ফাউল গেম এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৭ | ১৪ বৈশাখ ১৪২৪

ফাউল গেম এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী

মুজতবা খন্দকার ৭:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০১৭

print
ফাউল গেম এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী

এদেশে আওয়ামী লীগ হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক দল যারা রাজনীতির মাঠে যতই ফাউল করুক না কেন সব সময় সব মহল থেকে বেনিফিট অব ডাউট পেয়ে যায়। আর দলটির কিছু প্যানেল বুদ্ধিজীবী যারা, আওয়ামী লীগের এই ফাউল গেমকে যে কোনো মোড়কে ফেলে সেটাকে বৈধতা দিতে, ইতিহাসের বহু সত্য মিথ্যা নজির উপস্থাপন করে রায় দিয়ে দেন যে আওয়ামী লীগের অবস্থান সঠিক।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটির প্রতি এই সহানুভূতি দেখানো চলে আসছে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল থেকেই। সেই ৭৪-৭৫ সালে শেখ মুজিব যখন দেশ শাসন করতে লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে ছিলেন। বাকশাল গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুন্ঠিত করেছিলেন। রক্ষীবাহিনী দিয়ে দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তখনও একদল বুদ্ধিজীবী এবং মুজিব সমর্থক কিছু বামদল শেখ মুজিবের সব কুশাসনের বৈধতা শুধু দেয়নি। দলে দলে শেখ মুজিবের বাকশালে যোগদিতে লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।

একথা অবশ্যই সত্য যে, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের দল এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তাই বলে তাদের কোন ভুল ক্রুটির ন্যায্য সমালোচনা করা যাবে না এমন তো কথা নেই। নাকি আওয়ামী লীগ কোন ভুল করতে পারে না? আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই সেই ৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে যত বড় বড় গ্রস মিসটেক করেছে তা না হলে দেশের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো। অবশ্য এসব ভুলের খেসারত দলটি দিয়েছে চরমভাবে। একুশ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থেকে। সপরিবারে শেখ মুজিবের করুণ মৃত্যুও ছিল আওয়ামী লীগের ভুল রাজনীতির ফল।

অথচ আওয়ামী লীগের সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীরা যদি তাদের অবস্থানে ঋজুতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে সঠিক পরামর্শ দিতো তবে হয়তো অন্যরকম বাংলাদেশ আমরা দেখতে পেতাম! প্রথাবিরোধী, প্রয়াত লেখক-বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তার বই ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’এ এই সব দলীয় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লিখেছিলেন, বাংলাদেশের মধ্যশ্রেনীভূক্ত এই ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবীদের সকলের না হলেও কারো কারো ছিল অল্প-স্বল্প শৈল্পীক অঙ্গীকার এবং সামাজিক সুকৃতি। কিন্তু শাসক দলের চাল-কলা খেকো বামনের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাদের সমস্ত অঙ্গীকার এবং সুকৃতি প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছেন।

সরকারী বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ এক সময়ে শিল্পকলার নানা বিষয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। সরকারী সুবিধার বলয়ে প্রবেশ করার পর সর্বত্র তাদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রদর্শন করার যতগুলো মাধ্যম আছে সবখানে তাদের পবিত্র মুখমণ্ডল আলো করে জ্বলতে থাকল। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় অমৃত বাণী ছড়িয়ে দিতে লেগে গেলেন। সরকারী প্রচারযন্ত্রের অংশে পরিণত হওয়ার পর সৃষ্টিশীল মানুষ সম্পূর্ণরূপে সুকুমার অনুভূতি এবং কল্পনাশক্তি রহিত রোবটে পরিণত হয়েছেন।

তাদের অবস্থা দলীয় ক্যাডারের চাইতে অধিক শোচনীয়। কারণ ক্যাডারের কাজ চিন্তা করা নয়। নেতা বা দলের হুকুম তামিল করা। কিন্তু একজন বুদ্ধিজীবীকে চিন্তা করতে হয়। কিন্তু চিন্তার বদলে যদি চিন্তা করার ভাণ করেন, পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। তাই সরকারি বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন আমরা বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধন করেছি, তাদের এই উচ্চারণগুলো সত্য বলে মেনে নেয়ার কোন যুক্তি নিজেরাও দাঁড় করাতে পারবেন না।

সরকারি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন বলেই যত্রতত্র তারা তোতা পাখির মত এ বুলিগুলো উচ্চারণ করছেন। তাদের রচনার মধ্যেই মানসিক বন্ধ্যাত্বের চিহ্ন যে কেউ খুঁজে বের করতে পারবেন। তারা যখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কথা বলেন শুনে মনে হবে, আবাহনী মোহামেডান টিমের ভাড়া করা বিদেশী খেলোয়াড়দের মত তাদেরও ভাড়া করে আনা হয়েছে।

তারা যখন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বলেন শুনে মনে হবে টেক্সট বই থেকে কথাগুলো মুখস্থ করে হাজেরান মজলিসের শ্রোতাদের সামনে বমি করে দিচ্ছেন। তারা যখন মৌলবাদের বিরুদ্ধে হুংকার তোলেন, সেটাকে গোদা পায়ের লাথির সংগে তুলনা করা যায়। হুংকার দিয়ে কি মৌলবাদ প্রতিরোধ সম্ভব? তাদের মধ্যে স্বচ্ছ চিন্তা কোথায়? চিন্তার সমর্থনহীন ঢোলা উচ্চারণ এবং শোরগোল কি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষেধক বিবেচিত হতে পারে? এই সকল বুদ্ধিজীবীদের অতীত অন্ত্যন্ত ঘৃণ্য এবং কলঙ্কিত।

পাকিস্তান আমল থেকেই রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় তারা ননী –মাখন লুট করে এসেছেন। তাদের অতীত দিনের কর্মকাণ্ড ঘেটে আসল পরিচয় উদঘাটন করা হলে যে কেউ বুঝতে পারবেন তারা কিছুতেই আমাদের জনগণের বন্ধু হতে পারেন না। তাদের উচ্চ কন্ঠে চিৎকারের মধ্যদিয়ে নির্লজ্জ সুবিধাবাদ ছাড়া অন্যকোন প্রত্যয় ধ্বনিত হয় না। বাহাত্তর সালে তারা যা করেছেন, অধিক জোরের সঙ্গে তার পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন মাত্র।

বর্তমান সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যে ভূমিকাটা পালন করছে, তা কিছুতেই বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত সময়সীমার মধ্যে আওয়ামী বাকশালী বুদ্ধিজীবীরা যে কাপুরোষোচিত ভূমিকা পালন করেছে তার চাইতে বেশী আলাদা নয়। তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হয় বাহাত্তর-তিয়াত্তর সাল থেকে টাইম মেশিনে চড়ে তারা এই সাতানব্বই সালে প্রবেশ করেছেন।

বাহাত্তর সালে তারা যেভাবে যে ভাষায় অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলতেন, বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতি অঙ্গীকার করতেন, এই সাতানব্বই সালেও তারা একই ভাষায় সেই পুরনো বুলিগুলো উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে তাদের কণ্ঠস্বর এখন অধিকতর দ্বিধা এবং জড়িমাহীন।

অনেকটা স্বৈরাচারী অবস্থানে দাঁড়িয়ে তারা এই প্রত্যয়সমূহ উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইনা ভোগি নট-নটির মত সেই পূরনো কথা বলে যাচ্ছেন তাদের কণ্ঠস্বর থেকে অনুভব কিংবা উপলব্ধির কোন সারকথা সঞ্চারিত হয় না। তাদের উচ্চারণ থেকে কোন গাঢ় প্রত্যয়ের দ্বীপ্তি জনমানসে বিকিরিত হয় না।

দুই.
আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতির সকল ফাউল গেমের জন্য বেনিফিট অব ডাউট পেয়ে থাকে। তবে বিএনপি হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক দল। যাদের পান থেকে চুন খসলে শুরু হয়ে যায় দলটির বিরুদ্ধে সব মহলের নির্দয় সমালোচনা! যে সমালোচনা এক সময় দলটির জন্ম ঠিঁকুজি পর্যন্ত চলে যায়।

বিএনপির সাথে জামাতে ইসলামীর গাঁটছড়া বাঁধাকে এমনভাবে সমালোচনা করা শুরু করেন যে- বিএনপি মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছে। অথচ এই একই দলের সাথেজোট বেঁধে আওয়ামী লীগ যখন বছরের পর বিএনপির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করে। তখন সেই একই সমালোচকরা এটাকে পজেটিভ হিসেবে দেখতে থাকেন।

তারা এটাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের মধুচন্দ্রিমাকে পজিটিভ তত্ত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেন। অথচ বিএনপি জামায়াত যখন এই সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। তখন খালেদা জিয়া তাদের চোখে ব’নে যান জামায়াতের মহিলা আমীর!

এই যে হেফাজত নিয়ে একসময় চারদিকে এত আলোচনা, বিএনপির বিরুদ্ধে এত সমালোচনা। সেই হেফাজতের আমীর আহমদ শফি যখন সদলবলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। তখন সেই বুদ্ধিজীবীরা থাকেন নিশ্চুপ। তারা এটাকে আওয়ামী লীগের দোষ বা ফাউল গেম হিসেবে দেখতে চান না। তারা এটাকে অবহিত করেন আওয়ামী লীগের উপলব্ধি হিসেবে। কি চমৎকার আমাদের বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা চেতনার বৈপরিত্য! একেই হয়তো বলে বিবেক প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের পার্টনার হয়ে আছে বেশ কয়েকটি বাম দল। এইসব কথিত বাম দলের কয়েকটি আবার সরকারের মন্ত্রী হয়ে প্রতিদিনই জাতিকে জ্ঞান দেন। মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি শেখান আরও কতকি! এই যে প্রতিদিন তারা মুখে মুক্তিযুদ্ধ গণতন্ত্র নিয়ে কথার তুবড়ী ছোটান। হেফাজত নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক প্রসঙ্গে তাদের মুখে কোন রা নেই। কিন্তু রাজপথে আবার হেফাজতকে, জামাতকে ধুইয়ে দেন।

কিন্তু সাহস নেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে জিজ্ঞেস করা এই যে তিনি এত বড় একটা পলিসিগত সিদ্ধান্ত নিলেন সরকার এবং জোটের শরীক হিসেবে তাদের সাথে কেন আলোচনা করলেন না। আসলে তাদের হিম্মত কিংবা মুরোদ কোনটাই তাদের নেই। তাদের নৈতিক মনোবলটাও ভেঙ্গে গেছে বহু আগে। না হলে ঘটনার পর মন্ত্রীসভা থেকে আমরা একজন অথবা দুজনের পদত্যাগের খবর পেতাম।

অথচ এই যে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসা সনদকে সরকার স্বীকৃতি দিল। এরকম উদ্যোগ বিএনপিও একবার নিয়েছিলো- প্রজ্ঞাপনও হয়েছিলো। শেষতক কার্যকর হলে

শিক্ষাব্যবস্থা গেল গেল বলে চিৎকার করে আকাশ বাতাস ভারী করে ফেলতো। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকেই আল্লামা শফি যখন এটা আদায় করে নিলো। এখন আর কারো মুখে কোন কথা নেই! যেন কিছুই হয়নি। সবাই স্পীকটি নট! রামপালের কথায় যদি বলি সরকার গোঁ ধরেছে সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে। সরকারের এই ভুল নীতির বিরুদ্ধেও এসব বুদ্ধিজীবী নীরব। তিস্তার পানি বন্টনে উত্তরাঞ্চল মরুভূমি হলেও আনন্দবাজারি তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মুখে কোন বুলি নেই।

তাই বলি এমন বিবেক প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী-যারা সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পৌষ মাস আর আষাঢ় মাসের জন্য অপেক্ষা করেন তাদের কাছ থেকে দেশজাতি ক্ষতি ছাড়া উপকার পাবে, সেই প্রত্যাশা দূরাশা ছাড়া আার কিছুই নয়।

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
mujtobantv@gmail.com

print
 

আলোচিত সংবাদ