প্রাণের বইমেলা ও প্রযুক্তির কুপ্রভাব
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০ | ১৬ চৈত্র ১৪২৬

প্রাণের বইমেলা ও প্রযুক্তির কুপ্রভাব

মোহাম্মদ নজাবত আলী ৩:২৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০

প্রাণের বইমেলা ও প্রযুক্তির কুপ্রভাব

আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার উর্বর উৎস বইমেলাকে আরও বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শনভিত্তিক গ্রন্থ যা সমাজকে আলোকিত করবে; বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সৃষ্টি করবে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে তরুণ প্রজন্মের ভাবনা, বই নিয়ে বাস্তবতার নিরিখে কলামটি লিখছি। অপ্রিয় হলেও সত্য, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত পাঠকের অধিকাংশই বই পড়তে চায় না।

একুশে বইমেলার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বহুমাত্রিক। নবীন প্রবীণ লেখকদের বিভিন্ন বই নানা ধরনের পাঠক রুচি অনুযায়ী ক্রয় করে। অনেক পাঠক আছে যারা বইমেলা থেকে একাধিক বই ক্রয় করে। প্রকৃতপক্ষে বইমেলা যেন হাজারও পাঠকের মিলনমেলা। বই মানুষের মনকে ভালো রাখে। সুস্থ রাখে। বই মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু। মানুষ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে কিন্তু বই বিশ্বাসঘাতকতা করে না। ছলনা বোঝে না। বই মানুষকে নিয়ে যায় এক গভীর জ্ঞানের রাজ্যে। যেখানে শুধু শান্তি আর প্রশান্তি। ১৯৬৭ সাল থেকে বইমেলার সঙ্গে এ ভূখণ্ডের মানুষের আত্মার সম্পর্ক। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বই ক্রয় করা একধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কারণ সে বই কেউ পড়ে, কেউ পড়ে না। আমার এলাকায় পরিচিত কয়েকজন ঢাকায় পড়াশোনা করে। গতবার অমর একুশের গ্রন্থমেলা থেকে বই কিনে তা না পড়ে সেলফে রেখে দেয়। জিজ্ঞেস করতেই বলে, বই পড়ে কী হবে? তাহলে বই কিনলে কেন? মেলায় গিয়ে একটি দুটি বই না কিনলে কেমন লাগে। তাছাড়া আজকের যুগে বই পড়তে ভালো লাগে না। তার পরিবর্তে মোবাইল ইন্টারনেট ল্যাপটপ তো রয়েছে। বাস্তবতা হলো, সেকালের মতো একালে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে চায় না। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের যুগে বইয়ের পরিবর্তে ইন্টারনেট ফেসবুকে আসক্তি বাড়ছে। অথচ একুশে বইমেলার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে পাঠক সমাজে বইপড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করা।

লাইব্রেরি হচ্ছে বইয়ের ভাণ্ডার, আর বই হচ্ছে জ্ঞানের ভাণ্ডার। দেশে প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী গ্রন্থাগারিক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পড়ার পাশাপাশি ‘অপাঠ্য’ বইপড়ায় উৎসাহ সৃষ্টি করা যাতে করে শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ে। অথচ বই পড়া বা সাহিত্যচর্চা ছাড়া যে জ্ঞানী হওয়া যায় না সেটা আজকের প্রজন্ম প্রায় ভুলেই গেছে। বই মানুষের মনকে সহজ, সরল, সজাগ, শুভ্র করে, কালিমামুক্ত করে, পুত-পবিত্র করে, একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে সৎ, নিষ্ঠাবান ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী, নতুন প্রজন্ম, শিক্ষিত ছেলেমেয়ে বই পড়ার পরিবর্তে ইন্টারনেট, ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়া তথা তথ্যপ্রযুক্তির নানা দিক নিয়ে ব্যস্ত। যদিও প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য। তথ্যপ্রযুক্তির এ উৎকর্ষের যুগে নতুন প্রজন্ম জ্ঞানের দিকে মঙ্গলের দিকে ধাবিত না হয়ে অকল্যাণের দিকে ঝুঁকছে যা কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। মানুষের মনকে সুন্দর, মহৎ ও আলোকিত করতে বইমেলার কোনো বিকল্প নেই। তেমনি বইপড়ারও।

বইমেলার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে- পাঠক সৃষ্টি, বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ও সৃজনশীলতার বিকাশ। বই মানুষকে যেমন মহৎ করে তেমনি জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়। গল্প, উপন্যাস মানুষের মনকে করে প্রভাবিত, বিকশিত করে অফুরন্ত আনন্দ, চিত্ত করে প্রফুল্ল। মানুষের মনকে করে পরিবর্তন। সুকুমার বৃত্তিগুলো উন্মেষ ঘটিয়ে মনকে করে সুন্দর। সকল প্রকার কুদৃষ্টি, কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে বই মানুষের মনকে জাগ্রত করে। এক কথায় বলা যায়, বই এক অফুরন্ত জ্ঞান ও আনন্দের উৎস। মানুষের মনকে বই উন্নত করে, দেয় নতুন প্রাণশক্তি। আজকের যে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, পৃথিবীর ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম অবলম্বন বই। বই মানুষের মনকে আনন্দিত করে, শেখায় সফলতার গল্প। মানুষের চিন্তার জগতকে করে প্রসারিত। সে সময়ে মানুষ বইকে জীবনের নিত্যসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণেই এতটা সামাজিক অবক্ষয় ছিল না। এখন শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর হাতে হাতে শোভা পাচ্ছে বইয়ের পরিবর্তে মোবাইল ল্যাপটপ।

জীবনে এগুলোর প্রয়োজন যে নেই তা বলছি না। কিন্তু এর বহুমাত্রিক ও নেতিবাচক ব্যবহারে আমাদের সমাজে নানা ধরনের অবক্ষয় ও অপরাধ বাড়ছে। সুস্থ বিনোদনের জন্য বই পড়ার পরিবর্তে আজকের তরুণ-তরুণীরা মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ফেসবুকে মেতে উঠেছে। যা অপ্রিয় হলেও সত্য।

কারণ, এর ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে এবং এর নেতিবাচক ব্যবহারে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন অপরাধপ্রবণতা ও যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক দিকে যতটা উন্নতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি। এখন ধনী দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, সবার হাতে বইয়ের পরিবর্তে এক সেট মোবাইল, ল্যাপটপ। অথচ বেশিরভাগই ছেলেমেয়ে বই পড়তে চায় না।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি ছেলেমেয়ে অবসর সময়ে বই পড়ার পরিবর্তে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। অথচ একসময় আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় ছিল। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। তারা বইপড়ার পাশাপাশি নানা ধরনের হাসি তামাশার গল্প বলে সময় কাটাত। অজানাকে জানার আগ্রহে তারা লাইব্রেরিতে গিয়ে ইতিহাস, বিজ্ঞান, বিভিন্ন মনীষীর জীবনীর বই পড়ত। এতে তারা একদিকে নতুন কিছু জানত অন্যদিকে তাদের জ্ঞানার্জন ও জানার স্পৃহা বেড়ে যেত। সামাজিক শৃঙ্খলা মজবুত ছিল। বিভিন্ন অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, বলতে গেলে এসবের কিছুই ছিল না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে সামাজিক শৃঙ্খলা যেমন ভেঙে পড়েছে, বিভিন্ন অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কিন্তু যদি অধিকাংশ ছেলেমেয়েই মনের রুচি অনুযায়ী বইমেলা থেকে বই ক্রয় করে পড়ত, তাহলে তাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নেতিবাচক চিন্তাভাবনা দূরীভূত হত।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করছে বলা যায়, প্রত্যেকের হাতে মোবাইল আছে। তারা যেভাবে মোবাইল ব্যবহার করে তার কিঞ্চিত পরিমাণ হলেও বই পড়তে চায় না। এভাবে আজকের তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে পারছে না। তাদের মনের মধ্যে একধরনের ভাইরাস অনুপ্রবেশ ঘটায় তাদের শুভ চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে ধবংস করে দিচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা বা বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কর্তৃপক্ষের বিধি-নিষেধ রয়েছে। তবুও একশ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা কর্তৃপক্ষের এ বিধি-নিষেধ মানতে নারাজ। এ নিয়ে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে বাকবিতণ্ডাও হয়। বিষয়টি অভিভাবক মহলে জানালে উক্ত ছাত্র-ছাত্রী অভিমান করে আত্মহত্যাও করে। বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না দেওয়ার ফলে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। মোবাইল ফোন মানুষের জীবনে একে অন্যের সাথে কথাবার্তা বলা বা যোগাযোগের সুবিধা এনে দিলেও এর নেতিবাচক ব্যবহারে ছোট এ যন্ত্র উঠতি যুবক-যুবতী তরুণ-তরুণীদের নৈতিক অধঃপতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু যে মোবাইল ফোন এর জন্য দায়ী তা নয়। একই সঙ্গে ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও অন্যদিকে এর নেতিবাচক ব্যবহারে আমাদের সন্তানরা বিপথগামী হচ্ছে। ভয়াবহভাবে তাদের নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটছে। অথচ অবসর সময়ে বই পড়লে মানুষের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিগুলো বিনাশ এবং মনকে করে আলোকিত।

কিন্তু অধিকাংশই বই পড়তে চায় না। বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে। এ সমস্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী যদি গড়ে প্রতিদিন কথা বলতে ৫ টাকা ব্যয় করে তাহলে দেখা যায় ২০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির হাতে। এতে তাদের অকারণে অর্থ ব্যয় হয় এবং পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। শুধু অর্থ ব্যয় নয় বখাটে যুবকরা প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান হওয়ায় বিভিন্ন সময় ওইসব মেয়ের ছবি তুলে ফেসবুক বা ইউটিউবে পোস্ট করে। সংশ্লিষ্টদের পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে।

ফোনে অযথা কথা বলা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একধরনের ফ্যাশন ও মরণনেশায় পরিণত হয়েছে। অশ্লীল ছবি দেখে ও বিচিত্রভাবে অপব্যবহার শুরু হয়েছে তা মাদককেও ছাড়িয়ে গেছে। মাদকাসক্তি কাউকে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব কিন্তু বই না পড়ে এর পরিবর্তে কম্পিউটার ইন্টারনেট মোবাইলে যে নেতিবাচক ব্যবহার অধিকাংশ তরুণ-তরুণীর মাঝে ছড়িয়ে গেছে তাতে তারা ক্রমশ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।

অথচ সুষ্ঠুভাবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়া যায়। তবুও তথ্যপ্রযুক্তির বিকল্প নেই। তবে এর ব্যবহার হওয়া উচিত ইতিবাচক। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের যুগে বইয়ের জানালা ও জ্ঞানের আলো বন্ধ করার কারণে নানা নেতিবাচক দিক আমাদের সমাজে প্রভাব ফেলছে। অথচ বই মানুষকে মহৎ করে, আলোকিত করে।

বাংলাদেশের অধঃপতিত তরুণ সমাজকে রক্ষা ও তাদের নেতিবাচক মনের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অভিভাবক পিতা-মাতার সচেতনতার অভাবে উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়া ও অসৎ সঙ্গদোষে এবং বইমুখী না হয়ে তারা ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিপথগামী হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্বই প্রধান। স্ব-স্ব পরিবারই পারে তাদের রক্ষা করতে। একটি পরিবারের প্রধানকর্তা হয়ে অভিভাবককে কঠোরতার আড়ালেও স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করে তাদের তথ্যপ্রযুক্তির পাশাপাশি বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। বইমুখী হয়ে বইকে জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়ে সমাজে বই পড়ার আগ্রহ ও অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

মোহাম্মদ নজাবত আলী: সহকারী শিক্ষক, চামরুল উচ্চ বিদ্যালয়, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও