রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতা ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতা ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য

তুষার আবদুল্লাহ ৬:১৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭

print
রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতা ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য

নাফনদীর পশ্চিম পাড় এখন মানবিকতার চাদরে ঢাকা। সেই চাদরে সহানুভূতির নানান বুনন। ২৫ আগস্ট যখন পূব থেকে পশ্চিমা আরাকান বা রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা ছুটে আসছিল, তখন সেই চাদর রক্তাক্তই ছিল। তাদের পশ্চিম এবার জায়গা করে দেবে কিনা, এ নিয়ে ছিল দ্বিধাতে। রাষ্ট্র পরিস্থিতি বুঝে নিতে খানিকক্ষণ সময় নিয়েছে। দ্বিপাক্ষিক এবং আঞ্চলিক কূটনীতির হিসেব কষতে একটু সময় ক্ষেপণ স্বাভাবিক।

.

এই সময়টাতে আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শরণার্থী হিসেবে প্রাণ নিয়ে বা নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আসার মানবিক দিকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমে জায়গা করে নেয়। নিজ ভিটে থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গা বিশেষ করে ঐ জনগোষ্ঠীর নারী-শিশুর উপর নির্যাতন, উখিয়া এবং টেকনাফে তাদের অনিশ্চিত গন্তব্যে ভেসে বেড়ানো, এক সময় বাংলাদেশসহ দুনিয়াকেও আদ্র করেছে।

রাষ্ট্রও শরণার্থী হিসেবে তাদের আশ্রয় দেয়ার উদ্যোগ নেয়। শরণার্থী থাকাকালীন তাদের খাবার, বসত এবং স্বাস্থ্যের দায়িত্বও নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী উখিয়া পরিদর্শন করে, সেই নিশ্চয়তা এবারে আসা প্রায় তিনলাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে দিয়েছেন। শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা রেজিস্ট্রেশনের কাজ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কূটনীতিক তৎপরতাও শুরু করেছে।

ঢাকায় বিদেশী কুটনীতিকদের অবহিত করার পাশাপাশি তাদের উখিয়া নিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও জরুরী বৈঠকে বসছে। অন্যদিকে, চীন-ভারত দাঁড়িয়ে পড়েছে মায়ানমারের পাশে। কুটনীতিক আলোচনা যতো তুঙ্গেই উঠুক না কেন, স্মরণে রাখা দরকার রোহিঙ্গা ইস্যু একাধিক দ্বি-পাক্ষিক এবং আঞ্চলিক গণিতের মিমাংসার উপর নির্ভর করছে।

এই গণিতের সমাধান ১৯৭৮ সাল থেকে করা সম্ভব হয়নি। পারা যায়নি রোহিঙ্গার স্রোতে স্থায়ী বাঁধ দেয়া। ১৯৭৯ সালে কিছু রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো গেলেও বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের শুধু মানবিক চোখে দেখা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কারণ সেই ১৯৭৮ সাল থেকে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামাজিক ভাবে মিশে গেছে, যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠনগুলোও তাদের ব্যবহার করছে।

আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে নিজেদের স্বাধীকার আদায়ে সংগ্রামরত বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর কতিপয় সদস্য ২৫ আগস্ট থেকে স্রোতের মতো আসা শরণার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এমন ধারণা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের। এই সদস্যরা আগেও বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু এবার তারা সশস্ত্র ভাবে আরো বেশি সংখ্যায় এসেছে। কারণ আরাকানে স্বাধিকারের দাবিতে মূলত ছয়টি গোষ্ঠী কাজ করতো।

এদের মধ্যে প্রভাবশালী গোষ্ঠী আল একিন, আরাকান সলিডারিটি অরগানাইজেশন এবং আরাকান আর্মি। তারা এখন আরাকান সলভেশন অ্যালায়েন্সে একীভূত হয়েছে। তারাই যৌথ ভাবে ২৩ আগস্ট ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প এবং একটি সেনা ক্যাম্পে হামলা করে একযোগে। তারা সাউন্ড গ্রেনেড হামলা করায় মায়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশও সীমান্ত ছেড়ে চলে যায়।

এই অবস্থায় মায়ানমারের সেনা বাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে এই বিদ্রোহীদের উপর পাল্টা হামলা করে। এই হামলা সাধারণ জনগোষ্ঠী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

শরণার্থীদের আশ্রয় কোন চূড়ান্ত সমাধান নয়। তাদেরকে আজ অথবা আগামীকাল নিজ দেশে ফিরে যেতেই হবে। শংকার জায়গা হচ্ছে এই আগামী কতো বিলম্বে আসবে? যতো দিন যাবে রোহিঙ্গারা মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যেতে থাকবে। এবার যেহেতু বিপুল সংখ্যায় এসেছে তারা, সেহেতু শুধু কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম নয় পুরো দেশেই তাদের ছড়িয়ে পড়ার আশংকা আছে।

ভয় হলো এবার ত্রাণ বিতরণের সময়েও দেখা গেছে বিভিন্ন মৌলবাদী ও জঙ্গী গোষ্ঠী কাজ করছে মানবিক মুখোশে। অতীতের যারা আছে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আত্মিয়তা হতে দেরি হবে না। শুধু জঙ্গী বা রাজনৈতিক অপরাধ নয় সামাজিক অপরাধেও এদের সুলভে ব্যবহার করার চেষ্টা থাকবে। ব্যবহার করার জন্য ওঁত পেতে আছে সুযোগ সন্ধানীরা।

এখানে রাষ্ট্র মজবুত রক্ষনব্যুহ তৈরি করতে হবে। যেনো সেই রক্ষণব্যুহকে ফাকিঁ দিয়ে সুযোগ সন্ধানীরা সফলকাম না হয়। এক্ষেত্রে মানবিকতার চোখকে অনুসন্ধিৎসু করে, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকেও রেফারীর ভূমিকা নিতে হবে রাষ্ট্রের স্বার্থে।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টিভি।

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত তুষার আবদুল্লাহ এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad