বাঙালির ‘ইংরেজি চর্চা’র বিভ্রাট!

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ | ৯ আষাঢ় ১৪২৫

বাঙালির ‘ইংরেজি চর্চা’র বিভ্রাট!

চিররঞ্জন সরকার ৪:২৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮

print
বাঙালির ‘ইংরেজি চর্চা’র বিভ্রাট!

আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা বিষয়টি জানলেও তেমন ভাবে মানিনি। আমাদের ছোটকালে ইংরেজি-জানা মানুষের ছিল ভয়ানক আকাল। তাইতো নিজের মত করে ইংরেজি চর্চা করতে গিয়ে আমাদের নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। ইংরেজি নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ইংরেজি বানান উচ্চারণ এক সময় আমাদের কাছে সীমাহীন ভীতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। সি ইউ টি কাট (Cut), বি ইউ টি বাট (But) কিন্তু পি ইউ টি (Put) পাট না হয়ে পুট! এটা আমাদের জন্য খুবই গোলমেলে!

আমার এক বন্ধু একবার ‘মানি (money)’ বানান munny লেখায় উত্তমমধ্যম খেয়েছিলেন।  এরপর সে ইংরেজি বানানের ক্ষেত্রে ‘সৃজনশীল’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। সে শব্দের উচ্চারণ বদলে দেয় যেন সেই বানান মনে থাকে। ‘মানি’কে সে বলত ‘মনি’। ‘ডিজেল’কে বলত ডাইসেল (Diesel), ‘এজুকেশন’কে বলত এডুকেটিওন (education), ‘কালার’কে বলত কোলআওয়ার (colour),‘কোরাপশন’কে কোররাপটিওন (corruption), ‘ফলস’কে বলতে থাকলো ফলসে (False), ইত্যাদি। আমাদের স্কুলজীবনে স্যাররাও নানাভাবে চেষ্টা করতেন ইংরেজি বানান ও মানে শেখাতে। যেমন স্কুলে ইংরেজির স্যার গুপ্তহত্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Assassination মনে রাখার সহজ উপায় বলেছিলেন: গাধা-গাধা-আমি-জাতি। Lieutenant শব্দের উচ্চারণ লেফট্যান্যান্ট বানান মনে রাখার সহজ উপায় বলেছিলেন : মিথ্যা-তুমি-দশ-পিপড়া। শিখিয়েছিলেন: ‘a quick brown fox jumps over the lazy dog’ -বাক্যটিতে ইংরেজি ২৬টি অক্ষর আছে।

যদিও আমরা স্যারদের কথা খুব একটা গায়ে মাখতাম না। আমরা চলতাম আমাদের নিয়মে। যতটা ফাঁকিবাজি করা যায়, তার পুরোটাই করতাম। এর ফলও পেতাম হাতেনাতে। একবার আমাদের ক্লাসের একজন ‘আমার বাবার একটি গরু ছিল’-এর ট্রানস্লেশন করেছিল: ‘মাই ফাদার ওয়াজ এ কাউ!’ আমাদের সময়ে কেউ-ই তেমন একটা ইংরেজি জানত না। তবে অনেকেই ইংরেজি চর্চার চেষ্টা করত। আমাদের এক বন্ধু কথায় কথায় ইংরেজি বলত। একবার জন্মদিনে তাকে আমরা ধরলাম, এই খাওয়াবি না? সে তাঁর বিখ্যাত ইংরেজি ভাষায় বললেন, ‘ওকে ওকে, আই উইল ইট ইউ।’ একদিন তার বাসায় গেছি। সে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। ঘরে প্রবেশের পর অনুরোধ জানায়, প্লিজ, বার্ন দ্য লাইট, রাউন্ড দ্য ফ্যান।’ যার অর্থ—অনুগ্রহ করে লাইট জ্বালাও, ফ্যান ছাড়ো। তো একবার ক্লাসে স্যার তাকে ট্রানস্লেশন করতে বলেছিলেন, ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগিটি মারা গিয়াছিল। উত্তরে সে বলেছিল, দি ডক্টর কামস বিফোর দি পেশেন্ট হ্যাড ডাই।এই ইংরেজি শোনার পর স্যার তাকে যার পর নাই অপমান করেছিলেন। ক্লাস শেষ হবার পর সে রাগে ফুলতে থাকে! সব রাগ গিয়ে পড়ে ঐ ডাক্তারের ওপর। শালার ডাক্তাররা সবসময় রোগি মারা যাবার পরেই আসে কেন?

আমাদের সময়ে আমরা নানা ধরনের ‘ক্রিয়েটিভ’ ইংরেজি ব্যবহার করতাম।যেমন বৃষ্টি পড়ছে-রেইন ইজ রিডিং, আমি তাকে চিনি-আই সুগার হার, তোমার জন্য আমার মন কেমন কেমন করছে-মাই মাউন্ড ইজ ডুইং হাউ হাউ ফর ইউ, মেয়েটি নিচে দাঁড়িয়ে-মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং!

তবে এমন ইংরেজি চর্চা যে কেবল আমি বা আমরা করেছি, তা কিন্তু নয়। যে কোনো বিদেশি ভাষা শিক্ষা নিয়ে সব মানুষের অভিজ্ঞতাই প্রায় এমন।ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে বাঙালিকে যে কত তামাশা করতে হয়েছে তার কোনো শেষ নেই। উৎপল দত্তের সেই ফিল্মি সংলাপে আজও পেটে খিল ধরে যায় বাঙালির। আমি দেশের মুখ উজ্জ্বল করব-র ইংরেজি অনুবাদ: আই উইল বার্ন দি ফেস অব দি কান্ট্রি! যুগপৎ আমরা ভুল ইংরেজি শিখে এবং যথাযথভাবে বাংলাটা না শিখে যুগ যুগ ধরে যেন তাই করে যাচ্ছি।

ব্রিটিশ আমলে রায়বাহাদুর হওয়ার আশায় নিজেকে ‘ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট’ প্রমাণ করতে মরিয়া এক নেটিভ জমিদার। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে নিজের বেয়াইমশাইয়ের পরিচয় করানোর অননুকরণীয় ভঙ্গি: ‘দিস ইজ মাই ফাদার-ইন-ল’জ সান’ বলে সামলে নিয়ে, ‘সান্স ফাদার-ইন-ল’!

একবার এক ইংরেজ জজকে ‘গাভী’ বোঝাতে অল্প ইংরেজি জানা উকিল নাকি পাশের মাঠ থেকে একটি ষাড় ধরে এনেছিলেন। তারপর জজকে বলেছিলেন, ‘গাভী’ ইজ হিস ওয়াইফ স্যার!

দুই.
ভারতবর্ষে ইংরেজি চর্চার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। বাংলায় ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করার ব্যাপারটি শুরু হয় সতেরো শতকের ত্রিশের দশকে, প্রথমে কোলকাতার বালাসোরে এবং পরে হুগলিতে ইংরেজ ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার পরে। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সুজা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যে যে ফরমান জারি করেন, তার মাধ্যমেই এ অঞ্চলে তথা ভারতে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক আধিপত্যের সূচনা হয়; ইংরেজি ভাষা ব্যবহারেরও সূত্রপাত ঘটে তখনই।

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড মেকলের বিখ্যাত Minute-এ প্রথম ভারতে পাশ্চাত্য বিষয়সমূহ শিক্ষাদানের সুপারিশসহ ইংরেজি ব্যবহারের প্রতি সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে লর্ড বেন্টিঙ্কের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতীয়দের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। অবশ্য, এর আগেই ভারতীয় ও ব্রিটিশদের মধ্যে প্রথম যোগাযোগের সময় থেকে বাংলায় ইংরেজি শিক্ষা শুরু হয় ইংরেজ প্রতিনিধি ও দেশিয় সহযোগী বানিয়াদের মধ্যে বাণিজ্যিক ভাষা হিসেবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজি-শিক্ষা ছিল বিক্ষিপ্ত এবং ব্যক্তিগত প্রয়াস ও পরিস্থিতিভিত্তিক; পরে বিভিন্ন স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার প্রসার ঘটে। সতেরো শতকে ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল প্রধানত ইউরোপীয় শিশুদের শিক্ষার জন্য। ১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে সোসাইটি ফর প্রোমোটিং ক্রিশ্চিয়ান নলেজ কর্তৃক কলকাতায় প্রথম সর্বজনীন ইংরেজি শিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে Rev. Kiernander ৪৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আর একটি ইংরেজি স্কুল; বছর শেষে এর ছাত্রসংখ্যা বেড়ে হয় ১৭৪। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রি স্কুল সোসাইটি অব বেঙ্গল প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত  কলকাতা ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়। পর্যায়ক্রমে মিশনারি স্কুলসমূহের পাশাপাশি কলকাতা ও তার আশেপাশে আরও অনেক ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য বাণিজ্যিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলগুলি ছিল মিশনারি স্কুলগুলি থেকে ভিন্ন ধরনের। ব্রিটিশ গোমস্তাদের অধীনে চাকরি প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় হিসাববিদ্যা ও বুককিপিং ছাড়াও ইংরেজি পড়া ও লেখার প্রশিক্ষণ দিত এ স্কুলগুলি।

সে সময় ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে কলকাতার  হিন্দু কলেজ (পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্সি কলেজ)। হিন্দু কলেজের জনপ্রিয়তার ফলে কলকাতায় আরও ৯টি এবং ঢাকায় ১টি অনুরূপ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথমদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও ধীরে ধীরে তারাও ইংরেজির গুরুত্ব উপলব্ধি করে। ১৮২৬ সালে কলকাতা মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের সে চেতনা প্রতিফলিত হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ শিক্ষার উচ্চতর স্তরগুলিতে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানের মাধ্যমে পরিণত হয়। যেহেতু উচ্চশিক্ষালাভে আগ্রহী সকলকে ইংরেজি জানতে হতো, সেহেতু স্কুল পর্যায়েও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

উনিশ শতকের তৃতীয় দশক নাগাদ মাদ্রাসা শিক্ষায় ইংরেজি প্রবর্তিত হয়। তখন ইংরেজির প্রতি বিরোধিতা এতো প্রবল ছিল যে ছাত্ররা ইংরেজি ক্লাস বর্জন করত। কিন্তু নবাব আবদুল লতীফের (১৮২৮-১৮৯৩) মতো কতিপয় বাঙালি মুসলমান ইংরেজির গুরুত্ব অনুভব করেন। কলকাতা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করলেও তিনি উপলব্ধি করেন যে, ইংরেজি ছাড়া জীবনে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি মাদ্রাসায় নিয়মিত ইংরেজি ক্লাস করে এ ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর মুসলমান সঙ্গীদের বোঝাতেন যে, নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে হলে ইংরেজি জানা একান্ত আবশ্যক।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি-শিক্ষা শুরু হয় ১৮৫৮ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সকল ডিগ্রি কলেজে। ১৯২১ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষা পূর্ব বাংলায় সহজতর হয়। তখন ভাষাবিভাগগুলি ছাড়া অন্যসব বিভাগে শিক্ষাদানের মাধ্যম ছিল ইংরেজি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু হওয়া ১২টি বিভাগের মধ্যে ইংরেজি ছিল একটি (সিনহা, ১৯৭৮)।

ইংরেজদের আগে ভারতবর্ষে আরবি এবং সংস্কৃত ছিল ধর্মের ভাষা, আর ফারসি ছিল রাষ্ট্রের ভাষা। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন শুরু হলে ইংরেজি হয়ে উঠে উপনিবেশের নতুন ভাষা। এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই ছিল বিভাজিত। যারা ধর্মীয় চর্চায় থাকতে চায়, তাদের জন্য ছিল মাদ্রাসা কিংবা আশ্রম। যারা শাসক কিংবা শাসকের দোসর হতে চায়, তাদের জন্য ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা— প্রথমে ফারসি পরে ইংরেজি। ইংরেজদের পত্তনের পর দীর্ঘদিন হিন্দু-মুসলিম দুই দলই পাশ্চাত্যের শিক্ষার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। পরে অনেকেই বুঝতে পারেন এর অসারতা। তাই তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা সৈয়দ আহমদ খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ইংরেজি শিক্ষার সংস্কৃতি।

তত দিনে ইংরেজি শিক্ষা হয়ে ওঠে রানীর ভাষা। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল, কী করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সহায়ক দেশি সহযোগী তৈরি করা যায়। যারাই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, ইংরেজদের সঙ্গে ওঠাবসায় পারদর্শী, তারাই হলো ভাগ্যবান। ক্রমে ইংরেজি শিক্ষা বা ইংরেজি চর্চা হয়ে ওঠে সংস্কৃতির অঙ্গ। অনেকের মন অহঙ্কারে ভরে ওঠে। মা-বাবারা বলতে থাকেন, আমার সন্তান কী সুন্দর ইংরেজি বলে (বোঝাই যায় না ওরা বঙ্গসন্তান)!

ইউরোপীয়দের ভারতবর্ষে আগমনের একটি প্রধান কারণ ছিল, তখন ভারতবর্ষ ও চীন ছিল জ্ঞানের শীর্ষে। ভারতবর্ষ ও চীন আঠারো শতকে গোটা পৃথিবীর অর্ধেক পণ্য উৎপাদন করত। তারা ছিল ধনকুবের। তাই তো ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে সৃষ্টি হয়েছিল প্রতিষ্ঠান। তাদের ইচ্ছা ছিল, কী করে ভারতবর্ষের বাজারে প্রবেশ করা যায়। পর্যায়ক্রমে পর্তুগিজ, ফরাসি ও ইংরেজরা ভারত আসে, প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য। কিন্তু ক্রমে তারা হয়ে ওঠে শাসক।

ব্রিটিশরা ভারত দখলের পর তারা বুঝতে পারে যে, এত দূর থেকে কেবল সাদা চামড়া দিয়ে ভারত শাসন করা যাবে না। তখন তাদের মাথায় প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়, কী করে তাদের দোসর এ দেশেই তৈরি করা যায়। সেই থেকেই ইংরেজি শিক্ষার চর্চা শুরু। তবে একই সঙ্গে ব্রিটিশরা এটিও বুঝতে পারে যে, ভারতে একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। গোটা বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য ১৮৮২ সালে হান্টার শিক্ষা কমিশন সৃষ্টি হয়। কমিশনের মূল কাজ হয়, ভারতের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করা আর প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় জানা। হান্টার শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। হান্টার ভারতবর্ষের প্রায় সব অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তিন.
সময় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। জাত খোয়ানোর ভয় আর খ্রিষ্টান হওয়ার আশঙ্কা কেটে গিয়ে বাঙালি ইংরেজি শিখতে উঠেপড়ে লাগাল। অতিরিক্ত প্রণোদনা ছিল সামাজিক প্রতিপত্তি ও সরকারি চাকরি পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক হাতের কাছে না থাকলেও কাজ চালানোর মতো অভিধাননির্ভর একধরনের ইংরেজি অল্প সময়ের মধ্যেই গড়পড়তা বাঙালির আয়ত্তে এসেছিল। তবে এই বিদেশি ভাষাটির কাঁচা ঘুঁটি পাকা হওয়ার আগেই একে চাকরির বাজারে টেনে আনায় ভিতটি নড়বড়ে রয়ে যায়। এসব ত্রুটি সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষার বিজয়রথ এগিয়ে চলছিল। এর ফল হয়েছিল দুটি—যেসব বাঙালি সময় ব্যয়ে ইংরেজি শিখেছিলেন, তাঁদের মুখে ফুটল অনাবশ্যক ইংরেজি শব্দবহুল এক বিচিত্র বাংলা বুলি। তবে যাঁরা যথার্থ ইংরেজি শিখে প্রকৃত শিক্ষিত হয়েছিলেন, তাঁরা এ দলের বাইরে ছিলেন। দ্বিতীয়টি—স্বল্পশিক্ষিত সামান্য কিছু ইংরেজি জানা বাঙালির একধরনের ভুলেভরা ইংরেজির আবির্ভাব ঘটল তাঁদের কলমে ও বুলিতে। অফিস, আদালত ও সদাগরি হাউসে। একেই সাহেবরা পিঠ চাপড়ানোর ভঙ্গিতে এবং কৌতুক করে নাম দিয়েছিলেন ‘বাবু-ইংলিশ’।

প্রথম দলে যাঁদের উল্লেখ করা হলো, সেসব ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির ভাষা ভরে উঠেছিল ইংরেজি শব্দ ও বাক্যবিন্যাসের টইটম্বুরে। প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনে যত্রতত্র ইংরেজি শব্দের হাস্যকর ব্যবহারে সে যুগের বাঙালি তার ইংরেজিজ্ঞানের জাহির করতে গর্ব অনুভব করত।

বিয়ের আসরে ইংরেজিওয়ালারা তখন একে অপরের নাম জিজ্ঞাসা করছে, ‘হোয়াট ডিনোমিনেশন পুট ইয়োর পাপা’। ডিকশনারি মুখস্থ করাও বেশ একটা কৃতিত্বের বিষয় বলে প্রচলন ছিল সমাজে। আরও ছিল ইংরেজি বানান জিজ্ঞাসা করে একে অন্যের বিদ্যার বহর মাপার রেওয়াজ। ব্যাকরণ প্রণালি বা ব্যাকরণবিধি প্রভৃতি শেখানোর দিকে নজর ছিল না কারও। কেবল ইংরেজি শব্দ ও তার অর্থ কণ্ঠস্থ করানো হতো। ইংরেজি শব্দের ব্যবহারের আধিক্যে বাঙালির দৈনন্দিন কথোপকথন যে কতখানি ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল, তার একটি নমুনা পাওয়া গেছে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার পাতায়।

‘মশায়, লাস্ট নাইটে বড় ডেঞ্জারে পড়েছি, আঙ্কলের কালারা (কলেরা) হয়েছে। পলস্ বড় উইক হয়েছিল। আজ মর্নিংয়ে ডাক্তার এসে অনেক রিকবার করেছে। এখন লাইফের হোপ হয়েছে।’ বাংলা করার মধ্যে বিদেশি শব্দের ফোড়ন দেওয়া অবশ্য বাঙালির নতুন কিছু নয়, আজ থেকে শ-তিনেক বছর আগেও বাংলা ভাষায় ছিল ‘যবনী মিশাল।’ ১৭৭৮ সালে হ্যালহেড তাঁর বাংলা ব্যাকরণের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘এ দেশের কম্পাউন্ড ইডিয়ম ব্যবহারে যে যত দিশি ক্রিয়াপদের সঙ্গে আরবি-ফারসি বিশেষ্যের ফোড়ন দিতে পারে, তার তত কইয়ে-বলিয়ে হিসেবে নাম ফাটে।’ এ বদ-অভ্যাস আজও অনেকেরই রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে নানা রকম গল্প চালু আছে। শোনা যায় সে আমলে চাকরি পাওয়া নিয়ে খুব কাড়াকাড়ি হতো। আগে ভালো দরখাস্ত পাঠাতে পারলে কিছুটা সুবিধার সম্ভাবনা থাকে। তাই অনেক চাকরিপ্রার্থী অগ্রিম খবরের সন্ধানে শ্মশানঘাটে গিয়ে সদ্যমৃত চাকরিজীবীদের নামধাম খুঁজে বের করত, মৃত ব্যক্তি কোন দপ্তরে, কী পদে চাকরি করেছিলেন—সব জেনে দরখাস্ত পাঠাত মৃতের চাকরিস্থলে। ইংরেজি ভাষায় লেখা সেই দরখাস্তের শুরুটি ছিল এ রকম—‘লার্নিং ফ্রম বার্নিংঘাট (শ্মশানঘাট) দেট এ পোস্ট হেজ ফলেন ভ্যাকেন্ট, আই বেগ টু অ্যাপ্লাই ফর দি সেম।’

দ্বিতীয় গল্পটি আরও মজার। একটি সদাগরি হাউসের বার্ষিক বাজেট তৈরি প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোম্পানির বড় সাহেব অনাবশ্যক বিবেচনায় কয়েকটি বরাদ্দ কেটে দিতে কলম তুলেছেন। এমন সময় অধস্তন কর্মচারী ছুটে এল সাহেবকে থামাতে। কর্মচারী বলতে চাইল যে বরাদ্দগুলো তিনি কেটে দিতে চাচ্ছেন, তা নানা কারণে অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু এত কথা বোঝানোর মতো ইংরেজি তার পেটে ছিল না। তাই সাহেবকে অনুনয় করে বললেন, ‘নো কাট, নো কাট। রিজন হ্যাজ (কারণ আছে), অর্থাৎ বরাদ্দগুলো কাটবেন না, এগুলো রাখার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। বলাবাহুল্য, সাহেব ব্যাপারটা বুঝে বরাদ্দগুলো রেখে দিলেন। এভাবেই পরস্পরের ভাষার অজ্ঞতায় একধরনের সহাবস্থানের জন্ম নিয়েছিল শাসক আর শাসিতের মধ্যে। তা না হলে ভাষাবিভ্রাটের ঠ্যালায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজকর্ম শিকেয় উঠত। বাবু-ইংলিশ ছোট একটু ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য, অন্তত এই কারণে।

এবার শেষ গল্পটি। জনৈক ‘নেটিভ বয়’, তার বেতন কমানোর জন্য দুঃখ জানিয়ে ইংলিশম্যান কাগজে ইংরেজিতে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানাচ্ছেন, …I am a poor native boy rite butiful English and rite good sirkulars for Mateland Sahib…very cheap, and gives one rupees eight annas per diem, but now a man say he makes better English, and put it all rong and gives me one rupes… অথচ কী দুঃখের কথা। ছেলেটি যে শুধু ‘ভাল’ ইংরেজিই লিখতে পারে তা-ই নয়, তার অন্য গুণও আছে। সে লিখছে— `I make poetry (কবিতা) and country Korruspondanse.’ চিঠিটি পড়ে ‘নেটিভ বয়ে’র মনিব মেটল্যান্ড সাহেবের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল জানা যায়নি।

বাবু-ইংলিশের বিকাশ প্রসারে সাহেবদের কি প্রচ্ছন্ন উসকানি ছিল না? কালা আদমিদের জবান-কলম থেকে তাদের মতো পরিশীলিত ভাষা বের হোক, সব ওপরওয়ালা সাহেবই কি মনেপ্রাণে চাইতেন? নেটিভরা সাহেবদের অধীনে মুখ বুজে চাকরি করে কাটিয়ে দেবে এতেই তো তাদের মোক্ষ—ভালো ইংরেজি লেখা বা বলার কী প্রয়োজন!

তবে তখনকার ইংরেজ সিভিলিয়ানদের দেশিয় ভাষা শেখা ছিল বাধ্যতামূলক। পাস করলে চাকরিতে জুটত অতিরিক্ত মোটা ভাতা। এত সব আকর্ষণীয় সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ সাহেব আমলার বাংলা জ্ঞান ছিল জোড়াতালি দেওয়া। সে সময়ের ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি সমাজে সাহেবদের কারও কারও বাংলায় পারদর্শিতা নিয়ে মুখোমুখি কয়েকটি গল্প চালু ছিল। এমন একটি গল্প কৃষ্ণনগর কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ ই লেথব্রিজকে নিয়ে। সাহেব নাকি বাংলা পরীক্ষায় পাস করে অনেক টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর বাংলা পরীক্ষায় ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য একটি বাক্য ছিল, ‘রাজা বিক্রমাদিত্যের দুই মহিষী ছিল।’ সাহেব এর যে ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন, তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘রাজা বিক্রমাদিত্যের দুটি মাদী মহিষ (সি বাফেলো) ছিল।

সে আমলের অধিকাংশ সাহেব প্রশাসকের পরিশ্রম করে শেখা বাংলা উচ্চারণ, শব্দচয়ন সাধারণ মানুষের জন্য তো দূরের কথা, শিক্ষিতজনেরও বোধগম্য হতে সময় লাগত। বক্তা ও স্রোতা উভয়ের জন্য প্রায়ই তা হতো বিভ্রান্তিকর। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা থেকে বাংলা ভাষায় দক্ষ প্রজাহিতৈষী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিনওয়েল সাহেবের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। সাহেবের জেলায় দুর্ভিক্ষ দেখা গেছে। তিনি সরেজমিনে দুর্ভিক্ষের অবস্থা দেখতে বেরিয়ে ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। পথে এক কৃষকের সঙ্গে দেখা। সাহেব বাংলা পরীক্ষায় পাস করে পুরস্কার পেয়েছেন। সুতরাং সেই কৃষকের সঙ্গে বাংলা ভাষাতেই কথাবার্তা শুরু করবেন। সাহেবের প্রথম প্রশ্ন ‘টোমাডিগের গুড়ামে ডুড়বেক্কা কেমন আছে?’ (তোমাদের গ্রামে দুর্ভিক্ষ কেমন?) ‘ডুড়বেক্কা’ কী কৃষকটির অজানা। ভাবল হয়তো বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম হবে। কিন্তু কেমন আছে? এর উত্তর কী দেবে?

যদি বলে যে ডুরবেক্কাকে চেনে না, তবে সাহেবের এক ঘা চাবুকের মার পিঠে পড়বে। যদি বলে যে ভালো আছে, তবে তাকে হয়তো ডেকে আনতে হুমুক হবে। তখন কী হবে? কৃষকটি অনেক ভেবেচিন্তে উত্তর দিল, ‘বেমার আছে।’ সাহেব বুঝে উঠতে পারলেন না। দুর্ভিক্ষ কী করে অসুস্থ হয়। নিশ্চয়ই কৃষকটি তার কথার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। একটু ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞাস করলেন, ‘ডুড়বেক্কা কেমন আছে? অধিক আছে কি কম আছে?’—এবার কৃষকটির চোখ খুলে গেল। তার মাথায় ঢুকল এ যখন সাহেব, তখন হাকিম না হয়ে যায় না। হাকিম যখন জানতে চাচ্ছে ডুড়বেক্কা অধিক আছে না অল্প আছে—তখন ডুড়বেক্কা অবশ্যই একটা নতুন ট্যাক্সের নাম। এখন যদি বলি, ‘আমাদের গ্রামে সে ট্যাক্স নাই, তবে বেটা এখনই ট্যাক্স বসাইয়া যাইবে।’ অতএব মিছা কথা বলাই ভালো। সাহেব আবার একই প্রশ্নটা করলে কৃষক উত্তর দিল, ‘হুজুর, আমাদের গায়ে ভারী ডুড়ক্কো আছে?’ সাহেব ভাবলেন, ‘হুম! আই থট অ্যাজ মাচ।’ তদন্তে সন্তুষ্ট হয়ে সাহেব ফিরে গেলেন। বুদ্ধিমান কৃষকের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? চাষা আসিয়া গ্রামে রটাইল, ‘একটা সাহেব টাকায় আট আনা হিসাবে ট্যাক্স বসাইতে আসিয়াছিল, চাষা মহাশয়ের বুদ্ধি-কৌশলে বিমুখ হইয়াছে।

সাহেবি বাংলার কার্যকারিতা বোঝাতে এর চেয়ে ভালো উদাহরণ চোখে পড়ে না। বঙ্কিম নিজে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাহেবদের সঙ্গে গাঁ-গঞ্জে সারাজীবন কাজ করেছেন। দুর্ভিক্ষকে ডুড়বেক্কা বলা ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তার ঢের দেখা ছিল বলেই মিনওয়েল সাহেবের দৃষ্টান্ত দিতে পেরেছেন।

চার.
বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই ইংরেজি চর্চা করেছেন। ইংরেজি শিখেছেন। কিন্তু সময় সময় আবার ইংরেজিকে গালাগালও করেছেন। এ প্রসঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বিলাতফের্তা’র শেষ চারটি লাইন মনে করা যেতে পারে: আমরা সাহেবি রকমে হাঁটি/স্পীচ দেই ইংরেজি খাঁটি/কিন্তু বিপদেতে দেই বাঙ্গালির মত/চম্পট পরিপাটি।

ডিএল রায়ই নন, বাঙালির ইংরেজ ও ইংরেজি প্রীতি নিয়ে সেকালের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশই ঠাট্টামশকরা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘লেখাপড়ার কথা দূরে থাক, এখন নব্য সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন কাজই বাঙ্গালায় হয়না। ... যদি উভয় পক্ষ ইংরেজি জানেন, তবে কথোপকথনও ইংরাজিতেই হয়...আমাদিগের এমনও ভরসা আছে যে, অগৌণে দুর্গোৎসবের মন্ত্রাদি ইংরাজিতে পঠিত হইবে’ (চট্টোপাধ্যায়, ১২৭৯ বঙ্গাব্দ)।

ইংরেজি ভাষার শব্দভান্ডার থেকে বাঙালিরা প্রচুর শব্দ ধার করেছে, কিন্তু বহুল ব্যবহৃত ‘ইংরেজ’ আর ‘ইংরেজি’ শব্দ দুটো সে ভাণ্ডার থেকে ধার করেনি। কারণ, আমরা ইংরেজদের চিনেছি পর্তুগিজদের মাধ্যমে, তারা এদেশে আগে এসেছিল বলে। পর্তুগিজরা ইংরেজদের বলতো Engrez। তাদের মুখে শুনে আমরাও বলেছি ইংরেজ। সে সূত্রে, তাদের ভাষাকে বলি ইংরেজি ভাষা। তাদের ভাবসাব, রকমসকম, কাজকারবারও আমাদের কাছে ইংরেজি ক্রিয়াকলাপ। এই ব্যাপারগুলো ইংরেজদের উৎকট অনুকারী কোনো বাঙালির মধ্যে দেখতে পেলে সেটাকে বলা হয় ইংরেজিয়ানা।

মুসলমানেরা ইংরেজি ভাষাকে খ্রিস্টানদের ভাষা গণ্য করে তা শেখা থেকে বিরত থাকলেও বাঙালি হিন্দুরা তাদের রক্ষণশীলতা অতিক্রম করে ইংরেজিকে সহজেই গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাঙালি মুসলমানেরা ধর্মীয় শাস্ত্রের শৃঙ্খলে নিজেদের আবদ্ধ রাখে। সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে আবেগ আর আনুগত্যকে মূল্যায়ন করার জন্য ছোট ছোট বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের তরুণ অধ্যাপক আবুল হুসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্র এম আব্দুল হক, আবদুল কাদিরসহ কয়েকজনকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদির, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী এতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

ইংরেজ জমানায় ইংরেজি নিয়ে অনেক বিপত্তি ঘটে। সপ্তদশ শতকে এক ইংরেজ সাহেব কলকাতা বন্দরে নেমে এক দোভাষীর খোঁজ করলে লোকজন ভুল বুঝে এক ধোপাকে নিয়ে এসেছিল। সে যুগে দোভাষীদের সার্টিফিকেটে নাকি লেখা থাকত: ‘প্রত্যয়ন করা যাইতেছে যে শ্রীমান অমুক বিশটি ইঙ্গরাজি শব্দ বলিতে পারেন।’

গঙ্গা ও বুড়িগঙ্গা দিয়ে এরপর অনেক জল ও পানি গড়িয়েছে। ক্রমে ইংরেজি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে আমাদের দেশে স্বীকৃতি পেয়েছে।ভাষাজ্ঞান একটি শক্তি। অনেক ক্ষেত্রে শুধু ইংরেজি জানার বদৌলতে ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার লোকেরা কর্মক্ষেত্রে সুপারভাইজার হয়, আর ইংরেজি না জানার কারণে বাংলাদেশিরা হয় অদক্ষ শ্রমিক। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইংরেজির ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই (ভট্টাচার্য্য, ২০১৬)।

সন্তানের ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে আমরা, বাঙালি অভিভাবকেরা আজ পড়াশোনার মাধ্যমে হিসেবে মাতৃভাষার প্রতি ভরসা রাখতে পারছি না। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাই। বিশ্বাস করি, তবেই তারা এই বিশ্বায়নের দুনিয়ার উপযুক্ত ভবিষ্যত নাগরিক হিসেবে তৈরি হয়ে উঠবে, তবেই তারা দুধে-ভাতে থাকবে। আর্থ-সামাজিক কারণে যারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সন্তানকে পাঠাতে পারি না, তারা হীনমন্যতায় ভুগি। কারণ আমরা ভাবি ইংরেজি ভাষাই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।

একসময় ভাবা হত শুধু ইংরেজিতে কথা বলা আর শোনা নয়, ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখতে হবে, তবেই ভাল করে ইংরেজি শেখা যাবে। আর, ভাল ইংরেজি শিখতে গেলে বাড়িতে বাংলা বলা একদম চলবে না। এই পদ্ধতি এখন অচল। কিন্তু দেখা যায় ইংরেজি ভাষা শেখাতে গিয়ে অনেক বাবা-মা ছেলেমেয়েদের প্রায় বাংলা ভাষা ভুলিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। এ প্রসঙ্গে ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার এক লেখায় বলেছেন:

“অনেক বাবা-মা নিজেরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের মতো যথেষ্ট ইংরেজি জানেন না, কিন্তু তাঁরা স্কুলের বাইরে তাঁদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজির দুর্ধর্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা হয়ে ওঠেন। স্কুলে যেতে বা স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে আসার সময় ছেলেমেয়েদের বাঙালি ইংরেজি উচ্চারণে বলেন,

‘লুক টিটু, দি ম্যান ইজ রাইডিং অন এ হর্স।’

'দি' কোথায় 'দ্য' গোছের হবে, 'এ' কোথায় 'আ' গোছের হবে, রাইডিং এর পর অন হবে কি না, এ সম্বন্ধে তাঁদের অনেকের কোনও ধারণা নেই, কিন্তু ছেলেমেয়েকে তাঁদের ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করতে তাঁরা কোমর বেঁধে লেগে যান। কাজেই ছেলেমেয়ে যদি বলে ওঠে, ‘মা ওই দ্যাখো, একটা বেড়াল দৌড়ে রাস্তা পেরল।’

তখন তাঁরা বকে ওঠেন, ‘বেড়াল বললে কেন টিনা, ক্যাট বলতে বলেছি না?’ এবং রাস্তা ঘাটে প্রাণপণ তাঁরা ওয়ার্ডবুকের মত ছেলেমেয়েদের প্রতিশব্দ শেখাতে থাকেন, ‘গরু নয় কাউ। কুকুর নয় ডগ। হাতি নয় এলিফ্যান্ট। ইঁদুর নয় মাউস।’ আসলে বাবা মা-দের এই মরিয়া চেষ্টার কারণ তাঁদের মানসিক বিপন্নতা। তাঁরা মনে করেন ইংরেজি ভাষা শিক্ষাই সন্তানের সাফল্যের চাবিকাঠি।

বাংলা শেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝে নিজেরাও হিমসিম খাচ্ছি। এই তো সেদিন কনুইয়ের একটু ওপরে ব্যথা পেয়ে এসে দেখাল- ‘এইখানে লাগছে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘এইখানটাকে কি বলে?’ বলল, ‘জানি না তো!’ আমি বললাম, ‘বলো, হাতে লাগছে।’ খুব অবাক হয়ে বলল,‘হাত তো হ্যান্ড। এইখানটা তো হ্যান্ড নয়, এটা আর্ম। আর্ম-এর অন্য বাংলা নাম নেই?’ প্রমাদ গুণলাম। সচরাচর কাঁধ থেকে আঙুলের ডগা পর্যন্ত সবটাই ‘হাত’ বলে উল্লেখ করে থাকি আমরা। তাও বঙ্কিমচন্দ্রকে স্মরণ করে মনে মনে ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি’ গেয়ে উঠে বললাম, ‘এইখানটাকে বলে- ‘বাহু।’ নতুন শব্দ শিখে খুব খুশি। এরপর বাবাকে সারাদিনের কার্যবিবরণী দিতে গিয়ে যখন জানাল, ‘আমার বাহুতে লেগেছে’, তখন বাবার হোঁচট খাবার পালা। একইভাবে প্রশ্ন করে, ‘জল কেন খাব! উই ক্যান্ট ইট ওয়াটার্। উই ড্রিঙ্ক ইট্।’ তখন নিজেদের কথ্য বাংলার সীমাবদ্ধতার কথা ভাবি মনে মনে।

তরুণ প্রজন্ম যখন প্রতি কথায় ‘সো’, ‘সো’, ‘বাট’, ‘বাট’ করে তখন তাদের হীনম্মন্যতা চোখে-মুখে ভেসে ওঠে। এরা তো কেউই শুদ্ধ করে এক লাইন ইংরেজি বলতে পারে না। শুধু ‘সো’, ‘বাট’, এসব দুয়েকটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের ‘স্মার্টনেস’ দেখায়। এদের দেখাদেখি বয়স্করাও এভাবে আজকাল কথা বলছেন (সরকার, ২০১২)।

ইংরেজির পাশাপাশি এখন আরও একটি ভাষা চালু হয়েছে আমাদের দেশে। একে বলা যায় ‘ই-ভাষা’। এই ভাষাটা যন্ত্রপ্রযুক্তি নির্ভর। এর বাহন হচ্ছে ইন্টারনেট-মোবাইল-ল্যাপটপ-কম্পিউটার। এটা হচ্ছে রোমান হরফে বিচিত্র কায়দায় লেখা কিছু খণ্ড বাক্য। এই ‘ই-ভাষা’ বোঝার আশা সেকেলেদের পক্ষে কঠিন। কিছু নমুনা দেয়া যাক।

‘Maa ask korlo J, kaal 2mi maa k ph korlena keno’? আমার এক বন্ধুর ছোট বোনের পাঠান ই-চিঠি। ভাষাটা বাংলা, হরফটা ইংরেজি। কয়েক দশকে বিবর্তনের পথ ধরে বাঙালির কাছে এই এক নব্য পণ্য দেখা দিয়েছে। ই-মেলে, এসএমএসে, ফেসবুকে সর্বত্র নানা কিসিমের বিচিত্র বাক্যবিন্যাস। পড়তে গিয়ে পদে পদে বিপদে পড়তে হয়। ‘hate’ লেখা দেখে ভাবি আমি কি এতোই ঘৃণ্য? বুঝতে পারি না ওটা হলো ‘হাতে’। এভাবেই ক্রমাগত শিখতে থাকি ই-ভাষা!

ফেসবুকে বিচিত্র সংক্ষিপ্তকরণের ছড়াছড়ি। শুরুতে o.m.g. দেখলে ভাবতাম বোধহয় লিখতে চাইছে ‘ও মাগো’, এখন বুঝেছি ওটা বিস্ময়যুক্ত ‘ও মাই গড’! সংক্ষেপে লেখার ইঁদুর মারা কল যে কী ভয়াবহ আবহ তৈরি করে, ভাবলে রোমাঞ্চ হয়। এক ভদ্রলোকের অভিজ্ঞতা: হাঁটুর বয়সী একটি মেয়ে সেদিন লিখেছে: ‘এই নিয়ে চারটে ম্যাসেজ করলাম, বাট এখনও তুমি আমাকে রেপ করলে না’? যখন বুঝলাম ইংরেজি হরফে ‘rep’  হলো ‘reply’-এর সংক্ষিপ্তকরণ, তখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। মনে মনে বললাম মা, আমাকে বরং ‘ans’ করতে বলো!

কতো সংক্ষেপে লেখা যায়, তার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ই-ভাষায়। শুধু ‘u’ অক্ষরটি দিলেই বুঝে নিতে হয় যে, ওটা আসলে ‘you’। বাংলার কয়েকটি শব্দ ইংরেজির একটি হরফের উচ্চারণেই মিলে যায়। একটি নমুনা পেশ করি বরং। ‘O-P-C-A-D-K-S-O’-কিছু বুঝলেন? এবার ওই ইংরেজি হরফগুলো উচ্চারণ করুন বাংলা বলছেন ভেবে, দেখুন আপনার শ্রবণে মধু বর্ষণ করে ই-ভাষা বলবে ‘ও পিসি, এদিকে এসো’।

ই-ভাষার মক্কা অধুনা ফেসবুক। রীতিমতো গবেষণার অজস্র রসদ মজুত রয়েছে ফেসবুকিয়ানদের ওয়ালে। খ্যাতনামা ব্যক্তির জন্মদিন বা মৃত্যুদিন এলেই হলো। ছবি পোস্ট করার ধুম লেগে যাবে হৃদকমলে। পোস্টটা যদি মৃত্যুদিনের হয়, তাহলেই লেগে যাবে গিট্টু। খালি কমেন্ট আসবে ‘RIP’। বিপ-বিপ ধ্বনির মতো এই রিপ-রিপ কী বস্তু, না বুঝলে আপনি যে ই-দুনিয়ায় আনাড়ি তা প্রমাণ হয়ে যাবে। এই রিপ হলো ‘রেস্ট ইন পিস’। শান্তিতে থাকার কী অশান্তিকর প্রার্থনা প্রয়াস!

এখন ফেসবুক-টুইটার-হোয়াটস-আপে চলছে শর্টকার্ট ইংরেজির যুগ। একটু নমুনা দেওয়া যাক:

bf> boy friend, gf> girl friend, lol> laughing out loud, asl> age, sex, location, ttt> to tell you the truth, hand> have a nice day. অনেকে ভাওয়েলের উপর ঝপাঝপ কোপ মেরে শব্দ চালু করেছেন। যেমন, Txt> text, ezy> easy, msg> message, pls> please, spk> speak, wk> week, wknd> weeknd. কিন্তু কনসোন্যান্ট একমাত্র তখন বাদ দেওয়া যায়, যখন তা সাইলেন্ট বা প্রায়-সাইলেন্ট (wen> when, doin> doing, englis)। Xmas, rly, rcpt, stn ইত্যাদি আগে থেকে চলে আসছে। আর ইদনীংকালের ‘ই-ভাষা’বিশারদরা শব্দের মধ্যে সংখ্যা ঢুকিয়ে দিয়ে সত্যিই ভাষার একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছেন। 4ever> forever, b4> before, 8> ate, d8> date, l8r> later, a3> anytime, anywhere, anyplace. শব্দের মধ্যে চিহ্ন ঢুকছে, thnk+> think positive, l%k^> look upwards. যা ছিল যতিচিহ্ন, পরিপূর্ণ শব্দ হয়ে যাচ্ছে। 2b o nt 2b dat s d?> to be or not to be that is the question. এসব নিয়ে রীতিমত cyberspeak ডিকশনারি বের করা সম্ভব। আপনি-আমি এই ভাষার মর্মোদ্ধার করব তা অসম্ভব! ছেলে যদি কোনও বান্ধবীকে মেসেজ করে prw, তা হলে আপনাকে তো বুঝতে হবে, ও বলছে parents are watching. ধমকে ওদের থামানো যাবে না। আপনি গাছে গাছে চললে ওরা চলে পাতায় পাতায়!

এই নতুন ভাষাবিদরা মাঝেমধ্যে ফুল ফোটাচ্ছেন। kiss-এর বদলে x, said-এর বদলে z এবং at-এর বদলে @, কে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন জানি না, এগুলো স্ট্রোক অফ জিনিয়াস। একই রকম বৈপ্লবিক হচ্ছে oo-র বদলে % বসানো। যেমন look> l%k, could> c%d, soon> s%n. oo এবং %-এর মধ্যে দুটো গোল্লার যে রূপগত সাদৃশ্য আছে, সেটাকে মেলাতে গ্রাফিক কল্পনার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

oo-র উচ্চারণ হয় উ। জুলিয়ার কবিতাটিতে তাই blue হয়েছে bl%. গ্রাফিক কল্পনা সত্যিকারের পাখা মেলেছে ইমোটিকনে। যেমন, happy বোঝাতে :-), sad বোঝাতে :-(, কারণ এগুলো ক্লকওয়াইজ ঘুরিয়ে দিলে হাসি-হাসি আর গোমড়া দেখায়। আরও কিছু মজার উদাহরণ হল ~,~ মানে napping, {} মানে hugging, ><> মানে fish ইত্যাদি।

ইংরেজি বর্ণমালার সুবিধা: তার কিছু কিছু বর্ণ একটা ধ্বনিও বটে, আবার শব্দও বটে। যেমন, b> be বা bee, c> see বা sea, d> the, i> eye, p> pea বা pee, q> queue, r> are, t> tea, u> you, y> why. বাংলায় এই সুবিধা নেই। একমাত্র ঐ> ওই, চ> চল, থ> থম আর হ> হও বাদে। পিপুফিশু> পিঠ পুড়ছে ফিরে শুই, পিএনপিসি> পরনিন্দা পরচর্চা, এমবিবিএস> মা বাবার বেকার সন্তান এ রকম কিছু শব্দ দূরবিন দিয়ে দেখতে হয়। চমকে দেওয়ার মতো সংক্ষিপ্তকরণ হল ১2> একটু!

তরুণপ্রজন্ম ইংরেজি ভাষাকে নিয়ে যাচ্ছে-তাই কাণ্ড করছে। ভুল-ভালও করছে দাপটের সঙ্গে। যেমন পৌঁছে মোবাইলে একটা ম্যাসেজ করে দিস’: কথাটা ‘ম্যাসেজ’ নয়, ‘মেসেজ’ (message)। ‘ম্যাসেজ’ (massage) বলে ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ হল মর্দন বা দলাইমলাই। বার্তা বা এসএমএস বোঝাতে ‘ম্যাসেজ’ নয়, বলতে হবে ‘মেসেজ’ (message). একইভাবে ‘স্ট্যাটাস’ নয়, ‘স্টেটাস’। ‘ক্যাওস’ নয়, ‘কেওস’। অনেকেই বলে থাকে: মেয়েটির গলার ভয়েস ভারি মিষ্টিএটা পুনরুক্তি দোষ। ‘ভয়েস’ মানেই গলার আওয়াজ। এটাই সব থেকে বেস্টআবারও একই গলতি। ‘বেস্ট’ মানেই তো সবথেকে ভাল। সব মিলিয়ে তরুণপ্রজন্মই সব থেকে বেস্ট (ভুলের দিক দিয়ে)!

পাঁচ.
অনেক জ্ঞানী-গুণী ‍বিশিষ্টজনও কিন্তু ইংরেজ ও ইংরেজির প্রতি বিশেষ আস্থা অনুভব করেছেন। কেবল মীর জাফরের ওপর দোষ দিয়ে লাভ নেই, বাঙালি কোনোকালেই বাঙালির ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। কথিত আছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর স্বল্পকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ গেছেন একটি সেতুর উদ্বোধনে। শুনছেন বাঙালি ইঞ্জিনিয়াররা গর্বের সঙ্গে দাবি করছেন, স্যার, এ-ব্রিজ সম্পূর্ণ আমাদের তৈরি। আর ততোই তাঁর তলব, মাথার ওপর সাহেবরা ছিল তো? তাতে তাঁরা একটু উদ্বিগ্ন হয়ে দাবি আরো জোর করেন, না, না, স্যার, এ বিলকুল আমাদের কাজ। তাতে প্রফুল্লবাবুর উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে; বুঝলাম, বুঝলাম, তোমারই করেছ। তবে মাথার ওপর সাহেব ছিল তো? ভয়টা এই যে সাহেব না থাকলে বাঙালিরা কি ঠিক-ঠিক কাজ করে দেখায়? সাহেব-বাঙালি সমীকরণে আরেকটা কথাও মনে আসছে – বিবেকানন্দের। বেজায় ধমক দিয়ে বলেছিলেন, তোরা একটা আলপিন বানাতে পারিস না, তোরা আবার ইংরেজের নিন্দে করিস (ভট্টাচার্য, ২০১৩)!

কেন আগের থেকে বেশি লোকে ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে তার উত্তর খুব সোজা। আর্থিক উদারীকরণ, বিশ্বায়ন এবং তথ্য-প্রযুক্তি ও দূরসংযোগের  জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে চাকরির বাজারে শিক্ষার এবং ইংরেজি জানার দাম আগের থেকে অনেক বেশি বেড়েছে।

ইংরেজি শুধু অর্থোপার্জনের ভাষা নয়, উচ্চশিক্ষার মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক স্তরে যোগসাধনের একমাত্র সোপান। প্রায় একশ বছর আগে লেখা একটি প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী ইংরেজি ভাষাকে বাঙালির দ্বি-মাতৃভাষা আখ্যা দেন, শিক্ষিত বাঙালির ক্ষেত্রে আজও তা সুপ্রযুক্ত এবং এতে আপত্তির কিছু নেই।

শুধু ভাষাটা একটু শুদ্ধ করে শিখতে হবে-এই যা। আমি ইংরেজিতে কাঁচা বলতে-আই `অ্যাম গ্রিন ইন ইংলিশ’ বললে চলবে না! 

তথ্যসূত্র

  1. সিনহা, সুরেন্দ্র প্রসাদ, ইংলিশ ইন ইন্ডিয়া: এ হিস্টরিক্যাল স্টাডি উইথ পার্টিকুলার রেফারেন্স টু ইংলিশ এডুকেশন ইন ইন্ডিয়া, জানকী প্রকাশনী, পাটনা, ১৯৭৮)
  2. চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, বঙ্গদর্শনের পত্র-সূচনা, ১২৭৯ বঙ্গাব্দ
  3. ভট্টাচার্য্য, শিশির, বাঙালির বহুভাষা চর্চা, প্রথম আলো, জানুয়ারি ০১, ২০১৬
  4. সরকার, পবিত্র, বাংলাভাষা প্রয়োগের সমস্যা: লেখায়-কথায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২২ মার্চ ২০১২
  5. ভট্টাচার্য, শঙ্করলাল, বাঙালি : কাল, আজ, কাল, কালি ও কলম, ১৭ জানুয়ারি ২০১৩
 
.




আলোচিত সংবাদ