‘লেখককে দাঁড়াতে হলে তার সময় নিয়ে লিখতে হবে’

ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১২ আষাঢ় ১৪২৪

‘লেখককে দাঁড়াতে হলে তার সময় নিয়ে লিখতে হবে’

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৮:৩০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৬

print
‘লেখককে দাঁড়াতে হলে তার সময় নিয়ে লিখতে হবে’
হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে এই প্রথম দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি পরিবর্তন ডটকমকে। পাঠাভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মিশেলে আলো ফেলেছেন বিশ্বসাহিত্যের নানা-প্রান্তে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মোজাফফর হোসেন।

হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে এই প্রথম দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি পরিবর্তন ডটকমকে। পাঠাভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মিশেলে আলো ফেলেছেন বিশ্বসাহিত্যের নানা-প্রান্তে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মোজাফফর হোসেন।

(তৃতীয় পর্ব)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুকাল পরেই ইউরোপে আঘাত হানল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই দুই যুদ্ধে যতটা না অর্থনৈতিক ক্ষতি হল কিংবা প্রাণহানি ঘটল তারচেয়েও বেশি পরিবর্তন সাধিত হল মানুষের চেতনায়। সাহিত্যে কয়েকটা নতুন মুখ গজালো। সাহিত্য সমাজমুখী গন্তব্য থেকে বাঁক বদল করে ব্যাক্তিমুখী হল। এখানে আমরা জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফদের মতো লেখকদের পেলাম। তারা মানুষের অবচেতনকে চেতনার স্থানে উঠিয়ে আনতে চাইলেন। অন্যদিকে পেলাম হেমিংওয়ের মতো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড সাহিত্যিক, যিনি যুদ্ধোত্তর সময়ে একটা আপাত অর্থহীনতা (নাথিংনেস) উঠিয়ে আনলেন। কামুও হেমিংওয়ের মতো সাংবাদিক ছিলেন। তিনিও একঅর্থে বিশ্বযুদ্ধের প্রোডাক্ট। হেমিংওয়ের চেয়ে আরো নীরব ঘাতক তিনি। এখানে দুটো প্রশ্ন আমি করবো। জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফ’র প্রসঙ্গে আসার আগে হেমিংওয়ে ও কামু সম্পর্কে জানতে চাইবো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯১৮ সালে। হেমিংওয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিখছেন। কামু লিখছেন আরো পরে। কামুর লেখায় বিশ্বযুদ্ধ তীব্রভাবে ছাপ ফেলেনি। একটা ইমপ্যাক্ট ছিল সেখানে। যুদ্ধাক্রান্ত ইউরোপের যে সামগ্রিক বিনষ্ট জগত, সেটি এসেছে হেমিংওয়ের লেখায়। তবে যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের কথা বলতে হলে বলতে হবে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাসের কথা। মেট্রিক পরীক্ষার আগে এই উপন্যাসটি পড়ি। এটি এখন পর্যন্ত আমার স্মৃতিতে পরিষ্কার হয়ে আছে।

কার অনুবাদে?
মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। মোহনলালের দাদু (মাতামহ) ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারী সুন্দর বাংলা। মোহনলালের গদ্য পড়ে দেখো। পাবে কিনা জানি না। বাংলাদেশ তো হতচ্ছাড়া, কোনো ক্লাসিক ছাপবে না। ঢাকাতে এসব বইয়ের ভালো অনুবাদ নেই। হেমিংওয়ের একটা অনুবাদ হয়েছিল পার্ল প্রকাশনী থেকে। পরে আর কোনো খবর নেই। আবুল মোমেনের বাবা প্রাবন্ধিক আবুল ফজল হেমিংওয়ের For Whom The Bell Tolls অনুবাদ করেছিলেন। আবুল ফজল প্রগ্রেসিভ চিন্তাধারার লোক। কিন্তু গদ্যটা জুতের না। স্টেইনবেকের কিছু বাংলা হয়েছিল। না; ফকনার বোধহয় হয়নি।   

হেমিংওয়ের তার সমসাময়িকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; সেটি ভাষা, ডায়লগ, বিষয়বস্তু, নির্মাণশৈলী—সবদিক থেকেই। আপনার কাছে বিউটি অব হেমিংওয়ে বা এক্সিলেন্স অব হেমিংওয়ে কি? 
ওভারঅল দৃষ্টিভঙ্গি না। হেমিংওয়ের ডায়লগ খুব শার্প বটে। ডায়লগের সংক্ষিপ্ততা, দৃঢ়তা, সেটিই আমার বেশি ভালো লাগে। আর মাঝে মাঝে খুব ব্যঞ্জনাময় বাক্য থাকে। বর্ণনাগুলোও মারাত্মক। ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ খুব ভালো লেগেছে আমার। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ও ভালো। যুদ্ধের পরে প্যারিসে কিছু বুদ্ধিবর্গ এবং সাহিত্যিক একত্রিত হয়েছিলেন। তারা বিনষ্টটা লক্ষ করেছিলেন। ঐ সময় সাহিত্যের কিছু তত্ত্ব আসে। তখনই বিনষ্টির ধারনাটা জন্ম নেয়।

লস্ট জেনারেশন?
হ্যাঁ, Gertrude Stein যেটা বলেছিলেন, ইউ আর এ লস্ট জেনারেশন। তখন সবাই প্যারিসে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

আমার কাছে হেমিংওয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয় এই কারণে যে, সেখানে চরিত্ররা বেঁচে থাকার অর্থ পাচ্ছে না। অনর্থক বড়শি হাতে বসে থাকছে, কিংবা স্পেনে চলে যাচ্ছে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে, পানশালায় যতক্ষণ খোলা ততক্ষণ পান করে রাত্রি পার করছে, প্রেমিক-প্রেমিকা সমুদ্রের পাশে বসে মিনিংলেস সব কথা বলছে, বেড়াতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী যে যার মতো সময় পার করছে। চরিত্ররা কেউ কাউকে কানেক্ট করতে পারছে না।  
হুম। কারণ হেমিংওয়ে ইউরোপের বিনষ্টিটা দেখেছিলেন। তার উপন্যাসের মধ্যেই আছে, তারা যখন একশহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে শহর ফাকা পড়ে আছে। বাড়ির দেয়ালগুলো সব ফুটো ফুটো হয়ে পড়ে আছে। শরতে গাছের পাতাগুলো ঝরছে। ঠাণ্ডায় মরা পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। নিক অ্যাডামস চরিত্রকে নিয়ে যে গল্পগুলো আছে, সেগুলো পড়লে বুঝতে পারবে। ছোট ছোট কাহিনি। নিকের বাবা একজন ডাক্তার, সবজায়গায় তাকে কাজ করতে হয়। ব্রোথেলে গিয়েছে, নিগ্রোপল্লীতে গিয়েছে। নিগ্রোপল্লীতে এক মেয়ের প্রসববেদনা উঠেছে কিন্তু প্রসব করতে পারছে না। থাকার একটাই ঘর। ঘরের কোণায় একটা বাঙ্কারের ওপর মেয়েটির স্বামী শুয়ে আছে। সেও সহ্য করতে পারছে না স্ত্রীর এই যন্ত্রণা। আনেসথেসিয়া নেই। অজ্ঞান না করেই নিকের বাবা মেয়েটির পেট কাটছে। সেকি চিৎকার আর যন্ত্রণা! সন্তান যখন হয়ে গেল তখন, ডাক্তার ‘ইউ হ্যাভ এ বেবি বয়’ বলতে গিয়ে দেখল যে, মেয়েটির স্বামী স্ত্রীর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতের ব্লেড দিয়ে নিজের গলা কেটে মরে পড়ে আছে। এসব চিত্র তুমি নিক অ্যাডামসে পাবে।

নিক অ্যাডামস সিরিজে হেমিংওয়ে প্রায় ২৪টি গল্প লিখেছেন। কিন্তু হাতে গোণা কয়েকটি আমার পড়া।
হ্যাঁ, অনেক আছে। দারুণ বর্ণনা সব। পড়ে দেখো।

একটা বিষয় স্যার, হেমিংওয়ে যখন ছোটগল্প লিখছেন, তখন ইউরোপের ছোটগল্পের একটা মজবুত ভিত তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু হেমিংওয়ে কোনো পূর্বসূরিকে তো অনুসরণ করেননি।
তা ঠিক। হেমিংওয়ে নতুন একটা স্টাইল নিয়ে এসেছেন। এটা একেবারে তার গড়া। পরে হেমিংওয়েকেই অনুসরণ করেছেন অনেকে। অপূর্ব স্টাইল। ইমেজও ভারি চমৎকার। পুরুষরা ইমপোটেন্ট হয়ে যাচ্ছে। আর মহিলারা তাদের চুল ছোট করে ফেলছে। তাদের নারীত্বকে আর টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মানে পৃথিবী আর বাড়বে না।

এখানে কামুর প্রসঙ্গও আসতে পারে। যুদ্ধোত্তর ইউরোপে মানুষের যে ডিটাচমেন্ট বা এলিনেশন, সেটি নিয়ে তো তিনি লিখেছেন?
সেও তো রেজিস্টারে ছিল। তখন তো আলজেরিয়াও স্বাধীনতা চেয়েছিল ফ্রান্সের হাত থেকে। যুদ্ধকে সেও দেখেছে। যে কারণে তার ভেতর থেকে ওরকম ভয়াবহ চিন্তা বের হয়ে আসতে পেরেছে। ‘আউটসাইডার’, ‘দ্য প্লেগ’র মতো উপন্যাস লিখতে পেরেছে। তারপর ‘দি ফল’। এগুলো সরাসরি যুদ্ধ নিয়ে নয়, তবে প্রভাবিত তো বটেই। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দেখে যাননি জেমস জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফ। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। তাদের দৃষ্টিতে তো আমরা আবার অন্যরকম ইউরোপ পেলাম?
আমার মনে হয় তারা তাদের সময়ের যে বীভৎস দুনিয়া, নষ্ট-ছত্রভঙ্গ সমাজ, সেটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছিল। এ কারণে সালভাদর দালির মতো পরাবাস্তববাদীদের উত্থান ঘটে। জয়েসও চেতনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে একটা বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করেছেন।

তাহলে কি এটাকে আমরা একধরনের স্কেপিজম বলব?
স্কেপ নয়। এটা সময়ের যে ভয়াবহতা তারই একধরনের প্রকাশ। দুটো বিশ্বযুদ্ধের ব্যবধান তো খুব বেশি নয়। বলতে গেলে গোটাটা মিলে একটি বিশ্বযুদ্ধই। কাজেই তারা পৃথিবীর খুব দুর্দশা দেখে গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান দেখে গেছেন। ওদিকে হিটলারের আগমন ঘটছে। সবদিক থেকেই তো ডিপ্রেশন ছিল। সে জন্যে এদের লেখার মধ্যে অন্তর্মুখী ব্যাপারটা এসে গেছে। আর উলফের কথা বলছ, তিনিও তো ডিপ্রেশনে ভুগেছেন। হেমিংওয়ের মতো তিনিও আত্মহত্যা করেছেন। তারপর সিলভিয়া প্লাথ, আনা সেক্সটনও আত্মহত্যা করেছেন।

স্যার, হুয়ান রুলফো আপনার কেমন লাগে? তার একটা গল্প অনুবাদ করেছিলাম, উত্তরাধিকারের চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
কোন গল্পটা বলো তো?

‘ওরা আমাদের জমি দিয়েছিল’।
ওটা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদ করেছেন। উনি হুয়ান রুলফো কথাসমগ্র অনুবাদ করেছেন। রুলফোর একটা গল্প আছে, ‘কোনো কুকুর ডাকে না’, খুবই সাংঘাতিক! এইটা আমার সবচেয়ে ভাল লাগে। ছেলেকে কাঁধে করে নিয়ে যায় বাবা, কাঁধে কেটে বসে যায়..। পুরো রাস্তায় তার সঙ্গে কথা বলে, আশ্বাস দেয়। শেষে তো  মারায় যায়। তারপর ছেলেকে তো কাঁধ থেকে নামানো যায় না, পা দুটো শক্ত করে আটকে গেছে। তারপর নামিয়ে দেয়ার পরে, কুকুর আর ডাকে না! তারপর ‘ভোরবেলায়’ গল্পটা সাংঘাতিক।

একজনকে খুনের অপরাধে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সে মনে করতে পারছে না সত্যি সত্যি খুন করেছে কিনা। সকলে বলছে বলে নাও করতে পারছে না।
হুম। খুবই সাংঘাতিক বিষয়। রুলফোর সবগল্পই ভালো। গল্প তো বেশি লেখেননি। একটি মাত্র গল্পগ্রন্থ, আর অন্যান্য কাজ করেছেন।

‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসটি আছে।
এটা তো ছোট, উপন্যাস বলা যায় কি জানি না। ছোট তবে দারুণ। বাড়ি যখন গেল, সব মরে ভূত হয়ে আছে। মৃতদের গ্রামে সে তার অতীত খুঁজছে। অসামান্য লেখা।

মার্কেস তো বলেছিলেন, রুলফোর এটা থেকেই তিনি ‘ওয়ান হ্যান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
সেই। তা তিনি বলতে পারেন। অনেকে এটা থেকে লেখার রসদ পেয়েছেন।

স্যার, কাফকা-সাহিত্যে তো প্রধানতম বিষয় হল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর ব্যক্তির অস্তিত্ব। যেখানে রাষ্ট্র একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ব্যক্তি তার অজান্তে ফাঁদে পড়ার মতো করে সেখানে পা ফেলে প্রমাণ করছে তার ওপর আরোপিত বাস্তবতাটা মিথ্যে ছিল না। সে তখন নিয়তি হিসেবে সেটিকে মেনে নিচ্ছে। কাফকার সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সূত্রপাত ঘটে, পুঁজিবাদ সবে আসছে, কর্পোরেট-মিডিয়া শক্তি তখনো আসেনি। তবে কাফকা পড়তে গেলে মনে হয় তিনি যেন বিংশ শতকটা জেনে লিখেছেন। আমার প্রশ্ন হল: বিংশ শতকে রাষ্ট্রশক্তি, কর্পোরেট শক্তি ও মিডিয়া শক্তি এত তীব্রভাবে আমাদের বেঁধে ফেলেছে, অথচ এই নিয়ে জ্বালাময়ী কোনো উপন্যাস পাচ্ছি না কেন?  বর্তমান ব্যক্তির সংকট নিয়ে কেউ কি তেমন করে লিখতে পারছেন?
এখানে আমি বাংলাদেশের প্রসঙ্গটাও টেনে নিচ্ছি। বাংলাদেশেও আমাদের যে নাগরিক সংকট। ঐ তিন শক্তির ফলে আরোপিত যে বাস্তবতা, সেটি  নিয়ে লিখতে পারছেন কেউ? আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর কোন উপন্যাসটা আজকের প্রতিনিধিত্ব করবে?
প্রতিটা লেখকের উচিত তার নিজের বাস্তবতা নিয়ে লেখা, নিজের দেখা জগত নিয়ে লেখা। দেখো আমি যা লিখেছি সবই আমার দেখা বাস্তবতা। ঢাকায় আমি থাকি নি। যেভাবে ঢাকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ তাতে আমি খুব বড় করে নাগরিক সমস্যা নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারবো না। তাতে দুয়েকটি গল্প লেখা সম্ভব; আমি লিখেছি। যারা দীর্ঘদিন ঢাকায় আছেন, ঢাকার পরিবর্তনটা চোখের সামনে ঘটেছে, তাদের উচিত এই সময়ে নাগরিক সমস্যা নিয়ে লেখা। এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশের ভালো সাহিত্য মানেই গ্রামনির্ভর সাহিত্য। মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর তিন বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার ভাবে গ্রাম ও প্রান্তিক জীবন নিয়ে লিখেছেন। তারা অসম্ভব ভালো লিখেছেন, বুঝেছ? তারা তাদের সময় নিয়ে লিখেছেন বলেই সেটি দাঁড়িয়ে গেছে। আজকের লেখকদের দাঁড়াতে হলে তাদের সময় নিয়ে লিখতে হবে।  

তরুণরা আজ নাগরিক জীবনে বসে মঙ্গা নিয়ে গল্প লেখেন, মহাজন নিয়ে গল্প লেখেন। আমি নিজে কয়েকজনের গল্পে দেখেছি। কেউ কেউ ইতিহাস পড়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছেন। আপনি নিজেও দুটি উপন্যাস লিখেছেন অতীত-প্লট থেকে। এটা কি লেখকের একধরনের স্কেপিজম নয়?
আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেটি স্কেপ নয়, বুঝেছ? আমি যেটা লিখেছি, সেটা না লিখলেই স্কেপিজম হত। কিন্তু তোমাদের যারা মঙ্গা নিয়ে লিখছে, মহাজন নিয়ে লিখছে, তারা কেন লিখছে আমি বুঝছি না। সময় তো অনেক এগিয়েছে, তরুণরা তাদের সময় নিয়ে লেখুক। আমিও তো সেটা চাই। তুমি একটা উপন্যাসের নাম বলতে পারবে, যেটা এই সময় নিয়ে দুর্দান্ত উপন্যাস হয়েছে? পারবে না তো! তবে আমি আশাবাদী। ভীষণ আশাবাদী, কেউ না কেউ আসবেই।

আপনার এই কথা থেকে আমার ফকনারের কথা মনে পড়ে গেল। ফকনার তার এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘যদি লেখক হিসেবে আমার অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে অন্য কেউ আমার লেখাগুলো লিখতেন। হেমিংওয়ে-দস্তয়েভস্কি—সবার ক্ষেত্রেই আমি একই কথা বলব। শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ নন, শিল্পকর্ম গুরুত্বপূর্ণ; যেহেতু নতুন করে আর কিছু বলবার নেই। শেকসপিয়ার, বালজাক, হোমার সকলে প্রায়ই এক বিষয়েই লিখেছেন। এবং তারা যদি আরো হাজার বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে প্রকাশকদের বই প্রকাশের জন্য নতুন লেখকের দরকার হত না।’
ঠিকই বলেছো। তবে কি জানো, প্রত্যেক লেখক তো তার সময়কে নিয়ে লেখে, সেই কারণে সবার আলাদা গুরুত্ব আছে। হোমার সারাজীবন লিখলে তো আর তিনি আচেবের লেখাটা লিখতে পারতেন না। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক লেখককে তার জাতির গল্পটা জানতে হয়েছে, তার সময়কে ধরতে হবে। সেইভাবেই তো সাহিত্যের পরম্পরাটা রক্ষিত হয়।  

( চলবে... চার পর্বের দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারের তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হল আজ) 

প্রথম পর্বের লিংক: মার্কেস কোনোদিন দাবি করেছেন যে, তিনি ম্যাজিক রিয়েলিজমের স্রষ্টা?
দ্বিতীয় পর্বের লিংক: ‘বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রটা এখন ইউরোপ থেকে সরে যাচ্ছে’

 

 

print
 

আলোচিত সংবাদ