বিতর্কের মুখে ভারতীয় সেনাপ্রধান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫

বিতর্কের মুখে ভারতীয় সেনাপ্রধান

আফসান চৌধুরী ৬:৫২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

print
বিতর্কের মুখে ভারতীয় সেনাপ্রধান

ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের বাংলাদেশ ও আসাম প্রসঙ্গে একটি বক্তব্য নিয়ে বেশ সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভারতে তার বক্তব্য নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছে। সেনাপ্রধান সংবিধানের বাইরে গিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও ভারতের কোনো কোনো রাজনীতিবিদ অভিযোগ তুলেছেন।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভারতে এক আলোচনা সভায় বিপিন রাওয়াত অভিযোগ করেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের নতুন ছায়াযুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের তারা আসামে পাঠাচ্ছে। ওই রাজ্যে জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাতেই এটা করা হচ্ছে। আগে আসামের চার-পাঁচটি জেলা ছিল মুসলিমপ্রধান। এখন সেখানে মুসলমানদের আধিক্য আট-নয়টি জেলায়।

বিপিন রাওয়াতের এ অভিযোগের অর্থ হলো, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এতটাই দুর্বল ও অসহায় যে, তারা নিজেদের সীমানার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। আসাম প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সময় ভারতীয় সেনাপ্রধান বোধহয় বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন নেতাদের কথা ভেবে দেখেননি। বিপিন রাওয়াতের ওই বক্তব্য থেকে এটাও উঠে এসেছে, একটা সরকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল না হলেও শক্তিধর প্রতিবেশীর দিক থেকে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে।

অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিষয়টি আসামে একটি প্রধান ইস্যু। ওই রাজ্যের সরকার এখন জাতীয় নাগরিক রেজিস্টার তৈরি করছে, যাতে অবৈধভাবে বসবাসরতদের খুঁজে বের করা যায়। তাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। এ প্রসঙ্গে জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন, ‘আমাদের পশ্চিমা প্রতিবেশীর (পাকিস্তান) কারণে পরিকল্পিত অভিবাসন চলছে। তারা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে সবসময় চেষ্টা করবে এবং নিশ্চিত করবে যাতে এই অঞ্চলটি বেদখল হয়।’

বিপিন রাওয়াতের ওই বক্তব্য নিয়ে ভারতের কেউ কোনো কথা বলেনি। তাদের অভিযোগ উঠেছে জেনারেলের আরেকটি বক্তব্যে, যার কারণে দেশের ভেতরেই তিনি রাজনৈতিক বিরোধীতার মুখে পড়েছেন। একই আলোচনা সভায় রাওয়াত বলেন, ‘এআইইউডিএফ (অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফোরাম) নামে একটি দল রয়েছে। যদি এদের দিকে লক্ষ্য করেন, দেখবেন তারা খুব দ্রুত বিকশিত হয়েছে, বহু বছরেও বিজেপির যেটা হয়নি। এআইইউডিএফ আসামে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।’

সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সবাদী (সিপিএম), এআইইউডিএফ ও মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম)। ওই দলগুলো পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সেনাপ্রধান তার সাংবিধানিক পরিসরের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। এ ঘটনায় তারা প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপও চেয়েছে।

আসামের বদরুদ্দিন আজমলের মুসলিম সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক দল এআইইউডিএফ গঠিত হয় ২০০৫ সালে। লোকসভায় তাদের তিনজন এবং প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে ১৩ জন এমপি রয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে ওই বক্তব্য?

ভারতের উদ্বেগের জায়গা থেকেই হয়তো কথা বলেছেন সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত। ‘বাংলাদেশের মুসলিম অভিবাসী পাঠানো’ নিয়ে তার কথার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে ব্যাপারে তার ধারণা নেই। অথবা এটাও হতে পারে যে, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে বাংলাদেশকে একটা সিগন্যাল দিচ্ছেন তিনি। ওই বক্তব্যে যাই বোঝানো হোক না কেন একটি নিশ্চিত ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশ সমস্যার বাইরে নয়, সেটা ইচ্ছাতেই হোক বা তার অক্ষমতার জন্যই হোক।

চীনকে বাংলাদেশে শত্রু মনে করা হয় না, কিন্তু পাকিস্তানকে অবশ্যই করা হয়। আর রাওয়াতের অভিযোগ থেকে মনে হবে, বাংলাদেশ যেন তার শত্রুর সঙ্গে ঘুমাচ্ছে এবং নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা অক্ষম। এমন বার্তা হলে এর তীব্র প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন।

আসামের অভিবাসন ইস্যু

আওয়ামী লীগ যে ভারতের কৌশলগত সহযোগী সে বিষয়টি স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশের সবকিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ভারতের, যার মধ্যে রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের বিষয়টিও রয়েছে। ভারত নিশ্চিতভাবে বিএনপিপন্থী নয়, কিন্তু সমস্যা হলো জনগণের অধিকাংশের মনোভাব ভারতপন্থী নয়। তাই, আওয়ামী লীগের জন্য পথটা সংকীর্ণ। আর এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে ভারতীয়রা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য খুব একটা ভাল কিছু করছে না।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যে এটাও বোঝা গেছে, আসামের অভিবাসী ইস্যুটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সমস্যাটা এখনও যথেষ্ট প্রকট ও এর সঙ্গে সাধারণভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। ভয় হলো মুসলিম সম্প্রদায় একটি দল ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারে এবং যেটা নিয়ে বিজেপি উদ্বিগ্ন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সব জায়গায় একরকম নয়। এ বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে মুসলিম ও পাকিস্তানের ধর্মীয় পরিচয় এবং মুসলিম অভিবাসন বাড়ানোর পেছনে বাংলাদেশকে সহযোগী হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ইন্দো-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন আঞ্চলিক কৌশলগত জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত যদি মনে করে যে বাংলাদেশ তার নিজের দেখাশোনা করতে সক্ষম নয়, তাহলে কে সক্ষম?

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের তিনটি বিষয়
আওয়ামী লীগ সরকার হয়তো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সামরিক-কৌশলগত অবস্থানের বিরোধী। তবে বাস্তবে সেটা বাস্তবায়নের মতো সক্ষমতা বা ইচ্ছা তাদের নেই। সেজন্যে যে কারণেই হোক, বাংলাদেশ সিনো-পাকিস্তান অক্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। আরেকটি কারণ হতে পারে, আসাম ভারতের জন্য খুবই মারাত্মক একটি সমস্যা, যা মুসলিম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্যই এটা একটা নিরাপত্তা সমস্যাও বটে, যেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা রয়েছে। আরেকটি হচ্ছে, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হতে পারে না। আঞ্চলিক রাজনীতি এখন ‘এটা না হলে ওটা’র পর্যায়ে চলে গেছে। এই আঞ্চলিক পক্ষপাতহীনতা এখন আর কোনো লক্ষ্য হতে পারে না।

কৌতুহলের ব্যাপার হলো, ভাতীয় সেনাপ্রধান এমন সময় এই বক্তৃতা দিলেন, যখন ভারতের একাধিক সাংবাদিক নেতা আওয়ামী লীগপন্থী মিডিয়াগুলোর সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক করছে। তারা ভারত সম্পর্কে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ বিবৃতি ও মনোভাব ব্যক্ত করছে। সিনো-পাক ছায়াযুদ্ধে বাংলাদেশকে একেবারে অসহায় হিসেবে তুলে ধরেছেন রাওয়াত, যাতে করে বাংলাদেশকে এতটা দুর্বল মনে হয় যে তার এখনই ভারতের সাহায্য প্রয়োজন।

তাই সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে বলা যায়, বিপর্যস্ত মিয়ানমার নীতির কারণে ঘুরপাক খাওয়ার পর রাওয়াত এখন স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের ভারত নীতিও খুব একটা ভালো করছে না। তার বক্তব্য এমনটাই ইঙ্গিত করছে।

আফসান চৌধুরী : গবেষক ও সাংবাদিক
afsan.c@gmail.com

 

 
মতান্তরে প্রকাশিত আফসান চৌধুরী এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ