‘মূর্তিকারিগর’ অন্যরকম এক আখ্যান

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ | ৯ মাঘ ১৪২৪

‘মূর্তিকারিগর’ অন্যরকম এক আখ্যান

চিররঞ্জন সরকার ৮:০৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

print
‘মূর্তিকারিগর’ অন্যরকম এক আখ্যান

‘মূর্তিকারিগর’ সাংবাদিক-লেখক জাহিদ নেওয়াজ খানের প্রথম উপন্যাস। এই উপন্যাসে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের জীবন কাহিনির বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা জানি যে এই দুটো বিষয় পরস্পর সংযুক্ত। কারণ, মানুষকে তো একটা সমাজে বসবাস করতে হয়। সেই সমাজে রাজনীতি রয়েছে, রাজনীতি করার জন্য নিশ্চয় তাকে নির্ভর করতে হয়। যেহেতু ভোটের একটা ব্যাপার আছে, নির্বাচনের একটা ব্যাপার আছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের জায়গা আছে। ফলে রাজনীতি ও জীবন পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।

যদিও সরাসরি রাজনীতির ব্যবহার সাহিত্যকে দুর্বল করতে পারে। একথা বহুবার আমরা শুনেছি। কিন্তু জাহিদ নেওয়াজ খান এই তত্ত্ব মানেননি। রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে যার জন্ম, সে কীভাবে উপক্ষো করবে রাজনীতিকে? তবে মূর্তিকারিগর কেবল রাজনীতির বয়ান নয়, এই গল্প মানবজীবনের বিচিত্র মাত্রা-চিহ্নিত। তার গল্পে আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা; আবার আছে সমাজের প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠীর লাড়াই-সংগ্রামে মধ্যবিত্ত হয়ে উঠার কাহিনি, পরিশেষে এই রাজনীতির শিকার হয়ে একটি জীবনের করুণ পরিণতির কাহিনি।

লেখক নিজে ময়মনসিংহের সন্তান। তার গল্পের মানুষও ঐ অঞ্চলের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ধারক। তার গল্পের চরিত্রগুলো যেন এক দুঃসহ কালের অভিযাত্রী। তারা অতিক্রম করে জটিল বন্ধুর রাষ্ট্র-সমাজের প্রদোষলগ্ন। বিষয়ের বক্তব্যধর্মিতাকে তিনি অতিক্রম করেন অভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতায়। ফলে গল্পের শৈলী বিবেচনার পাশ কাটিয়ে তাকে দায়িত্বশীল কথাশিল্পীর তকমা এঁটে দিতে হয়।

তার গল্পে চরিত্র, বৈচিত্র্য, চরিত্র বনাম সমাজ বৈপরীত্য, এমনকি রাজনৈতিক প্রসঙ্গের বিবেচনা খুবই আবশ্যিক। আঞ্চলিকতায়, ভৌগলিক অবস্থানে, আর্থ-সামাজিক বিন্যাসে জাহিদ নেওয়াজ খানের এই উপন্যাসটি ময়মনসিংহকেন্দ্রিক। কিন্তু এই ময়মনসিংহের মধ্যেই যেন সন্ধান পাওয়া যায় এক অখণ্ড ভারতবর্ষের। ত্রিশাল, ময়মনসিংহ, গৌরীপুর, জারিয়া-জঞ্ছাইল, বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার আঞ্চলিকতা বা নিসর্গ কেবল নয়, পুরো ময়মনসিংহের মানুষ তার উপন্যাসে উঠে এসেছে গভীর আন্তরিকতায়।

মূর্তিকারিগরে অনেকগুলো চরিত্র আমরা পাই। যারা স্বাধীনতাপূর্ব ময়মনসিংহের রাজনীতির খবর জানেন তাদের কাছে রফিক, আলোকময়, রতন চরিত্রগুলো খুবই জ্বলজ্বলে। তারা প্রত্যেকেই ময়মনসিংহ অঞ্চলে ছিলেন রাজনীতির সিংহ-পুরুষ। জাহিদ নেওয়াজ খানের উপন্যাসে এই চরিত্রগুলোই জীবন্ত হয়ে এসেছে। তবে তা কল্পনা মেশানো গল্পে।

স্বাধীনতা-পূর্ব আমাদের সমাজের ত্রুটি, নীচতা, স্বার্থপরতা, আত্মরম্ভিতা, দেশ শাসনে বিশৃঙ্খলা, রাজনীতিকদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ, সাম্প্রদায়িকতা- নানা বিষয় তার মূর্তিকারিগরে উঠে এসেছে। লেখক অভিজ্ঞতার পৃথিবীকেই ব্যবহার করেছেন তার গল্পে। যে-অভিজ্ঞতা বিচিত্র, অন্তর্মুখি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশীল, বিচিত্র মানুষের সমাহারে গড়া এক রাজনৈতিক বাংলাদেশের।

তার চরিত্রগুলো অনেকখানিই প্রত্যক্ষত রাজনৈতিক নির্মাণ। কিন্তু রাজনীতির ভেতর-বাইরের মানুষকে খতিয়ে দেখতে আগ্রহী তিনি। আর এ-কারণেই তার রচনায় ঘটেছে মানবিক বাস্তবের নিপুণ প্রতিফলন।

মূর্তিকারিগর উপন্যাস হিসেবে একেবারেই ভিন্ন মেজাজের। এটা মোটেও গতানুগতিক ধারার উপন্যাস নয়। রাজনীতির হাত ধরে সমাজবিবর্তনের পথে মানুষের বিবর্তন, সময়ের সেই বিবর্তনের ছবি এঁকেছেন মূর্তিকারিগর উপন্যাসে। ময়মনসিংহ ও এর আশপাশের মানুষের কাহিনি রূপলাভ করেছে এ উপন্যাসে।

স্থানীয় মানুষের লোকায়ত চেতন-অবচেতন জগতের সঙ্গে সেই সময়ের বাংলাদেশে ও ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঘটনা উপন্যাসটিতে চিত্রিত হয়েছে। ভারত ভাগ হয়ে গঠিত হয় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। পাকিস্তানি শাসকেরা নতুন আইন তৈরি করে। দেশবিভাগের পর ঘটে মানবিক বিপর্যয়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানসের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, সংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ, গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের রাজনৈতিক প্রতিঘাত ও পাকিস্তানের সহযোগীদের চরিত্র উন্মোচনে লেখকের প্রগতিশীল মননের পরিচয় ফুটে উঠেছে। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশত্যাগ, রিফিউজি আগমন, সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ বিভিন্ন পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে।

পূর্ববঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে তুলে ধরতে গিয়ে লেখক ইতিহাসকে ধারণ করেছেন। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ লেখক দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাকে অবলম্বন করে উপন্যাসটিকে মহাকাব্যিক রূপ দান করেছেন। ঔপন্যাসিকের চিন্তা-চেতনা তাঁর সৃজিত চরিত্রের মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন এ-উপন্যাসে। লেখকের ব্যক্তি-মানসের প্রতিফলন ঘটেছে উপন্যাসের চরিত্রগুলোতে।

তার গল্পের নায়ক কিশোর তরুণ। তার মধ্যে জৈবিক আকাঙক্ষা প্রবলভাবে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। লেখক অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায় যৌনতার বিষয়গুলো কিশোর বয়সে গ্রামবাংলায় কীভাবে আসে তার বর্ণনা দিয়েছেন। ‘পাডা দেখানো, নটি-পাড়া’ হস্ত মৌথুনের বিষয়গুলোর মাধ্যমে তিনি মানুষের স্বভাবজাত জৈবিক তাড়নার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।

‘শিক্ষায় কোনদিন ভাত জোটায় না, শিক্ষায় ফোটায় চোখ, আর তাই দিয়ে যে জ্ঞান হবে ভাত হবে তার থেকে।’ তৎকালীন ভারতবর্ষে, এমনকি, আজকের এই বাংলাদেশের সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট্য সাহিত্য সমালোচক হেমন্তকুমার সরকারের এই উক্তি অবশ্য-অনুকরণীয় বলে মনে হয়। মূর্তিকারিগর উপন্যাসটি আমাদের রাষ্ট্রভাবনায়, সমাজভাবনায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়-অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে এক ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শবাদ আজ খুব বেশি প্রয়োজন আমাদের। এই উপন্যানের নায়ক বাদল চরিত্রটি আমাদের আজকের বিপথগামী, বিভ্রান্ত হতাশ অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

রশিদ নামে এক প্রতিমাশিল্পীকে একাত্তরের এপ্রিল মাসে ময়মনসিংহ শহরে হত্যা করা হয়। তাকে ডাকা হয় ‘একাত্তরের যীশু’ নামে। মূলত এই রশিদ চরিত্রটিই সৃজনশীলতার আলোকে উপন্যাসে এসেছে ‘বাদল’ হয়ে। যদিও ‘মূর্তিকারিগর’-এর গল্পটি একেবারেই তার জীবনভিত্তিক নয়।

লেখক বলছেন: ‘‘রশিদের জীবনের গল্পগুলো হয়তো আরো গল্পময়, কিন্তু মৃত্যুর ঘটনাটি ছাড়া গল্পের প্রতিমাশিল্পীর সবগুলো গল্পই কল্পনা। চরিত্রগুলোও কাল্পনিক। ঐতিহাসিক সময়ের বর্ণনায় কিছু বাস্তব নাম এসেছে, তবে এটি ইতিহাসভিত্তিক কোন উপন্যাসও নয়।’’

লেখক যে জীবন দেখেছেন এবং যে জীবনাভিজ্ঞতা তাকে আলোড়িত করেছে, নিজের উপন্যাসের রসদ সেখান থেকেই সংগ্রহ করেছেন। জাহিদ নেওয়াজ খান লিখেছেন তার জন্মের আগের অভিজ্ঞতার গল্প। কিন্তু বর্ণনায় জন্মের পরের অভিজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠেছে। কখনও কখনও মনে হয়েছে চরিত্রগুলো তার নিজের আদর্শ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। সেটাও বেশ মানিয়েই গেছে। আমরা অন্তত পাঠক হিসেবে কিছু আদর্শবান চরিত্র পেয়েছি।

এই উপন্যাস আসলে একজন সশিক্ষিত তরুণের বর্ণনা, যে কেবল ইচ্ছে শক্তির জোরে জীবনে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। যার অসম্ভব কল্পনাশক্তি। স্মৃতিশক্তি। আবেগ। অনুভব। অনুভূতি। উপন্যাসের নায়ক বাদল আসলে একটি অসাধারণ চরিত্র। লেখকের বর্ণনায়: ‘‘জলে সাঁতরেও যেমন মাছেদের শরীরে যেমন জল লাগে না, তেমনি বাদল সবার মধ্যে থেকেও নিজেকে সবকিছু থেকে বাইরে রাখতে পারে। আবার সব দুঃখে-কষ্টে জড়িয়েও নিজেকে সুখী মনে করতে পারে।

সুখ বিষয়টা আসলে নিজে নিজে চর্চার মতো। বাদল জানে, দুঃখ-কষ্টের যেমন একটা কারণ থাকে ঠিক তেমনি সুখী হওয়ার উপলক্ষ থাকে এক হাজার একশ এগারটা। সেটা নিজেকে বুঝে নিতে হয়। বাদল কখনও কখনও নিজেকে দুঃখবিলাসী মনে করলেও সে জানে, শেষপর্যন্ত সে একজন সুখী মানুষ। দুঃখগুলো যে ভেসে ভেসে আসে সে সুখটা বোঝানোর জন্যই। দুঃখ না থাকলে মানুষ বুঝত কীভাবে যে সুখ কী জিনিস!’’

এই উপন্যাসে এক যুবকের বিষাদগাথা নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ধর্ম কেবলই বিভেদ সৃষ্টি করে, স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, প্রেম-ভালোবাসা এমনকি শখ-আকাঙ্ক্ষা-আসক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সব সময় প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। কিছু সহায়ক চরিত্রও দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে কি এমনটা সচরাচর আছে? নারী তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত, নিম্নবর্ণের মানুষ সমাজের প্রান্তসীমায় বাস করে, মুসলমানদের দিন কাটাতে হয় অবিশ্বাসে, অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াইরত যুবককে পালিয়ে বেড়াতে হয় পুলিশ ও সামাজের রক্তচক্ষু থেকে। এই দুইয়ের মধ্যে ভেদরেখা নির্ধারণ অসম্ভব। বস্তুত, জাহিদ নেওয়াজ খান এই চিত্রই নির্মাণ করেছেন ‘মূর্তিকারিগর’ উপন্যাসে।

মূর্তিকারিগর একটা আলাদা ধাচের উপন্যাস, সত্তরের দশকের রাজনৈতিক আদর্শ ও টানাপড়েনের এক বর্ণাঢ্য মানচিত্র। এখানে হিন্দু-মুসলমান প্রেম, দ্বন্দ্ব, বিহারীদের বাংলাদেশে আসা, এদেশের মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া, তার পর সুযোগ বুঝে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়া। রয়েছে হিন্দুদের দেশত্যাগের গল্প, ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোর কিছু খণ্ড চিত্র, আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর কাব্যিক বর্ণনা।

ধর্মের নামে এখানে কীভাবে সামাজিক ভাবে মানুষকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। আবার গ্রামের মানুষ স্বভাবজাত ভাবেই কেমন করে এসবের মধ্যেই টিকে থাকে। এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ করেও যে টিকে থাকা যায় সেই গল্পও আমরা পাই। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উচ্চকণ্ঠ অন্য সব কণ্ঠস্বরকে তলিয়ে দিতে পারে। আবার এই দুঃসহ ও দুর্মর মানচিত্রের ভেতরের পাতায় বাস করে ভালোবাসা, সেখানে আশ্রয় পায় প্রেম, জন্ম নেয় আশা। এক কথায়, অপূর্ব!

কোনো লেখক কঠিন বাস্তবের রূঢ় চিত্র এড়িয়ে বেশ আলাভোলা নিটোল গল্প ফাঁদতে পারেন, সেটি হবে ওই লেখকের লেখক হিসেবে নিজের দায়িত্ব থেকে পলায়ন। রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি একসময় তাঁর এক অগ্রজ লেখককে এই বলে তিরস্কার করেছিলেন, মানুষ রাস্তায় গুলিতে মারা যাচ্ছে, আর আপনি নিজের ব্যক্তিগত শোক-দুঃখের গল্প লেখায় ব্যস্ত! নিঃসন্দেহে জাহিদ নেওয়াজ খান সেই দলভুক্ত লেখক নন। একজন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি হিসেবে তার কাজ ছিল ক্ষমতাহীন ও দুর্বল মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। তাদের সঙ্গে সংহতি নির্মাণ। এই কাজটি তিনি করেছেন যথাযথ ভাবেই।

অসম্ভব গতিময় গদ্যে জাহিদ নেওয়াজ খান উপন্যাসটি লিখেছেন। ‘‘কাউকে কাঁদতে দেখলে তাকে মনে পড়ে, কাউকে হাসতে দেখলেও। নিজের কান্না পেলেও তাকে মনে পড়ে, হঠাৎ মন ভালো করা কোন খবর পেলেও মনে পড়ে তাকে। আনন্দের সময় তার কথা বেশি মনে হয়, সবচেয়ে বেশি মনে হয় কষ্টের সময়।

সে আছে সব সময়। মনের ভেতর তারবসবাস, তার বাস মস্তিষ্কের ভেতরেও। হৃদকম্পনে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, রক্তের বয়ে চলাতেও তার চলাচল।....’’

এক অসম প্রেম সন্ধ্যার আরতির মতো জেগে থাকে বাদলের হৃদয়ে। প্রতিনিয়ত অস্তিত্বে যার বাস, তাকে লেখক ঠিকই ভাষায় ধরেছেন: ‘‘যতটুকু করার সন্ধ্যাদি করে দিয়ে গেছেন। হাত বাড়ালেই কিংবা হাত না বাড়ালেও তার অস্তিত্ব, সারাক্ষণই তার সঙ্গে মিশে থাকা; তারপরও তিনি চলে গেছেন কোনো এক অচিনপুর। এখন যে জীবনপুরে বাদলের বসবাস সেটাতো সেই সন্ধ্যাবাতির কারণেই!’’

গ্রামের মানুষের মুখের ভাষায় অসম্ভব গভীর ভাবনা তিনি একেছেন এই ছোট্ট উপন্যাসে। ‘‘সূয্য ডুবলেও যে মাইনষে কষ্ট পায়, এইডা পরথম হুনলাম। ধর যে মাইনষে কষ্ট পায় খাইবার না পারলে, অসুখ-বিসুখ করলে কাছের মানুষ বা গরুডা মইরা গেলেও মানুষ কষ্ট পায়!’ ...

এই সংলাপ শোনার পর কয়েক দণ্ড চুপচাপ বসে থাকতে হয়। জীবনের সঙ্গে মানুষের এমন কিছু স্মৃতি লেপ্টে থাকে, সেটা সকাল দুপুর, রাত কিংবা সূর্যাস্ত যে কোনো সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে, সেই সময়টাই জীবনে ধ্রুব হয়ে ওঠে। কিন্তু সবাই কি সেই স্মৃতিময় দুঃখ বোঝে? কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না! যেমন বোঝেনি বাদলের বন্ধুরা। কিন্তু বাদলের সন্ধ্যার স্মৃতি ভুলিয়ে দেবে, তেমন সর্বগ্রাসী শক্তি কোথায় আছে?

কৈশোরের ভালোলাগা-ভালোবাসাগুলোও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে দারুণ জীবন্ত হয়ে। ‘‘বাদল তাদের বোঝতে পারে না যে বিষয়টা সেরকম না। সত্য যে ইদানীং মেয়েদের দেখলেও তার বুকের ভেতর কেমন কেমন কেমন করে। একদিন চুলে জবাকুসুম তেল মেখে আসা জবার সঙ্গে একটু ছোঁয়াতেই তার মনের আর শরীরের ভেতর গুড়ুম গুড়ুম ডাক উঠেছিল। হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ ডাকার মতো। কিন্তু কখনও কখনও বিদ্যুৎ ডাকলেও যে বর্ষা নামে না সেরকম ছিল সেদিন।

বাদলের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তুমুল বৃষ্টি হোক। তার বুকের ভেতরের ডাকটা চৌত্রিশটা বিদ্যুচ্চমক হয়ে টানা চারদিন ঝরে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে নিয়ে যাক। সেও ভেসে যাক, আবার আটকে থাকুক জবার নিঃশ্বাসের কাছে যেমন ওইরকম বর্ষার দিনগুলোতে যখন কৈ মাছেরা গাঙ পেরিয়ে ভাসতে ভাসতে তাদের বাড়ির উঠোনে এসে লাফালাফি দাপাদাপি করে, সেই রকম!’’ কী অসম্ভব আবেগ! কী নিষ্কলুষ কিশোরপ্রেমের ভাবনা!

‘মূর্তিকারিগরে’ গ্রামীণ জীবন, গ্রামের মানুষের বৈশিষ্ট্যও এসেছে খুবই সহজ সরলভাবে। ‘‘শুধু ঝগড়া নয়, কখনো কখনো লাঠিসোটা-বল্লম নিয়েও তারা মারামারি করেছে, তারপরও মনে হয় ওই মানুষগুলো কতো আপন! তারা ঝগড়া করেছে, মারামারিও; তারপর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দশ ঘরের মানুষ এক হয়ে আবার মিটমাট করেছে, এরপর আবারও ঝগড়া, আবারও মিটমাট! উপন্যাসটি পাঠ করলে মনে হয় আমি আমার যাপিত জীবন দেখছি। চারপাশকে দেখছি!

সম্পর্ক নিয়েও উপন্যাসে আছে গভীর ভাবনা, অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ! ‘‘একবার তার মামীর বাচ্চা হওয়ার পরদিনই মারা গেল। বাচ্চাটাকে সে দেখতেও পারেনি। কিন্তু ওই একরত্তি বাচ্চাটার জন্য তার সে কি কান্না! এটাই কি রক্তের সম্পর্ক? বাদল বুঝতে পারে না!

তবু বুঝতে চেষ্টা করে সে। মা-বাবার মধ্যে রক্তের সম্পর্ক নেই। তাহলে তাদের মধ্যে এত প্রেম কীভাবে! এর মানে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্ক হতে পারে। এর নাম কি ভালোবাসা? সেটাই বা কীভাবে হয়! বাদলের মনে হয়, ভালোবাসা হতে হলে তো ছেলে আর মেয়ে হতে হবে। যেমন জবার জন্য তার একটু একটু ভালোবাসা আছে। কিন্তু আওলাদ বা অন্যদেরও তো সে জবার চেয়ে কম অনুভব করে না। তাহলে! এটা কি ভালোবাসা না? এটা কি শুধুই বন্ধুত্ব? বাদলের মাথা গুলিয়ে আসে।’’

আবার অন্য এক জায়গায় লেখক বলেছেন, ‘‘মানুষের সম্পর্কগুলো যেমন খুব জটিল আবার খুব সুন্দর এবং অদ্ভুতও। হঠাৎ যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক কিংবা জানা বা অজানা কারণে আপন মানুষ পর হয়ে যায়, আবার দূরের কেউ হয়ে যায় আপন।’’ খুবই সাধারণ সব কথা। অথচ কি অসাধারণ তার তাৎপর্য!

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। শেষ দৃশ্যে উপন্যাসের নায়ক বাদল আক্রান্ত হয় স্বাধীনতাবিরোধীদের দ্বারা।  ‘‘তাকে আবারও টেনে-হিঁচড়ে দাঁড় করানো হয়। তাপর চলে লাথি। পড়ে যাবার পর আবারও দাঁড় করিয়ে আবারও লাথি। পাথর বৃষ্টিও চলতে থাকে। এভাবে সে যখন ময়মনসিংহ রেল স্টেশনে পৌঁছায় তখন সে ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে প্রায় একটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। ......বাদলের চোখটা তখনও খোলা! বাঁ চোখটা পিটপিট করছে। তখনও বাদল ওই চোখ দিয়ে একটু একটু দেখতে পারে, তবে জায়গাটা কোথায় সে বুঝতে পারে না। শুধু এটা মনে পড়ে, এখানেই কোথাও দাঁড়িয়ে সে অনেক মানুষকে পানি খাইয়েছিল। ইন্ডিয়া থেকে যখন দলে দলে বিহারী মুসলিমরা ট্রেন ভরে ভরে নামছিল, তখন তৃষ্ণার্ত তাদেরকে গ্লাস ভরে ভরে পানি খাইয়েছিল বাদল। এখন তারও পানির জন্য খুব তেষ্টা পায়!’’

স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির আক্রমণে একজন আদর্শবান যুবকের নির্মম আত্মদানের ঘটনার বর্ণনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় উপন্যাসখানি!

উপন্যাস শেষে পাঠককে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ! এ কি ঘটল! এক অপার সম্ভাবনাময় যুবকের এমন নির্মম মৃত্যু সত্যি পাঠককে বিচলিত করে। উপন্যাসের, ঔপন্যাসিকের সার্থকতা সম্ভবত এখানেই!

উপন্যাসের কাহিনি অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। বিশাল প্রেক্ষাপট। কিন্তু দ্রুত সেগুলোর ভারভাষ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ‘টি-টুয়েন্টি’র মজা আছে। কিন্তু যারা টেস্ট ক্রিকেট দেখতে আগ্রহী, তাদের কাছে একটা ক্ষুধা রয়েই যায়। আরও ব্যাপক পরিসরে চরিত্র ও সময়কে ধরবার সুযোগ তো ছিলই। কিন্তু মনে হয় ‘প্রথম উপন্যাস’ হিসেবে লেখকেরও একটু তাড়াহুড়ো ছিল। শেষ করার। কিন্তু তাতে যা হয়েছে, ব্যাপক ক্ষুধা জাগিয়ে লেখক দ্রুত সুস্বাদু একটু ক্ষীর পরিবেশন করেই সটকে পড়েছেন। এতো যেন ‘শেষ হওয়াও হইলো না শেষ!’

এই ভিন্ন স্বাদের অসাধারণ বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন গুণী শিল্পী ধ্রুব এষ। বইটি প্রকাশ করেছে ‘আবিষ্কার’! একজন সম্ভবানাময় লেখককে আবিষ্কার করে মননশীল পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য প্রকাশককে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়।

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট। 
chiroranjan@gmail.com

print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad