তাহলে তো পড়াশোনার দরকার নাই!

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

তাহলে তো পড়াশোনার দরকার নাই!

রেজানুর রহমান ১০:০২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৭

print
তাহলে তো পড়াশোনার দরকার নাই!

তাহলে কি আমরা সত্যিকার অর্থেই অসহায়? আমাদের কী কিছুই করার নাই? হাত গুটিয়ে বসে থাকব আর তামাশা দেখব? তামাশা কিন্তু দারুণ জমে উঠেছে। লাগ ভেলকি লাগ চোখে মুখে লাগ। ডুগ ডুগি বাজিয়ে সমাজের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এমন জাদুও দেখাচ্ছে একদল দুষ্টু জাদুকর। এমনিতে জাদুর প্রতি সকলেরই একটা আলাদা টান আছে। আমি যা পারি না তা অতি সহজেই করে দেখায় জাদুকর। মানুষকে কাটতে পারে। শূন্যে ভাসাতে পারে। ফাঁকা কৌটা থেকে একের পর এক পায়রা উড়ে যায়। শূন্যে ভাসে গোটা রেল গাড়ি... এরকম আরও কত শত জাদু আছে। অথচ জাদু কিন্তু জাদুই।

.

মঞ্চে যা দেখি তা মোটেই বাস্তব নয়। সবকিছুই একটু রহস্যের খেলা। কেউ বলেন হাত সাফাই। আবার কেউ কেউ জাদুকে বিজ্ঞানের সঙ্গেও তুলনা করছেন আজকাল। সে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জাদুর রকম ফেরও বদলেছে। সেটা কেমন? আসুন আপনাদেরকে একটা নাটক দেখাই। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতেই পারেন নাটক দেখতে হলে তো হয় মঞ্চ না হয় টিভি সেটের সামনে বসতে হবে। লেখার মাধ্যমে নাটক দেখাবেন কিভাবে? লেখার মাধ্যমেও নাটক দেখানো যায়। এটাও এক ধরনের জাদু। তো শুরু করা যাক।

সিকোয়েন্স-এক
(রাত। পড়ার টেবিল। অন্তুর কাল পরীক্ষা। অথচ পড়ায় মন বসাতে পারছে না। শুধুই ছটফট করছে। মা দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে ছেলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের দিকে দুধের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন)

মা : দুধটা খেয়ে নে বাবা।

ছেলে : (অস্থির) দুধ খাব না মা।

মা : (একটু চিন্তিত) কেন খাবি না? শরীর খারাপ লাগছে?

ছেলে : (ছটফট ভঙ্গি এবং কিছুটা বিরক্ত) না, আমি ঠিকই আছি। তুমি এখন যাও তো... প্লিজ...

মা : (চিন্তিত) তোর কী হয়েছে? এভাবে কথা বলছিস কেন? কোনো সমস্যা...?

ছেলে : (চরম বিরক্ত। মাকে দরজা পর্যন্ত ঠেলে দিয়ে) আমার কোনো সমস্যা হয়নি। তুমি এখন যাওতো। (মাকে এক রকম জোর করে ঘরের বাইরে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। মা অবাক হয়ে চলে যান। এমন সময় ছেলের মোবাইলে ফোন আসে। তার বন্ধু ফোন করেছে। ছেলে ব্যস্ত হয়ে ফোন ধরে) হ্যাঁ দোস্ত বল... পাইছস? আরে ব্যাটা পাইছস কিনা বল। শাহেদ তো বলল প্রশ্ন ফাঁস হইছে... কী বললি? দোস্ত... দোস্ত শোন প্রশ্ন পাইলে কিন্তু আমারে দিবি। আমি তো পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারতেছি না। এই ধরনের সিচুয়েশনে পড়াশোনা মাথায় ঢুকবে তুই বল! দোস্ত...

বন্ধুর ফোন কেটে গেল। ছেলে অস্থির পায়চারী করছে ঘরের ভিতর। বাইরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মা-বাবা দু’জনই আতঙ্কিত। ছেলেকে দরজা খুলতে বলছে। ছেলে দরজা না খুলে চেঁচিয়ে বলল।

ছেলে : অ্যাই তোমাদের কি হইছে...? আমাকে ডিস্ট্রাব করতেছো কেন? আজব তো...

(মা-বাবা আগের চেয়ে আরও বেশি আতঙ্ক নিয়ে ছেলেকে দরজা খুলতে বলে। ছেলে পাত্তা দেয় না। তার মোবাইলে আবার ফোন আসে। ব্যস্ত হয়ে সে ফোন রিসিভ করে)

ছেলে : হ্যাঁ দোস্ত বল। পাইছস? কোন লিংকে আছে। কি বললি প্রশ্ন এখন তোর হাতে? আমি আসতেছি... কি বললি ট্যাকা? আরে ব্যাটা ট্যাকা আমি আগেই জোগাড় কইর‌্যা রাখছি। মানি ইজ নো প্রোবলেম!

(বলেই দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বের হয় ছেলে)

সিকোয়েন্স-২
(রাত। ছেলের ঘরের দরজার সামনে উৎকণ্ঠিত বাবা-মা। বারবার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। হঠাৎ দরজা খুলে যায়। উদভ্রান্তের মতো ঘর থেকে বের হয় ছেলে। বাবা-মা উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চান)

বাবা-মা : (সমস্বরে) বাবা কোথায় যাচ্ছিস?

ছেলে : (উদভ্রান্তের মতো সামনের দিকে পা বাড়িয়ে) অ্যাই… একটু আসতেছি...

বাবা : (একটু প্রতিবাদী ভঙ্গি) আসতেছি মানে? এত রাতে তুমি কোথায় যাবে? কাল তোমার পরীক্ষা। যাও ঘরে যাও।

(ছেলে মোটেই গুরুত্ব দেয় না। বাবাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত গতিতে বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। বাবা-মা দু’জনই চরম উৎকণ্ঠিত। মা হঠাৎ কেঁদে ফেলেন)

সিকোয়েন্স-৩
(রাত। টিভির সামনে বসে আছেন বাবা। চরম উৎকণ্ঠা তার চোখে-মুখে। টিভি পর্দায় উপস্থাপকসহ দু’জন আলোচককে দেখা যায়।)

উপস্থাপক : সত্যিই আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য! স্কুলের পরীক্ষাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। বাবা-মায়েরাও ফাঁস করা প্রশ্নের খোঁজে দৌড়াচ্ছেন। আসুন দেখি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা কি বলেন। টিভি পর্দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ভেসে ওঠে। মিটি মিটি চোখে হাসছেন তিনি।

কর্মকর্তা : এতক্ষণ আলোচক বৃন্দ যা বললেন তার সঙ্গে আমি একমত। আসলে বর্তমান প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়...

(হঠাৎ মাকে কাঁদতে কাঁদতে টিভি রুমে ঢুকতে দেখা যায়। বুক চাপড়ে আহাজারী করতে করতে তিনি স্বামীকে বলেন)

মা : সর্বনাশ হয়েছে। আমার সর্বনাশ হয়েছে। আলমারীতে রাখা ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছি না। হায় আল্লাহ... আমি এখন কি করি...? হায় আল্লাহ...

প্রিয় পাঠক, নাটকটা আর বাড়াতে চাই না। আমার ধারণা নাটকের মূল বক্তব্য আপনার ধরতে পেরেছেন। এ যেন আর এক জাদু। মজার ব্যাপার হলো নতুন এই জাদুর সঙ্গে জড়িত আমাদের সমাজের হোমড়া চোমড়া অনেক ব্যক্তি। দেশের একটি বহুল প্রচারিত শীর্ষ দৈনিকে প্রশ্ন ফাঁসের নতুন জাদু ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ ‘বাজার আছে হরেক রকমের। ভালো বাজারের উল্টো দিকে আছে কালোবাজার। আর এই কালো বাজারের নতুন সংযোজন প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাজার। পরীক্ষার মৌসুমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয় এই বাজারে। কর্মকর্তা, কর্মচারী, ছাত্র-ছাত্রনেতা, শিক্ষক, কোচিং সেন্টার, প্রেসের কর্মচারী-এরাই এ বাজারের নিয়ন্ত্রক। আর ক্রেতা ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থী, চাকরি প্রার্থী ও তাদের অভিভাবক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই বাজারে প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় মাধ্যম।’

প্রিয় পাঠক, ভাবুন তো একবার কী ভয়াবহ তথ্য। এটাই যদি বাস্তবতা হয় তাহলে ছেলে- মেয়েরা কি আদৌ পড়াশোনা করবে? নাকি করতে চাইবে! একটি টেলিভিশনের টকশোতে সরকারের সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বললেন প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এটাই বাস্তব। বর্তমান প্রক্রিয়ায় বিষয়টির নিস্পত্তি সম্ভব নয়। কম পক্ষে ২ মাস আগে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপার কাজ সমাধা করা হয়। কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি ধাপে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনেক মানুষ এই কাজে জড়িত থাকেন। তাদেরই কেউ না কেউ প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। কাজেই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে হবে। দুষ্টু চক্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশ্ন ফাঁস করছে। কাজেই আমাদেরকেও প্রযুক্তির সাহায্যেই এই সংকট থেকে পরিত্রাণের পথ বের করতে হবে।

এটি খুবই ভালো প্রস্তাব। কিন্তু কার্যকর করবে কে? ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটাও কি সে রকম হয়ে যাচ্ছে না? দৈনিক প্রথম আলোয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাই প্রধান বিষয়। ছেলে-মেয়েরা জানল কি জানল না সেটাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। পরীক্ষার ফলাফলকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। এটা এখন চরম জায়গায় চলে এসেছে। এখন শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং এ যাওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়া গেলে তো আরও সুবিধা। শিক্ষা এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রিয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার সূত্র ধরেই লেখাটি শেষ করতে চাই। সত্যিই তো শিক্ষা এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে। এই লেখার নাট্যাংশে যে ছাত্রটির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তা কিন্তু বাস্তব ঘটনা থেকেই নেয়া। ছেলেটি মায়ের জমানো ৫০ হাজার টাকা চুরি করে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র কিনতে বেরিয়েছিল। কী ভয়াবহ তথ্য! ভাবতেই গা শিউরে উঠছে! এভাবে চলতে থাকলে ছেলে-মেয়েরা কি আদৌ পড়াশোনা করতে চাইবে। ওহ মাই গড! পড়াশোনা বিহীন প্রজন্ম! এরা ভবিষ্যতে কীভাবে দেশ চালাবে? কীভাবে...

রেজানুর রহমান : সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক।
rezanur.alo@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত রেজানুর রহমান এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad