পাহাড়ের কান্নার শেষ কোথায়?

ঢাকা, রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২ পৌষ ১৪২৪

পাহাড়ের কান্নার শেষ কোথায়?

সাজ্জাদ কাদির ১২:২১ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৭

print
পাহাড়ের কান্নার শেষ কোথায়?

গত ক’দিনের টানা বৃষ্টি পাহাড়ে কান্নার রোল পড়েছে। পাহাড়ের আকাশ বাতাস কান্নায় ভারি হয়ে উঠছে। একদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অন্য দিকে শোক এ যেন এক অসহ্য যন্ত্রণার নাম। পহাড় ধ্বসে মৃতের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া বেশ কিছু নিখোঁজও রয়েছে। মৃত্যুর মিছিলে আছেন দুই সেনা কর্মকর্তা এবং তিন সৈনিকেরও নাম।

.

এই বীর সেনারা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সামরিক-বেসামরিক নিহত সকলের আত্মার প্রতি শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো ছাড়া আমরা আর কীইবা করতে পারি? কিন্তু বাস্তবিক অর্থে করার আছে অনেক কিছু।

বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস. গালফ নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, ডয়েচে ভেলে, আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি এপি, রয়টার্স ও এএফপির মতো আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোও দ্রুততম সময়ে এই হতাহতের খবর ছড়িয়ে দিয়েছে।  

আমরা সমতলের মানুষ প্রতিবছরই কম বেশি পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর খবর পাই। আর শিহরিত হই। তবে এবছর যেন এ এক মিছিল। এ মিছিল থামছেই না। সর্বশেষ ২০০৭ সালে এরকম একটি বৃহৎ বিপর্যয় ঘটেছিল যাতে ১২৭টি প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। এভাবে মৃত্যু মোটেই কাম্য নয়।

বারবার কেন ঘটছে এই ঘটনা? এর একটিই উত্তর মানব সৃষ্ট পরিবেশের বিপন্নতা। সমতলের পরিবেশ যেভাবে আমরা বিপন্ন করে তুলছি তেমনিভাবে পাহাড়ও এর থেকে মুক্ত নয়। আপনি সমানে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাবেন আর প্রতিনিয়ত পার পেয়ে যাবেন এটি হতে পারে না। বিপন্ন পরিবেশই আপনাকে এক সময় খেয়ে ফেলবে পাহাড়ের সাম্প্রতিক ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদহারণ।

পাহাড়ের ঘটনাটি একটি অ্যালার্ম হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। কাজেই পরিবেশ বিপন্ন করার সর্বক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন যদি আমরা না করি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক বড় মানবিক বিপর্যয়ের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

পাহাড়কে পাহাড়ের রূপে থাকতে দিতে আমরা বড়ই কৃপণ। পাহাড়ের গাছপালা কাটা আর পাহাড় কাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত পাহাড়ের বুকে আঘাত হানা হচ্ছে। পাহাড়ের জমি, গাছপালা আর পাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসে মত্ত রয়েছে এক শ্রেণীর ভূমিদস্যু আর বনদস্যু।

আমাদের পাহাড়ে বসতি স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনায় কোন শৃঙ্খলা নেই। পাহাড় খাদক দখলদার বাহিনী অর্থের বিনিময়ে সমতলে মাথা গোঁজার ঠাঁইহীন মানুষগুলোকে পাহাড়ে বসিয়ে দেয়। সমতলের বাঙালিরা পাহাড়ে বসতি গড়ার কায়দা কানুন জানে না। তারা মাটি আর পাহাড়ের তফাৎ বোঝার আগেই ঘটে যায় দূর্ঘটনা। এবার তেমনটিই ঘটেছে।

অতীতে পাহাড়িদের পাহাড়ধসে মারা যাওয়ার খবর তেমন একটা পাওয়া যায়নি। কারণ তারা পাহাড় কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটি জানে। প্রাণহানীর ঘটনাগুলো ঘটেছে যেখানেই পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করা হয়েছে সেখানে। খাড়াভাবে কাটা আর গাছপালা উজাড় করে ন্যাড়া করে ফেলায় পাহাড়গুলো ধসে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের পাহাড়ি অঞ্চল বালু এবং পাথরের মিশ্রণে গঠিত। পাহাড়ের গাছ এবং পাহাড় কাটা হলে বালু ও পাথরের যে বন্ধন সেটি নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলেই ঘটে বিপর্যয়।    

আমাদের পার্বত্য অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। পর্যটনের এক বিশাল রত্ন ভাণ্ডার। সেই পাহাড়ে এমন কোন অপরাধ নাই যা ঘটছে না। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশি পর্যটকরাও সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এতে করে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি খারাপ হয়। পাহড়ের বড় সমস্যা সমতলের ভূমিহীন বাঙালিদের পাহাড় কেটে যত্রতত্র বসতি স্থাপন।

১৪ জুন দৈনিক জনকণ্ঠ একটি উদ্বেগজনক রিপোর্ট করেছে যে, ‘চট্টগ্রামের ১৩টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে সহায়তা করছে পুলিশ প্রশাসনসহ ওয়াসা, বিদ্যুত ও কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের অসাধুরা। তবে পাহাড়ে ফাটল দেখা দিলেও ভূমিদস্যুরা ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ ও হতদরিদ্র মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ বসবাসকারীদের।’ সবার আগে এটি বন্ধ করতে হবে।

পাহাড় কাটা সংস্কৃতি বন্ধ করে পাহাড়কে পাহাড়ের মত থাকতে দিতে হবে। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা বসতিগুলো একদিকে যেমন পাহাড় ধসের হুমকির মুখে থাকে তেমনি অন্যদিকে এই বসতি স্থাপনকারিদের আর একটি সমস্য পাহিাড়িদের সাথে প্রতিনিয়ত ঝগড়াবিবাদ। এতেও সেখানে সামাজিক শান্তি বিনষ্ট হয়।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর অমর বাণী, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’-এর সাথে সুর মিলিয়ে বলতেই হয় ‘পাহাড়িরা পাহাড়ে সুন্দর বাঙালিরা সমতলে।’ কাজেই পাহাড়ের সর্বত্র এই সত্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।

অন্যদিকে পাহাড়ের সম্পদ, গাছপালা কতটা অরক্ষিত ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন।পাহাড়ের ভূমি দখল, গাছপালা কাটা নিয়েও রয়েছে সেখানে বিস্তর সামাজিক বিশৃঙ্খলা।এই ভূমিদখল আর গাছপালা নিধন কঠোর হাতে দমন করতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সম্পদ রক্ষা করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নাই।

এছাড়া সেখানে ব্যাপক হারে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। সোজা কথা বারংবারই বলছি পাহাড়কে পহাড়ের মত থাকতে দিতে হবে। পাহাড়ের বুকে আঘাত পাহাড় সহ্য করবে না।

সমাজের সর্বক্ষেত্রে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা যেখানে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে পাহাড়েও অনিয়ম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করব সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রসহ পাহাড়ও তার নিজস্ব স্বকীয়তায় চলবে।

কারণ পাহাড় থেকে ভেসে আসা কান্না আমাদের সমতলেই শুধু নয় সারা বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। আমরা সইতে পারি না। পাহাড়ের কান্না বন্ধ হোক সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

সাজ্জাদ কাদির : কলাম লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপক।
sazzadkadir71@gmail.com

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত সাজ্জাদ কাদির এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad