যেভাবে বাংলাদেশের জন্যও লড়ছে মহারাষ্ট্রের কৃষকরা

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ | ৪ আষাঢ় ১৪২৫

যেভাবে বাংলাদেশের জন্যও লড়ছে মহারাষ্ট্রের কৃষকরা

আলতাফ পারভেজ ৬:০৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০১৮

print
যেভাবে বাংলাদেশের জন্যও লড়ছে মহারাষ্ট্রের কৃষকরা

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীতে মহারাষ্ট্রের কৃষকদের লংমার্চ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ সপ্তাহের এক বড় ঘটনা। লাল পতাকা হাতে রাজ্যের নাসিক থেকে মুম্বাই পর্যন্ত প্রায় দেড় শ’ কিলোমিটার দীর্ঘ এক পদযাত্রার মধ্যদিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক ভারতে কৃষকদের দুরবস্থার কথা সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিল।

ইতোমধ্যে এই পদযাত্রার পটভূমি নিয়ে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে ভারতজুড়ে এবং অন্যত্রও। এসব আলোচনায় যদিও সুদ মওকুফসহ কৃষকদের অনেক দাবির উল্লেখ করা হচ্ছেÑকিন্তু কৃষক-লংমার্চের বড় একটা দাবির বিষয় আড়ালেই থাকছে- তাহলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের অধিকার এবং নদীর পানিতে অববাহিকার মানুষের স্বাভাবিক অধিকারের প্রসঙ্গ।

মহারাষ্ট্রের কৃষকরা, যাদের মধ্যে অনেকেই আদিবাসী চাষী- স্পষ্ট করেই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্পেরও বিরোধিতা করছে। লংমার্চের উদ্যোক্তা সর্বভারতীয় কৃষাণসভার এটা একটা বড় দাবি।
উল্লেখ্য, আলোচ্য নদী সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্যও জরুরি এক জীবন-মরণ প্রশ্ন। মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের কেন ও বেতোয়া নদীর মাঝে একটি সংযোগ খাল তৈরি মাধ্যমে ২০১৪ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা-প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করেছিল।

২০১৬ সালে এইরূপ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে গোদাভারি ও কৃষ্ণা নদীকে পানি স্থানান্তরের জন্য সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া মূল প্রকল্পের আওতায় মহারাষ্ট্র ও গুজরাট জুড়ে ২০টি নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে মোদি সরকার-যার ৫টি ইতোমধ্যে অনুমোদিতও হয়ে গেছে। এর মধ্যে লংমার্চে আসা কৃষকদের মাঝে সবচেয়ে আলোচিত দুটি প্রকল্পের একটি হলো পার-তাপি-নর্মদা নদীর মাঝে সংযোগ খাল এবং অপরটি হলো পিঞ্জল ও ধমঙগঙ্গা নদীর মাঝে সংযোগ স্থাপন। মহারাষ্ট্র-গুজরাটের শেষোক্ত দুটি নদী সংযোগ প্রকল্প এবং উপরে উল্লিখিত কেন-বেতোয়া প্রকল্প হলো এমুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চলমান তিনটি নদী সংযোগ প্রকল্প।

যেসব নদীকে ঘিরে এসব প্রকল্প সবই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান নদীগুলোর শাখা নদী মাত্র। ফলে এসব নদী সংযোগ প্রকল্পের সঙ্গে চীন-ভারত-বাংলাদেশ-ভুটান-নেপাল-পাকিস্তানের ভাগ্যও কোন না কোনভাবে জড়িত। তবে ভাটির দেশ হিসেবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্বেগই বেশি।

আপাতত যে চারটি রাজ্যকে ঘিরে ভারতের উপরে আলোচিত তিনটি বৃহৎ নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে তার প্রত্যেকটিতে বিজেপি-আরএসএস পরিবার ক্ষমতায়। ফলে মোদির পক্ষে সহজে রাজ্য সরকারকে ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি রূপির এসব নির্মাণ প্রকল্প নেয়া সহজ হচ্ছে এবং তাতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও সমর্থন রয়েছে। কিন্তু কৃষকরা এসব নদী সংযোগ প্রকল্পবিরোধী। কারণ তাতে কৃষি সমাজের রুটিরুজির কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে বলেও মনে করেন তারা।

উল্লেখ্য, উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের মধ্যকার কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ খালটি হচ্ছে প্রায় ৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। যা শিগগির উদ্বোধন হবে। অন্যদিকে, গুজরাট-মহারাষ্ট্রের মধ্যকার পার-টাপি-নর্মদা প্রকল্পের খালের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩৯৫ কিলোমিটার। এই প্রকল্পে সাতটি ড্যাম নির্মাণ হবে। পিঞ্জল-ধমাঙগঙ্গা প্রকল্পে হবে আরও অনেকগুলো বড় বড় ড্যাম। স্বভাবত প্রত্যেক প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পার-টাপি-নর্মদা প্রকল্প পরিকল্পনার পর্যায়ে ২০০৪-৫ অর্থবছরে ব্যয় প্রাক্কালন করা হয়েছিল ৬ হাজার ১৬ কোটি রূপি।

পিঞ্জল-ধমাঙগঙ্গা প্রকল্পের পরিকল্পনাকালে ২০০২-০৩ সালে ব্যয়ের প্রাক্কালন করা হয় ১ হাজার ২৭৮ কোটি রূপি। কেন-বেতোয়া সংযোগে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ হাজার ৬৭৬ কোটি রূপি; এখন তা ১৮ হাজার কোটি রূপিতে পৌঁছেছে। সম্পূর্ণ নদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যয়ভার ইতোমধ্যে ১৭০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করছে। অনেকে এটাকে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবেও অভিহিত করছেন।

এরূপ প্রত্যেকটি প্রকল্পেরই মূল লক্ষ্য এক এলাকার পানি অন্য এলাকায় সরানো। যেমন গুজরটের ধমাঙগঙ্গা বেসিন থেকে পানি সরানো হবে মহারাষ্ট্রের পিঞ্জল জলাধারে। এটা করা হবে মুম্বাই শহরের পানি সরবরাহ বাড়াতে। আর এই পানির ক্ষতিপূরণ বাবদ মহারাষ্ট্রের পার-তাপি থেকে সম পরিমাণ পানি দেয়া হবে গুজরাটের নর্মদা নদীতে।

বলাবাহুল্য, চরম কৃত্রিম ও যান্ত্রিক ভাবনা থেকে প্রণীত এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা পর্যায়ে স্থানীয় কৃষকদের কোন অভিমতই নেয়া হয়নি এবং এরূপ পানিকৌশল বিদ্যা প্রকৃতিতে কীরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তাও বিবেচনা করা হয়েছে সামান্যই। যেমন মহারাষ্ট্রের পার নদীর পানি শিল্পবর্জ্যে চরম দূষিত। স্বভাবত এই পানি দূষিত করবে নর্মদাকে।

এরূপ দূষণ সেখানে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্ম দিবে বলে কৃষকরা বলছেন। কেবল তাই নয়, পার-তাপি-নর্মদা প্রকল্পের কারণে ৭৫টি আদিবাসী গ্রাম সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হবে। যার মধ্যদিয়ে ১৪ হাজার ট্রাইবালকে উদ্বাস্তু হতে হবে। মুম্বাইয়ের কৃষক-লংমার্চে আদিবাসী কৃষকরা যে দেড় শ’ কিলোমিটার পথ হেটে এসেছে তার পেছনে মূলত পূর্বপুরুষের বসতভিটা রক্ষার তাগিদ থেকেই। কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পেও ১০টি গ্রামের প্রায় ৮ হাজার ৫৫০ জন বাসিন্দা উচ্ছেদ হচ্ছে।

তবে মহারাষ্ট্রের কৃষকদের আন্দোলন একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থও দেখছে। কারণ আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পগুলোর কারণে ভিন্ন ধাঁচের বসতি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটবে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে নদী সংযোগ প্রকল্পের উত্তর-হিমালয় অংশের নদীগুলোতে (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ইত্যাদি) কৃত্রিম এসব খাল-সংযোগ এবং পানি প্রত্যাহার নদী-প্রবাহে চরম অস্বাভাবিকতার জন্ম দিতে বাধ্য। অনেকগুলো নদী সংযোগ প্রকল্প যখন বাস্তবায়ন হয়ে যাবে এসব নদীর বাংলাদেশ অংশে নিশ্চিতভাবেই তখন পানির প্রবাহও কমবে। যেমন, যমুনা ও গঙ্গার সঙ্গে যেহেতু কেন ও বেতোয়ার সংযোগ রয়েছে সেহেতু উজানে এই দুই নদীর তথাকথিত ‘উদ্বৃত্ত’ পানি ইচ্ছামতো প্রত্যাহার মানেই হলো ভাটির বাংলাদেশের মানুষের পানি প্রাপ্তি কমে যাওয়া।

উল্লেখ্য, ভারতে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে প্রথমে কাজ শুরু হয় ১৯৮২ থেকে। যে ধারণার উপর এইরূপ প্রকল্প চিন্তা গড়ে উঠেছিল তা হলো, ভারতে কিছু অববাহিকতায় ‘উদ্বৃত্ত পানি’ রয়েছে এবং সেখান থেকে পানি অভাবগ্রস্ত অববাহিকতায় নেয়া সম্ভব। এই চিন্তার সমর্থকরা বলছেন, এক অববাহিকার পানি অপর অববাহিকতায় নেয়া গেলে দেশটির ৩৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি নতুন করে সেচের আওতায় আসবে। ৩৪ হাজার হেক্টর নতুন বিদ্যুত উৎপাদন করা যাবে এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণও সহজ হবে।

কিন্তু ভারতীয় প্রকল্পচিন্তকরা একদম ভুলে যাচ্ছেন যে, যেসব অববাহিকতা থেকে তারা পানি প্রত্যাহারের চিন্তা করছেন সেগুলো আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকা এবং আন্তর্জাতিক নদীতে এক দেশের হিসাব থেকে ‘উদ্বৃত্ত পানি’ চিহ্নিত করা একটা অগ্রহণযোগ্য ধারণা। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এভাবে এক অববাহিকার পানি অন্য অববাহিকায় কোন এক দেশ তার ইচ্ছানুযায়ী স্থানান্তর প্রশ্নেও চরম বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের এ বিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনের যৌক্তিক কাঠামোটিই গড়ে উঠেছে পানির যেকোন উৎস ধারাকে অববাহিকার মানুষদের মাঝে ‘সমভাবে এবং যৌক্তিকভাবে’ বন্টনের ধারণার উপর।

যেমন, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার সম্মিলিত অববাহিকার বাংলাদেশ সীমান্তে রয়েছে ৭ ভাগ অঞ্চল, নেপালে ৯ ভাগ, ভুটানে ২ ভাগ, চীনে প্রায় ২০ ভাগ এবং ভারতে রয়েছে প্রায় ৫৮ ভাগ। স্বাভাবিকভাবে এই নদীগুলোর অববাহিকায় পানি প্রত্যাহার বা পানি নিয়ন্ত্রণমূলক যেকোন পরিকল্পনায় উপরোক্ত সব শরিকের মতামত, অংশীদারিত্ব ও সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কিন্তু ভারত ও চীন কখনোই তা করে না।

এদিকে ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্পগুলো তাদের দেশেই বিভিন্ন রাজ্যের মাঝেও বাড়তি বিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং এক রাজ্যের মানুষকে অপর রাজ্যের মানুষের বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছে। এইরূপ আন্তঃরাজ্য বিবাদ দেশটির শাসক শ্রেণীর জন্যও সুবিধাজনক হয়েছে।

মুম্বাইয়ে আসা মহারাষ্ট্রের কৃষকরা ঠিক এ অবস্থান থেকেই নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। তারা বলছে, এসব প্রকল্প কেবল যে তাদের রুটিরুজিতে আঘাত হেনেছে তাই নয়- বসতভিটা থেকেও তাদের উচ্ছেদ করছে এবং সর্বপরি একদেশের কৃষকদের মাঝেই পারস্পরিক বিরোধ তৈরি করছে।

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক।

 
মতান্তরে প্রকাশিত আলতাফ পারভেজ এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ