বাবুল আক্তার কি ন্যায়বিচার পাবেন?

ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ১০ আশ্বিন ১৪২৪

বাবুল আক্তার কি ন্যায়বিচার পাবেন?

মেহেদি রাসেল ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৭

print
বাবুল আক্তার কি ন্যায়বিচার পাবেন?

সম্প্রতি আবারও আলোচনায় এসেছেন চট্টগ্রামের সাবেক এসপি বাবুল আক্তার। একটা টেলিভিশন চ্যানেলের টকশো’তে তাকে বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, হাসাহাসি কিঞ্চিৎ বেশিই ছিল এবং সেটি দৃষ্টিকটু লেগেছে কোনো কোনো দর্শকের কাছে। যার স্ত্রী দিনদুপুরে খুন হলেন, বাচ্চাগুলো মাতৃহারা হলো, এমনকি সেই মামলার বাদী বাবুল আক্তার নিজেই, তার এমন নির্ভার হাসাহাসি মানুষের পছন্দ হয়নি। অনেকেই নিজেদের প্রোফাইলে এটা নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়েছেন।

মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলাটি ঝুলে আছে এখনো। মামলা নিয়ে যারা কাজ করেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট জনেরা কিছু মামলাকে বলেন ‘হাই-প্রোফাইল’ মামলা। গণমাধ্যম যেসব মামলায় মনোযোগ দেয়, অধিক গুরুত্বসহকারে সংবাদ পরিবেশন করে, সাধারণ মানুষ যে মামলাগুলো নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে, সেই ধরনের মামলাকে সাধারণত হাই-প্রোফাইল মামলা বলা হয়ে থাকে। মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলাটি সেরকমই একটি হাই-প্রোফাইল মামলা।

এসব মামলায় জনগণের আগ্রহ বেশি থাকে বলে মামলাগুলো খুব স্পর্শকাতর হয়। মামলাগুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জনমানুষের নজরে থাকে। ফলে, এগুলোর ন্যায়বিচার হওয়া খুবই জরুরি। না হলে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। এসব মামলার হালনাগাদ তথ্যও বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। বিশেষ করে পুলিশের ভাষ্যে বা কার্যক্রমে যদি গরমিল কিংবা রহস্য থাকে তাহলে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং তাদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে।

মামলাটির প্রথম দিকে এ ঘটনায় জঙ্গি তৎপরতার সন্দেহ করা হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, এটা সেরকম কিছু নয়। এরপর মাহমুদা খানমের স্বামী এসপি বাবুল আক্তারের দিকে অভিযোগের তীরটি ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমের কাছে পুলিশ এ বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি। মাহমুদা খানমের বাবা ও মা একপর্যায়ে বাবুল আক্তারকে দায়ী করেছেন। তারা ও তার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। মিতুর বোনও মনে করেন এ ঘটনায় বাবুল আক্তারের হাত ছিল।

অন্যদিকে পুলিশ বিভাগ থেকে বাবুল আক্তারকে চাকরিচ্যুতও (পুলিশের পক্ষ থেকে যদিও বলা হয়েছে তিনি নিজেই চাকরিটি ছেড়ে দিয়েছেন) করা হয়। ফলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে ধোঁয়াশাপূর্ণ সংবাদ ছাড়া তদন্তের আর কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ প্রায়শই একটি শব্দবন্ধ ব্যবহার করে। তারা বলে, ‘তদন্তের স্বার্থে’ অনেক কিছু গণমাধ্যমকে খুলে বলা যাবে না।

আমরাও চাই না ‘তদন্তের স্বার্থ’ ব্যাহত হোক। তবে, সে তদন্ত যেন নিষ্ফলা না হয়। সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো যেন কালের অতলে সেই তদন্ত হারিয়ে যেতে না বসে। 

১৯ ফেব্রুয়ারি তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ জানাচ্ছে, ‘স্ত্রী মিতু হত্যা ছাড়াও এসআই আকরামের রহস্যজনক মৃত্যুর সঙ্গেও সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।’ পত্রিকার সংবাদটির শিরোনাম ছিল, ‘গ্রেপ্তারের কাছাকাছি বাবুল আক্তার।’ সংবাদে আরও বলা হয়েছে, ‘‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক (পুলিশের) কর্মকর্তা বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত বাবুল আক্তার গ্রেপ্তার নাও হতে পারেন।

কারণ গত জুন মাসে তাকে ঢাকার ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়া হয়। সেখানে শর্ত ছিল, পদত্যাগ করলে তাকে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে না। প্রশ্ন হলো- পুলিশ সেই শর্ত লঙ্ঘন করবে কিনা। এ ক্ষেত্রে সূত্রটি বলছে, পুলিশ কৌশলী হয়ে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার না করে তাকে এসআই আকরাম হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিতে পারে।’’

মিতু হত্যায় সরাসরি জড়িত বলে যে দুজনের নাম পুলিশ জানিয়েছে, তারা দুজনই পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। প্রধান আসামি মুসাকে এত দিনেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে, মামলার স্বাভাবিক বিচারিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। ক্রসফায়ার, মুসাকে ধরতে না পারা, বাবুল আক্তারকে কয়েক দফায় দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা মানুষের সন্দেহকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাহমুদা খানম মিতু হত্যার পর সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কিন্তু বাবুল আক্তারের পক্ষেই ছিল। ধীরে ধীরে এ রহস্যের জট কিছুটা খুলতে থাকলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় এসআই আকরাম হত্যা এবং একটি পরকীয়ার ঘটনা।

লক্ষণীয় হলো, আকরাম হত্যার ঘটনাটি বেশ আগের, এবং সেটির বিচার একরকম আটকে ছিল। মানুষের মধ্যে এ ধারণাটি বদ্ধমূল হতে শুরু করেছে যে প্রভাবশালী হলে এ রকম হত্যাকাণ্ডও কি তবে চেপে রাখা যায়? তবে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, মানুষ এই নৃশংস, বর্বরোচিত মিতু হত্যাকাণ্ডটির বিচার চায়। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল দুটি শিশুর চোখের সামনে, প্রকাশ্য দিবালোকে।

ফলে, এটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুদের মনস্তত্ত্বে এর অভিঘাত তীব্র হতে বাধ্য। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার হওয়া উচিত। তবে, আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার না হলে সেগুলো রাষ্ট্র ও আদালত সম্পর্কে মানুষের অনাস্থাকে বাড়িয়ে তোলে, মানুষ ভেতরে-ভেতরে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। 

একটি হত্যার সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া গেল আরেকটি হত্যা মামলার। বাবুল আক্তার যদি সত্যিই সন্দেহভাজন হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? আর তিনি যদি নির্দোষ হন তাহলে তাকে দিয়ে পদত্যাগ করানো হবে কেন? এ ধরনের ফৌজদারি মামলার শাস্তি কি শুধুই চাকরি থেকে অব্যাহতি? দেশের প্রচলিত আইন কিন্তু তা বলে না। ফৌজদারি মামলার বিচার ফৌজদারি দণ্ডবিধি মোতাবেকই হতে হবে। গুরু পাপে লঘু দণ্ড দিয়ে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার কথাই ধরা যাক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেল। ওই শিক্ষক মীর মোশারেফ হোসেনকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলো ১০ জুলাই তারিখের অনলাইন সংস্করণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে লিখেছে- ‘সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েকজন ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মীর মোশারেফ হোসেনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’

প্রকাশিত সংবাদটির কোথাও তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলার খবর উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তখনো পর্যন্ত কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেনি। অপরাধের যে ধরন, তাতে এটি ফৌজদারি অপরাধ এবং চাকরিচ্যুতি এর প্রধান বা একমাত্র শাস্তি নয়। আদালতের মাধ্যমে এটি ফয়সালা হওয়ার কথা।

আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমাণিত হলে এখানে ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি হবে এবং তাতে তার চাকরিটি এমনিতেই চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা তার চাকরি যাওয়াতেই যেন খুশি হয়ে গেলাম। অপরাধের প্রকৃত বিচার চাইলাম না।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তার অপরাধের প্রমাণ রয়েছে। এবং সেসব তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই তারা মোশারেফ হোসেনকে চাকরিচ্যুত করেছে। তাহলে তারা কেন আদালতে অভিযোগ দায়ের করলেন না? তথ্য প্রমাণসহ কেন অপরাধীকে ধরিয়ে দিলেন না? যে প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে, আদালতে সেগুলো দাখিল করলে আদালতের কাজটিও সহজ হতো।

ফৌজদারি মামলা দায়ের করা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। সেখানকার কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল হবেন এটা আমরা আশা করতেই পারি। ফলে, এ রকম প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এহেন আচরণ আমাদের আশাহত করে। আমরা আশা করব অচিরেই অভিযুক্তের নামে আদালতে অভিযোগ দায়ের করবেন।

হত্যা কিংবা যৌন নির্যাতনের শাস্তি ফৌজদারি আদালতে হতে হবে। সামান্য চাকরিচ্যুতি এসব অপরাধের শাস্তি হতে পারে না। আদালতের মাধ্যমে এগুলো ফয়সালা হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অনাস্থা দিন দিন বাড়বে বৈ কমবে না।

মেহেদি রাসেল : সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট।
mehedirasel32@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত মেহেদি রাসেল এর সব লেখা

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad