ষোড়শ সংশোধনী: কেঁচো খুঁড়তে সাপ

ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

ষোড়শ সংশোধনী: কেঁচো খুঁড়তে সাপ

মুজতবা খন্দকার ৫:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৭

print
ষোড়শ সংশোধনী: কেঁচো খুঁড়তে সাপ

একটি মামলা এবং তার রায় যে আমাদের সমাজ, রাজনীতিতে কত বড় প্রভাব রাখতে পারে, কত চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারে তার বড় ধরনের নজির আমরা দেখি পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে। অনেক ছোট খাট মামলার সুত্রে অনেক সময় মেলে অনেক মাইলফলক রায়, যে রায় সমাজ এমনকি রাষ্টযন্ত্রের খোলনলচে অনেক সময় বদলে দেয়। কিংবা আদালতের আদেশকে শিরোধার্য মেনে বদলাতে হয়।

.

ঢাকার ওয়াইজ ঘাট এলাকার মুন সিনেমা হল ও এর সম্পত্তি নিয়ে বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদ আলম এই রিট আবেদন করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে রিটের নিষ্পত্তি শেষে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ আবেদনকারীর পক্ষে রায় দেন প্রথম। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্টে পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায়টি আসে।

ওই রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সামরিক শাসনামলের অনেক কিছু অবৈধ ঘোষিত হয়। রায়ে বলা হয় ধর্মকে মৌল বিষয় ধরে রাজনীতি করা যাবে না। সংবিধানকে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের আদলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঠিক একই কথা বলা যায়, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার রায়ের বেলায়ও। বিচারক মাজদার হোসেন তার পোষ্টিং নিয়ে কোন একটি বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে প্রতিকার চেয়ে একটি রিট আবেদন করেছিলেন। আর তার প্রেক্ষিতে আমরা পাই, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করাসহ ছয় দফা নির্দেশনা। যেটা নিয়ে এখনো সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে অকেটা সাপ লুডু খেলা চলছে। কেঁচো খুড়তে অনেক সময় সাপ বেরিয়ে আসে।

বিষয়টা হনুমানের সেই কৈলাস পর্বতের চূড়া ভেঙ্গে নিয়ে আসার মতো। যেমন এই মূহুর্তে আলোচিত হচ্ছে ষোড়শ সংশোনী মামলার ঐতিহাসিক রায় নিয়ে। যে রায় এখন শাসক দলের গলার কাটা হয়ে বিঁধছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের সব মন্ত্রী, শাসক দলের সব নেতাই এখন তারস্বরে সুপ্রিম কোর্টকে ধুয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়তে তার দলের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

আর অর্থমন্ত্রীতো আরো এককাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, আমরা আবার পাস করব এবং অনবরত করতে থাকব। দেখি জুডিশিয়ারি কত দূর যায়। মানুষের প্রতিনিধিদের ওপর তারা খবরদারি করবে? তাদেরকে আমরা চাকরি দিই।
ক্ষুব্ধ হয়ে এসব কথা বললেন, অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বেশ গোসসা করেছেন।

তাতো করবারই কথা। ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায় যে উনাদের গনেশ উল্টে দিয়েছে। উনাদের এতদিনের পরম পূজনীয় দেবতাকে
এক ঝটকায় আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে। উনাদের সকল হিসেব নিকেশ পাল্টে দিয়েছে। সুতরাং গোসসা তো উনারা একটু করতেই পারেন।
কিন্তু, পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে খায়রুল হক যে জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম দেখিয়েছিলেন, তখন তো মুহিত সাহেবরা খুশীতে বগল বাজিয়েছিলেন!

বিজয়োল্লাসে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করেছিলেন তখন উনার সমমনারা! সেকি উল্লাস! সে উল্লাস দেখে তখন মনে করা অস্বাভাবিক ছিল না যে খায়রুল হক, একটি দলের রাজনৈতিক অভিলাস পূরণ করেছেন তার রায়ে। যেন সেটা রায় নয়, সরকারের ব্রিফ রিপোর্ট। তার রায়ের পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ছত্রে ছিলো জিয়া বিদ্বেষ। আর সেদিন তাদের এরকম উল্লম্ফন দেখে বিধাতা হয়ত পর্দার ওপাসে বসে হাসছিলেন।


এখন মুহিত সাহেবরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, আমি তাদের হতাশা দেখে মোটেই বিচলিত নই। যে বয়সে নাতিপুতি নিয়ে তার খেলার কথা, সেই বয়সেও অর্থমন্ত্রী রাজভাণ্ডার, রাজকোষ সামলাচ্ছেন। কতটুকু কি করতে পারছেন তা আমরা সবাই জানি। আর বয়স হলে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় মানুষের। না হলে কেউ বলতে পারে, আমরা তাদের চাকরী দেই। চাকরী দিয়েছেন বলে, জুডিশিয়ারিকে উনাদের কথামত চলতে হবে নাকি? ভাবটা তো তেমনই মনে হচ্ছে। শুধু মুখে বলেননি এই যা!


নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ কেন সরকার সুপ্রিমকোর্টকে দিতে টালবাহানা করছে, সেটা মুহিত সাহেবদের বক্তব্যে অনেকটাই পরিস্কার।
মুহিত সাহেব বলেছেন, মানুষের প্রতিনিধিদের ওপর তারা খবরদারি করছে। তার এই কথাটার পর হয়ত সবাই এই উপসংহারে পৌঁছাবেন যে, তার আসলে বয়স হয়েছে, তাকে ক্ষমা করা যায়। কারণ তিনিসহ ১৫৪ জন বিনাভোটের আজ এমপি। বাকিগুলোতেও ভোট দিয়েছে পাঁচ থেকে সাত ভাগ মানুষ।

সেই নির্বাচনের এমপিদের যিনি জনপ্রতিনিধি বলেন, তাঁর সত্য জ্ঞানটুকুও যে আর অবশিষ্ট নেই, সেটা জানার জন্য কোন ডাক্তার ডাকার দরকার নেই, যে কোন আক্কেলজ্ঞানের মানুষ সেটা বুঝতে পারে।
ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ একটা চিন্তা ভাবনার দরোজা খুলে দিয়েছে।

আমাদের দেশ কিভাবে চলছে, আর কিভাবে চলবে তার একটি পথনির্দেশ বাতলে দেয়া হয়েছে... সেটাকে পজেটিভ ভাবে না নিয়ে তার সমালোচনা, জুডিশিয়ারিকে দেখে নেবো এমন মনোভাব দেশটাকে কেবল পিছিয়ে দেবে। এটা রাজনৈতিকরা কবে বুঝবেন।

বয়স হলে মানুষ বিশেষ করে রাজনীতিকরা নৈর্ব্যক্তিক হয়, কিন্তু শুধু মুহিত নয় সরকারের মন্ত্রী, শাসক দলের নেতাদের মুখ থেকে সুপ্রিম কোর্টকে যেভাবে নিন্দা মন্দ করছেন তাতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, কেউ দুধ বেচে মদ খায়, আর কেউ মদ বেচে দুধ খায়! আপনি কোনটা খাবেন সেইটা আপনার অভিরুচি!

এই লেখা যখন লিখছি তখন শুনলাম ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্য। মুন সিনেমা নিয়ে মামলায় তিনি কিন্তু পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছিলেন। তিনি রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বললেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় অগণতান্ত্রিক ও পূর্ব পরিকল্পিত। খায়রুল হক বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে সংবিধানের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনতে হলে আবারও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

সংবিধানে যেহেতু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল না, সেহেতু এটা রাখা সংবিধান পরিপন্থী বলেও জানান এই সাবেক প্রধান বিচারপতি। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, সংসদ সদস্যরা ভুল করলে সুপ্রিম কোর্ট দেখে সংশোধন করবেন। এই রায়ের মাধ্যমে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে এবং সংসদ সদস্যদের হেয় করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এবিএম খায়রুল হক।

খায়রুল হক যখন সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন, তখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট জুডিশিয়ারির জন্য কত কথা বলেছিলেন। ষোড়শ সংশোধনী রায়কে তিনি পূর্ব পরিকল্পিত বললেন। তাহলে মুন সিনেমার মামলায় তিনি যখন পুরো পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছিলেন, তখন কি সেটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিলো? প্রশ্নটা কি অস্বাভাবিক?

হঠাৎ করে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি হয়ে ঘটা করে তার উত্তরসূরীদের নাকচ করলেন এটা অনেকটা অস্বাভাবিক। যেটা ইতিপূর্বে কোন প্রধান বিচারপতি করেননি। অবশ্য তিনি অস্বাভাবিক, চমক দিতে বরাবরই পছন্দ করেন। তিনি জুডিশিয়ারিতে থাকার সময়ও বিভিন্ন রায় দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দিয়েছিলেন। তিনি পনেরই আগষ্ট সরকারী ছুটিও ঘোষণার রায় দিয়েছিলেন।

কে স্বাধীনতার ঘোষক আর কে না সেটা নির্ধারনের দায়িত্ব ঐতিহাসিকের। আদালতের কোন বিবেচ্য বিষয় ছিল না। তবে কি এসব রায়ও তিনি দিয়েছিলেন পূর্ব পরিকল্পনার অংশহিসেবেই।

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
mujtobantv@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত মুজতবা খন্দকার এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad