তুফান সরকারদের কি খুব দরকার?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

তুফান সরকারদের কি খুব দরকার?

বিভুরঞ্জন সরকার ৪:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৭

print
তুফান সরকারদের কি খুব দরকার?

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি প্রিয় স্লোগান হলো, ‘আরো অনেকদিন দরকার, শেখ হাসিনার সরকার।’ শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আছে টানা দুই মেয়াদে। এখন দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো কিছু সরকার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, যাদের কার্যকলাপ শেখ হাসিনার সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। এমন এক ব্যক্তি হচ্ছেন তুফান সরকার। গত কয়েকদিন ধরে গণ মাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

.

তুফান সরকরের একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে। তিনি বগুড়া শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক। এই পরিচয়ের কারণেই শেখ হাসিনা সরকারও আলোচনায় এসেছে। কোনো সুকীর্তির জন্য নয়, কুকীর্তির জন্যই তুফান সরকার আলোচনায় এসেছেন। তিনি যে রকম মানুষ, তার সম্পর্কে গণমাধ্যমে যে সব খবর বের হয়েছে, তা থেকে মনে হয় না যে তার আত্মমর্যাদাবোধ বলে কোনো কিছু আছে।

অথচ এই তুফান সরকার ঠিকই শেখ হাসিনার সরকারকে মানুষের সামনে হেয় করলো। কী কীর্তি সাধন করেছেন জনাব তুফান? গত ১৭ জুলাই কলেজে ভর্তি ইচ্ছুক এক ছাত্রীকে জোর করে তার বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছেন। এই শ্রমিক লীগ নেতা বিবাহিত এবং বাড়িতে তার স্ত্রী ও শাশুড়ি বর্তমান। তিনি যে একজন ক্ষমতাবান পুরুষ সেটা তার আত্মীয়-স্বজনদেরও অজানা নয়।

বরং এটাই হয়তো ঠিক যে তাদের সমর্থন-সহযোগিতা নিয়েই তিনি তার সব অপকর্ম সাধন করেন। এমন মনে করার কারণ ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী ও তার মাকে ২৮ জুলাই ডেকে নিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নাপিত ডেকে এনে মা-মেয়ের মাথা মুড়িয়ে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এই অমানবিক কাজে তুফানের সহযোগী হিসেবে স্ত্রী-শাশুড়ি-বোনের নামও এসেছে। ভাবা যায়!

চোরের সাক্ষী গাঁট কাটা শোনা গেলেও ধর্ষকের সহযোগী স্ত্রী এবং শাশুড়ি এটা কি আগে কখনো শোনা গেছে?

রিকশা চালকের সন্তান তুফান সরকার এখন অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক। না, কোনো রিকশাচালকের সন্তান সম্পদশালী হতে পারবেন না– এমন কথা আমি বলছি না। রিকশা চালকের সন্তান রিকশা চালকই হবেন, সেটাও কোনো কাজের কথা নয়। ছোট থেকেই তো মানুষ বড় হয়। কেউ কি আর বড় হয়ে জন্মগ্রহণ করে? কিন্তু কে, কীভাবে বেড়ে উঠছে, বড় হচ্ছে সেটা একটা দেখার বিষয় বৈকি!  

১০ বছরের কোনো বালককে যদি বিশাল বপু ও শশ্রূমণ্ডিত অবস্থায় রাস্তায় দেখা যায় তাহলে সেটা অস্বাভাবিক হিসেবেই চোখে লাগবে। তুফানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তার ‘বড়’ হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক নয়। এখন জানা যাচ্ছে, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠেছেন।

তার দুর্বৃত্ততার নানাকাহিনী এখন গণমাধ্যমে আসছে। প্রশ্নটা এখানেই। তুফান নিশ্চয়ই হঠাৎ করে বগুড়ায় আছড়ে পড়েননি। একটা সময় নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। কী ভাবে তুফান বেড়ে উঠলেন, অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলেন? কে, কার বা কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তার এই বিস্তার, এই স্ফীতি? কি করছিল তখন স্থানীয় প্রশাসন? পুলিশ প্রশাসনই বা কি করছিল?

সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক – এত সবকিছুর নজর এড়িয়ে তুফান সরকাররা কীভাবে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে? কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় বা অঘটনের কথা ফাঁস হলেই কেবল এদের অপকীর্তির কথা জানাজানি হয়। তখন সবাই এদের গালমন্দ করে। কিন্তু তুফান সরকার তৈরি হওয়ার পেছনে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা-উদ্যোগহীনতা-নিষ্ক্রিয়তা কম দায়ী নয়।

আমরা সময় থাকতে কিছু দেখি না। একজন ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং মাসহ ছাত্রীটির মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার আগে মিডিয়ার চোখও কেন তুফান সরকারের ওপর পড়েনি? এসব প্রশ্নের জবাব না খুঁজে তুফানদের নিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলা অর্থহীন।

এবার আসা যাক রাজনৈতিক দল প্রসঙ্গে। বগুড়ার আওয়ামী লীগ কোনো যুক্তিতেই তুফানের দায় এড়াতে পারবে না। তুফান কেমন মানুষ সেটা সারা দেশের মানুষের জানার কথা নয়। কিন্তু বগুড়ার আওয়ামী লীগ নেতাদের তার সম্পর্কে কিছু অজানা থাকার বিষয়টি একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না। তার সম্পর্কে কিছু না জেনেই তাকে শ্রমিক লীগের আহ্বায়কের পদে বসানো হলো?

কারা তার জন্য সুপারিশ করলো? কিসের বিনিময়ে তাকে পদ দেওয়া হলো? আমি নিশ্চিত জানি, আমি আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অখুশি হবে, আমার যোগদান নিরূৎসাহিত করা হবে, এমনকি পারলে বাধাও দেওয়া হবে। কোন পদ দেওয়াতো অনেক পরের ব্যাপার!

তাহলে তুফানেরা কীভাবে আওয়ামী লীগে জায়গা পায়? দলের জন্য কোনোভাবেই সম্পদ না হয়ে যারা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তাদের প্রতিহত করা কিংবা প্রতিরোধ করার কোনো অভ্যন্তরীণ মেকানিজম আওয়ামী লীগে না থাকা এই দলের একটি বড় দুর্বলতা।

এই দুর্বলতার ফাঁক দিয়েই খোন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, ওবায়দুর রহমান, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শফিউল আলম প্রধানেরা বড় পদাধিকারী হয়ে একসময় দলের পিঠে ছুরি মেরে অবাধে নিষ্ক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কেবল তুফান নয়, আরো দুর্বৃত্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে যারা আওয়ামী লীগের ডানার নিচে থেকে ভয়াবহ সব অপরাধ সংঘটিত করছে।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনা আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি। নূর হোসেনের মতো এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ কীভাবে আওয়ামী লীগের ছাতার নিচে জায়গা পেল? বহুল আলোচিত সাত খুনের আগ পর্যন্ত কেউ এই দুর্বৃত্তের খবর জানতো না, তা কি হতে পারে? সবার নাকের ডগায় সে অন্যায় অপকর্ম করে সম্পদের পাহাড় গড়ছিল অথচ তাকে নিবৃত্ত করার কোনো উপায় কারো জানা ছিল না।

স্থানীয় একজন প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদ পুষ্ট হয়েই নূর হোসেনের উত্থান বলে শোনা যায়। র‌্যাবের মতো একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিরপরাধ মানুষ হত্যার মতো ঘটনা কি যার তার পক্ষে করা সম্ভব?

ভাগ্যের ফেরে নূরহোসেন এখন জেলে। কিন্তু নূর হোসেন তৈরি কারী নেপথ্য নেতা তো দিব্যি বাইরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। আপন স্বার্থে তিনি আড়ালে-আবডালে আরো এক বা একাধিক নূর হোসেন তৈরি করছেন না – সে কথা কি জোর দিয়ে কেউ বলতে পারবেন?

এখন এমন একটি ধারণা ক্রমশ বদ্ধমূল হচ্ছে যে, টাকা দিয়ে বাংলাদেশে সব করা যায়। তাই যে-কোনো উপায়ে টাকা বানানোর অসৎ-অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে চারদিকে। আর এর সবই হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করার জন্য টাকা প্রয়োজন। সে টাকার মূল জোগানদার অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনকারীরা।

রাজনীতিবিদরা টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের শেল্টার দিচ্ছেন। সেজন্যই অপরাধের ধরন এবং মাত্রা দুটোই দেশে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। টাকা দিয়ে আইনের লম্বা হাতকেও সংকুচিত করার কথা শোনা যায়। সমাজের সর্বত্র অতি রাজনীতিকরণের ফলে এখন রাজনৈতিক কর্মী আর দুর্বৃত্তের মধ্যে পার্থক্য করাও অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে।

সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করা হলেও সামনে চলে আসে তার রাজনৈতিক পরিচয়। এই অসুস্থ ও দুষ্ট চক্র থেকে বেরিয়ে আসার কথা কেউ ভাবে না। শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আওয়ামী লীগ না হলে ক্ষমতায় আসার সামর্থ্য আছে বিএনপির। কিন্তু বিএনপি শাসনের অভিজ্ঞতা আমাদের কি নেই? বিএনপির ‘ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি' তারেক রহমান হাওয়া ভবন তৈরি করে তার অনুগতদের দিয়ে দেশে কার্যত চালু করেছিলেন জুলুমের শাসন, অনিয়মের শাসন। এলাকায় এলাকায় কত যে হার্মাদ তৈরি হয়েছিল তা বলার নয়।

আওয়ামী লীগ এখন বিএনপির জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটছে। এর পরিণতি ভালো হতে পারে না। ছোটবেলায় দিদিমার কাছে একটি গ্রাম্য ছড়া শুনেছিলাম : এক বৌ ছাড়লাম আমি চাল চাবানোর দোষে/ নতুন বৌ এসে দেখি তুষে-কুড়ায় ঠ্যাসে। এর আর বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এই রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। মোটা দাগে বলা যায়, রায়ে সরকার পক্ষ অখুশি, আর বিরোধীরা খুশি। এই প্রতিক্রিয়া আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঠিক আছে। আওয়ামী লীগ অখুশি হলে বিএনপি খুশি না হয়ে পারে?

কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় যদি রাজনৈতিক বিভক্তিকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে তাহলে উৎকন্ঠিত না হয়ে পারা যায় না। আমি রায় নিয়ে এই লেখায় কোনো মন্তব্য না করে রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবো।

মাননীয় প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি, যেখানে ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখে না, কিন্তু খারাপ লোকেরা আরও লুটপাটের জন্য বেপরোয়া।’

রাজনীতি সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ: ‘এখন রাজনীতি মুক্ত নয়। এটি বাণিজ্যিক বিষয়। আর অর্থ রাজনীতি পরিচালনা করে। আর সেটিই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়। এখন মেধা নয়, ক্ষমতাই সব জনপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী।’

পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি বলেছেন : ‘... স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও প্রতিরোধের স্পৃহার মাধ্যমে আমরা সামরিক শাসনের থাবা থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু পরাজিত হয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্রে। এমনকি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা আমাদের একটি জনপ্রতিষ্ঠানকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। কোথাও আমাদের ভারসাম্য নেই। তদারক কারী নেই। আর একারণেই সুবিধাভোগীরা ক্ষমতার অপব্যবহারে উৎসাহিত হন এবং যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের ধৃষ্টতা দেখান। রাষ্ট্র ক্ষমতা রাজনৈতিক ক্ষমতার আরেক রূপ, সাম্প্রতিক সময়ে তা গুটি কয়েক মানুষের একচ্ছত্র বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণের আত্মঘাতী প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার লিপ্সা মহামারির মতো, যা একবার ধরলে তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ছিল না।’

প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ কারো কাছে অতি রাজনীতিকরণ দোষে দুষ্ট মনে হতে পারে। অপ্রাসঙ্গিক ও বাহুল্য মনে হতে পারে। তিনি বিচার্য বিষয়ের বাইরে অনেক কিছু নিয়ে মন্তব্য করে সরকারকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছেন। কিন্তু নূর হোসেন ও তুফান সরকারদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও কার্যকলাপ কি সরকারকে খুব আনন্দ দিচ্ছে? স্বস্তি দিচ্ছে?

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
bibhu54@yahoo.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত বিভুরঞ্জন সরকার এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad