বিকারহীন মানুষের এই দেশে!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

বিকারহীন মানুষের এই দেশে!

গোলাম মোর্তোজা ৩:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭

print
বিকারহীন মানুষের এই দেশে!

সব আলোচনার কেন্দ্রে রোহিঙ্গা ইস্যু আর চালের দাম। এর বাইরে বাংলাদেশের মানুষের যে আর কোনো সমস্যা আছে, তা আলোচনায়ই আসছে না। এটা নতুন কিছু নয়। কয়েকদিন পর পর একেকটা ইস্যু সামনে আসে। আগেরটা চাপা দিয়ে নতুনটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রোহিঙ্গা ইস্যু আর চালের দামের বাইরের জনজীবন কেমন চলছে? সেদিকে একটু দৃষ্টি দেয়ার চেষ্টা করি।

০১.
সব সময় সব সরকারের সমর্থকরা এমন সব যুক্তি সামনে আনেন, যা হয়তো আপনি চিন্তাই করতে পারবেন না। যেমন বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে হইচই শুরু হলো। বিএনপি সমর্থক একজন সম্পাদক বললেন, দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বাজারে কোনো জিনিস তো অবিক্রিত থাকছে না। মানুষের কেনার সামর্থ্য বেড়েছে। সুতরাং দাম ‘একটু’ বৃদ্ধি পেলেও মানুষের সমস্যা হচ্ছে না।

এবার চালের দাম বেড়েছে সরকারের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে। সেদিকে না গিয়ে সরকার সমর্থক অনেকে বলছেন, হ্যাঁ চালের দাম ‘একটু’ বেড়েছে (১৫ টাকার ওএমএসের চাল ৩০ টাকা, তাও আতপ চাল। ৩২ টাকার মোটা চালের কেজি ৫৫ টাকা হয়েছে। এই বৃদ্ধি তাদের কাছে ‘একটু’।) বাজারে চাল পাওয়া তো যাচ্ছে। মানুষ চাল কিনতে পারছে। তাছাড়া দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হয়েছে। ভাত ছাড়াও মানুষ অনেক কিছু এখন খাচ্ছে। সবজি খাওয়া বেড়েছে। চালের দামের কারণে মানুষের সমস্যা হচ্ছে না।

০২.
গত দুই মাসে বাজারে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যার কারণে সবজির দাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এবার বন্যার আগে, বন্যার সময় এবং বন্যার পরে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কমার কোনো লক্ষণ নেই। চাল যেহেতু এখনও বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাবার, সে কারণে চালের দামের মধ্যেই সব আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ৩০ টাকা কেজির পটল যে ৬০ বা ৮০ টাকা হয়ে গেছে, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই নেই। কেন সবজির দাম এতটা বেড়ে গেল, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টাই করছেন না। শুধু ‘উন্নয়ন’র গল্প আর ‘মানুষ কিনতে পারছে’ জাতীয় প্রপাগান্ডা করছেন বিরতিহীনভাবে।

চাল, সবজিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির এই চিত্র ঢাকা, জেলা-উপজেলা শহর এমনকি গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। মানুষের ভেতরে ক্ষোভ আছে, সংগঠিত প্রকাশ নেই। সেই সুযোগে প্রপাগান্ডাবাজরা বলছে, সব ঠিক আছে। দাম ‘একটু’ বাড়লেও মানুষের সমস্যা হচ্ছে না।

০৩.
রাজধানী ঢাকার জনজীবনের দিকে একটু তাকানো যাক। আপনি নির্মোহভাবে বলেন তো, এই নগর দেখার কেউ আছে?

গুলশান-বনানী-বারিধারা, ভিআইপি রোড ছাড়া ঢাকা শহরের আর প্রায় কোনো রাস্তা চলাচলের উপযুক্ত নয়। গত পাঁচ ছয় মাস ধরে রাস্তা ধানক্ষেতে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির দোহাই দিয়ে অপকর্ম করা তো আমাদের চিরন্তন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এসব রাস্তা ঠিক করার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ভালো ফুটপাত এবং রোড ডিভাইডার ভেঙে আবার নতুন করে করাটা দৃশ্যমান। গত বছরখানেক ধরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই মুহূর্তে রোড ডিভাইডার এবং ফুটপাত ভাঙাগড়ার খেলা চলছে গণভবনের সামনে। সিরামিক ইটের অক্ষত রোড ডিভাইডার ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ভালো ফুটপাত ভেঙে আবার নতুন করে করা হচ্ছে। অথচ একটু এগিয়ে গেলে শ্যামলী মোড়ে রাস্তা পুকুরের মতো গর্ত হয়ে আছে। গাড়ি গর্তে পড়ে বিকট শব্দ হওয়ার দৃশ্য এখানে নিয়মিত বিষয়। তেজগাঁও, মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের সামনের রাস্তা সম্ভবত লাঙল দিয়ে ধান চাষের উপযোগী করা হয়েছে। এখানেও গাছ কেটে ভালো ফুটপাত ভেঙে নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। রাস্তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ কারও নেই।

০৪.
আগে ঢাকা শহরের যানজট ছিল মূলত অফিস সময়ে। আস্তে আস্তে ঢাকা এখন ২৪ ঘণ্টার জ্যামের শহরে পরিণত হয়েছে। ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে এখন প্রায় সারা রাত জ্যাম লেগে থাকে। এর মধ্যে ভয়ঙ্কর জ্যাম তৈরি হয় গাবতলী থেকে মিরপুর রোডের সংসদ ভবন পর্যন্ত। কোনো কোনো রাতে তা আরও বিস্তৃত হয়। রাতে যখন ট্রাক ঢোকে শহরে মূলত তখন থেকে শুরু হয় জ্যাম। থাকে প্রায় সারা রাত।

ট্রাক ঢুকলে রাস্তায় একটা চাপ পড়বে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্যতম কোনো আইন-কানুন থাকবে না? যার যেদিক দিয়ে ইচ্ছে গাড়ি-ট্রাক চালাবে, বিকট আওয়াজে হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে যাবে বাস-ট্রাক? তা দেখার জন্যে, ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে কেউ থাকে না। দু’একজন সার্জেন্ট বা ট্রাফিককে দেখা যায় অসহায়ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। রাতের ঢাকা নিরাপত্তার নামে তল্লাসী চৌকি, যানজট আর দুর্ভোগের আরেক নাম।

০৫.
ঢাকা শহরে যত বাস চলে এর মধ্যে একটি মিনিবাসও নেই, ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়ার উপযোগী। কিছু অংশ ভাঙা, এবড়োথেবড়ো এসব গাড়ির ফিটনেস থাকার কোনো কারণই নেই। কিন্তু এগুলো চলছে কোনো নিয়মনীতি না মেনে। নিয়মিত দায়িত্ব পালনরত সার্জেন্ট বা ট্রাফিক পুলিশ এদের কিছু বলেন না। এরা আইনের ঊর্ধ্বে। অঘোষিতভাবে সম্ভবত তাদের তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

ঢাকা শহরে চূড়ান্ত অপরিকল্পিতভাবে আরেকটি পরিবহন ছড়িয়ে পড়েছে। যার নাম লেগুনা। একসময় যা টেম্পু নামে পরিচিত ছিল, এখন তা লেগুনা। বিআরটিএ লেগুনা চালানোর অনুমতি দিয়েছে এলাকার ভেতরে যেসব রাস্তায় বাস চলে না সেসব রাস্তায়। কিন্তু লেগুনা চলে মূল রাস্তায়। আপনি মহাখালী রেলগেটের সামনে যান। গিয়ে দেখবেন সেখানে সার্জেন্ট আছেন, ট্রাফিক পুলিশ আছেন। এসব অবৈধ লেগুনা রেললাইনের উপর বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছেন, নামাচ্ছেন। পুলিশ তা তাকিয়ে দেখছে, কিছু বলছে না।

শুধু এই একটি জায়গা নয়। পুরো ঢাকা শহরের চিত্র এমন। ফিটনেসবিহীন বাস আর অবৈধ লেগুনা পুলিশকে নিয়ম করে অর্থ দিয়ে চলছে। চৌদ্দ পনেরো বছরের কিশোররা লেগুনার ড্রাইভার। যাদের কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। রাস্তায় চলার সময় সব লেগুনা মাঝরাস্তায় যাত্রী ওঠায়-নামায়। রাস্তার একপাশে সরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। নিয়মিত দূর্ঘটনা ঘটায়। যেহেতু অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে, ফলে তাদের কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না।

একটু ভেবে দেখার চেষ্টা করেন, লেগুনা নামক এই পরিবহনটির রুট পারমিট নেই। ড্রাইভার অপ্রাপ্ত বয়স্ক, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, বয়সের কারণে থাকার কথাও নয়। রাস্তার মাঝখানে যে কোনো জায়গায় সে দাঁড়াতে পারে। রেললাইনের উপরেও সে দাঁড়াতে পারে। রাজধানীতে এই লেগুনা দাপটের সঙ্গে চলছে।

রাস্তায় শত শত মোটরসাইকেল। ট্রাফিক সিগন্যাল বা ট্রাফিকের আদেশ কোনো কিছুই তাদের মানতে হয় না। ফুটপাত দিয়ে দাপটের সঙ্গে চলে। মানুষকে ধাক্কা দেয়, দূর্ঘটনা ঘটায়। তার কিছু হয় না। এই রাজধানীতে মোটরসাইকেল চালকদের জন্যেও কোনো আইন নেই-নিয়ম নেই। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন।

ব্যক্তি মালিকানার গাড়ি ঢাকার রাস্তার প্রায় পুরোটা দখল করে রাখে। গণপরিবহন না থাকায় যা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যক্তি মালিকানার এসব গাড়িও নিয়ম মেনে চলে না। পার্কিং করে যত্রতত্র। তারপরও সার্জেন্ট বা ট্রাফিক পুলিশকে কিছুটা তৎপর দেখা যায় ব্যক্তি মালিকানার গাড়ির ক্ষেত্রে। মাঝেমধ্যেই কাগজপত্র দেখার জন্যে আটকানো হয় এসব গাড়ি। ঢাকা শহরে যত পরিবহন চলে ব্যক্তি মালিকানার গাড়ির কাগজপত্রই মোটামুটিভাবে ঠিক থাকে। তারপরও এদেরই ধরা হয়, দু’শ পাঁচ’শ টাকার বিনিময়ে ছেড়েও দেয়া হয়। বাস, লেগুনা নিয়মিত অর্থ দিয়ে চলে। ব্যক্তি মালিকানার গাড়ি নিয়মিত অর্থ দেয় না। কাগজপত্র দেখার নামে তাদের থেকে অর্থ নেয়া হয়।

সারা বাংলাদেশ ভরে গেছে চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারি চালিত নিম্নমানের তিন চাকার গাড়িতে। সেটা দেখার জন্যে দেশে কোনো কর্তৃপক্ষ আছে বলে মনে হয় না।

০৬.
শহর-গ্রাম কোথাও স্বস্তির কোনো সংবাদ নেই। তারপরও ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’। চারিদিকে শুধু ‘উন্নয়ন’ আর ‘উন্নয়ন’। শোকে নয়, মানুষ সম্ভবত অতিরিক্ত ‘উন্নয়ন’ আনন্দে ‘পাথর’ হয়ে গেছে। কোনো কিছুতেই মানুষের বিকার নেই। বিকারহীন মানুষের এই দেশে আইনের প্রয়োগ বা ন্যায্যতা আশা করাটাই তো অপরাধ।

গোলাম মোর্তোজা: সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
s.mortoza@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত গোলাম মোর্তোজা এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad