গ্রেফতারের সাথে পাল্লা দিয়ে কেন বাড়ছে ধর্ষণ?

ঢাকা, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

গ্রেফতারের সাথে পাল্লা দিয়ে কেন বাড়ছে ধর্ষণ?

এখলাসুর রহমান৷ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

গ্রেফতারের সাথে পাল্লা দিয়ে কেন বাড়ছে ধর্ষণ?

ধর্ষণকারীদের ‘ক্রয় ফায়ারে’ সরাসরি গুলি করে হত্যা করার দাবি উঠেছে খোদ  জাতীয় সংসদে৷  জাপার সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে হলে ‘এনকাউন্টার মাস্ট’। ধর্ষককে গুলি করে মারতে হবে। একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলা।ধর্ষকরা কতটা অপ্রতিরোধ্য হয়েছে এতেই অনুমেয়৷ ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে নূরুল ইসলাম (৫৯) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। ১১ জানুয়ারি শনিবার এই  ব্যক্তিকে গাজীপুরের সালনা এলাকা থেকে  গ্রেফতার  করে৷ ১০ জানুয়ারি সকালে ওই শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে  ধর্ষন করে এই বৃদ্ধ৷ নূরুল এর আগেও অনেক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে ৷  ধর্ষন যেন থামছেইনা   ধর্ষন বিরোধী ক্ষোভ বিক্ষোভ ও গ্রেফতারের সাথে পাল্লা দিয়ে তা  বেড়েই চলছে ক্রমশ৷ রাজধানীর রামপুরায় কর্মজীবী দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ।  এ ঘটনায়  মামলা দায়েরের পর ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর ধর্ষিতা দু'জনকে পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)।  কিছুদিন আগে  কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে তনু, ফেনীর ফুলগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত ইস্যুতেও মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছে৷ঘটেছে গ্রেফতার৷ এসব করেই এগুলোর বিচার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে৷ কিন্তু এতে ধর্ষন কি কমলো?তাতো দিনের পর দিন বেড়েই চলল৷

বাড়ছে একক ধর্ষন ও গণধর্ষন৷ সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত বেরোচ্ছে ধর্ষনের খবর৷ প্রেমিক প্রেমিকাকে তুলে নিয়ে বন্ধুদের নিয়ে গণধর্ষন করছে৷ খবরে প্রকাশঃ প্রেমিকাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে প্রেমিকের তিন বন্ধুসহ মোট ছয় জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে।৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এ ঘটনা ঘটে।ভিকটিম বাদী হয়ে হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত ২-এ পাঁচ জনকে আসামি করে  মামলা করলে   পুলিশ প্রেমিক ও ধর্ষক মামুনকে গ্রেফতার করে৷ এই গণধর্ষন মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই কলেজছাত্রীর সঙ্গে মামুনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মামুন মেয়েটিকে ফোন করে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যায়৷  এরপর মেয়েটি কলেজ থেকে বের হয়ে মামুনের সঙ্গে অটোরিকশায় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে যায়। সেখানে মামুন প্রথমে তাকে ধর্ষণ করে। পরে মামুনের বন্ধু ফজলুর, আলী ও জুনেদসহ অজ্ঞাত আরও দু’জন তাকে ধর্ষণ করে আর এ সময় অটোরিকশাচালক আক্কাছ জঙ্গলের বাইরে থেকে ধর্ষকদের পাহারা দেয়৷

ধর্ষণের পর মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে  ঘটনাস্থলে  ফেলে রেখেই পালিয়ে যায় ধর্ষকরা৷  পরে মেয়েটি উদ্যানের বাইরে এসে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে লোকজন গিয়ে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে৷ধর্ষন থেমে নেই তা চলছেই৷    ময়মনসিংহের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে গণ ধর্ষন করেছে ধর্ষকরা৷

  সম্প্রতি ঢাকার কুর্মিটোলায় ধর্ষনের শিকার হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী৷ এ নিয়ে চলছে দেশব্যাপী বিক্ষোভ৷ কেনো এভাবে সর্বত্র  আমাদের নারীরা রাস্তাঘাটে চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছে?ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিক্ষোভের পর গ্রেফতার হল মজনু৷ পুলিশ বলছে সে একজন সিরিয়াল রেপিস্ট,মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারী৷ সে ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধীদের ধর্ষন করত৷ তাহলে সে এ পর্যন্ত কতজনকে ধর্ষন করেছে?এইসব ধর্ষনের কোন বিচার হয়নি বলেই কি মজনু এমন বেপরোয়া ধর্ষক হয়ে উঠলোনা?এসব ধর্ষন যেভাবে চেপে গেছে শিক্ষার্থী ধর্ষনটা নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন বিক্ষোভ না হলে কি তাও সেভাবেই চেপে যেতোনা?দেশে এমন চেপে যাওয়া ও বিচারের বাইরে থেকে যাওয়া ধর্ষনের সংখ্যা কত?

কার উপর নির্ভর করবে মানুষ?পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর সবুজবাগ থানায়৷  ধর্ষিতা কিশোরীটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ  হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এই অবস্থায় মেয়েটি পুরুষ দেখলেই এখন আঁতকে উঠছে৷ ধর্ষন থেমে নেই৷ তা চলছেই ঘরে বাইরে ও কলেজ মাদ্রাসা সর্বত্রই৷ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় হাফেজিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে (১৪) রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে রাতভর গণধর্ষণ করেছে ধর্ষকরা৷  ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে৷ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে ধর্ষিতা হয়েছে এক শিশু৷ ধর্ষিতা হচ্ছে কর্মজীবী নারীরাও৷  ঢাকার ধামরাই উপজেলায় মমতা আক্তার (১৯) নামের এক নারী শ্রমিককে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মেয়েটির ভাই আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। এ ঘটনায় ওই নারী শ্রমিককে বহনকারী বাসের চালক ফিরোজ এলাহী সোহেলকে (৩১) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ধর্ষিতা শ্রমিক  মমতার বাড়ি ঢাকার ধামরাইয়ে। তিনি স্থানীয় একটি সিরামিক কারখানায় কাজ করতেন।  কারখানার বাসে করে কর্মস্থলের দিকে যাওয়ার সময় বাস চালক কর্তৃক ধর্ষিতা হন তিনি।  বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে যাওয়ার পর হিজলিখোলা এলাকায় চালক ফিরোজ এলাহী সোহেল মেয়েটিকে ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ফেলে চলে যায়৷ প্রতিবন্ধী মেয়ের ধর্ষণের বিচার চেয়ে নিজে মিথ্যে মামলার আসামি হয়ে পথে পথে ঘুরছেন টিএসসির চা বিক্রোতা জলিল মিয়া ওরফে ‘স্বপন মামা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছে ‘স্বপন মামা’ নামেই তিনি পরিচিত।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ঢাবি শিক্ষার্থীদের  ধর্ষণ  বিরোধী  মানববন্ধনে এসে সংহতি প্রকাশ করেন তিনি।  মেয়ের ধর্ষণের কথা বলে কাঁদতে কাঁদতে আব্দুল জলিল বলেন, ‘ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে আমি একাত্মতা ঘোষণা করলাম। আমারও এক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আমি এর বিচার পাইনি।’

উপস্থিত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সামনে আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমি যেন এর বিচারটা পাই, এ ব্যবস্থা আপনারা সবাই করবেন। আর যেন কোনো দিন কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার না হয়, সেই ব্যবস্থা করবেন আপনারা৷ উল্লেখ্য  এক বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের বাসুদেব গ্রামে স্বপন মামার বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ে (২০) ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনার পর গ্রাম্য সালিশে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চালান মুরব্বিরা। মীমাংসা না হলে অভিযুক্ত বাচ্চু মিয়ার (৫০) নামে মামলা করেন স্বপনের স্ত্রী রহিলা। এক বছর জেলে থাকার পর জামিনে এসে জলিল মিয়া ও তার পরিবারের পাঁচজনের নামে পাল্টা দুটি মামলা করেন বাচ্চু মিয়া। ওই মামলার আসামি হয়ে এখন পথে পথে ঘুরছে স্বপন মামা ও তার পরিবারের সদস্যরা। গরিব হওয়ায় মামলার খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি৷ পুলিশ কেন ধর্ষক কর্তৃক এই মিথ্যে মামলাটি নিলো?ধর্ষনের এই বিচারহীনতার জন্যই কি ধর্ষন বাড়ছেনা?ইয়াসমিন, তনু,নূসরাতকে নিয়ে যারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন সব ক্ষুব্ধ কন্ঠগুলোকে আজ একীভূত হওয়ার সময় এসেছে৷ বিশেষ করে সোচ্চার হতে হবে নারী সমাজকে৷ দেশব্যাপী ধর্ষনবিরোধী নারী জাগরণ আজ সময়ের দাবী৷ জাগো নারী,জাগো বহ্নিশিখা৷

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও