একুশ : প্রেম ও দ্রোহের অগ্নিশিখা

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ | ৯ আষাঢ় ১৪২৫

একুশ : প্রেম ও দ্রোহের অগ্নিশিখা

ড. আজহার শাহিন ৬:৪০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮

print
একুশ : প্রেম ও দ্রোহের অগ্নিশিখা

হাজার বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ছিন্নভিন্ন আর লুণ্ঠিত এক জনগোষ্ঠীর মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে জেগে উঠেছিল একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিনদশকের মধ্যেই একটি তরুণ শিক্ষিত প্রজন্মের অন্তরে ভাষাকে কেন্দ্র করে জন্ম নেয়া জাতীয়তার চেতনা ছিল বাঙালির জীবনে অগ্নিশিখার মতো আঁধার বিদীর্ণকারী নব উত্থিত সত্তার নাম, মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ও প্রেরণার নাম যা জাগ্রত করেছিল ঘুমিয়ে থাকা সত্তাকে, গ্রথিত করেছিল বিচ্ছিন্নকে। বাঙালির এই নতুন জাগরণ ছিল এক অভূতপূর্ব বিস্ময়। মধ্যযুগীয় চিন্তা আর জীবনদৃষ্টিকে অস্বীকার করে একুশের চেতনা আমাদের জাতিসত্তার নতুন গৌরব ঘোষণা করে।

ফলে, বায়ান্নর উদ্দীপ্ত প্রহরে শহিদ সালাম-রফিক-জব্বার-আবুল বরকত- বিষণ্ন রক্তকরবীর মতো এই নামগুলো আমাদের জানায়, এঁরা ছিল আমাদের স্বজন; এই তরুণেরা ছিল এই পলিমাটির সন্তান। এদেশের কাদা-মাটি-জলের ভালোবাসা গায়ে মেখেই ওরা বেড়ে উঠেছিল; ওরা ভালোবেসেছিল এদেশের দিগন্ত-বিস্তারী নদীকে- নদীতে ভেসে থাকা ছেঁড়াপাল নৌকোকে; রূপালি ইলিশ, ফসলের মাঠ আকাশের নীলকে- মুক্ত পাখিকে; আর পাখির গানের মতো শ্রবণসুখকর ভাষা বাংলাকে। তাই যেদিন ঘাতক বুলেট বিদীর্ণ করল তাদের সুগঠিত করোটি, কোমল হৃদপি- অশ্রুধারার মতো শোনিতের সেই প্রবাহকে পরম মমতায় গ্রহণ করেছিল বাংলার কোমল মাটি। রক্তের প্রতিটি কণা সেদিন বৃক্ষের বীজের মতো উপ্ত হয়েছিল এই জমিনে।

এই বীজ চিন্তার- দেশ কী, রাষ্ট্র কী? সংস্কৃতি কী, কী ঠিকানা আমার? এই বীজ স্বাধীনতার।

অনেকগুলো প্রশ্নের অসংখ্য উত্তর আমরা অনুসন্ধান করতে আরম্ভ করলাম। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তাই কেবল একটি দাবি আদায়ের আন্দোলন হয়েই থাকেনি- ব্যক্তি ও জাতিসত্তা সন্ধানের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।

০২.
উনিশ শ সাতচল্লিশের আগস্ট মাস- পূর্ব ও পশ্চিম নিয়ে তৈরি হল নতুন রাষ্ট্র। শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান তখনো অন্তরে লালন করছে শিখা গোষ্ঠীর আলো কিংবা রুশ বিপ্লবের মর্মবাণী- না-হলে তার দ্রোহের উচ্চারণ এমন তীব্র ও বীরদর্পী হলো কী করে? দ্বিজাতি তত্ত্বের খোলসের আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যখন মধ্যযুগীয় সামন্তরাষ্ট্র তৈরির আকাক্সক্ষায় বিপুলভাবে ব্যস্ত, আমরা তখন তৈরি করলাম একটি দেশ। বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। সব স্বপ্ন বাস্তব হয় না, কোনো-কোনো স্বপ্ন বাস্তবকেও ছাড়িয়ে যায়। আমাদের রক্ত¯œাত সে-স্বপ্নের নাম বাংলা- যার এক নাম দেশ, অপর নাম ভাষা।

লক্ষ বছরের মানবযাত্রার ইতিহাসে মানুষের সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার সম্ভবত ভাষা। বাংলা নিশ্চয়ই পৃথিবীর সুন্দরতম ভাষা। এই ভাষা আমরা শিখেছি মায়ের মুখ আর ভাইয়ের প্রমত্ত বুক থেকে। বুকের ব্যাকুলতাকে প্রকাশ করার জন্য এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর হতে পারে না। বাংলা ভাষার ধ্বনিগুচ্ছকে আচ্ছন্ন করে আছে চর্যার বুনো ফুলের ঘ্রাণ, যমুনার কলতান। এর তীরে কোন রাখালের মোহন করা বাঁশির সুর যে-ধ্বনির নামে শ্রবণেন্দ্রিয়কে পরিতৃপ্ত করে তার নাম বাংলা। এর বর্ণমালা ধারণ করে আছে সভ্যতার ইতিহাস। এর ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে সহজিয়া বৌদ্ধের গোপন কাহিনি- পলাতক জীবন, ফকির বিদ্রোহের সাহস, ভিক্টোরিয়া পার্কে লাশ হয়ে ঝুলে থাকা বীরত্ব। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অগ্নি-উপাখ্যান ধারণ করে আছে আমার ভাষা। একই সুতোয় গ্রথিত হতেই হয়ত একগুচ্ছ তাজাপ্রাণ বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে আলোর শিখার মতো জ্বলে উঠল ঢাকার রাজপথে।

এই শিখা অনির্বাণ।

কতকিছুইতো জ্বলে আর নেভে-ঝরে যায় কত স্বপ্নসাধ ধুলো আর কাদায়। অথচ, যে-শিখা জ্বলে উঠেছিল বিশ শতকের মধ্য লগ্নে তার আলোয় পথ দেখেছি কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যতের নয়, অতীতের অন্ধকারেও। জেনেছি, কালের গহ্বরে লুকিয়ে থাকা জাতির ইতিহাস, সত্তার গভীরে বয়ে চলা আবেগের ঝর্ণাধারা।

০৩.
ফেব্রুয়ারি বার বার ফিরে আসে। আমরা প্রভাতফেরির পুষ্পাঞ্জলিতে রচনা করি স্বজনহারানো শোকের প্রগাঢ় বেদনা; কালো কাপড়ের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলি জাগরণের ইতিহাস। যে-শহিদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে প্রদীপ্ত সময়ের স্মারক হয়ে তার বেদিতে প্রাণের আকুতি, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার অঞ্জলি রেখে আসি হয়ত নির্দিষ্ট কোনো প্রহরে। অথচ, শহিদ মিনার- বিষন্ন মায়ের পাশে মাথাউঁচু সন্তানেরা- অনুক্ষণ শোনায় মাতৃভাষার প্রতি পরম মমতা, সর্বস্বত্যাগী দেশপ্রেম আর অন্যায় ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে দ্রোহের জয়গান।

ড. আজহার শাহিন : শিক্ষক, গবেষক।
azharshaheen76@gmail.com 

 
.




আলোচিত সংবাদ