কোথায় পেলেন হারানো আত্মবিশ্বাস!

ঢাকা, রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২ পৌষ ১৪২৪

কোথায় পেলেন হারানো আত্মবিশ্বাস!

মুজতবা খন্দকার ৬:১০ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৭

print
কোথায় পেলেন হারানো আত্মবিশ্বাস!

খালেদা জিয়া ধানের শীষের পক্ষে প্রকাশ্যে সবশেষ কবে ভোট চেয়েছিলেন অনেকের মতো আমারও মনে পড়ে না। তবে ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন যেটা হয়েছিলো ফখরুদ্দীন, মঈনুদ্দীন সরকারের সময়ে সেই নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন সেটা মনে পড়ে। কিন্তু এবার নির্বাচনের ঢের বাকি। কিন্তু এখুনি দলের অনেক সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন ইফতার পার্টিতে তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে জনগণকে ধানের শীষের পক্ষে ভোট দেয়ার আহবান জানিয়েছেন।

.

খালেদা জিয়া বলেছেন, আসছে ২০১৮ সাল হবে জনগণের বছর। তিনি শাসকদলের সমালোচনা করে বলেছেন, দুর্নীতি আর কুশাসনের কারণে নৌকা ডুবে গেছে। ডুবে যাওয়া নৌকাকে আর কোনভাবেই টেনে তোলা যাবে না। শুধু তাই নয়, তিনি বেশ কনফিডেন্টের সাথে বলছেন, আগামী নির্বাচন হবে সহায়ক সরকারের অধীনে।

বিএনপিকে বাদ দিয়ে আগামীতে কোন নির্বাচন হবে না। যে বিএনপি নেতার মুখে এর আগে নির্বাচনের কোন কথা শোনা যেত না- সেই নেতার মুখে হঠাৎ আত্মবিশ্বাসের সুর। কোথায় পেলেন তিনি তার হারানো আত্মবিশ্বাস!

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সেই আপসহীন নেত্রীকে এখন ফের নতুন করে আবিস্কার করছি। কোথায় পেলেন তিনি এই অভয় বাণী। কে দিলো। কে ফিরিয়ে দিলো তাকে তার হারানো আত্মবিশ্বাস! কোথায় পেলেন এত তেজ!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত গত এক দশক ধরে ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় বসবে এই দেশটি তাদের স্বার্থে তার নিয়ামক ভূমিকা রেখে চলেছে। পাঁচ জানুয়ারীর নির্বাচনের আগে সেদেশের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংহের দৌড়ঝাঁপ আমরা দেখেছি।

যার ফলে, ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান শাসক দল ক্ষমতাসীন হয়। শুরুতেই এই সরকার তাদের বৈধতার ক্রাইসিসে পড়ে। কিন্তু ভারত তাদের চরমভাবে আশ্রয় দেয়। বিশ্ব থেকে শাসক দলকে বৈধতা পেতে নগ্নভাবে ডিপ্লোমেসি শুরু করে। কৃতজ্ঞ শাসক দল ভারতকে এই চারবছরে দিয়েছেও দুহাত উজাড় করে।

আমাদের স্বার্বভৌমত্ব হুমকীতে পড়বে কি পড়বে না, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত করেনি। বরং তাদের কাছে ক্ষমতাটাই মুখ্য হয়ে পড়ে। দেশটির সেভেন সিস্টার বলে পরিচিত উত্তর পূর্ব রাজ্যগুলোতে রসদ সরবরাহ নিয়ে ভারত সব সময় ছিলো বেকায়দায়। ওই রাজ্যগুলোর অখণ্ডতা নিয়েও দেশটির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তো নিয়মিত। কিন্তু আমরা তাদের কপাল থেকে সে চিন্তার বলিরেখা দূর করে দিয়েছি নামমাত্র মাশুলে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে।

ভারত যদি বাংলাদেশের ট্রানজিট না নিয়ে কলকাতা, শিলিগুড়ি, শিলং হয়ে আগরতলায় পণ্য নিতো, তবে তাদের পাড়ি দিতে হতো ১৬০০ কিলোমিটার পথ। আর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ওদের টাটা বিড়লার ট্রাককে পণ্য নিয়ে মাত্র ৫০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে। এতে সময় তো বাঁচবে। খরচের কথা না হয় বলাইবাহুল্য!

আজকের যুগে ১৯২ টাকা কোন মাশুল হলো! একটি দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তাদের রসদ সরবরাহের সুযোগের মুল্য মাত্র ১৯২টাকা!

বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক বলেছেন, ট্রানজিট দেবার জন্য আমাদের বন্দরগুলো এখনো প্রস্তুত নয়। কিন্তু ভারতের সাথে খাতিরের কারণে, আমরা নিজেরাই নিজেদের টাকায় অবকাঠামো ঠিক করেছি! কি চমৎকার খাতিরের নির্দশন!

আন্তদেশীয় কানেকটিভি এখন সময়ের দাবি, কিন্তু তা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে! কিন্তু ভারতের সাথে সেটা কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ না হয় বাদই দিলাম, অর্থনৈতিক স্বার্থটা কি আমরা রক্ষা করতে পারতাম না?

মুদ্রার উল্টোপিঠ জানুন, বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের ট্রাক নেপালে যাবে, নেপাল রাজী। কিন্তু বাদ সাধছে ভারত। ভারত তাদের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের ট্রাক যাবার অনুমতি দেয়নি!

বন্ধুত্বর সংঙ্গা বাংলায় ব্যাখা করলে দাঁড়ায় গলায় গলায় পিরিত। বন্ধুর স্বার্থে বন্ধু নিবেদিত। ভারত কি তাহলে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। আমি কিন্তু কনফিউজড! আর এসবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে একদা নিরব থাকা বিএনপি।

বাংলাদেশ প্রতিশ্রুত তিস্তার পানি পাইনি। কিন্তু আমরা দিয়েছি তাদের আমাদের মংলা বন্দর। সবশেষ ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। সে চুক্তি নিয়ে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠলেও সরকার তার তোয়াক্কা করেনি। এই চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকীর মুখে পড়লো কিনা তা হয়তো সময় বলে দেবে।

আর অপ্রকাশ্যে ভারতকে আরো কতোকি দিয়েছে আমাদের শাসক দল তার হদিস কে রাখে। জানে নরেন্দ্রমোদির সরকার। তারা এও জানে তাদের এই সরকারের কাছ থেকে নেবার আর কিছুই বাকি নেই। আর এসব সুবিধা এবং চুক্তির ধারাবাহিকতাটা রক্ষাই এখন মোদি সরকারের অন্যতম ধ্যানজ্ঞান।

আওয়ামী লীগের নৌকা ডুবে গেছে, বলেছেন খালেদা জিয়া। তবে, বিশ্লেষকদের মতে নৌকা না ডুবলেও, শাসকদলের লাগাতার কুশাসনে উত্তাল নদীতে যে নৌকা ডুবি ডুবি করছে সেটা পরিস্কার। আর সেইটা মোদি সরকারও জানে।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটা গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, আগামী নির্বাচনে শাসকদলের করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থারও রিপোর্ট মোদি পড়েছেন।

আর সেই কারণে যদি দেশটি অপ্রকাশ্যে বিএনপিকে আশ্বস্ত করে। যদি অভয় দেয়। আগামী নির্বাচনে তারা বিগত নির্বাচনের মত মাতব্বরি করবে না। বিনিময়ে শুধু চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। আমরা জানি না। ভারতের পক্ষ থেকে এমন কোন আশার বাণী শোনানো হয়েছে কি না।

তবে, খালেদা জিয়ার স্পষ্ট কথাবার্তায় এটা পরিস্কার তার কাছে ক্লিয়ার মেসেজ আছে। আর সেকারণে খালেদা জিয়ার কণ্ঠে ফুটে উঠছে দৃঢ়তা।

তবে বিএনপিকে ক্ষমতার জন্য আরো অনেকদূর যেতে হবে। অতসহজে শাসক দল ক্ষমতা ছাড়বে সেটা ভাবা ঠিক হবে না। এর জন্য বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

এটা তো ঠিক যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এখন একটি পরীক্ষার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।এই দলের নেতা খালেদা জিয়ার পাশাপাশি দলের তৃনমূল নেতাকর্মীদেরও পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষায় দলটি উত্তীর্ণ হতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে অত সহজে মিলবে না মুক্তি। দল যখন ক্ষমতায় থাকে না। তখনই বোঝা যায়, সে দলের শক্তিমত্তা, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের দুরদর্শীতা এসব। এই সময়ের কিছু স্বার্থপর, সুবিধাবাদী নেতাও চেনা যায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের এখন দলের সুবিধাবাদী নেতাদের নতুর করে চেনার সময়। ঘরের শত্রু সবসময়ই বিভীষণ।

অন্য যেকোন শক্তির চেয়ে তারাই দলের ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশী। এদের শনাক্ত করে রাখাটাই জরুরী। আমাকে কেউ মানেন আর না মানেন, এটা সত্য যে দল হিসেবে বিএনপিকে পরিপূর্ণতা পেতে আরো সময় লাগবে।

জিয়ার আদর্শ থেকে বিএনপি দূরে সরে গেছে আমি সেটা মনে করি না। তবে কিছুটাতো বিচ্যুতি ঘটেছে, এটা মানতে ক্ষতি কী? তবে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব কালোত্তীর্ণ। তার বিকল্প এখনো নেই।

বিএনপিতে, জিয়াউর রহমান জাতীর মেধাবী সন্তানদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন, তাদের মেধা আর জিয়ার নেতৃত্বে দেশ ও দল দারুনভাবে প্রগতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কুচক্রিদের কালো হাত তাকে বেশীদূর যেতে দেয়নি। যার ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

রাজনীতির প্রথম দর্শন হচ্ছে ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়া, তাই বলে রাজপথে সংগ্রাম করার মানসিকতাও দলের নেতাকর্মীদের অর্জন করতে হবে। বিএনপির মতো জাতীয়তাবাদের শক্তিকে তো আরো বেশী লড়াকু হতে হবে।

কিন্তু ওই যে বললাম। বিএনপি এখনো পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারেনি। এর জন্য দলের কিছু শীর্ষ নেতাদের অবশ্যই দায় আছে, দায়িত্ব আছে। তাদের কমিটমেন্টের বড্ড অভাব, তারা বিএনপিকে একটা ধনি ক্লাব হিসেবে ধরে নিয়ে, দলের চেয়ে নিজেদের লাভালাভের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে চলছে। এবং এরাই আসলে, দলের সবচেয়ে নষ্ট অংশের প্রতিনিধি।

বিএনপিকে, ভাঙ্গার প্রচেষ্টা, জিয়ার মৃত্যুর পর থেকেই চলছে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। ফখরুদ্দিনের সময়ে দলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি যাকে মনে করা হতো, সেই আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াও বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন।

এক সময় ইউপিপি করা সাবেক বামের এরকম নীতিহীন পরিণতি, দলকে বেশ নাজুক অবস্থায় ফেলেছিলো। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কেউ যোগ্য হয়ে ওঠেনি বলে, বিএনপি এখনো খালেদার নেতৃত্বেই আছে, এবং সংহত হচ্ছে। সাময়িক ঝঞ্ঝা তো থাকবেই, সেতো সব সময় ব্যক্তি জীবনেও থাকে।

একটি বটগাছের কালবৈশাখী ঝড়ে দু’একটি পাতা ঝরলে গাছের কিছুমাত্র যায় আসে না। তেমনি সে অকাতরে ছায়া দেয়, সবাইকে। বিএনপি সেরকম একটি দল, যে দলটি জাতীয়তাবাদী সবার আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল।

বিএনপির সাম্প্রতিক অতীতের সবচেয়ে বড় ভুল, জামায়াতের পরামর্শে এক এগারোর সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া। এতে জামায়াতের কতটুকু লাভ হয়েছে, সে হিসেব তাদের, কিন্তু বিএনপির ক্ষতি হয়েছে ঢের।

আগেই বলেছি, দলটিকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, কোন পরীক্ষায় হারছে দলটি, কোনটাই জিতছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যেতে যেতে দল হিসেবে বিএনপি পরিপূর্ণতার পথে এগুচ্ছে। অনেকে বলছেন, বিএনপি অচিরেই মুসলীম লীগ হয়ে যাবে। যারা এটা বলছেন, তারা বিএনপিকে ভয় পাচ্ছে, ইতিহাসের মিথ্যা পাঠ শোনাচ্ছেন।

তবে,জামায়াতের মত, একটি বির্তকিত, যুদ্ধাপরাধের মতন একটি কালো দাগ যাদের গায়ে তাদের সাথে বিএনপি গাঁটছড়া আর কতদিন বেঁধে রাখবে, সে সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের কি উচিৎ হচ্ছে জামায়াত নামক একটি মরা লাশকে, সমাহিত না করে, কাঁধে বয়ে বেড়ানো?

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
mujtobantv@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত মুজতবা খন্দকার এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad