পাকিস্তানে ‘খান সাব’-এর ফাইনাল ম্যাচের প্রস্তুতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

পাকিস্তানে ‘খান সাব’-এর ফাইনাল ম্যাচের প্রস্তুতি

আলতাফ পারভেজ ১:০৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

print
পাকিস্তানে ‘খান সাব’-এর ফাইনাল ম্যাচের প্রস্তুতি

উপমহাদেশের প্রায় সব দেশেই ‘মূলধারা’র নির্বাচনী রাজনীতি আবর্তিত প্রধানত দ্বিদলীয় ব্যবস্থায়। পাকিস্তান এক্ষেত্রে এক ব্যতিক্রমী অবস্থায় প্রবেশ করেছে। দেশটির প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খান নিয়াজীর তেহরিক-ই-ইনসাফ (ন্যায়বিচারের আন্দোলন) নাটকীয় এই নতুন বাস্তবতার স্রষ্টা।

.

তবে পাকিস্তানে দ্বিদলীয় ব্যবস্থার পতন মডেল হিসেবে আশে-পাশের অন্যান্য দেশেও সংক্রমিত হবে কি না সে বিষয়ে নানান মত আছে। যেমন বিচিত্র মত আছে দেশটিতে ইমরানের উত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরিণতি নিয়েও। তবে এ বিষয়ে এখন আর কোন মতদ্বৈততা নেই যে ইমরান প্রধানমন্ত্রী হতেই লড়ছেন, ক্ষমতার হাতছানি এড়িয়ে শুধু রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার মিশন নয় তাঁর।

একসময় মনে হচ্ছিলো তিনি পাকিস্তানের জন্য লড়ছেন কিন্তু এখন স্পষ্ট, তিনি শুধুই নিজের জন্য লড়ছেন। অর্থাৎ ইমরানের জন্য রাজনীতিও ক্রিকেটের মতোই জয়-পরাজয়ের আরেকটি মোকদ্দমা মাত্র। সেক্ষেত্রে ৬৪ বছর বয়সী প্রাক্তন ক্যাপ্টেন নতুন ম্যাচেও ভালোই করছেন।

কিন্তু অতি সম্প্রতি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেও বিপদের ছায়া পড়েছে। নওয়াজ শরীফের পর ইমরানের বিরুদ্ধেও আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিলে অস্বচ্ছতার যে অভিযোগ উঠেছে সেই মোকদ্দমার শুনানি শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট যেকোন দিনে এ বিষয়ে রায় দেবে। ইতোমধ্যে এই রায় নিয়ে পাকিস্তান জুড়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এ যেন ফাইনাল ম্যাচের পূর্বে একখণ্ড কালো ছায়া।

২০১৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরাসরি ভোটের ২৭২ আসনে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) মাত্র ২৮টি আসন পেয়ে তৃতীয় হয়েছিল। কিন্তু আগামী ৮-৯ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচনে পিটিআই যে আগের চেয়ে ভালো করতে যাচ্ছে ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

ফলে পাকিস্তান জুড়ে এমুহূর্তে বিতর্ক শুধু এটাই হচ্ছে, ইমরান ১৯৯২-এর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো তাঁর ‘দল’কে চ্যাম্পিয়ন করাতে সক্ষম কি না। পাকিস্তানকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবশ্য এসব সন্দেহের কোন অবকাশ নেই আজ আর! স্পষ্টত সেখানে পিটিআই’এর সমর্থকরা কেবল নির্বাচন ও বিজয় উদযাপনের জন্য অপেক্ষা করছেন।

বহু ধরনের উগ্রপন্থায় পুনঃপুন বাধাপ্রাপ্ত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক বিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশটির সমাজের উদারনৈতিক অংশে এখন এমন শাসকদের ক্ষুধা তীব্র যে বা যারা লিবারেল মূল্যবোধ লালন করবে এবং একই সঙ্গে দুর্নীতি ও জঙ্গীপনা দমন করতেও সক্ষম। তবে শহরের চৌহদ্দি পেরোলেই দেশটির তৃণমূলে রক্ষণশীল ধর্মীয় উত্তাপ স্পষ্ট। পিটিআই এ দুয়ের এক অবিশ্বাস্য সমন্বয় ঘটাতে দুরূহ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দলটির বৈকালিক জনসভাগুলো অপরিহার্যভাবেই মাগরেবের বিরতিকালে নামাজের জামায়াতে পরিণত হয়; আবার নামাজ শেষে প্রায়ই সভার কাজ শেষ হয় তারুণ্যময় জনপ্রিয় পপ গানের মধ্যদিয়ে। দলটিতে একই সঙ্গে লিবারেল ও হার্ডকোর ইসলামিস্টদের সমাবেশ ঘটছে। ঠিক যেমন, দেশটির ফেসবুক জেনারেশন এবং অতিপ্রভাবশালী ডিপ-স্টেইটের কাছেও ইমরানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব খোলামেলা। অনেকেই এখন তাঁকে নির্ভরতা মিশ্রিত ভাষায় ‘খান সাব’ হিসেবেই সম্বোধন করছে। সর্বশেষ মামলা তাদের উদ্বেগে ফেলেছে।

কারণ পিটিআই কার্যত এখনও ওয়ান ম্যান শো। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনালের কথা আমরা যদি স্মরণ করি ইমরান নিজে দলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি রান করলেও দলকে জেতাতে ওয়াসিম আখতারের অলরাউন্ডার পারফরমেন্স এবং ইনজাম-উল-হকের ৪৬ বলে ৪২ রান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

অর্থাৎ সেদিন ইমরান প্রথমবারের মতো দেশকে ট্রপিটি উপহার দিতে পেরেছিলেন ‘এগারো জনের টীম’-এর সৌজন্যে। কিন্তু তাঁর আজকের পিটিআইয়ে এখনো ’৯২-এর ওয়ার্ল্ডকাপ দলের মতো জাভেদ মিয়ান্দাদ, ইনজাম বা ওয়াসিম আখতারের মতো ম্যাচ জেতানো সহযোগী নেই।

তবে ইমরান রাজনীতিতেও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন খারাপ পিচেও একজন বোলার যা করেন। ১৯৯২ সালে খেলা থেকে অবসর নেয়ার পূর্বে প্রায় ২০ বছর তিনি ক্রিকেট খেলেছেন যার মধ্যে পাঁচটি বিশ্বকাপও রয়েছে এবং পাকিস্তানের জন্য বিশ্বকাপ জিতেও এনেছিলেন।

প্রায় একইরকমভাবে রাজনীতিবিদ ইমরান খানের বয়স এখন ২১ বছর শেষ হওয়ার পথে এবং ২০১৮-কে তিনি মনে করছেন চূড়ান্ত ম্যাচ জেতার বছর।

তবে ক্রিকেটের মতো রাজনীতির ময়দানে তার সফলতা ঝড়ো গতির ছিল না। ১৯৯৬-এ পিটিআই-এর প্রতিষ্ঠার পরের বছর পাকিস্তানে যে জাতীয় নির্বাচন হয় তাতে ইমরান সাতটি আসনে দাঁড়িয়ে প্রতিটিতে পরাজিত হয়েছিলেন। অথচ বিশ্বকাপ উপহার দিয়ে তখনও তিনি দেশটিতে চূড়ান্ত এক নায়ক হয়ে আছেন। এই রূঢ় ও বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার উত্তর ইমরান ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন।

রাজনীতি আর ক্রিকেট এক নয়। তবে এ দুয়ের বাইরেও তাঁর সফলতার এক দারুণ ক্ষেত্র আছে। দেশটির নাগরিকদের জন্য লাহোর ও পেশোয়ারে অসাধারণ দুটি দাতব্য ক্যানসার হাসপাতাল করেছেন তিনি দেশ-বিদেশ থেকে তহবিল সংগ্রহের মধ্যদিয়ে।

মা শওকত খানমের ক্যানসারে মৃত্যুর বেদনাকে ইমরান যেভাবে বিশাল দুই হাসপাতাল বির্নিমানের কর্মপ্রয়াসে রূপান্তরিত করেছেন তার জন্য পাকিস্তানীদের কৃতজ্ঞতার ধরন আঁচ করা কঠিন নয় কারণ দেশটিতে এর আগে পূর্ণাঙ্গ কোন ক্যানসার হাসপাতালই ছিল না।

বলাবাহুল্য, ক্রিকেটের পর বড় মাপের কিছু সমাজকর্ম ইমরানকে প্রচারমাধ্যমে খানিকটা এগিয়ে রেখেছিল। তবে একই সঙ্গে তাঁর প্লেবয়সুলভ ইমেজ পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজ জীবনে ভোটের জন্য খুব বেশি সহায়ক ছিল না। তাঁর প্রথম স্ত্রী জেমিমাকে মোল্লারা ‘ইহুদি’ বলে প্রচার চালাতো। যদিও তা ছিল অসত্য কিন্তু ইমরানকে রাজনীতির স্বার্থে ডিভোর্স নিতে হয়।

রাজনীতির মাঠের বাস্তবতা বুঝতে স্বভাবতই তাঁর সময় লেগেছিল এবং ২০০২-এ প্রথম ইমরান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ঢুকতে পেরেছিলেন। যদিও সেবারও তাঁর দল জাতীয়ভাবে ভোট পেয়েছিল প্রদত্ত ভোটের এক ভাগেরও কম। ২০০৮-এর নির্বাচন পিটিআই বয়কট করে।

তবে সর্বশেষ ২০১৩- তে ইমরান ও পিটিআই উভয়েই পাকিস্তানের রাজনীতির দ্বিদলীয় কাঠামো ফুঁড়ে নিজের সদম্ভ অস্তিত্ব জানিয়ে দেয়। জাতীয় ভোটের ১০ ভাগ হিস্যা পায় তারা। সিন্ধু ও পাঞ্জাব দেশটির এই দুই ভরকেন্দ্রেই পিটিআই প্রধান বিরোধীদলে পরিণত হয়। ইমরান নিজেও তিনটি আসনে বিজয়ী হন।

বলাবাহুল্য, গত পাঁচ বছরে ইমরান আরও এগিয়েছেন। বলা যায়, পাকিস্তানের রাজনীতির এককালের ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ ইমরানই এখন সবচেয়ে মনযোগে আছেন। মূলত দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন করেই তিনি এ অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দুর্নীতির বিষয় আদালত পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারা এবং শেষপর্যন্ত নওয়াজের বিদায়।

তবে ইতোমধ্যে পিটিআই-এ এসে ভিড় করেছেন পূর্বতন বিভিন্ন সরকারের এমন সব নেতৃবৃন্দ যাদের রাজনৈতিক ইমেজ স্বচ্ছ নয়। এদের মধ্যে আছেন জাহাঙ্গীর তারিন, খুরশীদ কাসুরী, শাহ কুরাইশী প্রমুখ। ইমরানের দলের সেক্রেটারি ধনাঢ্য জাহাঙ্গীর তারিন এবং সহ-সভাপতি শাহ কুরাইশী যথাক্রমে সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ ও পিপলস্ পার্টির ইউসুফ গিলানির সময়কার মন্ত্রী ছিলেন। ঐসব শাসনামলকে ইমরান প্রায়ই দুর্নীতির বিস্তারের জন্য অভিযুক্ত করে থাকেন।

তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রচার পণ্যই হলো রাজনীতি ও প্রশাসনে স্বচ্ছতার দাবি। কিন্তু দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি জাহাঙ্গীর তারিনের বিরুদ্ধে অতীতে মন্ত্রী থাকাকালে কর ফাঁকি, অর্থ পাচার এবং ব্যাংক ঋন মওকুফ করিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। পিটিআই-এ যোগ দেয়া ব্যক্তিদের মাঝে এরকম দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইমরানের জিহাদে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে নওয়াজ শরীফ ও মুসলিম লীগের বিরোধিতা করতে যেয়ে ইমরান প্রায়ই দেশটির ক্ষমতাধর ডিপস্টেইটের হাতের পুতুল হয়ে উঠছেন বলেও প্রতীয়মান হয়েছিল। নওয়াজের সঙ্গে সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের মনস্তাত্ত্বিক বৈরিতায় ইমরান অনেক সময় শেষোক্তদের ক্রীড়ানকের মতো আচরণ করেছেন। এসব কারণেই পাকিস্তানজুড়ে এ শংকা এখন তীব্র যে, তরুণদের যে পরিবর্তন আকাঙ্খা ইমরানকে দাবার বোর্ডের একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে আদৌ পিটিআই সেরকম কোন পরিবর্তন উপহার দিতে সক্ষম কি না।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের মতোই পাকিস্তানেও শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের প্রধান এক চাওয়া রাষ্ট্রীয় পরিসরে দুর্নীতি নির্মূল। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কার মতোই পাকিস্তানেও দুর্নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি ও রাজনীতি। ইমরান খান ও পিটিআই দুর্নীতিবিরোধী জিহাদের ডাক দিলেও এখনও ঠিক স্পষ্ট নয় কিরূপ অর্থনৈতিক নীতি-কৌশলের মাধ্যমে ঐ অধরা লক্ষ্যটি হাসিল হবে।

কোন সন্দেহ নেই ইমরান নিয়াজীর সৎ ইমেজ রয়েছে। কিন্তু একজন বা কয়েকজন সৎ ব্যক্তি কিছু নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব গ্রহণ করলেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহমান দুর্নীতি ধারা বন্ধ হয়ে যাবে এমন সমাধানচিন্তা সন্দেহজনক।

এই সন্দেহ বিশেষ করে তীব্র হয়েছে খাইবার পাখতুনওয়ারা (কেপি)’র অভিজ্ঞতা থেকেও। পাকিস্তানের একমাত্র এই প্রদেশটিতে পিটিআই ২০১৩ থেকে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু ইমরানের দল সেখানে এমন কোন ম্যাজিক দেখাতে পারেনি যা থেকে মনে হতে পারে জাতীয় পর্যায়ে ‘পরিবর্তন’-এর জন্য তাদের কাছে কোন অব্যর্থ অস্ত্র আছে।

উপরন্তু গত চার বছর ইমরান ও তার দল রাজপথে নওয়াজকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য যতটা পরিশ্রম করেছে তার সামান্যই করেছে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতির প্রগতিশীল সংস্কার সাধনে ক্ষমতাসীনদের উপর চাপ প্রয়োগ। ইমরান ও পিটিআই পাকিস্তানে বিদ্যমান অসাম্যের বিষয়েও নীরব। যদিও পাকিস্তান জুড়ে পরিবর্তনের ক্ষুধার মূলে রয়েছে অসাম্যও।

ফলে আপাতত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজের পতন ঘটাতে পারলেও কেপি ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অভিজ্ঞতার কারণে পিটিআই-এর পক্ষে জনজোয়ার থমকে আছে।

সন্দেহ-অবিশ্বাসের পাশাপাশি ইমরানকে নিয়ে উদ্বেগেরও কারণ রয়েছে অন্তত একটি ক্ষেত্রে। সেটা হলো ধর্মীয় জঙ্গীবাদ নিয়ে তাঁর নীরবতা। পাকিস্তানকে প্রতিদিন প্রচুর বেসামরিক ও সামরিক মানুষকে মিলিট্যান্সির রক্তক্ষুধা মেটাতে হয়। এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় ইমরান খান সামান্যই মনযোগী। বিভিন্ন সময় প্রদত্ত বক্তব্যে ইমরানকে উগ্রপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হয়েছে।

তিনি সামরিকভাবে দমনের পরিবর্তে স্থানীয় তালেবানদের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে। পিটিআই-এর এইরূপ অবস্থানে শুধু ইউরোপ-আমেরিকাই নয়, বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন পাকিস্তানের এমুহূর্তের প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মিত্র গণচীন। কারণ বালুচিস্তানসহ পাকিস্তানজুড়ে তাদের রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ।

ইমরানের প্রতি সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষপাতও পাকিস্তানীরা ভালোভাবে দেখছে না যদিও জনগণ দেশটির অস্তিত্বের প্রধান এক রক্ষাকবচ হিসেবে সেনাবাহিনীর বিশেষ ভক্ত। ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের পাকিস্তানবিরোধী হিস্টিরিয়ার কারণে সেনাবাহিনীকেই তাদের ভূ-খণ্ডগত সুরক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে দেখে পাকিস্তানীরা। এই মনোভাবের সুযোগ নিয়ে যা কিছু ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ সংশ্লিষ্ট তাতেই হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনীর বিশেষ শাখা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেট বা আইএসআই।

প্রটোকল অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ হলেও বাস্তবে এর কর্তৃত্ব চীফ অব স্টাফের হাতেই রয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ক্রমাগত হস্তক্ষেপে হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লান্ত। দেশটির জনগণও তার অবসান চায়।

অতিজটিল এই জনমনস্তত্ত্বের মুখোমুখি এখন ইমরান খান ও তাঁর দল। তবে ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়তে ইমরানকে আন্তরিক মনে হচ্ছে। যদিও স্পষ্ট নয়, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে তাঁর অগ্রাধিকার কী। পাকিস্তানে এক্ষেত্রে স্পষ্টতা জরুরি; কারণ পূর্বেকার অনেক শাসক ‘জাতি’কে রক্ষা করার কথা বলে গণতন্ত্রকে তাৎক্ষনিকভাবে কুরবানী দিয়ে দিয়েছিলেন।

অতীতে দেশটির দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় মানুষ এও দেখেছে, সেনা আমলাতন্ত্র বারবার মুসলিম লীগ ও পিপলস্ পার্টির মাঝে রেষারেষি লাগিয়ে নিজেদের কর্তৃত্বশীল অবস্থান বজায় রাখছে। সেই কারণে সেনাবাহিনীকে ভালোবাসলেও দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হওয়ার জন্য সেনা আমলাতন্ত্রকেই দায়ী করে মানুষ।

তুরস্কেও একদা এইরূপ অবস্থা ছিল। পরিস্থিতি বদলাতে নওয়াজ এরদোয়ানকে অনুসরণ করলেও ব্যর্থ হয়েছেন নিজের ও পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতার কারণে।

পাঞ্জাবের শরীফ ও সিন্ধুর ভুট্টো ডাইনেস্টির দুর্নীতির কারণেই ডিপ-স্টেইটের পক্ষে মুসলিম লীগ ও পিপিকে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার এবং প্রয়োজনে উভয়কে রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার সহজ হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে নতুন উত্থিত পিটিআইকে একই ভূমিকায় দেখতে চায় না জনতা। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতোই একই রকম ক্ষুধা এই জনতারও একজন ত্রাতা চাইছে।

আপাতত নওয়াজ ও জারদারির চেয়ে এক্ষেত্রে ইমরান এগিয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে পরিণত রাজনীতিবিদের বৈশিষ্ট্যের কিছু ঘাটতি আছে। দেশটির একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের (ফারাহ আইদিদ, দ্য নেশন, ২৮ এপ্রিল ২০১৭) মতে , ‘ইমরানের সংকট হলো তিনি এখনো জানেন না, কখন কি বলতে হবে, কতটুকু বলতে হবে এবং কতটুকু গোপন করতে হবে।

ফলে প্রায়ই তাঁকে দুই পা এগিয়ে এক পা পেছাতে হয়।’ ইমরানের এইরূপ অস্থির মত্ততার প্রকাশ দেখা যায় তাঁর বাংলাদেশ সংক্রান্ত কূটনীতিক অবস্থানেও।

২০০১ সালের মার্চে ইমরান জিও টিভি’র হামিদ মীরকে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টত বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া। ইমরানের এই অবস্থান বাংলাদেশে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করলেও ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে দেখা যায় তিনি পূর্বতন অবস্থান ভুলে ঢাকার যুদ্ধাপরাধকেন্দ্রীক বিচার নিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে অসহিঞ্চু বক্তব্য রাখছেন। পিটিআই-এর উত্থান তাই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের জন্য কোন উৎসাহব্যাঞ্জক খবর নয়।

পিপিপি ও মুসলিম লীগের সঙ্গে কূটনীতিক পরিমণ্ডলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিবিদের। ঐ উভয় দলের নেতৃবৃন্দও বাংলাদেশীদের পাকিস্তান সম্পর্কিত মনোভাব বুঝতে পারেন সহজে। কিন্তু ইমরান এক্ষেত্রে নবীন ও আবেগপ্রবণ বলেই পরিচয় মেলে।

তবে এটা নিশ্চয়ই আশা করা যায়, যে দলের নামের অর্থ হলো ‘ন্যায়বিচারের আন্দোলন’ সেই দল বাংলাদেশীদের ১৯৭১ সালের ন্যায়বিচারের আর্তি বুঝতে পারবে এবং ইসলামাবাদে নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পেলে দু’দেশের সম্পর্ককে নতুন করে পুনর্গঠন করবে। বাংলাদেশে ক্রিকেটার ইমরানের অনেক ভক্ত রয়েছে যারা রাজনীতিবিদ খান সাবের ফাইনাল ম্যাচ দেখতেও অধীর অপেক্ষায় আছে।

আলতাফ পারভেজ: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক এবং গবেষক।

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত আলতাফ পারভেজ এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad