দুর্ঘটনা নয়, বলুন 'হত্যা'

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

দুর্ঘটনা নয়, বলুন 'হত্যা'

মেহেদি রাসেল ৪:০২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

print
দুর্ঘটনা নয়, বলুন 'হত্যা'

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় মারা যান মাইক্রোবাসে থাকা গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদ, চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। ২০১১ সালের ১৩ আগস্টের এ ঘটনা নাড়া দেয় সারা দেশের মানুষকে। বিগত বছরগুলোতেদেশজুড়ে অন্যতম আলোচিত দুর্ঘটনার খবর হয়ে ওঠে এটি। অভিযুক্ত চালক জমির উদ্দিনকেএ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ক্ষতিপূরণ চেয়ে তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের করা এক মামলায় গত ৩ ডিসেম্বর তারেকের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজর ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আসামি পক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

.

ফেব্রুয়ারিতে জমির উদ্দিনকে যাবজ্জীনক সাজা দেওয়া হলে পরিবহন খাতের লোকেরা পুরো দেশ অচল করে দেওয়া এক ধর্মঘটের নামে। নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যান একজন।পরিবহন খাতের এক নেতা তখন বলেন, 'যাবজ্জীবন আর ফাঁসির দায় মাথায় নিয়ে আমরা গাড়ি চালাতে পারব না। যতক্ষণ না আইন বাতিল ও দণ্ডিত চালকদের মুক্তি না দেওয়া হবে, ততক্ষণ এ আন্দোলন চলবে।’ (প্রথম আলো অনলাইন, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। উল্লেখ্য, ধর্মঘটের কয়েক দিন আগে মীর হোসেন নামের আরও এক চালকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ট্রাকচাপা দিয়ে সাভারে এক নারীকে হত্যা করেছিলেন।

পারিবারিক রাস্তা দিয়ে মাটিভর্তি ট্রাক চলাচলে বাধা দিলে ওই নারীর ওপর দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাক চালিয়ে দেন মীর হোসেন। এ ক্ষেত্রে এটি কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না। হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি ট্রাকটিকে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে, মামলাটিকে কোনো অবস্থায় দুর্ঘটনা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা চলে না। কিন্তু পরিবহন খাতের লোকেরা খুনিকে বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এ মামলার ন্যায়বিচার না হলে মীর হোসেনের মতো লোকেরা এ রকম ঘটনা বারবার ঘটানোর সাহস পেতেন। পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকদের সে সময়ের অনৈতিক ঐক্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এক নৈমিত্তিক ঘটনা। চালকেরা যাচ্ছে তাই ভাবে গাড়ি চালান। মহাসড়কে এক অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোটেন। ট্রাফিক আইনও যথাযথভাবে মেনে চলেন না অনেকে। অবশ্য বেশির ভাগ চালকই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নন। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ভরে আছে আমাদের সড়ক ও মহাসড়কগুলো। চালক কিংবা গাড়ির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যায় না এদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনায় মালিক ও শ্রমিকপক্ষ ধর্মঘট ডেকে বসেন। ফলে, পুরো পরিবহন খাতের কাছে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই জিম্মি। এমতাবস্থায় তারেক মাসুদের দুর্ঘটনা মামলায় ক্ষতিপূরণের রায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাই বটে।

এতদিন আমরা ভাবতেই পারতাম না যে, সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় কারও সাজা হয়। কেননা, সাজা হলেও সেটি এত লঘু হতো যে, তাতে দোষীদের কোনো ভাবান্তরই হতো না। সড়ক দুর্ঘটনা যে নিছকই দুর্ঘটনা নয়, তাও প্রমাণিত হলো এ রায়ের মাধ্যমে। এটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ রায়ের পর বলেছেন, ‘যে ঘটনায় তারেকমাসুদ-মিশুক মুনীরসহ এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল, সেটিকে আমরা বলি দুর্ঘটনা। কিন্তু এটা নিছকই দুর্ঘটনা নয়। এমন ঘটনার পেছনে অনেক মানুষেরই দায়দায়িত্ব আছে। শুধু চালকের নয়। বাস বা ট্রাক কোম্পানি, মালিক, বিমা প্রতিষ্ঠানেরও দায়দায়িত্ব আছে।’ (প্রথম আলো, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭)

সত্যিই সড়ক দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ঘটনাকে কি নিছকই দুর্ঘটনা বলা যায়? এটি কি পরিবহন সেক্টরের লোকদের দীর্ঘদিনের খামখেয়ালির ফল নয়? চালকের মাদকাসক্তি,অসতর্কতা কিংবা বেপরোয়া ভঙ্গির খেসারত নয়? ফিটনেসবিহীন যান চলাচলের মাশুল নয়?

সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় এত বড় অঙ্কের জরিমানা সচরাচর হয় না। এর আগে ১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু নিহত হওয়ার ঘটনায় হাইকোর্ট ২০১০ সালে ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছিল।(বিডিনিজউ২৪, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭)। কিন্তু রায়টি হয়েছিল দীর্ঘ ২১ বছর পর। সুতরাং, যেকোনো বিচারে মামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। চালকদের বেপরোয়া ভঙ্গি কিংবা মালিকদের পাত্তা না দেওয়া মানসিকতার কিছুটা পরিবর্তন এখন আশা করাই যায়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘দুর্ঘটনার দায় চালককেও নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে চালককেও ক্ষতিপূরণের ভার নিতে হবে। তা না হলে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে তারা সতর্ক হবেন না।’ (প্রথম আলো, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭)। এ রায়ে আরও লক্ষণীয় হলো, চালক, বাস মালিক কোম্পানি এবং বিমা প্রতিষ্ঠান সবাইকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা গুনতে হবে। ফলে, সব মহল থেকেই সতর্কতা বাড়বে।

সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কিত যেকোনো পরিসংখ্যানই চমকে ওঠার মতো। প্রতিদিনই সড়কে কেউ না কেউ মারা যান।বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের অন্য দেশগুলো অঙ্গীকার করেছিল ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার। কিন্তু কার্যত তা হয়নি, উল্টো এ সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দিনে গড়ে ২৪ জন মারা গেছে। সে বছর সড়কে মোট মৃত্যুসংখ্যা ছিল ৮,৬৪২। (প্রথম আলো, ১০ জানুয়ারি ২০১৬)।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বিষয়গুলোর সমাধান করতে পারলে এটা কমিয়ে আনা যাবে বহুগুন। বাণিজ্যিক গাড়ির জন্য চালক থাকার কথা দুই জন। এ নিয়মটা কি মালিকপক্ষ মানেন? চালককে যে যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা, তা কি দেওয়া হয়। যানবাহনগুলোকে যথাযথ পরীক্ষা করে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়? ফিটনেস ছাড়া গাড়িগুলো কীভাবে সড়কে চলার অনুমতি পায়? পরিবহন খাতের প্রতিটি বিভাগ আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।

শীতকাল আসন্ন। প্রায়ই ঘন কুয়াশা পড়বে। কুয়াশায় ক্ষেত্রবিশেষে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। একান্তই সেটা পারা না গেলে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানো উচিত। কিন্তু আমাদের চালকেরা কখনোই এটা মেনে চলেন না। সড়কে দুর্ঘটনার জন্য চালকদের মাদকাসক্তিও অন্যতম কারণ। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেডের গবেষণা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত চালকের কারণে দেশে ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। (সমকাল, ১৪ অক্টোবর ২০১৭)। তবে, এখন পর্যন্ত মাদকাসক্তির কারণে কোনো চালকের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে বলে শুনিনি।

তারেক মাসুদ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই মিডিয়া, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারিতে ছিল এ মামলা। ফলে, বিচারপ্রাপ্তি ছিল সময়ের ব্যাপার। সাধারণ মানুষ, যাদের জন্য মামলা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ করাই অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে ওঠে, তারাও যেন ন্যায়বিচার পান। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান যেন নিজ উদ্যোগে তাঁদের পাশেও দাঁড়ান। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা গেলে সড়কে অপমৃত্যুর সংখ্যা অনেকখানি কমবে। পাশাপাশি, উপযুক্ত জরিমানা আদায় করা গেলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ধ্বংসের হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে।

মেহেদি রাসেল : সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট।
mehedirasel32@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত মেহেদি রাসেল এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad