শেষে যেন পস্তাতে না হয়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

শেষে যেন পস্তাতে না হয়

বিভুরঞ্জন সরকার ৪:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৭

print
শেষে যেন পস্তাতে না হয়

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছুটিতে গেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে ছুটির আবেদন করেছেন। কারণ হিসেবে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি নাকি ক্যান্সার প্যাশেন্ট। আগেও তিনি ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আগে তার অসুস্থতার কথা তেমন শোনা যায়নি। আবার বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। সুস্থ মানুষ, ছুটির আবেদনে অসুস্থতার কথা লিখলেন কেন? 

.

তিনি কি স্কুলের সেই দুষ্টু শিক্ষার্থীর মতো, যে কি না অসুস্থতার কথা বলে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটায়? তিনি তো কেবল একজন ব্যক্তিমাত্র নন, তিনি দেশের প্রধান বিচারপতি। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি যদি অসত্য তথ্য দিয়ে ছুটি চান, সেটা একেবারেই সমর্থন করা যায় না।

কেউ হয়তো বলবেন, তিনি পরিস্থিতির স্বীকার। তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কে? তাছাড়া যাকে ‘বাধ্য' করা যায় তিনি কি খুব শক্ত মেরুদণ্ডের মানুষ? ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেওয়ার পর তাকে তো অনেকে শক্ত মেরুদণ্ডের মানুষ বলেই মনে করেছেন। অনেকে তার সাহসিতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি তার পর্যবেক্ষণে বিচার্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় কিংবা প্রাসঙ্গিক নয় - এমন অনেক বিষয়ে মতামত দিলেও অনেকেই তা সমর্থন করেছেন। দেশের প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছেন। 

দেশের যিনি প্রধান বিচারপতি, তিনি যথেষ্ট কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ – এটা আমাদের ধরে নিতেই হবে। তিনি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু করবেন না। তিনি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। অন্যায় দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের সঙ্গে তিনি যেসব অযাচিত পর্যবেক্ষণ জুড়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তা তিনি জানতেন না - ভাবার কোনো কারণ নেই ।

যদি প্রকৃত অর্থে একজন সৎ ও সাহসী মানুষ হিসেবেই তিনি ওই পর্যবেক্ষণ দিয়ে থাকেন তাহলে ছুটি নিয়ে কোনো ধরনের লুকোচুরি খেলার প্রয়োজন ছিল কি? যিনি চাপের মুখে ছুটির আবেদনে ভুল তথ্য লিখতে পারেন, তিনি রায় দেওয়ার বেলায়ও কারো চাপে বা অন্য কোনো প্রলোভনে প্রভাবিত হতে পারেন – এমন কথা কেউ বললে তাকে কীভাবে ভুল প্রমাণ করা যাবে? তিনি দেশত্যাগের আগে নিজের সুস্থতার কথা যেহেতু বলতে পারলেন, সেহেতু তিনি আরও কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারতেন। কথা বলা যিনি পছন্দ করেন, তিনি হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে তাতে সন্দেহ বাড়ে।

বিচারপতি সিনহা একজন প্রচারপ্রিয় মানুষ। তার আগে দেশে আরো অনেকে প্রধান বিচারপতির পদ অলঙ্কৃত করেছেন। তাদের কেউ বিচারপতি সিনহার মতো এত সভা-সমাবেশে যোগ দেননি, এত কথাও বলেননি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করার চটুল মন্তব্যও তিনি করেছেন। কিন্তু সরকারকে বড় রকম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা ছাড়া আর কোন ‘মহৎ' কর্ম তিনি সাধন করলেন? তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় যারা নাখোশ হয়েছিল, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর তারাই তাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করেন। তিনি যদি সত্যি সঠিক পথে থাকতেন, তাহলে তার একসময়ের শত্রুরা কি তার মিত্র হতে পারতো?

বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ মোট এগারোটি অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের হাতে রয়েছে। তারা এনিয়ে তার সঙ্গে কথাও বলেছেন। তিনি সদুত্তর দিতে না পারায় ওই বিচারপতিরা তার সঙ্গে আদালতে বসতে না চাওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েন। আদালতে কোনো অচলাবস্থা যাতে না হয় সেজন্য এক পর্যায়ে তিনি ছুটির আবেদন করেন। এটা তিনি ঠিক করেছেন।

অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে সরকারের কাছে কি আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না? যদি থেকে থাকে তাহলে ষোড়শ সংশোধনী রায়ের আগে তা দেশবাসীকে জানানো হলো না কেন? সরকার কেন জেনে-শুনে একজন ‘দুর্নীতি’পরায়ণ ব্যক্তিকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রেখেছিল? ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় যদি সরকারের পক্ষে যেত তাহলে কি বিচারপতি সিনহার দুর্ণীতির অভিযোগ প্রকাশ করা হতো?

বলা হচ্ছে, বিচারপতি সিনহা বিএনপির সঙ্গে একটি ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতায় জড়িয়েছিলেন। বিএনপিকে রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং সরকারকে বিপাকে ফেলার লক্ষ্যে কিছু পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন বিচারপতি সিনহা। এই অভিযোগের সত্যাসত্য প্রমাণ সাপেক্ষ। তবে তিনি তার পর্যবেক্ষণে বর্তমান সংসদ, নির্বাচন কমিশন, শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যে মতামত দিয়েছেন, তাতে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। বিএনপি যেভাবে প্রধান বিচারপতির পক্ষে নেমেছে, তা থেকেও মনে হওয়া স্বাভাবিক যে তাদের স্বার্থ তিনি দেখছিলেন। যাহোক, বিচারপতি সিনহা আর প্রধান বিচারপতির চেয়ারে বসতে পারবেন বলে মনে হয় না। তার অধ্যায় শেষ বলেই ধরে নেওয়া যায়।

বিচারপতি সিনহা প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আছেন। তার সততা সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা আদালত পাড়ায় পাওয়া যায় কি? তিনি শপথ গ্রহণের কিছু দিন পর তার পরিচিত একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেমন করবেন তিনি? জবাব পেয়েছিলাম, তিনি আওয়ামী লীগ তথা সরকারকে ভোগাবেন এবং কাঁদাবেন। আমি এই জবাবে বিস্মিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কোনো কারণে হয়তো বিচারপতি সিনহাকে তিনি অপছন্দ করেন। তাই অমন নেতিবাচক কথা বলছেন। যারে দেখতে নারী তার তো চলন বাঁকা! কিন্তু বাস্তবে সে রকম হতে দেখে আমি কিছুটা হতভম্ব।

বিচারপতি সিনহা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত করার নামে যা করলেন তার খেসারত আমাদের সবাইকে হয়তো দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, আওয়ামী লীগ খাদে পড়লে আসলে গোটা জাতিই খাদে পড়ে। নানা তাৎক্ষণিকতায় আচ্ছন্ন থাকি বলে আমরা সময় থাকতে বিষয়টি বুঝতে চাই না। আওয়ামী লীগের অনেক ত্রুটি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু এই দলটি ক্ষমতায় না থাকলে কি হয়, সেটা আমরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেখেছি, দেখেছি ২০০১ সালের পরও। আবারও হয়তো দেখতে হবে।

দুই.
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তিন মাস লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন ১৮ অক্টোবর বিকেলে। তিনি দেশে ফিরে আসায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্য ভ্রান্ত প্রমাণ হলো। খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন ওবায়দুল কাদের। এখন কি তিনি বলবেন যে, দেশে ফিরলেও খালেদা জিয়া বেশি দিন দেশে থাকবেন না! বিএনপি বলেছে, চোখ ও পায়ের চিকিৎসার জন্য তাদের নেত্রী লন্ডন গিয়েছিলেন। আর, সরকার পক্ষ বলেছে, সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করতেই তিনি গিয়িছিলেন।

বেগম জিয়া লন্ডনে গিয়ে সত্যি কোনো ‘ষড়যন্ত্র' করেছেন কি না তা এখন সরকারের প্রকাশ করা উচিত। না হলে মানুষ ভবিষ্যতে সরকারি দলের নেতা কিংবা মন্ত্রীদের কোনো কথাই আর বিশ্বাস করবে না।

বেগম জিয়া লন্ডনে থাকতে পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এখন তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন। তাকে গ্রেপ্তার করার পরিকল্পনা সম্ভবত সরকারের নেই। প্রধান বিচারপতির পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারও সরকারকে কিছুটা চাপে ফেলেছেন জিয়ার প্রশংসা করে।

সংলাপে অংশ নেওয়া সব দল এবং দলের প্রধান নেতা সম্পর্কে নাকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু সেসব গণমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ায় কেউ তা জানতে পারেনি। জিয়াউর রহমানের এবং বিএনপির প্রশস্তি করায় তা গণমাধ্যমে এসেছে এবং তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিএনপির টানা আন্দোলনে সরকার বিচলিত না হলেও এখন কিছু ঘটনায় সরকার নড়েচড়ে বসছে। খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে খামোখা উত্তেজনার একটি ক্ষেত্র তৈরি করা এখন ঠিক হবে না বলে অনেকেই মনে করছেন। সরকারকে এখন ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতেই সরকারকে বেশি মনোযোগ নিতে হবে। বিএনপি যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকার অজুহাত না পায় সে দিকেও নজর রাখতে হবে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের আন্তরিকতা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। কোনো কারণে যেন মানুষের কাছে কোনো ভুল বার্তা না যায়।

দেশে ফিরে খালেদা জিয়া কোন পথে হাঁটেন সেটা সরকারকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তিনি যদি হঠকারিতার পথ পরিহার করেন, তাহলে সরকারেরও উচিত হবে নমনীয়তা দেখানো। বিএনপিকে শাসনে না রেখে সরকারকে শাসন করতে হবে নিজ দলের বিতর্কিত নেতা-কর্মী-সমর্থকদের। দল সমর্থকরা এখনও বেয়াড়া আচরণ বন্ধ না করলে নির্বাচনের সময় পস্তাতে হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
bibhu54@yahoo.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত বিভুরঞ্জন সরকার এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad