অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

প্রভাষ আমিন ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৭

print
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? এই প্রশ্নটি আমি আমাকেই করছি। মাস কয়েক আগে আমি প্রথম ‘ব্লু হোয়েল’ নামে এক ভয়ঙ্কর গেমের কথা শুনি। গেমটি সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জেনে ভয়ে-আতঙ্কে জমে যাই আমি। কিন্তু আমি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করিনি। আমার ভয় ছিল কথা বললে যদি আরো কিছু মানুষ গেমটি সম্পর্কে জেনে যায়। বা কারো মধ্যে গেমটি নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়। তাই আমি বিষয়টি একদম গিলে ফেলতে চেয়েছিলাম। 

তার কয়েকদিন পর আবৃত্তিকার শিমুল মোস্তফা ফেসবুকে ব্লু হোয়েল নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি তার স্ট্যাটাসে মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছেন। কিন্তু তবুও আমি ইনবক্সে শিমুল ভাইকে আমার শঙ্কার কথা জানাই। শিমুল ভাইও আমার সাথে একমত হন। তবে পাশাপাশি সচেতনতার বিষয়টি নিয়েও আমরা কথা বলি। আমি নিশ্চিত আমার মত আরো অনেকে ব্লু হোয়েল সম্পর্কে জেনেও চুপ করে ছিলেন। এখন দেখছি শিমুল ভাইই ঠিক ছিলেন। আমিই ভুল। আমি চোখ বন্ধ করে রেথেছিলাম। কিন্তু প্রলয় বন্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে চুপেচাপে অনেকেই জেনে যান এই ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী খেলা

সম্পর্কে। দু’দিন আগে ঢাকার এক কলেজ ছাত্রী ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন, এমন একটি খবর জানাজানি হওয়ার পর সব আড়াল ভেঙ্গে পড়ে। শুরু হয় সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়। ইদানিং যা হয় সামাজিক মাধ্যমের তোলপাড়ের ঢেউ লাগে গণমাধ্যমেও। এখন গোটা বা্ংলাদেশই ব্লু হোয়েল নিয়ে আতঙ্কিত। এই লেখাটি লেখার আগেও আমি ভেবেছিলাম, নাম উল্লেখ না করে আমি সচেতনতার কথা

লিখবো। কিন্তু যখন দেখলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও গেমটি নিয়ে কথা বলেছেন এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন। তখন বুঝলাম, অন্ধ হলে সত্যি প্রলয় বন্ধ থাকে না। এখন আমাদের আড়াল না করে, এটি

ঠেকানোর উপায় বের করতে হবে। তবে আতঙ্ক ছড়ানোর কিছু নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে ঠাণ্ডা মাথায়।

আমি জানি ব্লু হোয়েল নিয়ে এখন আপনারা প্রায় সবাই আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন। গত কয়েকদিনে আমি ফেসবুক ইনবক্সে কয়েকশ সতর্কতামূলক বার্তা পেয়েছি। এই বার্তায় বিরক্ত হয়ে অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যারা বার্তা

পাঠাচ্ছেন, তাদের ব্লক করার হুমকি দিচ্ছেন। আমি অবশ্য বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখেছি। যারা বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তারা আমাকে ভালোবেসেই পাঠিয়েছেন। আপনারা সবাই জানেন, তবু অতি সংক্ষেপে ব্লু হোয়েল সম্পর্কে দুটি কথা বলে নেই। ২০১৩ সালে রাশিয়ান হ্যাকার ফিলিপ বুদেকিন ব্লু হোয়েল গেমটি বানান। নীল তিনি মৃত্যুর আগে তীরে উঠে আসে। ধারণা করা হয়, এটি এক ধরনের আত্মহত্যা। তাই এই গেমটির নাম রাখা হয়েছে ব্লু হোয়েল বা নীল তিমি।

সাইকোলজির ছাত্র ফিলিপ আসলে মানসিক বিকারগ্রস্ত। পুলিশ ইতিমধ্যেই তাকে আটক করেছে। আমরা জানি সব অপরাধীরই আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ফিলিপ পুলিশকে জানিয়েছে, হতাশাগ্রস্ত মানুষ পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর। তারা তাদের হতাশা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। যারা অপরিচিত এডমিনের নির্দেশে নিজের ক্ষতি করে এবং আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে, তারা মানব সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর। তাদের সন্তানরাও মানসিকভাবে দুর্বল হবে। তার বিবেচনায় এই হতাশাগ্রস্ত ও দুর্বল মানসিকতার মানুষরা

‘বায়োলিজিক্যাল ওয়েস্ট’। এদের বেঁচে থাকার দরকার নেই। ফিলিপ তাই এই আবর্জনা বা আগাছা পরিস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে। কী ভয়ঙ্কর যুক্তি! ফিলিপ তার এই মিশন ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। ইতিমধ্যে রাশিয়া-ভারতসহ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ তরুণ-তরুণী ব্লু হোয়েলের ফাদেঁ পড়ে জীবন দিয়েছে। বাংলাদেশে এই গেমের প্রচলন আছে কিনা, তা নিয়ে এখনও সংশয় আছে। বাংলাদেশের যে তরুণীর আত্মহত্যাকে ঘিরে ব্লু হোয়েল আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তার

বাবাই তার মেয়ে ব্লু হোয়েলে জড়িয়েছে বলে সন্দেহের কথা জানিয়েছিলেন। তবে এখন জানা যাচ্ছে, মেয়েটির আত্মহত্যা করলেও তার সাথে ব্লু হোয়েলের কোনো যোগাযোগ আছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। কারণ তার শরীরে ব্লু হোয়েলের আর কোনো

চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একটি জাতীয় দৈনিকে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৬১ জন ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে জীবন দিয়েছেন। তবে এই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি। আলোচিত তরুণীটি ছাড়া বাংলাদেশের আর কেউ এই গেমে আসক্ত কিনা নিশ্চিত নয়। হলেও খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। ব্লু হোয়েল ৫০ ধাপের একটি গেম।

শুরুর পর এডমিন থেকে নানা নির্দেশনা দেয়া হয়। শুরুর দিকে বিভিন্ন মজার নির্দেশনা দেয়া হলেও যত ধাপ বাড়তে থাকে, ততই ভয়ঙ্কর নির্দেশনা আসতে থাকে। ফাঁকে ফাঁকে এডমিন জেনে নেয় খেলোয়াড়ের পারিবারিক সব তথ্য, জেনে নেয় সব পাসওয়ার্ড। তারপর সেই তথ্য দিয়ে

ব্ল্যাকমেইল করা হয়। যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের কেউ কেউ লিখে গেছেন, ব্লু হোয়েলে ঢোকা যায়, কিন্তু বেরোনো যায় না। ব্লু হোয়েলে জোরে গাড়ি চালানো, মধ্যরাতে ছাদের কার্নিশে হাটা, হরর ছবি দেখা, মা-বাবা বা বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করা, চুরি করা, নগ্ন হওয়া, সেক্স করা, মাদক নেয়া, নিজের শরীর রক্তাক্ত করার মত নির্দেশনা দেয়া হয়। শেষ ধাপে নির্দেশনা আসে আত্মহত্যার। আত্মহত্যাকেই বলা হয় মুক্তি। প্রতিটি নির্দেশনা বাস্তবায়নের ছবি পোস্ট করতে হয়। ছবি দিলেই আসে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার চাবি। খেলোয়াড়রা

পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে যান। তাই এডমিন যা বলে তাই করে। ব্লু হোয়েল আসলে খেলা নয়, মরণ নেশা।

অনেকে বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন বিশ্বে শত শত মানুষ মারা যায়। ব্লু হোয়েল ছাড়াও শত শত মানুষ আত্মহত্যা করে। তাই এটা নিয়ে অত হইচই করার কিছু

নেই। হইচই হয়তো করার দরকার নেই। কিন্তু প্রতিদিন মানুষ আত্মহত্যা করে বলেই আরেকটি আত্মহত্যার গেমকে থামানোর ব্যবস্থা করতে হবে না, এমন অমানবিক যুক্তি যারা দেন, তারাও মানসিকভাবে সুস্থ নন। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে ব্লু

হোয়েল তেমন বিস্তার লাভ করেনি, হয়তো একদমই করেনি। তাই এখনই সময় বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেয়ার। বিটিআরসির কাছে দাবি জানাচ্ছি, বাংলাদেশে যাতে ব্লু হোয়েল ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে

সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়ার। অনেকে বলছেন, লিঙ্ক বন্ধ করলেও বিকল্প ব্যবস্থায়ও ব্লু হোয়েল খেলা সম্ভব। সেটাও যাতে সম্ভব না হয়, তাই সর্বোচ্চ কারিগরী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং চালাতে হবে কঠোর নজরদারি। সজাগ থাকতে হবে আইশৃঙ্খলা বাহিনীকেও। সংবেদনশীল হতে হবে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমকেও।

সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক সচেতনতা। তবে সামাজিক সচেতনতারও আগে দরকার ব্যক্তি সচেতনতা। ব্লু হোয়েল গেম খেলার জন্য চাই উচ্চ গতিসম্পন্ন ইন্টারেনেট। তাই মধ্যবিত্তের নিচের কারো এই গেমে আসক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ব্লু হোয়েল এডমিনদের টার্গেট হলো একাকিত্বে ভোগা হতাশ তরুণ- তরুণীরা। তাদের সহজেই প্রভাবিত করা যায়। তাই সবার আগে দায়িত্ব হলো পরিবারের, মানে মা-বাবার।

প্রথম কথা হলো একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে আপনার সন্তান যেন ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একাডেমিক কারণে ইন্টারনেট দরকার হলেও তার ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। তবে ব্লু হোয়েলের ভয়ে আপনার সন্তানকে ইন্টারন্টে প্রযুক্তির বাইরে রাখাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। যতটুকু দরকার, ততটুকু যেন সে পায়, সেটা দেখতে হবে।

বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই বাবা-মা দুজনই চাকরি করেন। দুজনের চাকরির সুবাদে সেই পরিবারের সন্তানরা সচ্ছলতা পায়, সাথে পায় একাকিত্বও। অনেক বাবা-মাই হয়তো সন্তানকে সময় দিতে না পেরে ইন্টারনেট দিয়ে দেন। সে হয়তো সাধারণ গেম খেলে বা সিনেমা দেখে বা হয়তো পড়াশোনার কাজেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। কিন্তু কখন কোন ফাঁদে পড়ে যাবে, তার তো গ্যারান্টি নেই। তাই

সন্তানকে আরো বেশি সময় দিতে হবে। তার মধ্যে যাতে হতাশা বাসা বাঁধতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দূরে থাকলেও আপনার ভালোবাসা যেন সে ফিল করে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যে যাতে কখনোই নিজেকে একা মনে না করে। ব্যাপারটা এমন নয়, আপনি সারাক্ষণ তাকে আগলে রাখলেই সে হতাশ হবে না। অনেকের মধ্যে থেকেও মানুষ একা হয়ে যেতে পারে। আবার একা থেকেও প্রিয়জনের ভালোবাসায়

জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই সন্তানকে ভালোবাসুন। কোনো বিষয় অন্যায়, অসম্ভব চাপ দেবেন না। তাকে তার মত আনন্দের সাথে বেড়ে উঠতে দিন। সে যাতে সারাক্ষণ কম্পিউটারে বুঁদ হয়ে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করুন। তাকে মাঠে যেতে বলুন, খেলতে বলুন। ভার্চুয়াল পর্দায় নয়; খেলায়, গানে, সিনেমায়, বইয়ে, প্রকৃতিতে অ্যাকচুয়াল আনন্দে মেতে থাকতে দিন। তাকে বলুন, জীবন অনেক আনন্দময়। জীবন

একটাই। সে জীবনের কোনো বিকল্প নেই। তাকে সেই জীবনের গল্প শোনান। বলুন বাস্তব জীবন ভার্চুয়াল ব্লু হোয়েলের চেয়েও এক্সাইটিং। তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এমন নয়, আপনার সন্তান আজ ব্লু হোয়েল খেলা শুরু

করলো, আর কালই বাসার ছাদ থেকে লাফ দিলো। ব্লু হোয়েল খেলার ৫০টি ধাপ পেরুতে কমপক্ষে ৫০ দিন লাগার কথা। আর এই খেলায় জড়িয়ে গেলে আস্তে আস্তে তার মধ্যে নানা ধরনের পরিবর্তন আসবে। আপনি যদি আপনার সন্তানকে ভালোবাসেন,

আপনি তার পরিবর্তনগুলো টের পাবেন। তাই আপনার ভালোবাসার টান যদি তীব্র হয়, তাহলে আপনার সন্তান ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পা দেবে না। ব্লু হোয়েল নিয়ে মাতামাতি শুরুর পর, আমার পরিচিত কেউ কেউ গেমটির ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন, খেলতে চেয়েছেন। তাদের ধারণা, তারা মানসিকভাবে অনেক স্ট্রং।

তাই এক পর্যায়ে তারা বেরিয়ে আসতে পারবেন। আপনি যদি সত্যি সত্যি মানসিকভাবে স্ট্রং হন, তাহলে সেই শক্তিটা পড়াশোনায় কাজে লাগান, জীবনযুদ্ধে কাজে লাগান। মানুষের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু মানসিক শক্তির

পরীক্ষা দিতেও ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পা দেবেন না। জীবন নিয়ে বাজি ধরার কিছু নেই। বাঁচুন আনন্দের সাথে।

প্রভাষ আমিন: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত প্রভাষ আমিন এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad