পাবলিক লাইফ পুরুষের, প্রাইভেট লাইফ নারীর !

ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১২ আষাঢ় ১৪২৪

পাবলিক লাইফ পুরুষের, প্রাইভেট লাইফ নারীর !

সাদিয়া নাসরিন ৫:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৭

print
পাবলিক লাইফ পুরুষের, প্রাইভেট লাইফ নারীর !

কয়েকদিন আগে আমার একজন বন্ধুর সাথে আলাপ হচ্ছিলো নারীর বাইরে কাজ করা নিয়ে। বিচার বিভাগের পদস্থ এই কর্মকর্তা নারীর ছ’মাস মেটারনিটি লিভ, কর্মক্ষেত্রে নারীর সন্তান নিয়ে আসা আর অফিস থেকে বাসায় ফেরার তাড়া ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ বিরক্ত। তিনি মনে করেন সমান মানে সমান। তাই তিনি নারীর জন্য বাসে সংরক্ষিত আসনেরও বিরোধিতা করেন।

এ ধরনের কূটতর্ক করার পুরুষ অগণিত আমাদের সমাজে। যেখানে উন্নত দেশে মিনিস্ট্রেশনাল লীভ অ্যাপ্রুভ করা হচ্ছে, সেখানে এদেশে ছ’মাসের মাতৃত্বজনিত ছুটি নিয়ে বিরক্ত আমাদের শিক্ষিত অগ্রগামী সমাজ। এ ধরনের অর্ধিশিক্ষিত কূটতর্ক করার পুরুষরা হয়তো জানেন না যে, পৃথিবীর কোন সভ্য দেশই শিশু পালনের ভার একা মায়ের উপর চাপিয়ে দেয়নি। উন্নত দেশে শিশুরা রাষ্ট্রের সম্পদ।

সে সব দেশে রাষ্ট্রই শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়, রাষ্ট্রের উদ্যোগে কর্মস্থলে এবং সুবিধাজনক স্থানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্পন্ন শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র থাকে। তারপরেও যে মা সন্তান পালনের জন্য কর্মজীবন থেকে দূরে থাকতে চায় তার জন্য মাতৃত্ব ভাতা আছে।

আর আমাদের দেশে নারীকেই বাচ্চাকে ঘণ্টার মতো গলায় ঝুলিয়ে অফিসে নিয়ে আসতে হয়, কারণ, আমাদের পরিবারের সভ্য(!) সদস্যরা সে দায়িত্ব পালন না করে নারীকেই মা হবার দায়ে আসামী বানিয়ে যাবজ্জীবন গৃহদণ্ড দিয়েছে আর সমাজ- রাষ্ট্র পপকর্ণ নিয়ে বসে মাতৃত্বের দম আর ত্যাজ উপভোগ করছে।

এদেশের অধিকাংশ পুরুষই এখনো নারীকে শুধু ভাত আর বিছানা গরম করার যন্ত্র মনে করে বলেই নারীকে অফিস সময় শেষ হতে না হতেই বাড়ি ছুটতে হয়।

এই শিক্ষিত পুরুষরা বাসায় ফিরে মহারাজার মতো সোফায় হাত পা তুলে দিয়ে টকশো না দেখে যদি একটু একটু ঘরের কাজে ঢুকতেন, তাহলে তার নারী সহকর্মিটিকে কিংবা কর্মজীবী স্ত্রীকে হয়তো গরম ভাত রাঁধার জন্য, কিংবা বাচ্চার জন্য হন্যে হয়ে আগে আগে ঘরে ফেরার ছুতো খুঁজতে হতো না।

এই সভ্য(!) দেশে নারীকে দেরী করে ঘরে ফেরার অপরাধে স্বামীর মার খেতে হয়, প্রতিনিয়ত চারিত্রিক সততার পরীক্ষায় পাশ করতে হয়, শাশুড়ির অত্যাচার সইতে হয় বলে এখনো অনেক মেয়ে অফিস ফোবিয়ায় ভোগে।

এদেশের পুরুষের অসুস্থ যৌনতার বিকার থেকে বাঁচার জন্যই বাসে নারীর রিজার্ভ সিট দরকার হয়, তুখোড় সংবাদ কর্মিটিকেও গভীর রাতে অফিসের ট্রান্সপোর্ট নিতে হয়। লজ্জাও হয় না এসব পুরুষের! বলিহারি!

এই দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে এখনো মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য পরবর্তি দুই/তিন বছরের কর্মচুক্তির বন্ড নেওয়া হয়। গণমাধ্যমে কাজ করা নারীদের দুর্গতিও নিজের চোখেই দেখছি। পুরুষতান্ত্রিক মগজ ধারন করা বসরা মাঝরাত পর্যন্ত নারীকর্মিদের অ্যাসাইনমেন্টে রেখে নির্বিকার ভাবেই বলেন, পুরুষ রাত বারোটায় ফিরতে পারলে নারীও যদি না পারে তবে কিসের সমান অধিকার?

এইসব অর্ধশিক্ষিত পুরুষরা কি জানেন না, কেবল পুরুষের কাছেই আছে নারী ধর্ষণের অমোঘ অস্ত্র যা যখন খুশি তাক করা যায় নারীর দিকে? হোক সে নারী সাংবাদিক, পুলিশ, নাট্যকর্মি কিংবা সেনা সদস্য!

আমার আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, নারীকে দেখতে চান বড় বড় প্রজেক্ট লিড দিতে, কিন্তু তিনি তার স্ত্রীকে বাইরে কাজ করতে দিতে চান না। এর পক্ষে তিনি খুব রোমান্টিক যুক্তি দেন। তা হলো, তিনি চান তার স্ত্রী পুরোটা সময় ‘তার’ বাচ্চাদের দিবে, বাচ্চার সাথে ঘুমাবে, খাবে, খেলবে, নিজেও বাচ্চার মতো আদুরে আহ্লাদী হয়ে তার জন্য একটা শান্তির গৃহকোণ তৈরী করবেন।

তিনি শান্তি চান, সাফল্য না। আমি জানি না, সবাই যদি তার মতো নিজেদের স্ত্রীদের ঘরে ঢুকিয়ে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন, তাহলে তিনি যে স্বপ্ন দেখেন নারীরা বড় বড় প্রজেক্ট লিড দেবে, তা কিভাবে সম্ভব হবে?

মূল বিষয়টি হলো, পুঁজিবাদ আর পিতৃতন্ত্র হাত মিলিয়ে নারী পুরুষের জন্য তৈরী করেছে পাবলিক আর প্রাইভেট, কর্মস্থান আর বাসস্থান, উৎপাদন ও ভোগ, ঘরের কাজ ও বাইরের কাজ এর রাজনৈতিক বিভাজন। যে বিভাজনে পড়ে নারীর হাত থেকে খসে পড়েছে উৎপাদনের চাবি।

এই মনস্তাত্ত্বিক চর্চায় নারী পুরুষ উভয়েই একসময় বিশ্বাস করে নেয়, মেয়েরা নিজের ভাত কাপড় নিজে রোজগার করবে না, বাবা-স্বামী-ছেলের উপর নির্ভর করবে, বিনিময়ে ঘরের শান্তি রক্ষা করবে। ওরা রোজগেরে স্বনির্ভর নারীদের ‘বেচারা’ হিসেবে চিহ্নিত করে দাসের জীবনকে স্বামী-সোহাগিনী সুখী হিসেবে ব্রান্ডিং করে।

রোবার্টা হ্যামিলটন এর চমৎকার একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন, ‘‘বাইরে বিক্ষিপ্ত শ্রমজীবী পুরুষ ঘরের মধ্যে এসে নিজেকে সম্রাট মনে করে। তখন তার দরকার প্রাইভেট জীবনের নিশ্চিন্ত নির্জনতা।

তাই ‘পুরুষ উৎপাদন করে আর ভোগ করে নারী’, ‘পাবলিক লাইফ পুরুষের আর প্রাইভেট লাইফ নারীর’এই বন্দীত্বের গণ্ডি এঁকেই পুঁজিবাদ ক্ষান্ত হয়নি বরং ঘরের কাজকে তুচ্ছ প্রমাণ করে নারীকে সেখানেই ঠেলে দিয়েছে।

কারণ, নারী যদি পুরুষের প্রকাশ্য সক্রিয় জীবনের স্বাদ পেয়ে যায় তবে নারীকে দিয়ে ঘরের সেবা আদায় করা কঠিন হবে। তাই উপার্জনকারী ‘কর্তা’র জায়গা ছাড়তে বা নারীকে এর অংশীদারিত্ব দিতে অধিকাংশ পুরুষই প্রস্তুত হবে না পিতৃতন্ত্রের বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত( দ্য লিবারেশন অব উইমেন)।’’

পুরুষের এই মনস্তত্ত্ব নারীর কর্মজীবন মানতে পারে না। এই আমরা, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মায়েরাই যত্ন করে আমাদের ছেলেদের মনস্তত্ত্বে বপন করেছি পুরুষতন্ত্রের বীজ। আমরা যখন কন্যা সন্তানটিকে রান্না বান্নার তালিম দিই, ঠিক সে সময় পুত্রটি বিছানা এলোমেলো করে যায় আর আমরা আমি খুশি হয়ে ভাবি আমাদের সন্তান পুরুষ হয়ে উঠলো!

তাকে বলেছি, ‘তোমার হাতে লাঠি মানায়, ঝাড়ু নয়; রান্না রান্না খেলা তোমার নয়। তোমার জন্য আছে ফুটবল, পিস্তল।’ ‘আমি পুরুষ’ এই গর্বের সাথে আমরাই তাকে পরিচিত করেছি! শৈশব থেকেই আমরা পুত্রদের বলেছি, তুমি পুরুষ, তুমি হবে রক্ষক, তোমাকে নিতে হবে পরিবারের দায়িত্ব।

ভাইয়ের এলোমেলো করে যাওয়া বিছানা বোনটিকে গোছাতে আমরা বাধ্য করেছি বলেই আমাদের পুত্ররা পেয়েছে এমন এক চেতনা, যে চেতনায় সে পুরুষ হয়ে নিজেকে ভাবে কর্তা, নারীকে কর্ম।

এই পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষাকে ফরোয়ার্ড করা অনেক মেয়েই তাদের স্বামী নামক প্রভুটি রান্নাঘরে গেলে, বাচ্চার যত্ন করলে, নিজের জামা কাপড় খুঁজে নিলে, নিজের খাবার বেড়ে খেলে দুনিয়া গুলজার করে। একটা পকেটের উপর নির্ভর করতে গিয়ে এই নারীরা প্রাণপন চেষ্টা করে যায়, যেনো তার প্রয়োজন কখনো না ফুরায়।

ভালোবাসার তাগিদ যদি নাও থাকে, অন্তত প্রয়োজনের তাগিদে যেন তাকে সারাক্ষণ কাছে চায় স্বামী! এই মনস্তাত্বিক চাপে পড়ে নারী পুরুষ উভয়েই ভুলে যায়, দাতা-গ্রহীতার সম্মান কোনদিন এক হয় না।

পুরুষের সংসারের শান্তি রক্ষার জন্য তাই আজীবন নারী উদয়াস্ত বিনামজুরীর জীবন কাটায় যেখানে আটঘণ্টার হিসেব নেই, বেতন বোনাসের বালাই নেই, ছুটি নেই, হরতাল অবরোধ নেই।

সময় এসেছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের এবং তা শুরু করতে হবে পরিবারের ভেতর থেকেই। এই সত্য মেনে নেয়ার সময় এসেছে যে, নারীদের দমিয়ে রেখে সংসারের শান্তি ও সামঞ্জস্য আর রক্ষা করা যাবে না। পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাই পুরুষকেই পরিবর্তিত হতে হবে, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

নিজের মুখোমুখি বসতে হবে এখন পুরুষদের। স্বীকার করতে হবে, নারীর সমৃদ্ধ কর্মজগতের সমান সুবিধাভোগি তারাও। না, শুধু টাকার জন্য নয়। সমতার সম্মানের জন্য।

মাতৃত্বের ছুতোয় নারীদের আটকে পুরুষদের মনে রাখা উচিত, যে নারী নিজে সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত জীবন যাপন করতে পারে, সে-ই তার সন্তানদের দিতে পারে সবচেয়ে বেশি এবং তাদের কাছে দাবি করে সবচেয়ে কম।

বোঝা দরকার উদ্যোগ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নারী অর্জন করে সত্যিকার মানবিক মূল্যবোধ, সে-ই পারে তার সন্তানদের সবচেয়ে ভালোভাবে লালন-পালন করতে। অতএব, পুরুষ মুক্ত হোক। পুরুষতন্ত্রের অচলায়তন ভেঙ্গে বাইরে আসুক পুরুষও!

সাদিয়া নাসরিন : নারীবাদী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট।

print
 

আলোচিত সংবাদ