মাশরাফি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে লোকগাথার নায়ক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৭ | ২ ভাদ্র ১৪২৪

মাশরাফি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে লোকগাথার নায়ক

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৬

print
মাশরাফি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে লোকগাথার নায়ক
গৌতম ভট্টাচার্য কলকাতার জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান থেকে শুরু করে ম্যারাডোনা, নেলসন মান্ডেলা, অমিতাভ বচ্চন, আশা ভোঁসলের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এবার তিনি নিজেই দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমকে।সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন আপন তারিক। 

গৌতম ভট্টাচার্য কলকাতার জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান থেকে শুরু করে ম্যারাডোনা, নেলসন মান্ডেলা, অমিতাভ বচ্চন, আশা ভোঁসলের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এবার তিনি নিজেই দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমকে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন আপন তারিক

আপনাকে অনেকেই ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথিকৃতদের অন্যতম বলে মনে করেন। এমন কী অনেকের মতে আপনি দুই বাংলা মিলিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক। আপনার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিকের কথা শুনতে চাই। 
দেখুন আমি পথিকৃৎ নই। এমন কোন দাবিও করছি না। মনে হয় না যে আমাদের এখানে কেউ এমন দাবি করেন। আমাদের ওখানে মতি নন্দী ছিলেন, ছিলেন অশোক দাশগুপ্ত। তারা একটা ধারা তৈরি করে দিয়েছেন। আর আমি ব্যাট করতে এসেছি অনেক পরে। যদি ধরে নেই এটা ৫০ ওভারের ম্যাচ তবে আমি বোধহয় ২৮ ওভারে ব্যাট করতে এসেছি।

এ কারণেই বলবো ধারাটা আমি তৈরি করিনি। তবে আমি বেশ খুশি যে এই ম্যাচটা যখন হচ্ছিল তখন শুরুর দিককার ওভারগুলো আমি বেশ মন দিয়ে দেখেছি। তখন আমি পাঠক ছিলাম। তখন মনোযোগ দিয়ে সব দেখেছি। তারপর নিজেই একসময় খেলার মধ্যে ঢুকে গেছি। কিন্তু আমি এটা শুরু করেছি এমন কোনো দাবি করার সুযোগ নেই। আমি বলতে পারি এটা একটা রিলে দৌড়ের মতো। পূর্বসূরিরা একটা ব্যাটন দিয়েছেন। সেটা নিয়ে আমি দৌড়াচ্ছি। ব্যাটনটা এক সময় কেউ একজন আমার কাছ থেকে নিয়ে নেবে। এভাবেই চলছে।

মতি নন্দীর কথা বলছিলেন। সেই সময়টা তিনি ছাড়াও আর কাদের লেখা আপনাকে প্রাণিত করেছেন?
আমি একটা সময় পর্যন্ত মতি নন্দীর লেখা পড়তাম। তারপর দেখলাম যে, উনার লেখাটা টেলিভিশন এসে যাওয়ার পর পড়তে সব সময় ঠিক ভাল লাগছে না। কারণ লেখার মধ্যে আমি টেকনিক্যাল জিনিস আর অন্তরালের খবর খুঁজতাম। যেগুলো কভারেজ থেকে সব সময় পেতাম না। যখন আমি ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আসি, তখন আমার মনে হয়েছিল যে, একজন পাঠক হিসেবেই আমার দায়িত্বটা অ্যাপ্রোচ করা উচিত।

সাংবাদিক হিসেবে আমার ভাবা উচিত যে, পাঠক গৌতম ভট্টাচার্য কী চাইছে সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের কাছে। আমি একজন অ্যাভারেজ পাঠক, আমাকে যদি সে সন্তুষ্ট করতে পারে, তাহলে ধরে নেয়া যায় অন্য পাঠকদেরও মোটামুটি সন্তুষ্ট করতে পারবে। অন্তত সে পাঠককে বোঝাতে পারবে সে যেটা চাইছে সেটার কথা ভেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। এটাই আমার রোডম্যাপ ছিল।

আপনি ক্রীড়া সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন সেই ১৯৮০ তে। এরপর বিবর্তন এসেছে লেখায়। বদলে গেছে সাংবাদিকতার ধরণ। শুরুর সঙ্গে এখন কী পরিবর্তন চোখে পড়ছে?
এখানকার ক্রীড়া সাংবাদিকতার কাজটা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। বিশেষ করে আমি বলবো ক্রিকেট-ফুটবল দুটোই যারা করেন তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে গেছে। কারণ আমরা কিছুটা সুবিধা পেয়েছিলাম, তার আগে যারা ছিলেন তারা আরো পেয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে, খুব স্বচ্ছন্দে প্লেয়ারদের সঙ্গে মেশা যেতো। কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়া যেতো। এখন বাণিজ্যিক কারণে দূরত্ব হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, সিকিউরিটিটা বেড়ে গেছে। এই যে লোকে বলে, নাইন ইলেভেনে বোমা পড়েছিল টুইন টাওয়ারে।

আমার তো মনে হয়, বোমা পড়েছিল প্রত্যেকটা ক্রীড়া সাংবাদিকের ওপর। কারণ তারপর থেকে নিরাপত্তাটা এমন একটা দুশ্চিন্তা হয়ে গেছে যে অর্ধেক সময় ড্রেসিংরুমের কাছাকাছি যাওয়া যায় না। এর সঙ্গে ম্যাচ গড়াপেটা সংক্রান্ত ঘটনা; সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে গেছে। সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে গিয়ে দেখেছি, সেখানেও ফুটবলারদের কাছে এখন যাওয়া যাচ্ছে না। টেলিভিশন কমেন্ট্রেটর হিসেবে যেসব ফুটবলার কাজ করছেন এর বাইরে কোনো ফুটবলারের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। গোটা বিশ্বকাপে দেখার চেষ্টা করেও পেলে বা জিকো, কাউকে দেখিনি। আসলে দেখার কোনো সুযোগই ছিল না। অথচ আগে যারা বিশ্বকাপ কাভার করেছেন তারা অনেক কাছ থেকে তাদের দেখতে পেয়েছেন।

ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাই, ইন্ডিয়ান টিমের সঙ্গে আগে সহজে মেশা যেতো, তাদের কাছে যাওয়া যেতো। আমরা পাশাপাশি ঘরে থাকতাম বলে অধিনায়কের ঘরে আড্ডা মারতে যেতাম। এখন মনে হয় সেসব আগের জন্মে ঘটেছিল। কাজেই এখন যারা ক্রীড়া সাংবাদিক, তাদের জন্য কাজটা অনেক কঠিন; কারণ তারা প্রথমেই দেখছে, ক্রিকেট মাঠে সব কোণে প্রায় ১৬জন ফিল্ডার দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার মাঝখান দিয়ে এটাকে মারতে হবে। আমরা যখন শুরু করেছি তখন সেই ১৬জনের সংখ্যাটা আটজনে ছিল। তার আগে যারা ছিলেন তাদের সামনে তিনজন ছিলেন। যতদিন যাচ্ছে কাজটা আরো কঠিন হচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতা কি আপনি অনুসরণ করেছেন? দেখছেন কী-না কি লেখা হচ্ছে এখানকার পত্রপত্রিকায়?
বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতা এখনো আমি খুব এডমায়ার করি। কারণ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা আবেগ আছে। একটা প্যাশন আছে। সেটা তাদের টিম সমর্থনে আছে। সেটা তাদের লেখার মধ্যেও আছে। এবং যতোদিন যাবে হয়তো এই সমর্থনটা কমে আসবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে আজ থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর পর যারা সাংবাদিকতায় আসবে তারা হয়তো অনেকেই হাসবে, বলবে যে এরা কি রকম দেশপ্রেমকে টেনে লেখালেখি করতো! কিন্তু প্রত্যেকটা জিনিস, প্রত্যেকটা পারফরম্যান্স সেই আমলের নিক্তিতে বিচার হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে। ১৬ বছর ধরে একটা আইডেন্টিটির জন্য চেষ্টা করছে। যখন সেটা পাচ্ছে, তখন সাংবাদিকদের স্ফুরণ হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিছুদিন আগে একটা প্রয়োজনে আমার নিজের পুরনো রঞ্জি ট্রফির লেখা পড়ছিলাম। লেখা পড়তে গিয়ে দেখলাম, বেঙ্গল যখন রঞ্জি ট্রফির চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেবার লেখা একটা ম্যাচ রিপোর্টে আমি লিখেছি- আমরা আউট করলাম। আমার নিজেরই পড়ে মনে হল ‘আমরা আউট করলাম’ আবার কি? এটা আবার কী! বেঙ্গল টিম আউট করেছে। কিন্তু ওই সময়ে একজন সাংবাদিকও চাইছিলেন বাংলা রঞ্জি জিতুক।

কাজেই সেই নিরিখে বাংলাদেশে আমি মনে করবো যারা পরে সাংবাদিকতায় আসবেন, তারা ভেবে দেখবেন যে, সেই সময়ের সাংবাদিকদের স্পিরিটটা কী রকম ছিল। আমি কাছ থেকে বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের দেখি, আমার দারুণ লাগে। আমার মনে হয় কোথাও এই যান্ত্রিক পেশাদারিত্বের বাইরে এরা মানুষ হিসেবে টিমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। আমরা এতো যান্ত্রিকতা দেখে অভ্যস্ত যে এটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দিকে চোখ ফেরাই: অনেক বছর ধরে টাইগারদের খেলা দেখছেন। ওপার বাংলা থেকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই পথচলা?
আমার মনে হয় বাংলাদেশ ঠিক পথেই এগোচ্ছে। বাংলাদেশ মাঝখানে একটা সময়ে হাবিবুল বাশার যখন অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলেন, যখন তার অধ্যায়টা শেষ হয়ে গেল, সেই সময় মোহাম্মদ আশরাফুলকে বিসিবি অধিনায়ক করল। আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্তটা সেই সময় ঠিক হয়নি। কেননা, আশরাফুল খুব বড় মাপের ক্রিকেটার, বড় অধিনায়ক নন। এমন ভুল একটা সময় আমাদের দেশেও হয়েছে। শচীনকে অধিনায়ক বানিয়েছি।

সেরা ক্রিকেটার সেরা অধিনায়ক হবেন, এর কোনো মানে নেই। একটা টিমকে তৈরি করার জন্য স্পেশালি বাংলাদেশের মতো একটা টিম যেটা তৈরি হয়ে উঠছে সেখানে অধিনায়ককে কিছুটা সংস্কারক হতে হবে। তাকে হতে হবে ফাদার ফিগার। যেমনটা মাশরাফি এখন। যেটা সুমন সেই সময় ছিলেন। আমার মনে হয়, ওই সময় আশরাফুল না হয়ে মাশরাফিকেই যদি অধিনায়ক করা হতো কিংবা অন্য কাউকে যার সার্বিক একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, যিনি শুধুই সেরা ক্রিকেটার নন, তাহলে বাংলাদেশের এই উত্থানপর্বটা আরো চারবছর আগে হতো।

মাশরাফির কথা তুললেন। আপনার লেখায় বরাবরই আলাদা একটা গুরুত্ব পেয়ে থাকেন টাইগারদের রঙিন পোশাকের এই অধিনায়ক…
দেখুন, মাশরাফির জীবনটা যে কোনো বাঙালি ছেলেকে উদ্বুদ্ধ করার মতো। কিভাবে লড়াই করে ও উঠে এসেছে! আমরা বাঙালি ফাস্ট বোলার সম্পর্কে শুনেছি বরুণ বর্মণ, সুব্রত অনেকের কথাই। তারা হয়তো দুর্দান্ত বোলার ছিলেন কিন্তু এখনো তাদের নিয়ে কথা বললে লোকে বলে যে তাদের হৃদয়টা ছিল না। তারা অনেকে কপিল দেবের সঙ্গে লড়েছেন কিন্তু বড় আসর শুরু হতেই তারা পালিয়ে গেছেন।

মাশরাফি একজন সিংহ-হৃদয় ক্রিকেটার। ওকে কেকেআরে থাকার সময়ও দেখেছি, সবসময় উজ্জীবিত। কলকাতায় বোরোলিনের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো একসময়, যেখানে লেখা থাকতো: ‘জীবনের ওঠা পড়া কিছুই লাগে না গায়’। মাশরাফি সেই ধরনের। সেই জন্য আমার মনে হয় সৌরভের পর দুই বাংলা মিলিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণামূলক চরিত্র হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

ভারতের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ১ রানে হারের পর অনেকে মাশরাফির সমালোচনায় মেতেছেন। এমন কী সুনীল গাভাস্কারের মতো বিশ্লেষকও বাংলাদেশ অধিনায়কের একাদশে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন...
না, আমি ঠিক এভাবে দেখছি না। ওকে একটা দুটো ম্যাচ দিয়ে আপনি বিচার করতে পারেন না। মাশরাফি শুধু এই দলটির অধিনায়কই নন, দলের পিতা। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মাইক ব্রিয়ারলি। তার বলের গতি এখন একশো তিরিশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। ব্যাট হাতে নিয়মিত প্রচুর রান করে দেন, এমনটাও নয়। তবু মাশরাফিকে বাদ দিয়ে টিম নামানো যায় না।

কারণ গোটা দলের রিমোট সব সময় তার হাতেই আছে। তিনি প্লেয়িং আবার এক অর্থে নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেনও। আমি ওর বাসায় গিয়েছি, কথা বলেছি দীর্ঘ সময় ধরে। ওর ক্রিকেট দর্শনটাও মুগ্ধ করেছে আমাকে। দেখুন আমার তো মনে হয়—বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আজ অবধি কেউ এমন লোকগাথার নায়ক হয়ে উঠতে পারেননি। আমি এককথায় বলতে পারি, মাশরাফি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে লোকগাথার নায়ক।

(তিন পর্বের দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হল আজ)

এমজে/ কেআরএস

 

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad