নারীর পোশাক নয়, প্রতিভা মাপুন

ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫

নারীর পোশাক নয়, প্রতিভা মাপুন

জেসমিন চৌধুরী ৫:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৮

print
নারীর পোশাক নয়, প্রতিভা মাপুন

টি-টুয়েন্টি এশিয়া কাপ ক্রিকেট ফাইনালে জিতে গেল বাংলাদেশের নারী দল। তুখোড় সব দলকে পরাজিত করে ভারতীয় দলকে দুই দুইবার হারিয়ে তারা এই বিশাল বিজয়ের গৌরব ছিনিয়ে এনেছে দেশের জন্য, ক্রীড়ায় বাংলাদেশের প্রথম চূড়ান্ত বৈশ্বিক শিরোপা।

ইতোমধ্যে উপমহাদেশীয় ফুটবলেও আমাদের মেয়েরা একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে এনে ক্রীড়ার ক্ষেত্রে তাদের অসমান্য ক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

হোক পুরুষ অথবা নারী, দেশের দল জিতলে আনন্দে-গর্বে আমাদের বুক ভরে যায়, মাথা উঁচু হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের নারী দলের বিজয় একটা ভিন্ন ধরনের তাৎপর্য বহন করে বৈকি।

যে দেশে এখনো মেয়েদের একা চলাফেরা করাকে দূষণীয় ভাবা হয়, সন্ধ্যার পর একা বাইরে বেরুনো প্রকৃত পক্ষেই তাদের জন্য ঝুঁকির ব্যাপার সেই দেশের মেয়েরা যখন এরকম একটা বিজয় ছিনিয়ে আনে, তখন আশার আলো দেখি— এ দেশের মেয়েরা সুযোগ পেলে আরো অনেক কিছুই করতে পারবে। সেই সুযোগ তারা কোন ক্ষেত্রে কতটুকু পাবে, সেটা হচ্ছে সময়ের প্রশ্ন।  

আমরা কি কল্পনাও করতে পারি কতগুলো বাধা অতিক্রম করে মেয়েদেরকে ক্রীড়াচর্চা করতে হয়? সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিধিনিষেধ ছাড়াও রয়েছে পিরিয়ডসহ নানান শারীরিক সীমাবদ্ধতা। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের মেয়েরা এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে আমাদের দ্বারা সবই সম্ভব। উপযুক্ত সুযোগ পেলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা পুরুষের থেকেও বেশি সাফল্য অর্জনে সক্ষম। 

দেখা যাচ্ছে— আজকাল মেয়েরা কিছুটা হলেও সুযোগ পাচ্ছে, সবকিছুর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের পদচারণার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এটা আশার কথা। তবে নারীদের প্রতি দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সার্বিকভাবে পরিবর্তন না হলে সবক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতিভার যথাযথ স্ফূরণ সম্ভব হবে না।

ফুটবলের ক্ষেত্রে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনা মেয়েদের দল দেশে ফিরে এসে উপযুক্ত সম্মান তো পায়ইনি, বরং নানান রকম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদেরকে। এখন প্রশ্ন উঠছে নারী ক্রিকেট দল কি পুরুষ দলের মতো সমান মানের সরকারি পুরস্কার বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাবে?

আমাদের পুরুষ ক্রিকেট দল বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয় অর্জন করলেও এই প্রথম দেশের জন্য বৈশ্বিক শিরোপা বয়ে এনেছে নারী দল যা ক্রীড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ পর্যন্ত অর্জিত সর্বোচ্চ বিজয়। নারীরা সব ক্ষেত্রে পুরুষের সমান সুবিধা পেলে তাদের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

এই বিজয় শুধু নারী ক্রিকেট দলের নয়, দেশের সমস্ত নারীদের, দেশের সমস্ত মানুষের। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছি দেশের আপামর জনগণ পথেঘাটে দোকানপাটের সামনে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে খেলাটি দেখেছেন। আশা করব এই অর্জন নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সহায়ক হবে। এই বিজয়ে দেশবাসী যে গৌরববোধ করছেন তা নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে তাদের জন্য প্রেরণায় পরিণত হোক, নারীর চলার পথ সহজতর হোক।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে সাঁতার কাটতে গেলে সুইমিং কস্টিউম পরতে হয়, ডাইভিং করতে হলে ডুবুরীর পোশাক পরতে হয়, দৌড়াতে গেলে আঁটসাঁট পোশাকের বিকল্প নেই। একজন নারী যখন অর্জনের পর্যায়ে চলে যায় তখন আমরা তার পোশাক আশাক নিয়ে আর কথা বলি না, কিন্তু সাধারণভাবে নারীর পোশাক এবং তার চলাফেরায় বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক প্রতিভা অংকুরিত হবারই সাহস পায় না, কুঁড়িতেই মরে যায়।

অনেকে মনে করেন— সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো অসংখ্য মেয়ের স্বপ্ন হারিয়ে যায় মেয়েদের ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এখনো কৈশোর পেরুনোর আগেই মেয়েদের বিয়ে হয়, বাচ্চা হয়। ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে সমাজ পাশে দাঁড়ায় না, নিজের মা-বাবাও মুখ ফিরিয়ে নেন। সহযোগিতার ভয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছেকে গলা টিপে নিজেরাই মেরে ফেলে তারা।

যারা তারপরও ঘুরে দাঁড়ায়, তাদেরকে স্রোতের বিপরীতে লড়তে হয় এক অসম লড়াই। অনেক মেয়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশে পড়াশোনা করতে যেতে পারে না, বহু মেয়ের শিল্প সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতা আঁতুড় ঘরেই মৃত্যুবরণ করে শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলেই। সেইসব মেয়ের কাছে এই বিজয় একটা আশার আলো হয়ে জ্বলবে, তাদেরকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে।

ক্রিকেটে আমাদের মেয়েদের সাফল্য আমাকে লোভী করে তুলেছে, আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েদেরকে এগিয়ে যেতে দেখতে চাই। একের পর এক দেশের মানুষের উল্লাসের ভিডিও ক্লিপ দেখছি আর চোখ ভিজে উঠছে বারবার। এরা আমাদেরই মেয়ে, এরা আমাদের আলোক বর্তিকা যাদের অনুসরণ করে আমার দেশের মেয়েরা আরো অনেক বেশি জেগে উঠবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব মেয়ে আমাকে প্রতিনিয়ত তাদের অসহায়ত্ব ও অক্ষমতার কথা বলেন, তাদেরকে বলতে চাই— লড়ে যাও মেয়েরা। অন্যান্য দেশের মেয়েরা যা করছে, আমরাও তা পারি। চেষ্টা করলে সবার সেরা হতে পারি সবকিছুতেই। চেষ্টা জারি রাখতে হবে। নারীমুক্তির পরিপন্থী শক্তিগুলোকে বলব নারীর পোশাক মাপার দিন শেষ হয়েছে, এবার তাদের প্রতিভা মাপুন। 

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে।
jes_chy@yahoo.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত জেসমিন চৌধুরী এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ