কোটা সংস্কার: সময়ের যৌক্তিক দাবি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫

কোটা সংস্কার: সময়ের যৌক্তিক দাবি

গোলাম মোর্তোজা ৫:১৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

print
কোটা সংস্কার: সময়ের যৌক্তিক দাবি

কোটা পদ্ধতি সংস্কারের আন্দোলন, বাতিলের নয়-যার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে লিখছি। কোনো ভনিতা বা আকার- ইঙ্গিত নয়, সরাসরি কিছু কথা বলার চেষ্টা করব। জানি ঝুঁকি আছে। শুধু কোটার ক্ষেত্রে নয়, স্বাধীন মত প্রকাশ, সত্য ও নায্য কথা বলা- লেখার ঝুঁকি সব সময়ই ছিল। বর্তমানে যা তীব্র রূপ নিয়েছে। কোটা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলতে গেলেই, মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসবে।

’জামায়াত- রাজাকার- পাকিস্তানপ্রেমী’ উপাধী পেতে হবে।এসব উপাধী যারা দেয়, তারা মূলত অনৈতিক সুবিধাভোগি। যুক্তি দিতে না পেরে, বিষোদগার করে। যাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। ফলে তাদেরকে গুরুত্ব বা বিবেচনায় না নিয়ে, প্রকৃত সত্যটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

১.
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল পাকিস্তানিদের গালি দিয়ে নয়,যৌক্তিক দাবির ভিত্তিতে। একথা সমান সত্য যে, আবেগ যুক্তির চেয়ে কম ছিল না।তার চেয়েও বড় সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে মিথ্যা বা অসত্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না, নেই।মুক্তিযুদ্ধের পুরো ভিত্তিটাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার- সত্য বলার অধিকার।সকল রকমের অন্যায়- অনৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- প্রতিরোধ করার অধিকার। জীবন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এদেশ স্বাধীন করেছেন। মা- বোনের সম্মান হারিয়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ।

মুক্তিযোদ্ধারা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ্য সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণবাসন ছিল সময়ের সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি। সেই কাজটি বঙ্গবন্ধু সরকার করেছিলেন ১৯৭২ সালে।মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে চাকরিতে ঢোকার বয়স ৩২ বছর এবং ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করেছিলেন। যা ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।কিন্তু দূর্ভাগ্য বাংলাদেশের, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটা বাংলাদেশের কোনো সরকার ঠিক মত বা যোগ্যতার সঙ্গে করতে পারেনি।

১৯৭৫ সালের আগে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে সমস্যা এতটা প্রবল ছিল না। ১৯৭৫ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে জটিলতা শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটা অংশ ‘সার্টিফিকেটের জন্য বা কোনো কিছু পাওয়ার জন্যে মুক্তিযুদ্ধ করিনি’ এই যুক্তিতে তালিকার বাইরে থেকেছেন স্বেচ্ছায়। অনেকে অভিমান করে নাম লেখাননি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্নীতি- অনৈতিকতা, মুক্তিযোদ্ধাদের অভিমান তৈরির পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। জাসদ গঠন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারাই। জাসদের গণবাহিনি আর বঙ্গবন্ধুর রক্ষীবাহিনির একে অপরকে প্রতিরোধ বা নির্মূলের স্বশস্র যুদ্ধও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পুরণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর মোশতাক- জিয়াউর রহমান- সাত্তার- এরশাদ- খালেদা জিয়ার সময়কালে বঙ্গবন্ধুর খুনি, স্বাধীনতা বিরোধি রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা নিয়ে বারবার উদ্যোগ নেয়া হয়।উদ্দেশ্য সৎ না হওয়ায়, কখনও তা সফল হয় নি। প্রতিটি তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটা অংশ বাইরে থেকে যায়।

অমুক্তিযোদ্ধা বা বিরোধিদের অনেকে তালিকায় ঢুকে যায়। বর্তমান সরকারের সময়ে এসে আবার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার কাজ শুরু হলো, সেটা নিয়েও নৈরাজ্য অব্যাহতই থাকল। ১৯৭১ সালে বয়স কয় বছর থাকলে মুক্তিযোদ্ধা, এমন অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করা হলো।প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা নয়,অমুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে ঢুকে গেল সেই তালিকায়। কাজ হলো খুবই অযোগ্যতার সঙ্গে।

২.
একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ঠিক থাকল না। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের পরে ৩২ বছর বয়সজনিত কারণে মুক্তিযুদ্ধ কোটায় প্রার্থী সংকট দেখা দিতে থাকে।১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিপরীতে প্রার্থী পাওয়া যায় মাত্র ১ থেকে ৭ শতাংশ। ১৯৯৭  সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বংশদ্ভূত সদস্য মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধাভোগি হবেন, নীতি কার্যকর করা হয়।তখন থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, সন্তানদের সন্তানরা এই কোটা সুবিধা পাচ্ছেন। এখনও পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক পদ শুন্য থেকে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে এক ধরণের জনমত তৈরি হয়েছে। আন্দোলনও হচ্ছে। যদিও আন্দোলন শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়েই নয়।

বাংলাদেশে এখন কোটার ধরণটা এমন, মুক্তিযোদ্ধা ৩০ , জেলা ১০, নারী ১০, উপজাতি ৫,প্রতিবন্ধি ১ শতাংশ। অর্থাৎ মোট কোটা ৫৬ শতাংশ, ১০০ জনের মধ্যে ৫৬ জন চাকরি পাচ্ছেন কোটায় ।যারা দেশের মোট জনসংখ্যার খুব সামান্য অংশ। বাকি ৪৪ শতাংশ চাকরির জন্যে প্রতিযোগিতা করছেন, প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার সব চাকুরি প্রার্থী। যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে বৈশম্য সৃষ্টি না করার কথা বলেছে। তবে সংবিধান একথাও বলেছে,রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া যাবে।

৩.
সেই অনুযায়ী কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি তুলে দেয়া যাবে না। কোটা পদ্ধতি থাকতে হবে। তবে তা ৫৬ শতাংশ নয়। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে। রণাঙ্গনে যে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন, সাধারন মানুষ তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। রাজাকার এবং পাকিস্তানিরা আশ্রয়দাতাদের ঘর- বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল, হত্যা করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা সাধারণ মানুষ, একাত্তরের জনযোদ্ধা। তাদের অবদান ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এক অর্থে অল্প কিছু সংখ্যক রাজাকার ছাড়া ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সব মানুষই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তালিকায় তাদের নাম নেই বলে, তাদের সন্তানরা সারাজীবন বঞ্চিত থেকে যাবেন আর রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং সার্টিফিকেটের জোরে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সুবিধা পাবেন- এমন নীতি স্বাধীন দেশে আর চলতে পারে না।

এখন আর জেলা কোটার প্রয়োজন নেই। কমিয়ে আনতে হবে নারী কোটাও। উপজাতি কোটা রাখা দরকার, আরও কমিয়ে। 

কোটা বিষয়টি যত সহজভাবে বলছি, মোটেই তেমন নয়। ড. আকবর আলী খান গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, সরকারি চাকরিতে  ২৫৭ রকমের কোটা বিদ্যমান।পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত জটিল। যা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে চাকরির ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে প্রয়োগও করা যায় না।

সামগ্রিকভাবে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করাটা সময়ের সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি।সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কোটা থাকতে পারে। মেধা ভিত্তিক দেশ গঠনের জন্যে যা অপরিহার্য ।

৪.
যেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সবচেয়ে বেশি, সংস্কার বা কমানোর প্রসঙ্গ আসলেই মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ চলে আসে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে যখন যুক্তি দুর্বল হয়ে গেছে, রাজাকার- জামায়াত তত্ত্ব সামনে আনা হচ্ছে।

কোটা সংস্কার নিয়ে যারা আন্দোলন করছে, তারা জামায়াত- রাজাকার, তত্ত্ব হিসেবে যা একেবারে অচল। এদের মধ্যে শিবির থাকতেই পারে, অস্বীকার করা যাবে না। সবাইকে জামায়াত- বানিয়ে দেয়াটাও চরম বোকামিপূর্ণ আচরণ। যৌক্তিক আন্দোলন বা দাবির বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার সংবেদনশীলতার সঙ্গে। অহেতুক অসত্য রাজনৈতিক রঙ দেয়াটা কাম্য নয়।

গোলাম মোর্তোজা: সম্পাদক, সাপ্তাহিক। 
s.mortoza@gmail. com

 
মতান্তরে প্রকাশিত গোলাম মোর্তোজা এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ