একজন অসহনশীলের স্বীকারোক্তি

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

একজন অসহনশীলের স্বীকারোক্তি

জেসমিন চৌধুরী ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

print
একজন অসহনশীলের স্বীকারোক্তি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক নির্যাতন আর নিপীড়নের ঘটনা ঘটে ক’দিন পরপরই। আরো অনেক সচেতন, সংবেদনশীল মানুষের মত আমিও এসবের প্রতিবাদে নিরলসভাবে লিখে যাই। এ কি আমার মনুষ্যত্ব, নাকি পাপের প্রায়শ্চিত্য? আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, সবচেয়ে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ কী, উত্তর দিতে আমাকে এক মুহূর্তও ভাবতে হবে না।

.

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, বয়স মাত্র পনেরো। ঐ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদ ধ্বসে গিয়ে অনেক হিন্দু ছাত্র মারা যায়। তখন আমার হিরো ছিলেন আমার সুদর্শন এবং চৌকস প্রাইভেট শিক্ষক যার নাম বলছি না কারণ তিনি এখন জামায়াতের একজন বড় নেতা। তখন তিনি ছিলেন সিলেট এমসি কলেজের নাম করা ভাল ছাত্র, ইসলামী ছাত্র শিবিরের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। 

ঐ লোকটিকে আমি নানান কারণে পছন্দ করতাম। তিনি আমাকে যে ধরনের মনোযোগ দিতেন তা আমি আগে কারো কাছ থেকে পাইনি, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তো নয়ই। তিনিই প্রথম আমাকে বুদ্ধিমতী মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, এবং আমার মধ্যে যে আরো কিছু গুণাবলী আছে তাও প্রথম তার মুখেই শুনেছিলাম।

তিনি আমার লেখা ছেলে মানুষী কবিতা এবং গল্পগুলো মন দিয়ে পড়তেন এবং আরো বেশী করে লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন। কাজেই তিনি যা-ই বলতেন, সবই আমি বিশ্বাস করতাম।

যাই হোক, সেদিন আমাকে পড়াতে এসে তিনি বললেন, 'সবই আল্লাহর ইচ্ছা। ভালই হয়েছে, কত গুলো কাফির মরেছে।'

পনেরো বছর বয়সের হরমোনের কারসাজি কিনা জানি না, যে আমার মায়ের মুখে শোনা 'মুসলমান ছাড়া আর সবাই দোযখে যাবে' জাতীয় কথা শুনে আমার হিন্দু বন্ধুদের জন্য লুকিয়ে কাঁদতাম, সেই আমি এই অসম্ভব রকমের নোংরা অসহনশীল মন্তব্যটি শুনে চমকে উঠলাম না, মনে কোন প্রশ্ন বা প্রতিবাদও জাগলো না।

পরদিন স্কুলে টিফিনের ছুটিতে যখন মেয়েরা ক্লাসে এই ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল, আমি তোতাপাখীর মত আমার শিক্ষকের অকথ্য কথাটারই পুনরাবৃত্তি করলাম, 'ভাল হয়েছে কতগুলো হিন্দু মরেছে।' আমি দেখিনি আমার ঠিক পেছনের বেঞ্চেই বসেছিল আমার এক হিন্দু ক্লাসমেট।

সে সাথে সাথে আমার মুখোমুখি হয়ে বলল, 'জেসমিন, তার মানে আমি মরলে তুই খুশী হবি, বলবি 'ভাল হয়েছে একটা হিন্দু মেয়ে মরেছে?'একটা প্রচণ্ড চাবুকের বাড়ি যেন এসে পড়ল আমার হরমোনাক্রান্ত বিবেকের উপর, কয়েক মুহুর্তের জন্য আমি বাক রুদ্ধ হয়ে গেলাম।

সেকি অপরাধ বোধ! সেকি লজ্জা! কিন্তু নিজের ভুল সাথে সাথে স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার মত শিক্ষা তখনো পাইনি। আমার ঠিক মনে নেই তারপর কী হয়েছিল। আমি কি কিছু বলেছিলাম? নাকি নীরব থেকে ছিলাম? শুধু এটুকু জানি, আমার সেই হিন্দু বন্ধুটির চোখের অবাক দৃষ্টি, তার প্রশ্নের সারল্য আমাকে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছিল সেদিন, প্রচণ্ড একটা আঘাতে খানিকটা মানুষ বানিয়েছিল আমাকে।

এসটি কোলরিজের 'দ্য রাইম অব দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনারের' অ্যালবাট্রস হত্যাকারী নাবিকের মত অপরাধ বোধে পুড়ছি আমি সেই থেকে।তারই মত অনেককে আমার অল্প বয়সের কূপমন্ডুকতার এই গল্পটা বলে স্বস্তি পাবার চেষ্টা করেছি। আমার বাচ্চাদেরকে সব ধরণের সংকীর্ণতার উর্ধ্বে রেখে বড় করার চেষ্টা করেছি।

সব সময় সব ধরনের অসহনশীলতার প্রতিবাদ করেছি, কিন্তু তাতে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্য হয়েছে কি? আমার মনে হয়, না। এধরনের অপরাধের ক্ষমা আছে, বা থাকা উচিৎ।

এখন সেই হিন্দু ক্লাসমেটটি আমার ফেসবুক বন্ধু। বেশ কিছু দিন আগে ইনবক্সে একটা লম্বা মেসেজ পাঠিয়ে আমি তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। উত্তরে সে বলেছিল, এ রকম কিছু ঘটেছে বলে তার মনেই নেই, আর ঘটে থাকলেও এখন তাতে কিছু যায় আসে না।

তার হয়তো মনে নেই কারণ বাংলাদেশে বড় হওয়া একটা হিন্দু মেয়ের জন্য এ ধরনের অসহনশীল মন্তব্য শোনা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু আমি কথাটা আজো ভুলিনি কারণ আমার জীবনে সহনশীলতার শিক্ষায় ওটাই ছিল প্রথম পাঠ এবং কোন ধর্মীয় পণ্ডিত বা গুরুজন নন বরং আমার একজন হিন্দু সহপাঠীই ছিল আমার প্রথম শিক্ষক।

এই লেখাটা পড়ে পনেরো বছরের আমিটিকে আপনারা অনেকেই তিরস্কার করবেন, করাই উচিৎ, তবু এই গল্পটি আমি যেচে সবার সামনে তুলে ধরছিকেন? আমরাতো কথাবার্তায় অনেক সহনশীলতার পরিচয় দেই, মানুষের মনে কষ্ট না দেবার চেষ্টা করি, কিন্তু আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাসে অপরের প্রতি অসহনশীলতা থেকে যায়।

আমরা মনে করি আমার নিজের বিশ্বাসই সঠিক, আর অন্যরা ভুল পথে চলছে। আর নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব শেখাতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই সন্তানদেরকে অন্যদের প্রতি অসহনশীল বানিয়ে তুলি।

আমার নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে হোক, আর যেভাবেই হোক, আমি অবশেষে চিন্তা এবং বিশ্বাসে অসহনশীলতা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। জাত, ধর্ম, যৌন অরিয়েন্টেশন কোন কিছুই একজন মানুষকে আরেক জন মানুষের চেয়ে বড় বা ছোট বানায় না, কোন বিশেষ বিশ্বাসের কারণে আমার চিন্তার জগতে কারো বেহেস্ত দোযখ নির্ধারিত হয় না।

জীবনে এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর এই প্রাপ্তির জন্য অনেক কিছুর সাথে, অনেকের সাথে আমার একজন হিন্দু বন্ধুর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। আজ আবার খোলামেলা তার কাছে ক্ষমা চাই। সে হয়তো আমার এই লেখাটা পড়বে, পড়ে আবারও ভাববে এরকম কিছু ঘটেছিল বলে তার মনে নেই। কিন্তু আমার মনে আছে, মনে থাকবে, অনুতাপের আগুনে আমৃত্যু পুড়ব আমি।

জেসমিন চৌধুরী: অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক।
jes_chy@yahoo.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত জেসমিন চৌধুরী এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad