বাংলাদেশের অদৃশ্য একটা জাতীয় পতাকা যাচ্ছে। আমি তো,সাকিবের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা দেখি।

১৯৮৩ সাল থেকে আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। অনেকে আপনাকে বলে ‘ভয়েস অব আনন্দবাজার’। এতো দীর্ঘ সময় একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিভাবে জড়িয়ে থাকলেন? কেমিস্ট্রিটা কি?
কোনো কেমিস্ট্রি নেই। আমার মনে হচ্ছে, প্রথমত, আনন্দবাজারে কাজ করতে পারাটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। যদি কলকাতার মিডিয়া জগত একটা উপগ্রহ হয়, তবে আনন্দবাজারের নিজস্ব একটা স্যাটেলাইট চ্যানেল আছে। আনন্দবাজার একটা উপগ্রহ। এখানে যে কাজ করেনি তাকে বোঝানো মুশকিল যে, আনন্দবাজার কী! তার আছে নিজস্ব একটা ওয়েদার স্টেশন, নিজস্ব জলবায়ু—সব কিছু। সেখানে কাজ করতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কোথাও একটা অন্তহীন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে যে কারণে হয়তো কর্তৃপক্ষ আমাকে বদলান নি। আমিও থেকে গেছি। 

সাম্প্রতিক সময়ে একটা বিষয় লক্ষ করেছি যে, আনন্দবাজারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদ থাকছে। বিশেষ করে অনলাইন সংস্করণে।
বিশ্বের যেখানে বাঙালি আছে সেখানেই আনন্দবাজার-র পৌঁছে যাওয়া কর্তব্য বলে মনে করি। বাংলাদেশিরা পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তে আছেন। আমাকে বার্লিনের রাস্তায় একটা ছেলে ফুল দিচ্ছিল, দেখে মনে হল এ অঞ্চলের। জানতে চাইলাম কোথাকার? বলল যে বাংলাদেশের। আমাদের অভিনেতা জিৎ ইতালিতে গিয়েছিলেন শ্যুটিংয়ে, সেখানে একজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছিল। পরে জিৎ আমাকে বলল যে, ছেলেটা বাংলাদেশি। সিলেটের রেস্তোরাঁ মালিক লন্ডনে রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছেন। আসলে বাংলাদেশিরা পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশিদের অগ্রাহ্য করবে কোন বাঙালি? কেনই বা করবে? আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের কাছে যাওয়াটা অবশ্যই উচিত। হয়তো সেটা আরো কয়েকবছর আগেও করা যেতো।

বাংলাদেশে পুরো জাতি মিলে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ছোঁয়া লেগেছে গোটা বিশ্বে। আপনি বেশ কয়েকবার ঢাকায় এসেছেন। এখানকার বাংলার চর্চাটা দেখেছেন। বাংলা ভাষার চর্চাটা পশ্চিমবঙ্গে কেমন হয়?
কলকাতায় অনেকে আছেন যারা অসাধারণ গদ্য লেখেন। কলকাতার গদ্যলেখক খুব ভালো। কিন্তু সার্বিকভাবে যদি বলি, আমাদের ওখানে বাংলা ভাষার চর্চাটা খুব বেশি হচ্ছে না। ভাষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার, সেটা বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি করেছেন। ভাষার মর্মটা তারা অনেক বেশি বোঝেন। তারা রক্ত দিয়েছেন ভাষার জন্য। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু ভাষার জন্য রক্তদান হয়নি। হয়তো অনেক বিপ্লবী মারা গেছেন। ভাষার জন্য রক্তদান, ভাষার জন্য ত্যাগ স্বীকার সব বাংলাদেশেই হচ্ছে। ঢাকায় গাড়িতে চড়তে গিয়ে আমি রেডিওতে এফএম-এর প্রোগ্রাম শুনছিলাম। ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে থাকার সময় ভাবছি যে, কলকাতার এফএম চ্যানেল কতো আলাদা, সেখানে আরজেরা কথায় কথায় ইংলিশ বলেন, হিন্দি বলেন। এখানে অনর্গল বাংলায় সবাই কথা বলছেন। ভাষা বা সংস্কৃতির কথা বলছেন। বাংলাদেশে আসলে আমার খুব ভালো লাগে। কিছুদিন আগে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। এই কিংবদন্তি অভিনেতা আমাকে বলছিলেন, ‘জন্মদিনে আমাকে সবাই, উঠতি নায়ক-নায়িকারা, ফুল দেয়, প্রণাম করে। আমার জন্মদিনে সবচেয়ে বড় উপহার হতো যদি ওরা ওদের ডায়লগগুলো বাংলায় ঠিকঠাক বলতে পারতো। কিন্তু অর্ধেকই বাংলাটা ঠিকমতো জানে না!’ ৮২ বছর বয়সী এই সৌমিত্রদার খেদোক্তি দেখেই বোধহয় বোঝা যায় ভাষার মান কতোটা নেমেছে ওখানে।

এবার শচীন প্রসঙ্গে আসি। ভারতীয় এই কিংবদন্তির পুরোটাই আপনি প্রেসবক্সে বসে দেখেছেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগও আছে আপনার। তাকে নিয়ে লিখেছেন দীর্ঘ আত্মজীবনী সচ অমনিবাস’। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কিভাবে এমন ধারাবাহিকতা নিয়ে খেলে গেলেন তিনি?
সাধনা, সাধনা এবং অবিশ্বাস্য প্রতিভা। ওর সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া ট্যুরে ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের দিনে শচীনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ও নেট প্র্যাকটিস শেষে বেরিয়ে আসলে কথা বলবো বলে। দেখলাম যে, ‘আজতাক’ চ্যানেলের ক্যামেরাম্যানও অপেক্ষা করছিলেন। মেলবোর্নের চিড়িয়াখানায় শচীনের স্ত্রী অঞ্জলি এবং তাদের দুই সন্তান পৌঁছে গেছেন। একটু পর শচীন সোজা মাঠ থেকে ওদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কিন্তু বেরোচ্ছেই না, বেরোচ্ছেই না! প্রায় সাড়ে তিনঘণ্টা পর তিনি যখন বেরোলেন, আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে, ২৫ ডিসেম্বর যেখানে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় বল কুড়িয়ে দেওয়ার লোক থাকে না, ক্রিকেটারদেরই নিজেদের বল কুড়াতে হয়, সেখানে সাড়ে তিন ঘণ্টা প্র্যাকটিস করলেন এই মানুষটা। বললাম, ‘আজ ক্যায়া স্পেশাল কুচ থা?’ শচীন তাকিয়ে উত্তর দিলেন, ‘নেহি তো।’ বললাম ‘ফের ইতনা লম্বা সেশন?’ তিনি বললেন, ‘আজ থোড়া কম হোগিয়া!’ এই হচ্ছেন শচীন টেন্ডুলকার! যিনি ওইরকম ঈশ্বর-প্রদত্ত প্রতিভা নিয়ে বসে থাকেননি! সেটা ঘষে মেজে শান দিয়ে এমন একটা স্তরে নিয়ে রেখেছেন যে অবিশ্বাস্য। আর কখনো এমনটা দেখবো বলে মনে হয় না।

(তিন পর্বের দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হল আজ)

প্রথম পর্বের লিংক: মাশরাফি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে লোকগাথার নায়ক

এমজে/কেআরএস

 

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad