বেলজিয়াম, পর্তুগাল না ব্রাজিল; নাকি আর্জেন্টিনাই?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

বেলজিয়াম, পর্তুগাল না ব্রাজিল; নাকি আর্জেন্টিনাই?

প্রভাষ আমিন ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৮

print
বেলজিয়াম, পর্তুগাল না ব্রাজিল; নাকি আর্জেন্টিনাই?

জোয়াকিম লো রাশিয়া গিয়েছিলেন রেকর্ড গড়তে। গড়েছেনও, তবে উল্টো রেকর্ড। গৌরবের বদলে লজ্জার রেকর্ড। দল হিসেবে পরপর দুই বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড ব্রাজিলের আছে। তবে পরপর দুই বিশ্বকাপ জেতানোর রেকর্ড কোনো কোচের নেই। জোয়াকিম লো'র সামনে সেই সম্ভাবনার দুয়ার হাট করে খোলা ছিল। কিন্তু দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন।

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়া নিয়ে অবশ্য বিস্ময় নেই, এটাই যেন সাম্প্রতিক প্রবণতা। ২০০২ সালে ফ্রান্স, ২০১০ বিশ্বকাপে ইতালি, ২০১৪তে স্পেন; সেই ধারাবাহিকতায় জার্মানির বিদায় স্বাভাবিকই মনে হবে। তবে গত বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে জার্মান মেশিন যেন আরো গতি পেয়েছিল। দারুণ খেলে কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছে। বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে ফিফা র‍্যাঙ্কিঙে শীর্ষ দল হিসেবে, ফেবারিট তালিকায়ও শীর্ষে। এমনিতে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে গিয়ে শিরোপা জেতা কঠিন। মানে বিশ্বকাপ যেখানে হয়, সে এলাকার দেশই শিরোপা জেতে। কিন্তু গতবার সে অসম্ভবও সম্ভব করেছে জার্মানি। ব্রাজিল থেকে শিরোপা নিয়ে এসেছিল। এবার কাজটা অনেক সহজ ছিল। ইউরোপের শিরোপা ইউরোপেই রাখতে হলে জার্মানির চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে? সেই জার্মানি প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়াতেই এত অালোচনা, এত বিস্ময়।

তবে জার্মানির বাদ পড়ায় ভাগ্যের কোনো হাত নেই। অযোগ্য দল হিসেবেই বাদ পড়েছে। প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর কাছে হার দিয়ে শুরু জার্মানির। তাদের বিদায়টা হতে পারতো দ্বিতীয় ম্যাচেই। ক্রুসের অতিরিক্ত সময়ের গোল তাদের আশা তৃতীয় ম্যাচ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে পরিষ্কার ব্যবধানে হেরে বিদায় হয়েছে জার্মানির। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা যেমন খেলছিল, তাতে তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়াতে বিশ্বকাপের ইজ্জত বেঁচেছে।

সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইতালি তো বাছাই পর্বেই বাদ। জার্মানির বিদায়ে ফেবারিটদের তালিকা আরেকটু ছোট হলো। তবে এবারের বিশ্বকাপে ফেবারিটের পুরোনো ধারণাই যেন এলোমেলো। বড় দল, ছোট দল বলে কিছু নেই। ব্যবধান খুব সামান্য। ধারেই কাটতে হবে, ভারে কাটার দিন শেষ। জার্মানি শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েছে। কিন্তু বাদ পড়তে পারতো আরেক ফেবারিট অার্জেন্টিনাও। প্রথম ম্যাচে পুঁচকে আইসল্যান্ড ঠেকিয়ে দিয়েছিল আর্জেন্টাইনদের। বাছাই পর্বের মত গ্রুপ পর্বেও শেষ ম্যাচে মেসির ঝলকে পাড় পেয়েছে আর্জেন্টিনা।

এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চমক এশিয়া। ইউরোপ বা ল্যাতিন আমেরিকার সাথে না পারলেও এশিয়ার পারফরম্যান্স এবার অাফ্রিকার চেয়ে ভালো করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া নকআউট পর্বে যেতে না পারলেও জার্মানিকে হারিয়ে দেশে ফিরেছে বীরের মতই। আর জাপানের দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সাথে মিশে আছে দারুণ এক গৌরব। সেনেগালের সাথে পয়েন্ট এবং গোল গড় সমান হলেও ফেয়ার প্লের বিবেচনায় এগিয়ে ছিল জাপান। সেনেগালের চেয়ে দুটি কম হলুদ কার্ড দেখেছে তারা। এর আগে জাপানের দর্শকরা খেলা শেষে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করে দারুণ বার্তা দিয়েছে বিশ্বকে। মাঠে এবং মাঠের বাইরে পরিচ্ছন্নতার বার্তা বিশ্ব পেলো এশিয়ার কাছ থেকেই।

শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্ব। শুরু হচ্ছে আসল বিশ্বকাপ। শিরোপা মাত্র ৪ ম্যাচ দূরে। শুনতে যত সহজ, কাজটা ততটাই কঠিন। প্রথম পর্বে ড্র ছিল। এখন তাও নেই। জিতার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে আসল বিশ্বকাপ মানে নকআউট পর্বে শুধু ধারে হয় না, ভারও লাগে। বিশ্বকাপ বিধাতা খুব কিপ্টে। ১৯৯৮এর আগ পর্যন্ত ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ইংল্যান্ড আর প্রাগৈতিহাসিক কালের উরুগুয়েতেই সীমাবদ্ধ ছিল বিশ্বকাপের রোল অব অনার। ফ্রান্স ভাঙলো এই গেরো। সেই ফাঁকে ২০১০সালে ঢুকে পড়ে স্পেন। সাবেক চ্যাম্পিয়নরা ফেবারিটদের তালিকায় ঢুকে পড়েন অটো। তবে উরুগুয়ে অনেকদিন ধরেই অটো ফেবারিট নয়। যেহেতু ইতালি, জার্মানি নেই; তাই তালিকাটা আরো ছোট- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন আর ইংল্যান্ড। সাথে যোগ করে নিন বেলজিয়াম আর পর্তুগাল। ১৬ দলের মধ্যে ৭টিকেই ফেবারিট তালিকায় রাখলে সেটা আসলে কোনো তালিকা নয়। আর এক সপ্তহের মধ্যে বিশ্বকাপই হয়ে যাবে ৮ দলের। তাই ফেবারিটদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠতে এক সপ্তাহ বাকি।

আগেই বলেছি, ইউরোপ থেকে ল্যাতিন আমেরিকায় কাপ নেয়া খুবই কঠিন। এই কঠিন কাজটি করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্রাজিল। ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল অবশ্য বরাবরের ফেবারিট। আর এবার বিশ্বকাপে এসেছে ফিফার র‍্যাঙ্কিঙের দ্বিতীয় দল হিসেবে। জার্মানি চলে যাওয়ার পর তারাই এখন শীর্ষে। প্রথম পর্বে ব্রাজিলের পারফরম্যান্সও চোখ ধাধানো ছিল না। দ্বিতীয় ম্যাচে কোস্টারিকার সাথে অতিরিক্ত সময়ের গোলের জয় না পেলে তাদেরও বাড়ির টিকেট কাটতে হতো। তবে তিনটি ম্যাচেই তাদের পারফরম্যান্স উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। শৈল্পিক ফুটবলের ট্রেন চলতে শুরু করেছে। নকআউট পর্বেই হয়তো গতি পাবে। আর নেইমারকে নিয়ে অনেক অালোচনা হলেও কুতিনহো, জেসুসরা বুঝিয়ে দিয়েছেন এতজন নয়, জিততে হলে দল হিসেবে খেলতে হবে। ব্রাজিল না পারলে ল্যাতিন পতাকা আর্জেন্টিনার হাতেই থাকবে। উরুগুয়ে আর কলম্বিয়া সেরা ১৬তে আসলেও তাদের ওপর ভরসা নেই। আর্জেন্টিনাও খুব ভরসা করার মত দল নয়। খালি মেসি নামে এক ভিনগ্রহের খেলোয়াড় আছে বলেই যে কোনো কিছু সম্ভব। ৯০ মিনিট দরকার নেই, মেসির কয়েক মিনিটের ঝলকই প্রতিপক্ষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর অার্জেন্টিনার ধার এবার কম হলেও ভার তো আছেই। আর বাংলাদেশের সমর্থকদের গলাবাজিকে যদি আমলে নেয়া হতো, তাহলে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা আরেকটু উজ্জ্বল হতো।

ফ্রান্সে অনেক তারকার ভিড় থাকলেও মাঠে তার ঝলক দেখা যায়নি। চ্যাম্পিয়ন হতে যে খুনে ক্ষুধা লাগে, সেটা দেখা যাচ্ছে না। তাই ফ্রান্স বাদ। প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের সাথে দারুণ খেললেও কোচ বিতর্কের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি স্পেন। দুদিন আগে নিয়োগ দেয়া কোচের অধীনে বিশ্বকাপ জেতা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব।

ইংল্যান্ড একবারই বিশ্বকাপ জিতেছে, ১৯৬৬ সালে। কিন্তু জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত গোলের সুবাদে পাওয়া সেই শিরোপা নিয়ে তাদের স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি বেশি। সেই বিতর্ককে চিরতরে ভুলিয়ে দেয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় আরেকটি বিতর্কমুক্ত শিরোপা। হারিকেন ঠিকমত জ্বললে, এবারই তা হতে পারে। তবে আমার ধারণা ল্যাতিন আমেরিকা না পারলে বিশ্বকাপ এবার নতুন চ্যাম্পিয়ন পাবে। ফিফা র‍্যাঙ্কিঙে বেলজিয়াম ৩ নাম্বার, আর পর্তুগাল চার। আর দল দুটি প্রথম পর্বেই তাদের সামর্থ্যের ঝলক দেখিয়েছে। আমার পছন্দ পর্তুগাল। মেসির হাতে যেমন একটি শিরোপা চাই, তেমনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরও একটি বিশ্বকাপ পাওয়ার যোগ্যতা আছে। পর্তুগাল ওয়ান ম্যান আর্মি। তবে সেই ওয়ান ম্যানটার যোগ্যতা-সামর্থ্য সবই আছে। বিশ্বকাপ আসলে একজনই জেতান; হয় পেলে, নইলে ম্যারাডোনা, নইলে বেকেনবাওয়ার বা পাওলো রসি, রোনালদো, রোমারিও, জিদান। এবারও হয় মেসি নয় রোনালদো নয় নেইমার; এমন কেউই জেতাবেন দলকে। তবে মেসি না রোনালদো সে ফয়সালা হয়ে যেতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালেই। কোয়ার্টার ফাইনালে মীমাংসা হয়ে যেতে পারে ব্রাজিল না বেলজিয়াম সে প্রশ্নেরও। ইংল্যান্ড বা স্পেন অবশ্য অপর প্রান্তে দৌঁড়ে ফাইনাল পর্যন্ত পৌছে যেতে পারে।

বিষয়টা যদি ইউরোপ হয়, তাহলে বেলজিয়ামের সম্ভাবনা বেশি। বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম দারুণ ফর্মে আছে। আমার মস্তিষ্ক বলছে বেলজিয়াম, হৃদয় বলছে পর্তুগাল।

তবে আমি বরাবরই ল্যাতিন ফুটবলের সমর্থক। আমি চাই, শুধু চাই বলে নয়; ফর্ম-র‍্যাঙ্কিং মিলিয়ে ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপাই সম্ভাব্য ফল। ব্রাজিল না পারলে যেন আর্জন্টিনা পারুক। মেসির মানের খেলোয়াড়ের হাতে বিশ্বকাপ না থাকলে বড্ড বেমানান লাগবে।

ব্রাজিল না পর্তুগাল, ইংল্যান্ড না আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম না স্পেন? নতুন চ্যাম্পিয়ন না ঘুরেফিরে সেই পুরোনো নাম? উত্তর মিলবে ১৫ জুলাই রাতে।

আরজি/

 
মতান্তরে প্রকাশিত প্রভাষ আমিন এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ