বিপুল পরিমাণ আম কি ধংস না করলে হতো না !

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

বিপুল পরিমাণ আম কি ধংস না করলে হতো না !

আদিত্য শাহীন ১০:৫৪ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৮

print
বিপুল পরিমাণ আম কি ধংস না করলে হতো না !

ফলের রাজা আমের জন্য এবার ‘অন ‌ইয়ার’। গবেষকরাই বের করেছেন আমের জন্য একবছর ‘অন ইয়ার’, আরেক বছর ‘অফ ইয়ার’। সারাদেশেই আম ফলেছে আশাব্যঞ্জক। সাধারণ ভোক্তা অবশ্য অফ ইয়ার অন ইয়ার বোঝে না। তারা বাজারে সরবরাহ প্রাচুর্য আর দাম বিবেচনায় বুঝে নেন এবার কেমন আম হয়েছে। এবার মে মাসের শুরুতেই একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি আম দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিচালিত ‍অভিযানের সময়। টেলিভিশন ক্যামেরার দক্ষতা ও তৎপরতায় আমের পাহাড় দেখার সুযোগ হচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্য আমপ্রিয় বাঙালির জন্য সুখকর নয়। ট্রাক ট্রাক বা টন টন আম ধংসের চিত্র দেখে কল্পনায় স্বাদ গ্রহণের বদলে আমাদের গা রি রি করে ওঠে। ভয় পেয়ে যাই, ভগ্যিস এসব আম আমরা খাইনি। খেলে হয়তো নির্ঘাৎ মৃত্যু হতো। মানুষের সংশয় প্রতিবছর গাণিতিকহারে বাড়ছে। টেলিভিশনের উৎকর্ষ আর সামাজিক যোগাযোগের লাগামহীন স্রোতে ভাসতে ভাসতে মানুষ সাহসী হয় না বরং ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে। যুগই এমন, মরতে মরতে বেঁচে যাই। বাঁচতে বাঁচতে মরে যাই। গত কয়েকদিন টেলিভিশনের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে দেখছি ধংস আমের ছবি। এসব ছবি পোস্ট করছেন ‘উৎসাহী জনতা’ থেকে শুরু করে অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট পর্যন্ত। ফেসবুকের পোস্ট তো অনেকটাই লাইক শেয়ারের কাঙাল হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে যেচে পড়ে মানুষের মতামত গ্রহণ ও সমর্থন আদায়ের বিষয়টিও থাকে। মানুষের মন্তব্য দেখে বুঝি বন্ধুকযুদ্ধে অপরাধী নিধন যেমন সবার কাছে স্বস্তিকর, একই রকম স্বস্তিকর বিষ মেশানো ‘ফলের রাজা’ ধংস করার অভিযান।

প্রশ্ন হলো, আসলে হাজার হাজার মণ আম বিষাক্ত ছিল? ওগুলো খেলে মানুষ কি সত্যিই মরে যেত? গবেষক, সম্প্রসারক ও প্রশাসনের নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী যেদিন আম পাড়ার কথা, তার চেয়ে আগেই পেড়ে তাতে রাইপেন হরমোন প্রয়োগ করা হয়। তার পরপরই আম পেকে যায়। সেগুলোই বাজোরজাত করা হয়। কিন্তু রাইপেন হরমোন বিষ কি বিষ নয়, এমন বিতর্ক অনেক আগেই নিরসন হয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নির্দিষ্ট সময়ে ফল বাজারজাতকরণের স্বার্থেই রাইপেন হরমোন প্রয়োগের রেওয়াজ রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফলের ক্ষেত্রে একচেটিয়া ফরমালিন প্রয়োগের অভিযোগ ছিল। তিন বছর আগে যখন এই অভিযোগ আর মানুষের সংশয় চরমে পৌঁছে তখন বিশেষজ্ঞ মহলের অনেক বক্তব্য ছিল, ফল পাকাতে যা প্রয়োগ করা হয়, তা রাইপেন হরমোন। নির্দিষ্ট মাত্রায় রাইপেন হরমোন প্রয়োগ ফলের জন্য যেমন ক্ষতিকর নয়, ক্ষতিকর নয় মানবস্বাস্থ্যের জন্যও।

তারপরও অপরিণত আমে রাইপেন হরমোন প্রয়োগের কারণে অনেক ধৈর্যহীন অসাধু ব্যবসায়ীর বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা হয়েছে। এটি সরকার প্রশাসনের ঘোষণা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে বড় ধরণের সতর্কবার্তা। আশা করি, এর মধ্য দিয়ে তাদের ধৈর্য্য বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু বারবারই মনে হচ্ছে, এই পরিমাণ আম কি কোনোভাবে রক্ষা করা যেত না? বছরব্যাপী পুষ্টিকর ফল চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদের সঙ্গে কথা বলেছি। জানতে চেয়েছি পরিপক্ক হওয়ার কিছু আগে যদি আমে রাইপেন হরমোন প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা বিষাক্ত হয়ে যায় কি-না? তিনি বলেন, বিষাক্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে তাতে আমের স্বাভাবিক স্বাদ আসবে না। আম পরিণত হলে প্রাকতিকভাবেই পেকে ওঠার জন্য হরমোন তৈরি হয়। আগে ভাগেই যদি হরমোন দিয়ে পাকানো হয়, তাহলে আমের স্বাভাবিক গুণাগুন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠিক, কিন্তু বিষাক্ত হয়ে যায় এমন কথা বলা যাবে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, আম এখন সারাদেশের ফল। কৃষকের স্বপ্ন ফসল। আগে আমের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিবর্তে ঐতিহ্যের যোগ অনেক বেশি ছিল। রাজশাহী চাপাইনবাবগঞ্জকেই আমের রাজধানী মেনে নিয়ে ভালো আমের জন্য নির্দিষ্ট মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করা হতো। গাছ পাকা আম পাড়া হতো, সেগুলোই বাজারে পাঠানো হতো। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে আম পেকে যেত। ভোক্তার হাতে পৌছতে পৌছতে আম পেকে যেমন যেত, অনেক সময় একটু বেশিও পেকে যেত। অনেক দোকানীর ঘরেই আম পচে নষ্ট হতো। তখন বিষয়গুলো গা সওয়া ছিল। সবার জন্যই ছিল বছরের ফল খেয়ে দেখবার বিষয়। এখনকার মতো এই আঠারো কোটি মানুষ আর সবার চাহিদা পুরণের মতো বাণিজ্যিক পরিমন্ডল ছিল না। এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতেই চাষী আম ফলান। গাছে মুকুল আসলে বা গুটি হলে বাগান বেচে দেন। ব্যবসায়ী নানা রকমের ঝুঁকি মাথায় রেখেই বাগান কিনে নেন। তারপর বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচর্যা করেন। মৌসুমে যখন আম বাজারে পাঠানো হয় তখনও মাত্রামতো রাইপেন হরমোন প্রয়োগ করা হয়। একসঙ্গে পাকানোর জন্যই এটি করা হয়।

রাসায়নিকের প্রশ্নে অনেকেরই কোনো জবাব নেই। বছর চারেক আগে দেশবাসী জেনেছে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ট্রাক ট্রাক আম ফরমালিনের অভিযোগে ধংস করা হয়। কিন্তু পরে তদন্তসাপেক্ষে আদালতই রায় দেন ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্রেই ঝামেলা ছিল বা যন্ত্রটি আদৌ ফলের ফরমালিন পরীক্ষার উপযোগী নন। প্রশ্ন হলো অাজও পর্যন্ত কি আমের মত ফলের ফরমালিন পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা হয়েছে? অন্যদিকে রাইপেন হরমোন প্রয়োগের বিষয়টি যে স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং বিশ্বব্যাপী অনুমোদিত সে ব্যাপারেও বিজ্ঞানীরা বহু আগেই একমত হয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ব বিভাগের প্রফেসর ও সর্ববৃহৎ জার্ম প্লাজম সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ড. আব্দুর রহিম বলছেন, অভিযানের মাধ্যমে ফল ধংসের কারণটি পরিস্কার নয়। গত চার বছর আগেই বিষয়টির মীমাংসা হয়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেছি। সেখানে সুস্পষ্টভাবেই রাইপেন হরমোন দিয়ে আম বা অন্য যেকোনো ফল পাকানোর বিষয়টি বিজ্ঞান অনুমোদন করছে এবং সেখানে স্বাস্থহানীকর কিছু নেই। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানের মাধ্যমে কৃষকের টমেটো ধংস করার তৎপরতার সময়ও বিষয়টি উঠে আসে। তখনও বিষয়টির শেষ নামে এভাবেই যে রাইপেন হরমোন ক্ষতিকর নয়।
যে পরিমাণ আম ধংস করা হয়েছে তা যে অভিযোগেই করা হোক না কেন ওই আম অনায়াসেই কাজে লাগানো যেত। আম জব্দ করে দেশের বিভিন্ন জুস ফ্যাক্টরিতে পাঠানো হতো, তাহলেও জাতীয় সম্পদের এই অপচয় দেখতে হতো না।

জানা গেছে, রাসায়নিকের দোষে দুষ্ট অভিযোগে আম ধংস করার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছেন চাষী। কারণ, যেসব ব্যবসায়ী আগেই চাষীর বাগান খরিদ করেছিলেন নামমাত্র বায়নার অর্থ দিয়ে তারা এখন চাষীর টাক‍া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ের একজন কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আম নিয়ে অভিযান দেখে মনে হয়, আমরা সবকিছুতেই শতভাগ বিশুদ্ধ হয়ে উঠেছি। কেবলমাত্র কৃষকের কিছু পণ্যই ভেজালের দোষে দুষ্ট রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যে বিষের প্রচারটি অনেক বেশি উৎসাহের সঙ্গে হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীব্যাপীই বিষমুক্ত খাদ্য উপাদান উৎপাদনের যেমন বাণিজ্যিক কাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে, একইভাবে কীটনাশকসহ নানা উপকরণ দিয়ে ফসল উৎপাদনের রেওয়াজও শেষ হয়ে যায়নি। এখনও সিংহভাগ ফসল উৎপাদনই হয় রাসায়নিক কীট, বালাই, আগাছা ও ছত্রাক নাশক দিয়ে। চুলচেরা বিবেচনা নিয়ে বাজারের সবজির মতো খাদ্যপণ্যে অভিযান চালানো হলে খাবার মতো কিছুই থাকবে না, সবই বাদ পড়ে যাবে।

আমরা উন্নয়নশীল দেশে পৌঁছতে যাচ্ছি। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষি সমৃদ্ধি সারাপৃথিবীতে এক দৃষ্টান্ত। ধান, ফল, সবজি, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃতিত্ব বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ নজির গড়েছে। এর পেছনে কৃষকের যেমন অবদান রয়েছে, অবদান রয়েছে বিজ্ঞানী, সম্প্রসারক থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের পর্যন্ত। এখন খেয়াল করার সময় এসেছে আমাদের কোন উদ্যোগ বা কোন প্রচারণার নেতিবাচক ফলাফল কতদূর পৌ‍ঁছে যেতে পারে। আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ আম ধংসের চিত্র যখন টেলিভিশনের প্রচারিত হয়,আর তা যখন ইউরোপ আমেরিকার দর্শক দেখেন, তখন আরা বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফেলেন। বাংলাদেশের মানুষ এত খারাপ! তারা আমের মতো ফলেও বিষ মেশায়? অথচ পৃথিবীর সব দেশই বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রশ্নে হরমোনের ব্যবহারকে এখন অপরিহার্য করেছেন। আমাদের সাফল্যের ইতিবাচক দিকগুলোর চর্চাটিই বেশি হওয়া দরকার। অন্যদিকে, কোনো উদ্যোগই যেন উৎপাদক শ্রেনীর বিপক্ষে না যায় সেদিকটাতেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

• আদিত্য শাহীন, লেখক ও সাংবাদিক।
ashaheenbd@gmail.com

 

 
মতান্তরে প্রকাশিত আদিত্য শাহীন এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ