‘কায় কি নেকচে, হামার বাড়ি পুড়চে’

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

‘কায় কি নেকচে, হামার বাড়ি পুড়চে’

উমর ফারুক ৪:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

print
‘কায় কি নেকচে, হামার বাড়ি পুড়চে’

বিকেলের রোদ তখন মিষ্টি তাপ ছড়াচ্ছে। রাস্তার দু’ধারে পাকাধান ক্ষেত। সোনালী রঙ ছড়াচ্ছে। রংপুর দিনাজপুর মহাসড়ক ধরে এইপথে খানিকটা পেরুলেই পাগলাপীর। এখানে নেমে মহাসড়ক ধরে কয়েক শ মিটার। রিক্সা অথবা ভ্যান হতে পারে বাহন। গন্তব্য হরকলি, ঠাকুরপাড়া। মহাসড়কে দাঁড়িয়েই দু’ধারের ধ্বংসস্তুপের চিহ্ন নজরে পড়বে। বামে রংপুর সদর। ডানে গঙ্গাচড়া উপজেলা। উত্তরদিকে নেমে গেছে একটা মেঠো পথ। সে পথ সোজা পৌঁছে গেছে টিটু রায়ের বাড়ি। টিটু রায় এখন বাংলাদেশে আলোচিত একটি নাম। লেখাপড়া জানে না। এলাকা ছেড়েছে বছর সাতেক আগে। নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানায় কাজ করে। তার ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে সারাদেশে তোলপাড়। পুড়েছে ১৫টি ঘর। মরেছে ১জন।

.

টিটু রায়ের বাড়ির পোড়া ছাঁইয়ের চিহ্ন এখনও পড়ে আছে মহাসড়কে। ঘরপোড়া ছাই আপনাকে ঠিক তার বাড়ি চিনিয়ে দেবে। চারিদিকে পোড়া গন্ধ। সরকারি উদ্যোগে চারিদিকে ছড়ানো নতুন টিন। ক’জন কারিগর নতুন ঘর তুলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হবে। আপনারা কারা? জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আমরা মেম্বার সাহেবের লোক। বেঞ্চে দু’জন বসা। মনে হচ্ছে পাহারাদার। পাশেই পুলিশের ভ্যান। ক’জন পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। প্রচুর মানুষের চলাচল। উৎসুক মানুষ। সবাই টিটু রায়ের বাড়ি দেখতে চায়। টিটু রায়ের মায়ের সাথে কথা বলতে চায়।

টিটু রায়ের মা কোথায়? জিজ্ঞেস করতেই কর্মরত একজন বললেন, বাড়ি নেই। পাশের বাড়ি কোথাও গেছে। একটু অপেক্ষা করতেই একজন বয়স্ক নারীকে দেখা গেল। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মাসী মা, আপনি কি টিটুর মা? হ্যাঁ সূচক উত্তর এলো। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চোখে তখনও আতঙ্ক। অসুস্থ মনে হচ্ছে তাকে। কলের দিকে ছুঁটলেন। মাথা ব্যথা করছে। জল দিতে চান। কলে জল নেই। বেশ কয়েকবার চাপার পর জল এলো। মাসী মা’র মাথায় দিলাম। তিনি এখন একটু সুস্থ বোধ করছেন।

সোজা ছুটলেন ঘরে। অন্ধকার ঘর। আলো নেই। বিদ্যুতের পাখা আছে। তবে ঘুরছে না। বিছানায় কাত হলেন। আমার মতো আরও একজন অচেনা নারী একটি হাতপাখা নিয়ে বাতাস করতে লাগলেন। শীতের বিকেল। কিন্তু তিনি ঘামছেন। শরীরটা ভালো নেই জিতেন বালার। কিছুক্ষণ পর ১৫-১৬ বছর বয়সী একটি ছেলে ঘরে প্রবেশ করলো। নাম সঞ্জয়। তখন ঘড়ির কাঁটায় প্রায় ৪টা বাজে। সঞ্জয় বললো, স্কুল ঘরে খাবারের জন্য ডাকছে। জিতেন বালার খিদে নেই। নিজের ঘর-বাড়ি পুড়তে দেখার পর থেকেই তিনি অসুস্থ। আগন্তুক অন্য একজন বারান্দায় বিছানা করে দিলেন।

জিতেন বালা বারান্দায় এসে শুয়ে পড়লেন। পুজা নামে একটি মেয়ে, বয়স বছর সাতেক হবে। বাতাস করতে লাগলো। সম্পর্ক জিজ্ঞেস করতেই বললো, আমার দিদি। মাসী মা, এখন কেমন লাগছে? কী হয়েছিল সেদিন? সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো। কিছু জানি না বাবা। জান নিয়ে পালিয়েছি। শুধু এটুকু মনে আছে।

ঠাকুরপাড়ার ভেতরে আর একটু এগুলেই ছোট একটা টং দোকান। পান, সিগারেট, বিস্কুটের দোকান। তরুবালা (৬০) এই দোকানের মালিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৩বছর। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভয়ে শিউরে উঠলেন। বললেন, ৭১-এর ভয়াবহতা আরও একবার দেখলাম। তার গরু পুড়ে গেছে। তরুবালা আরও জানান, সেদিন শলেয়া শাহ, বালাপাড়া এলাকার মানুষ মাইকিং করে একত্রিত হয়। সেদিন টাকা দিয়ে ট্রাকে করে লোক আনা হয়েছিল।

নিবারণ রায় জিতেন বালার প্রতিবেশী। তার বাড়ির সামাজি ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। বড় আর্তনাদ করে বলছিলেন, একজনের শাস্তি কেন সবাই পাবে? বলছিলেন, ভয় এখনো কাটেনি। পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। আমরাও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি।

রাস্তার দক্ষিণ পাশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। এটা ব্রাহ্মণপাড়া। দুর্বৃত্তরা পালানোর সময়, প্রায় ১৩-১৪টা ঘর পুড়িয়ে দেয় এ পাড়ায়। ব্রাহ্মণপাড়ায় জিতেন বালা নামে আরও একজনকে পাওয়া গেল। তার উঠানে এখনও পোড়া টিনের স্তুপ। কানে ভালো শুনতে পায় না। ছেলে মিলন রায়, সেদিন বাড়ি ছিল না। ছিল তার মা কৌশুল্লা বালা। বয়স হয়েছে। মায়ের হাত ধরে জীবন নিয়ে পালিয়ে বাঁচেন সেদিন। ধান ক্ষেত দিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন বাঁশ বনে।

জিতেন বালার বাড়িতেই কথা হলো শেফালী রায়ের সাথে। শেফালী বলছিলেন, এলাকার প্রায় ৫০-৬০টা গরু নিয়ে গেছে ওরা। কেউ ফিরে পেয়েছে। আবার কেউ পায়নি। তার একটা গরু এখনো নিখোঁজ। নারীদের উপর নির্যাতন হতে পারে এই শঙ্কায় সেদিন ঘরে তালা দিয়ে পালিয়ে যান। পরে অবস্থা স্বাভাবিক হলে ফিরে আসেন। শেফালীর কণ্ঠে ফিরে এলো এক নতুন তথ্য। বললেন, টিটু এলাকায় আসে না প্রায় সাত বছর। টিটুর বড় মেয়ে মিষ্টি। ক্লাস এইটে পড়ার সময়, ভিন্নধর্মের একটি ছেলে তাকে তুলে নিয়ে যায়। উদ্ধার করা হয় সাতদিন পর। টিটুর ছোট মেয়েটা শলেয়া শাহ স্কুলে পড়তো। তার ভাগ্যেও জোটে বড় বোনের কপাল।

ধ্বংসস্তুপ থেকে ব্রাহ্মণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে হাঁটতে থাকলাম। সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ। খানিকটা পথ হাঁটতেই পথে সুমতি বালার সাথে দেখা। বয়স আশির কাছাকাছি। ততোক্ষণে প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে। তার হাতে সরষে শাক। রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নাম জিজ্ঞেস করতেই ভয় পেলেন। বললেন, আমার নাম দিয়ে কি করবেন?

বোঝা যাচ্ছে এলাকায় আতঙ্ক এখনো কাটেনি। স্কুল মাঠের পবেশ পথে একটা মন্দির। একজনকে থালা হাতে বের হতে দেখা গেল। তাতে ভাত আর আলুর ডাল। খাবার কোথা থেকে আনলেন? জিজ্ঞেস করতেই বললেন, খাবেন? এখনও আছে। খাবেন? আমার সাথে আসেন। জানা গেল, গেল ১০ নভেম্বর থেকে এই স্কুল মাঠে সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়।

ব্রাহ্মণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে লতা রাণী  ও বিথী রায়ের সাথে দেখা। বিথী পাগলাপীর কলেজে পড়ে। বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে। সে দিন সে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সেই ভয়াল চিত্র তার দেখা হয়নি। লোকমুখে শুনেছে সে গল্প। তাতেই তার ভয় লাগছে। ঘুম আসছে না। পুরো ঘটনার একটা সারবর্ণনা পাওয়া গেল তার কাছে। তাতে আতঙ্ক আর ভয় মাখানো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলছিল কার খাবারের থালা পুড়ে গেছে। কার সেলাই মেশিন পুড়ে গেছে। কার গরু গেছে।

মাঠে খেলছে ছোট্ট শিশু কৌশি। বয়স চারের কাছাকাছি। গায়ে একটা পুরনো জামা। লতা রাণীর ছেলে। লতা রাণীর কষ্টটা একটু বেশি। বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক হবে। স্বামী রতন রায়। সাইটে কাজ করেন। সে দিন রতন কাজে ছিলেন। দুর্বৃত্তরা তার সাজানো সংসার পুড়িয়ে দিয়েছে। বিয়ের শাড়িটাও পুড়ে গেছে। সেলাই মেশিন পুড়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সন্তানকে আগলে বেঁচে আছেন তিনি।

হরকলি, ঠাকুরপাড়ার ঘটনাটা খুবই হৃদয়স্পর্শী। ব্রাহ্মণপাড়ার জিতেন বালা বলছিলেন, কায় বা কি নেকচে, কোডে কোনায় দেচে, আর হামার বাড়ি পুড়ি দেচে। ঘটনার সূত্রপাত ৫ নভেম্বর ২০১৭। টিটু রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনভূতিতে আঘাত হানার জন্য মামলা করা হয়। টিটু লেখাপড়া জানে না। এলাকায়ও থাকে না। তদন্তে ইতোমধ্যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, পোস্টটির সূত্রপাত খুলনার মাওলানা আসাদুল্লাহ হামিদির ফেসবুক থেকে।

দুর্বৃত্তরা টিটু রায়ের বাড়িতে হামলা করে ১০ নভেম্বর। এলাকাবাসী বলছে, এই ঘটনা প্রতিহত করার জন্য পুলিশ ৫দিন সময় পেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তা করেনি। অথবা করতে পারেনি। যদিও হামলার সময় পুলিশের খুব তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে বলেও দাবি করলেন এলাকার লোকজন। বললেন, অন্যথায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তো। ওইদিন দুর্বৃত্তরা টিটু রায়, সুধীর রায়, অমূল্য রায়, বিধান রায়, কৌশুল্লা রায়, কুলীন রায়, ক্ষীরোদ রায় ও দীনেশ রায়ের ঘর ভস্মীভূত করে। এলাকাবাসী বলছে, কয়েক হাজার লোক এলাকায় প্রবেশ করে সেদিন। যাদের মধ্যে অনেকেই চেনা। আবার অনেকেই অচেনা। এখন এলাকায় পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে।

এখনও প্রচুর বহিরাগত আসছে এলাকায়। সবার চোখে সহানুভূতি। বহুদূর থেকে হিন্দুরা আসছেন। আশেপাশের এলাকা থেকে আসছেন মুসলমানরাও। তারা সবাই এ ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ক্ষতিগ্রস্ত ছাড়া অন্যএলাকার যেকোন পুরুষকে জিজ্ঞেস করলেই তিনি বলছেন, ওদিন তিনি এলাকায় ছিলেন না। অর্থাৎ পুরো এলাকা থেকে এখনও আতঙ্ক কাটেনি।

ভালো নেই টিটুর মা। ভালো নেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা অন্যায়। কারও ঘর পুড়িয়ে দেয়া অন্যায়। একজনের শাস্তি, অন্যকে কিংবা সবাইকে দেয়া অন্যায়। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া অন্যায়। আইন শৃঙ্খখলা বাহিনীর ত্বরিৎ সক্রিয় না হওয়াটাও অন্যায়।

ক্ষতিগ্রস্তরা বলছিলেন, তারা সরকারি সাহায্য পাচ্ছেন। নতুন টিন পাচ্ছেন। কিন্তু ঘরপোড়া ছাইয়ের গন্ধ তারা ভুলতে পারছেন না। হামলার ভয়াবহতা তারা ভুলতে পারছেন না। মন থেকে আতঙ্ক কাটছে না। এই জঘন্য হামলার দ্রুত বিচার করতে হবে। দ্রুত প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই বারবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা বন্ধ হবে।

ঠাকুরপাড়ায় হামলার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ:
০১. রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

০২. জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

০৩. যারা টিটুর মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

০৪. টিটুর মেয়ের যেহেতু ভিন্নধর্মের অনুসারী সাথে বিয়ে হয়েছিল, সেহেতু তার সম্প্রদায়ের কারও সংশ্লিষ্টতাও উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না।

০৫. স্থানীয় রাজনীতিতে কোনো কোন্দল আছে কি না খতিয়ে দেখতে হবে।

০৬. টিটুর প্রচুর ঋণ ছিল। সেইসব ঋণের সাথেও কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

উমর ফারুক: লেখক ও শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
faruque1712@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত উমর ফারুক এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad