একি বললেন ভারতের প্রধান সেনাপতি!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫

একি বললেন ভারতের প্রধান সেনাপতি!

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী  ৫:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮

print
একি বললেন ভারতের প্রধান সেনাপতি!

দুর্ভোগ বাংলাদেশের পেছন ছাড়ছে না। ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বার্মা বিতাড়িত করে বাংলাদেশের ভূমিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। গত তিন দশকব্যাপী বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার মাঝে রয়েছে। বার্মা এমন এক দেশ তার সাথে আলোচনা করে সমস্যাটার কোন সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ বার্মার আলাপ-আলোচনায় কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্জিত তাদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ খুবই কঠিন ব্যাপার। 

গত তিন মাস ধরে আসামে জনগননা চলছে তাতে নাকি বহু বাঙালী বাংলাদেশ থেকে গিয়ে অনুপ্রবেশ করে বসতি স্থাপন করেছে তাদেরকেও সংখ্যাপ্রকাশ করেছে ৩০ লক্ষ। রোহিঙ্গা ১০ লক্ষ আর আসাম থেকে যদি আসে ৩০ লক্ষ তবে বাংলাদেশের অবস্থাটা হবে কি? 

ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বিপিন রেওয়াত অভিযোগ করেছেন চীনের সহায়তায় পাকিস্তান ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশী মুসলমানকে ঠেলে পাঠাচ্ছে। এ এক অভিনব অভিযোগ। পাকিস্তান চীনের সহায়তা ভারতের উত্তরাঞ্চলে অর্থাৎ আসামে ঠেলে পাঠাবার জন্য বাঙালি পাবে কোথায়? বাংলাদেশের মাটিতে কোন পাকিস্তানি নেই। কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও জোরদার নয়।

ভারতের জেনারেলেরা সাধারণত কোন রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করেন না। হঠাৎ করে জেনারেল বিপিন রেওয়াত অনুরূপ বক্তব্য নিয়ে হাজির হলেন কেন? ভারতের শান্তশিষ্ঠ পরিবেশে গণতন্ত্রের চর্চা হয়ে আসছিলো। কিন্তু গত ২০১৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর মোদি কংগ্রেস হঠাও স্লোগান তুলেছে। এ স্লোগান কার্যকর করতে গিয়ে ছোট ছোট রাজ্যে পর্যন্ত বিধানসভার নির্বাচনে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করছে। তাদের টাকা খরচের সামনে অন্যদলগুলো দাঁড়ানো মুশকিল হয়েছে। ৩০ লক্ষ লোক অধ্যুষিত ত্রিপূরা রাজ্যে নাকি বিজেপি ১৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে।

নরেন্দ্র মোদির সরকার এরই মাঝে ভারতের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ভুলুণ্ঠিত করে দিয়েছে এবং বিপিন রেওয়াতেকে রাজনীতিতে টেনে এনে সামরিক বাহিনীর বৈশিষ্ট্যও মনে হয় কলুষিত করে দেবেন। বিপিন রেওয়াত বলেছেন আসামে মুসলিম অনুপ্রবেশের ফলে বদরুদ্দীন আজমলের অল-ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এর অবস্থা নাকি বাড়ন্ত এমন কি বিজেপির চেয়েও অনেক ভাল। আর তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন এ বাড়বাড়ন্ত হওয়ার কোন পাকিস্তান চীনের চীনের সাহায্যে বাঙালী মুসলমান অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। 

বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের দূরত্ব ১২ মাইল। পাকিস্তান বাঙালী পাবে কোথায়! জেনারেল বিপিন রেওয়াত বলেছেন বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ার কারণে নাকি বাংলাদেশে লোক সংখ্যা থাকার স্থান সংকুলান হচ্ছে না তাই চীন এবং পাকিস্তান আসামের জন-বিন্যাস বদলানোর জন্য বাঙালি মুসলমান অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে, পূর্বেও হাজার হাজার বাঙালি আসামে ছিলো, মূলত: আসাম আবাদ করেছে বাঙালিরা। 

ভারত সরকার নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্বে যারা আসামে বসবাস করেছে তারা আসামী হিসেবে গণ্য হবে। আসামের জীবনমান বাংলাদেশের চেয়ে নিচে। সেখানে বাংলাদেশী যাবে কেন? ৫৬ হাজার বর্গ মাইলে ১৬/১৭ কোটি লোকের বাস এখনও বাংলাদেশে গুজরাটের মতো অন্ধ্রপ্রদেশের মতো বা মহারাষ্ট্রের মতো কোনো কৃষক গলায় ফাঁস দিয়ে মরে না। 

গত নির্বাচনে আসামে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। গত তিনমাস ধরে তারা জনগণনা আরম্ভ করেছে। বিজেপি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে। আর এ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে নিঃসক্রান্ত করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ গত ৯ বছরে এক ছটাক অস্ত্র প্রবেশ করতে দেয়নি। সাত রাজ্যেই স্বাধীনতা সংগ্রামী বিচ্ছিন্নতাবাদীর আন্দোলন করছিলো। বাংলাদেশ যদি অস্ত্র যাওয়া বন্ধ না করতো তবে সাত রাজ্য স্বাধীন হওয়ার ধারপ্রান্তে পৌঁছে যেত। 

আমাদের এক বড় দলের নেত্রী বলেও ছিলেন তারা স্বাধীনতা সংগ্রামী তাদেরকে সাহায্য করা উচিৎ। আমরা এ পর্যন্ত যতটুকু জেনেছি জনগণনায় কোনো বাঙালীর নাম আসেনি হঠাৎ করে ত্রিশ লক্ষ্যের কথা এল কেন বুঝলাম না। আসামে মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৪ লক্ষ্য তার মাঝে ১ কোটি চার লক্ষ মুসলমান। তারা প্রায় ৯টি জেলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। 

আমরা পশ্চিম বাংলার অনেক বুদ্ধিজীবীর লেখায় পড়েছি আসামের নয় জেলা আর পশ্চিম বাংলার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ মিলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আরেক রাজ্য চায় কি না তাই নিয়ে তাদের লেখা দেখেছি। 

বাংলাদেশ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। এসব বড় বিষয়ে মাথা দেয়ার অবকাশ নেই। আসামের বদরুদ্দীন আজমলের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট আর অন্ধ্রের অল-ইন্ডিয়া ইত্তেহাদুল মুসলিমিন ছাড়া মুসলমানদের আর কোনো সংগঠন নেই। জামিয়তে ওলামায়ে হিন্দ প্রায় মৃত্যু অবস্থা। আর মাঝে মাঝে কংগ্রেসের লেজুড়বৃত্তি করে। 

ভারতের মুসলমানেরাও গত ৭০ বছরব্যাপী মুসলমান নিহত হয়েছে। আরএসএস ২০ কোটি মুসলমানের অস্থিত্ব সহ্য করে না। তারা চায় ২০ কোটি মুসলমানকে হিন্দু বানাতে তাই তারা ঘরওয়াপসির ডাক দিয়েছে অর্থাৎ ঘরে ফিরে এসো। এ ডাক চলছে প্রায় ১০০ বছর ধরে। আরএসএস -এর আগে জয়ানন্দ সরস্বতী, শ্রদ্ধানন্দ স্বরস্বতী, বাল গঙ্গাধর তিলক এরাও তো কম চেষ্টা করেনি। যা সম্ভব নয় তা নিয়ে উৎপাত সৃষ্টি করলে জাতীয় অগ্রগতিই ব্যহত হয়। এখন প্রকৃত হিসাবে ৪৩% শতাংশ ভারতীয় দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। 

আমরা একটা  বিষয় লক্ষ করেছি যে, বাংলাদেশ চীন থেকে দুইটা সাবমেরিন কেনার পর থেকে ভারত বাংলাদেশ আরেকটা পাকিস্তান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা অনুরূপ একটা ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। আমেরিকা কেরেবিয়ানের ছোট রাষ্ট্রগুলোর প্রতি যে আচরণ করে থাকে ভারতও তার পাশ্ববর্তী দেশগুলোর প্রতি ঠিক অনুরূপ আচরণ করে।

ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল বিশ্বে একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। নেপাল স্থলভূমি দ্বারা আবদ্ধ দেশ। দেশটাকে দুই দুইবার অবরুদ্ধ করে ভাতে-পানিতে যথেষ্ট কষ্ট দিয়েছে এখন তারা চীনের উপর দিয়ে বিকল্প রাস্তা তৈরী করেছে। গত নির্বাচনে কমিউনিস্টরা জিতে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী ওলি ভারত বিরোধী লোক। শ্রীলংকাও প্রায় ভারতের হাতছাড়া। 

বাংলাদেশ একমাত্র বন্ধু যারা এখনও ভারতের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে। কিছুদিনের মাঝে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। সরকারী দল বিরোধী দল সংকটে আছে। শুনেছি বিএনপিকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গিলে ফেলেছে। সম্ভবতো কোনো ফায়দালুটার জন্য ভারত ৩০ লক্ষ বাঙালী আসামে আছে অনূরূপ ধুয়ো তুলেছে কোন রাজনৈতিক পায়দা লুঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। 

অন্যদিকে এটাও হতে পারে নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করার পথ খোলা রাখা। পাকিস্তান, চীনের সমর্থনে, ছায়া যুদ্ধে বাংলাদেশীদের আসামে 'অনুপ্রবেশ' ঘটাচ্ছে বলে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের সমর্থন লাভ করার নীলনকশাও হতে পারে ভারতীয় সেনা প্রধানের বক্তব্য। 

বাংলাদেশ সাবধান।

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী  এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ