আমলাতন্ত্র ও নৈর্ব্যক্তিক সুশাসন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

আমলাতন্ত্র ও নৈর্ব্যক্তিক সুশাসন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ২:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৭

print
আমলাতন্ত্র ও নৈর্ব্যক্তিক সুশাসন

একইদিনে দুটি খবরে চোখ আটকে গেলো। চালসহ নিত্যপণ্যের চড়া দামে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ত্রাহি অবস্থা। প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমন একটি খবর প্রধান শিরোনাম করেছে একটি জাতীয় দৈনিক। কিন্তু রাষ্ট্র কি সাধারণ মানুষের জন্য? কিছু অসাধারণ মানুষও যে আছেন! একইদিনের আরেকটি খবরে তার নজির মিলল।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সব সচিব ও সচিব পদমর্যাদার চাকরিজীবীরা তাঁদের বাসার জন্য সরকারের দেওয়া বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরী নেবেন না। বদলে মাসিক ভাতা নেবেন তাঁরা। ভাতার পরিমাণ ১৬ হাজার করে প্রতি মাসে মোট ৩২ হাজার টাকা। জনপ্রশাসন  মন্ত্রণালয় গত রোববার এ বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছে।

এটুকু শুধু দেখলেতো আসলে আমলাতন্ত্রের চরিত্র ঠিক ঠাহর করা যায় না। জনতার সেবকরা কেমন মন মানসিকতার হতে পারেন তা পাওয়া যায় খবরের ভেতরে প্রবেশ করলে। কেউ যদি বাবুর্চি বা নিরাপত্তা প্রহরী না রাখেন তাহলে কী হবে— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, এই এখতিয়ার সম্পূর্ণ সচিবদের। রাখলেও ৩২ হাজার এবং না রাখলেও ৩২ হাজার টাকা তাঁদের বেতনের সঙ্গে ব্যাংকে চলে যাবে। কী অসাধারণ জনগুরুত্বপূর্ণ ভাবনা!

যেকোন আলোচনায় দেশের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হলে, স্বাভাবিকভাবে রাজনীতির প্রসঙ্গই বেশি আলোচিত হয়, আসে। এবং কম-বেশি হতাশাই উচ্চারিত হয় বেশি। কিন্তু আমলাতন্ত্রের এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কতটা আলোচনা হয়? সবাই সমস্বরে বলেন, জনপ্রশাসন, তথা আমলাতন্ত্র আজ এক দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশের ভাল-মন্দ অনেক বেশি তাদের উপর নির্ভরশীল।

একথা সত্য যে আমাদের জনপ্রশাসনে মেধাবী কর্মকর্তার অভাব নেই। অভাব নেই দেশ ও দশের প্রতি ভালবাসা আছে এমন আমলারও। কিন্তু শুধুই সুবিধা খোঁজার এই সংস্কৃতি এদের ভেতর এলো কি করে? যারা সততা ও পেশাদারীত্বের সাথে চাকুরী করেন তাদের ভেতর এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি কেন কাজ করে যে, চলুক যেভাবে চলছে? কেন তারা সাহসী হয়ে উদ্যোগ নিতে চান না? কারণটা আমরা জানি। যে সিস্টেমের ভেতর দিয়ে তারা বেড়ে উঠেন, সেটিই আজ তাদের জন্য ভিলেন হয়ে গেছে। এই সিস্টেম একজন কর্মকর্তাকে সৎ ও সাহসী করে না, তার দক্ষতা বাড়ায় না।

আজ একজন প্রকৌশলী খুঁজে পাওয়া যায় না যিনি কোন দলীয় ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার বিরোধিতা করেন, কোন আমলা পাওয়া যায় না যিনি গণবিরোধী, কিংবা আইন পরিপন্থি কোন সিদ্ধান্তের আপত্তি করেছেন। কিন্তু তাদের তা করার অধিকার আছে, কারণ তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, কোন দল বা ব্যক্তির নন। আজ এমন কর্মকর্তা পাওয়া বিরল যিনি বিধি ও আইনের প্রসঙ্গ তুলে কোন অযৌক্তিক কাজ করতে আপত্তি করবেন। এমনকি মন্ত্রী যদি শেষ পর্যন্ত তার আপত্তি অগ্রাহ্য করেন, তবুও তিনি তার আপত্তির কথা লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারেন। এমন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমলা আজ আর পাওয়া যায় না।

দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের রাস্তা বের করেন রাজনীতিকরা। আমলারা তা বাস্তবায়ন করেন। তাই এ প্রথায় দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা আমলাতন্ত্রকে লোভের জালে বন্দী করে রাখতে চায়। এখন এমনভাবে ফাইল তৈরী হয়, যা আসলে দুর্নীতি করে অর্থ আদায়ের জন্য রাজনীতিক আর আমলার ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’।

আমলাতন্ত্রে ভিকটিমাইজেশন প্রথা চলছে অনেকদিন ধরে। রাজনৈতিক ধারায় বিভাজিত প্রশাসনে এমন আমলার কদরই বেশি, যিনি রাজনীতিকদের কাছে পদলেহনকারী ও মেরুদণ্ডহীন। একজন এমন ভিকটিম আমলা আমাকে বলেছেন এটা করাই নিরাপদ। ঝুঁকি নিতে চান খুব কম সংখ্যক। অথচ এই ধরনের উদাসীনতা এক ধরনের দুর্নীতিও। এমন শতভাগ বাধ্য আমলা অন্যকোন দেশের রাজনীতিকরা পান কিনা সন্দেহ।

দীর্ঘ মেধাচর্চা, কঠোর শ্রম, নিয়মানুবর্তিতা, নৈর্ব্যক্তিক ও বাস্তববাদী প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজগঠন ও সংস্কারে তীব্র ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের সেবক হিসেবে সবসময় মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, এই গুণাবলি যে- জনপ্রশাসকের মাথার মুকুট, তাকে আমরা ‘আমলা’ বলি। কিন্তু এসব বৈশিষ্ট্যের কোনও কিছু আর অবশিষ্ট আছে? ব্রিটিশরা চলে গেছে, পাকিস্তানিরাও গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর, অথচ আমাদের জনপ্রশাসককে সমাজ-বিচ্ছিন্ন থাকতে আমলাতন্ত্র প্রসারিত হয়েছে এমন তীব্রভাবে যে উচ্চ আদর্শ, উচ্চ শির, উচ্চ চরিত্র এখন এই পেশার আর বৈশিষ্ট্য নয়।

আমাদের শাসনতন্ত্র ব্রিটিশদের থেকে যে শাসনব্যবস্থা গ্রহণ ও আত্মস্থ করেছে, তা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষ করে, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের অফিসারদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব শাসন ব্যবস্থায় তারা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন, নির্বাচিত সরকার ও তার মন্ত্রীদের জননেতা হতে দক্ষ প্রশাসকে পরিণত করার প্রক্রিয়াটির প্রয়োজনীয় তদারকিও তারাই করেন।

শাসন পরিচালনার জটিল, বহুমুখী ও বহুমাত্রিক বিষয়গুলো নেতা-মন্ত্রীদের গোচরে আনা, তাদের সে সব বুঝানো এবং হাতে ধরে শেখানোর কাজও এদেরই। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে দেখছি এরা হয়ে উঠছে মন্ত্রী আর এমপিদের তাবেদার।

আমলারা সরকারের স্থায়ী কর্মচারি। তাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো, যেসব রাজনীতিক সরকারি কাজে নিযুক্ত তাদের সরকারি নীতিমালা সম্বন্ধে অবহিত করা, পরামর্শ দেওয়া এবং সরকারি নীতি ও নির্দেশনা অনুসারে কাজ বাস্তবায়ন করা। তারা তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়ী। তবে শেষ বিচার তিনিই দেখবেন কোথাও আইনের ব্যত্যয় ঘটছে কিনা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে সবসময় পরামর্শ দেন। আমলাদের সততার পাশাপাশি নীতি বোধ এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উৎকর্ষতা বৃদ্ধির ওপরেও বিশেষ জোর দেন তিনি। কিন্তু সেসব কতটা বাস্তবে দেখা যায়? মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে, মাঠ পর্যায়ে তারা আর প্রশাসনিক ক্যাডার থাকেন না, হয়ে ওঠেন রাজনীতিকদের ক্যাডার। আর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এরা হয়ে ওঠেন বড় রাজনীতিকদের মতোই ক্ষমতালিপ্সু, সুবিধাবাদি।

গণতান্ত্রিক সমাজ বা স্বাধীন স্বদেশের জনগণের সেবার উপযোগী সংস্কার বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে হয়নি। পদায়ন ও পদোন্নতি দলীয় আনুগত্য ও দলীয় চাটুকারিতার ভিত্তিতে হওয়ায় আমলারা জনসেবকের ভূমিকায় নেই কোনভাবেই। আমলাতন্ত্রের চরিত্র ও মূল্যবোধে গণতান্ত্রিক রূপান্তর না ঘটাতে পারলে উন্নয়ন আর গণতন্ত্র দুটোই একসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।

সবশেষ চাকুরীরত একজন আমলার দেয়া তথ্য – ‘প্রশাসনের একজন সিনিয়র, অতি ক্ষমতাধর আমলা চুল কাটাতে গেলে তাকে প্রটোকল দিতে সেখানে হাজির ছিলেন আরও কয়েকজন সচিব।’ নৈর্ব্যক্তিক সুশাসনের যুক্তিসিদ্ধ প্রত্যাশার বদলে কাচারি-সেরেস্তার হীনতা বোধ ও অনাধুনিকতার প্রশ্রয় একেই বলে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি।
ishtiaquereza@gmail.com 

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad