প্রসঙ্গঃ ধর্মান্ধতার কুফল ও ধর্মের নামে দলাদলি

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৬

প্রসঙ্গঃ ধর্মান্ধতার কুফল ও ধর্মের নামে দলাদলি

এখলাসুর রহমান ৩:৫০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

প্রসঙ্গঃ ধর্মান্ধতার কুফল ও ধর্মের নামে দলাদলি

মাদরাসা ছাত্রকে বলাৎকার করে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে মাদরাসাশিক্ষক। গত ২৪ জুলাই চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নূরানী হাফিজিয়া মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আবির হুসাইনের গলা কাটা মৃতদেহ মাদরাসার অদূরে একটি আম বাগান থেকে উদ্ধার করা হয়। হত্যার পর ওই ছাত্রের মাথাটিকেও গুম করা হয়৷ আর এই  ঘটনায় মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবু হানিফ ও তামিম বিন ইউসুফকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷

চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটছে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা। এসব থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছোট ছোট শিশুরাও। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় শিশু শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে একটি মাদরাসার অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। মাওলানা আবুল খায়ের বেলালী নামে ওই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুটি ধর্ষণ মামলা করা হয়। এক বছরে তিনি ছয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল খায়ের বেলালীর ধর্ষণের বর্ণনা তুলে ধরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. শাহজাহান মিয়া। তিনি লিখেছেন, ‘তিনি একজন দাওরায়ে হাদিস মাওলানা (সিলেট বালুরচর কওমি মাদরাসা থেকে), একজন বক্তা, একজন ইমাম, শুক্রবারের জুমার নামাজের খতিব। মাওলানা (!) আবুল খায়ের বেলালী। শুক্রবারও তার বয়ান শোনার জন্য আধা ঘণ্টা আগে মুসল্লিরা এসে অপেক্ষা করেন মসজিদে। তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক (মুহতামিম) সেই মা হাওয়া (আ.) কওমি মহিলা মাদরাসায় প্রায় ৩৫ জন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্রী রয়েছে, যাদের ১৫ জন আবাসিক। সেখানে তিনিও আবাসিক।

সময় সুযোগ বুঝে তিনি কলিংবেল চাপেন আর ওনার পছন্দমতো একজন কোমলমতি ছাত্রীর ডাক পড়ে তার শরীর টিপে দেয়ার জন্য। এক পর্যায়ে তিনি সেই অবুঝ শিশুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শেষে আবার কোরআন শরিফ হাতে দিয়ে শপথ করান কাউকে কিছু না বলার জন্য।

বললে আল্লাহ তাকে দোযখের আগুনে পোড়াবেন বলেও হুমকি দেন। ভয়ে কোমলমতি ছাত্রীরা কাউকে কিছু বলে না।

এটা কি ধর্ম ও কোরআনের অবমাননা নয়? বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে এমন ঘটনা অহরহ শিরোনাম হয়েই চলছে; এগুলো কি জেনার পর্যায়ে পড়ে না? হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী দেশের স্কুল কলেজগুলোকে জেনার বাজার বললেন৷ চট্টগ্রামের রাউজান গহিরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে তিনি বলেন, শিক্ষকরা জেনা করছে। ছাত্র-ছাত্রীরা তো জেনা করেই। হাসিনাকে জানাই, হাসিনা তুমি যেভাবে লেখাপড়া করেছো সেভাবে আমাদের মেয়েদেরও, মহিলাদেরও ওইভাবে লেখাপড়া করার জন্য আদেশ দাও। আমি মহিলাদের শিক্ষিত হওয়ার জন্য বাধা দিচ্ছি না। মহিলা আলাদা, পুরুষ আলাদা-এমন করলে ভালো হবে না খারাপ হবে?

আল্লামা শফী আরও বলেন, এখন তো রাস্তাঘাটে একজন মহিলা, একজন পুরুষ, কেমন? এরা চোখের জেনা করে।

হেফাজতের আমীর আসলে দেশটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়? তার জবানীতে শেখ হাসিনা কিভাবে পড়ালেখা করেছেন? দেশব্যাপী মহিলা প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহিলা হাই স্কুল, মহিলা কলেজ, মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, মহিলা পাঠাগার করা কি সম্ভব? মহিলা রোড ও পুরুষ রোড করা কি সম্ভব? মহিলারা মহিলা প্রতিষ্ঠানে যাবে, মহিলা রোড দিয়ে হাঁটবে বিষয়টা কি তা-ই? ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের একটি মসজিদে সাইনবোর্ড টানানোর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে; যাতে মসজিদের মাঠ দিয়ে মহিলাদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে৷ আল্লামা শফীর চোখে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জেনাগুলো পড়ে মাদরাসাগুলোরটি পড়ে না৷ কিছুদিন আগে নারীদের সাথে তেঁতুলের তুলনা করে দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছেন৷ অনেককেই তাকে ব্যঙ্গ করে তেঁতুল হুজুর বলতেও শোনা যায়৷ হুজুরদের সমালোচনা করে কারাগারে ও রিমান্ডে গেলেন শরীয়ত বয়াতী৷ অথচ কতিপয় হুজুর একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলেই চলছেন৷ তবে কি এই শরীয়ত বয়াতী বাউল না হয়ে হুজুর হয়ে এসব কথা বললে জেলে যেতেন না?

বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমাও হুজুরদের দ্বন্দ্বে দুই ভাগ হয়ে গেল৷ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে এসব বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে৷

বক্তারা নিজেদের জাহির করতে ও শ্রোতাদের মন জুগাতে অনেক অবান্তর হাস্যকর কথাও বলে চলছেন৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ২০১৫ সালে হোয়াইট হাউজে দেখা করার কথা ছিল মওলানা তারেক মনোয়ারের৷ তিনি এও বলেছেন হাদিসে ট্রাম্পের নাম এসেছে৷ এখন কথা হল এই হাদিসটা কে ও কবে রচনা করল? আর ট্রাম্পতো রাষ্ট্রপতিই হলেন ২০১৭ সালে৷ আর তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানালেন ২০১৫ সালে! এ কথাটা হুজুর না হয়ে কোন বাউল বললে কী হতো তখন? মাওলানা জোবায়ের বিষোদগার করে চলছে মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে৷ দেওয়ান বাগীর হুজুর বিষোদগার করে চলছে চরমোনাই হুজুরের বিরুদ্ধে৷ এসব বিষোদগার হুজুরের দ্বারা না হয়ে বাউলের দ্বারা হলে কী হতো? গান বাজনার পক্ষে কথা বলে হুজুরদের রোষানলে পড়লো শরীয়ত বয়াতী৷ কিন্তু এ নিয়ে কতিপয় বিজ্ঞ আলেম কী বলেছেন?

মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রয়াত) গ্র্যান্ড মুফতি (১৯৮২ – ১৯৯৬) শেখ জাদ আল হকের মতে, অনৈতিক ও গুনাহের কর্মকাণ্ডের সহিত যুক্ত না হইলে, কিংবা সেই বাহানায় মানুষকে হারামের দিকে না টানিলে, কিংবা মানুষকে ফরজ ইবাদত (আল ওয়াজিবাত) হইতে সরাইয়া (বা ভুলাইয়া) না দিলে সংগীত শোনা, সংগীত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা, এবং বাদ্যযন্ত্র বৈধ৷

ডক্টর কারযাভীও একই কথা বলেছেন৷

কাজী আবুবকর ইবনুল আরাবী বলিয়াছেন ‘গান হারাম হওয়া পর্যায়ে একটি হাদিসও সহীহ নহে’।

ইবনে হাজম বলিয়াছেন– ‘এ পর্যায়ের সকল বর্ণনাই বাতিল ও মনগড়া রচিত’

অখণ্ড ভারতের সর্বোচ্চ ইসলামি নেতাদের অন্যতম, ভারতীয় কংগ্রেসের দুইবারের সভাপতি, কলকাতার ঈদের নামাজ পড়ানোর পেশ ইমাম মওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, পয়গম্বর দাউদের (আঃ) কণ্ঠস্বর অত্যন্ত মিষ্টি ছিল। তিনি সর্বপ্রথম হিব্রু সংগীতের সংকলন করেন। মিশর ও ব্যাবিলনের গাছ হইতে উচ্চমানের বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবনা করেন। (তর্জুমান আল্ কুরান, ২য় খণ্ড পৃঃ ৪৮০।)

ইমাম গাজ্জালী বলেছেন, নবী করিম (সাঃ) হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে বলিয়াছেন− তাহাকে হযরত দাউদের (আঃ) সংগীতের অংশ প্রদান করা হইয়াছে (মুরশিদে আমিন, পৃষ্ঠা ১৭০ − এমদাদিয়া লাইব্রেরী)৷

শরীয়ত বয়াতী কেন গানকে জায়েয বলল এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে মামলা করলো এক হুজুর৷ আলেমদের এসব মত সম্পর্কে কী বলবেন তিনি? ওয়াজ মাহফিলে হুজুরদের কতিপয় ওয়াজ নিয়ে সরকার দলীয় জোট ১৪ দলেও দেখা দিয়েছে ক্ষুব্ধতা৷ স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমেদ শফীর ‘অশালীন’ বক্তব্যের প্রতিবাদও জানিয়েছে তারা৷

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এক বিবৃতিতে বলেন, তার বক্তব্য নিম্ন রুচি ও সংস্কৃতি, অসভ্যতা এবং অশালীনতা, বর্বর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

জাসদ নেতারা বলেন, হেফাজত আমির আহমদ শফী সম্প্রতি এক মাহফিলে ‘শিক্ষকরা জেনা করছে, ছাত্র-ছাত্রীরাতো জেনা করেই’ মন্তব্য করেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে, যা নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে।  তারা তাদের বিবৃতিতে বলেন, দেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজের চরম অবমাননা করেছেন। তিনি ইতোপূর্বেও নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করে বক্তব্য দিয়ে দেশের নারী সমাজের চরম অবমাননা করেছেন৷ তারা আহমদ শফীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে তাকে বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান৷

এ ছাড়াও জাসদ নেতারা একই সাথে ওয়াজের নামে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়া বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

এব্যাপারে প্রধান শরীক আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের কী বক্তব্য৷ জামায়াত কি হেফাজত হয়ে নতুন পরিকল্পনায় দেশটাকে ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? ধর্মের নামে ধর্মান্ধতার কুফলে ও ধর্মীয় লেবাসধারীদের পরস্পর বিরোধিতায়  কোন ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে দেশটি?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও