বইমেলার বৈশ্বিক রূপ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫

বইমেলার বৈশ্বিক রূপ

মিলটন রহমান ১২:৪১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮

print
বইমেলার বৈশ্বিক রূপ

বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলা নিয়ে দেশের মত প্রবাসেও আগ্রহের কমতি নেই। বাংলা ভাষার অনেক লেখক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে বসবাস করেছেন। এখন এ হার আরো বেড়েছে। এক নি:শ্বাসে যদি বলি লন্ডনে বসবাস করছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, গোলাম মুরশিদ, কাদের মাহমুদ, শামীম আজাদ, হামিদ মোহাম্মদ, কামাল রাহমান, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, মুজিব ইরম, ইকবাল হোসেন বুলবুলসহ অনেকে।

বিলেতে নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করেন এমন কবি-লেখকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এছাড়া মার্কিন মুলুকে কুলদা রায়, ফকির ইলিয়াস, তমিজ উদ্দিন লোদি এবং কানাডায়, লুৎফুর রহমান রিটন, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, ফেরদৌস নাহার, নাহার মনিকা, শাহানা আক্তার মহুয়া, নিতু পূর্ণা, আঞ্জুমান রোজীসহ অনেকেই বসবাস করছেন। অস্ট্রেলিয়াতে অজয় দাশগুপ্ত, আকিদুল ইসলাম, আবুল হাসনাত মিল্টনসহ অনেকে বসবাস করছেন। এছাড়াও ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমাদের লেখকগণ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ফলে বইমেলা এলেই দেশের বাইরেও বাংলাসাহিত্যেকে ঘিরে এক ধরনের তরঙ্গ সঞ্চার হয়। সেই তরঙ্গে খবর আসে, একুশে বইমেলায় কার কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে।

কোন প্রকাশক এ কাজটি করছে এবং গ্রন্থ সম্পর্কে সম্মক ধারণাও পাওয়া যায়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক এ কাজটি অনেক বেশি সহজ করে দিয়েছে। অন্তর্জালের সুবাধে কোন দূরত্বই এখন আর দীর্ঘ নয়। বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে সাহিত্যচর্চা এখন আর দূরূহ নয়। একটি রচনা সম্পন্ন করার পর ঢাকা কিংবা যেকোন স্থানের পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করাও যায় সহজে।

লেখালেখি সম্পর্কে যে কোন প্রান্ত থেকে নিজের ভাব বিনিময়ও এখন সহজ। দেশে বসে যেভাবে অনেকে সাহিত্য করছেন, তাদের মতই বাইরে বসবাসরত লেখকরাও কাছের-দূরত্বে বসে কাজ করছেন। বাইরে সাহিত্য চর্চা করার আবার কিছু সুবিধা রয়েছে, যা দেশে পাওয়া একেবরেই দুষ্কর। বিশেষ করে পঠন-পাঠনের সুবিধা। যুক্তরাজ্যের কথা যদি বলি, এখানে প্রতিটি পাড়াতেই রয়েছে বৃহৎ লাইব্রেরী।

সে লাইব্রেরীতে রয়েছে প্রয়োজনীয় প্রায় সব গ্রন্থ। ব্রিটিশ লাইব্রেরীতো রয়েছেই। এই লাইব্রেরীতে রয়েছে ১৫০ মিলিয়ন আইটেম এবং চৌদ্দ মিলিয়ন গ্রন্থ। শুধুমাত্র কাব্যচর্চার জন্য রয়েছে ওয়েস্টমিনিস্টারের সাউথব্যাংকে বিশাল পোয়েট্টি লাইব্রেরী। শুধুমাত্র কবিতা বিষয়েই রয়েছে দুই লক্ষাধীক গ্রন্থ। এভাবে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের অন্যান্য দেশে একইভাবে রয়েছে ঐতিহাসিক অনেক লাইব্রেরী। ফলে এসব দেশে বসে যারা সাহিত্যকর্ম করে থাকেন তাদের রচনা নব দিগন্তের সন্ধান দিবেই।

এখন যাঁরা এসব দেশে বসে সাহিত্য চর্চা করছেন তাঁদের রচনায় সেই গন্ধ পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রবীন সাংবাদিক, কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাথে এ বিষয়ে কথা হলো। তিনিও বললেন, এখন যোগাযোগ সুবিধার কারণে সবকিছুর মতই বাইরে বসে বাংলাসাহিত্য চর্চার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং নীরদচন্দ্র চৌধুরীর প্রসঙ্গ টেনে তিনিও বললেন, বর্তমানে অনেকে বিলেতে বসে বাংলাসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

ফলে বাংলাসাহিত্য চর্চার ভ’মি এখন বিশ্ব-বিস্তৃত। একে এখন কেবল দেশের গন্ডিতে বেঁধে রাখা বা চিন্তা করা ঠিক হবে না। কারণ আমি মনে করি বাংলাসাহিত্যের সাম্প্রতিক কালের উল্লেখযোগ্য অনেক কবি-সাহিত্যিক দেশের বাইরে বসবাস করছেন। ফলে এর মাধ্যমে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলাকে এখন বিশ্বমূখি করার একটি সুযোগ তৈরী হয়েছে। বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের কর্মকারগণ এ জগৎ তৈরী করেছেন। এখন বাংলা একাডেমি চাইলেই এর সুযোগ নিতে পারে।

বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত কবি-সাহিত্যিকদের একুশে বইমেলার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের প্রথা তৈরী করতে পারে। এতে করে কবি-সাহিত্যিকগণও মেলাকে বিশ্বজনীন রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখবে। প্রসঙ্গত বলতে চাই, লন্ডনে প্রতি বছর ‘লন্ডন বইমেলা‘ আয়োজিত হয়। এই মেলায় ঢাকা থেকে আগামী প্রকাশনী, পাঞ্জেরী প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা যোগ দেয়। গত কয়েক বছর আমাদের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও অংশ গ্রহণ করেছেন।

লন্ডনের বিশাল ভ্যানু অলিম্পিয়াতে এই মেলা আয়োজিত হয়। জানার বিষয় হলো, লন্ডন বইমেলায় খুচরা কোন বই বিক্রি হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এ মেলায় অংশগ্রহণ করে প্রকাশকরা। তাদের প্রধানতম লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের বইয়ের বিশ্ববাজার তৈরী করা। আর এ কাজটি সম্পাদন করার জন্য সব ব্যবস্থায় করে রাখে আয়োজক কর্র্তৃপক্ষ। মূলত একদেশের প্রকাশক অন্যদেশের বা ভাষার গ্রন্থের অনুবাদের স্বত্ব কিনে নিয়ে যায়। এ মেলা শুধু প্রকাশকদের বিশ্ববাণিজ্য তৈরীর লক্ষে।

প্রকাশকদের জন্য আয়োজন হলেও এই মেলায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান কবি-সাহিত্যিকগণ আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। নিজের এবং বিশ্বসাহিত্যের নানান বিষয়ে তাঁরা কথা বলেন সেমিনারে। তাঁদের বক্তব্য শুনে প্রকাশকগণ বিভিন্ন গ্রন্থ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন এবং সেখান থেকে নিজের দেশের জন্য উপযোগী গ্রন্থটি কেনার চুক্তিতে সই করেন। শুধু তাই নয় কবি-সাহিত্যিকদের আলোচনা থেকে তাঁদের দেশ ও ভাষাসাহিত্য সম্পর্কে একটা ধারণাও পাওয়া যায়। এ মেলা আমাদের জন্য মডেল হতে পারে। তবে লন্ডন বইমেলার মত একই মেলা আমাদের পক্ষে আয়োজন করতে আরো সময় নিতে হবে।

কেননা বাংলাদেশে অনুবাদ সাহিত্য এখনো শিশু পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাসাহিত্যেকে পৌঁছে দিতে হলে অনুবাদ সাহিত্যের উৎকর্ষের দিকে নজর দিতেই হবে। তা না হলে বাংলা একোডেমি বইমেলা ুঢাকার বাইরে কোন অবদান রাখতে পারবে না। অনুবাদসাহিত্যের মান যদি একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে একুশে বইমেলায় বাংলা একোডেমি একটি অংশ বরাদ্ধ দিতে পারে আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের। তারা বইমেলায় আসবে এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের কাজ দেখবে আর চুক্তি বিনিময় করবে। আর এ কাজটিতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাস্ট্র, কানাড এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বসে যাঁরা বাংলাসাহিত্য চর্চা করেন তারা গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখতে পারেন।

আমি বিভিন্ন সময় আমার লেখায় এবং স্বাক্ষাৎকারে বলেছি বাংলা একোডেমি বইমেলাকে একটি বিশ্বরূপ দেয়ার বিষয়ে। এটি যদি করা সম্ভব না হয়, তাহলে বাংলাসাহিত্যের বিশ্বমুক্তি সম্ভব নয়। হোর্হে লুইস বোর্হেস, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, গুন্টাগ্রাস এঁরা বিশ্ব পরিচিতি লাভ কেনো করেছিলো তা জানাই। কারণ তাঁদের রচনা বহু ভাষায় রচিত হয়েছে। সেই সুবাধে বিশ্বপাঠকের হাতে তাদের রচনাও দ্রুত পৌঁছেচে। ফলে বাংলাসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখকদের উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো অনুবাদ করতে হবে। আবার কেবল অনুবাদ করলেই হবে না, সেগুলো বিশ্বপাঠকের হাতে তুলে দিতে আয়োজন করতে হবে বইমেলা।

এই কাজটি একুশের বইমেলা আয়োজনের সাথেই করা যেতে পারে। সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাংলা একাডেমির সাথে সহায়তা করলে এ আয়োজনের সূচনা কঠিন হবে না বলে মনে করি। এছাড়া দেশের বাইরেও মেলা আয়োজনে মাধ্যমে এ সুযোগ নেয়া যেতে পারে। লন্ডনে প্রতি বছর বাংলা একাডেমি বইমেলা আয়োজিত হতো। কেবল গত বছর হয় নি। কারণ মেলাটি বাংলা একাডেমি এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অদূরদর্শীতার কারণে পড়েছিলো একজন বণিকের হাতে। ফলে মেলাটি বইয়ের মেলা না হয়ে, হয়ে পড়েছিলো আখের গোছানোর মেলা।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি বুঝতে পেরে গত বছর মেলা আয়োজন থেকে বিরত থাকে। আমি মনে করি সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে লন্ডনে বাংলা একাডেমি বইমেলার আয়োজন করতে পারে। যোগাযোগ সুবিধার কারণে লন্ডনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশকরা অংশগ্রহণ করার ইচ্ছে পোষণ করবে। এই মেলাটিকে বাংলাসাহিত্যের বিশ্ববাজার তৈরীর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বাংলাদেশ।

শুধু মেলা নয়, এ আয়োজনের মাধ্যমে পাঠক তৈরীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করতে হবে বাংলা একাডেমিকে। এ কাজটি প্রকল্প পরিচালার মাধ্যমেই করা সম্ভব। কাজটি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কারণ আমাদের পাঠক খুবই কম। প্রতিদিন মেলায় হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করে। অর্ধেক মানুষও যদি বই কিনতো তাহলে মেলায় কোন বই অবশিষ্ট থাকতো না। কিন্তু দৃশ্য তো সম্পূর্ণ বিপরীত। বই বিক্রির হার একেবারেই হতাশাজনক।

একটি কথা এখানে বলে রাখা ভালো যে, যারা বইমেলায় আসে কিন্তু বই কেনে না, তাদেরও কিন্তু বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আছে। পুরোপুরি না হলেও কিঞ্চিত ভালোবাসা রয়েছে। এই ভালোবাসার সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে বাংলা একাডেমি নতুন নতুন পাঠক তৈরী করতে পারে। এর জন্য সেমিনার বা কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এভাবে পাঠকশ্রেনী তৈরীর মাধ্যমে যখন বইয়ের একটি চমৎকার বাজার তৈরী সম্ভব হবে তখন, লেখকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের চেহারা পোক্ত হয়ে উঠবে।

এই পেশাদারিত্বই বাংলাসাহিত্যেকে বিশ্বমূখি করতে সহায়ক হবে। পাঠকদের জন্য বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে বইমেলা করেই চুপ থাকলে চলবে কেনো। পুরো বছরই বই নিয়ে দেশে বিদেশে কাজ করতে হবে বাংলা একাডেমিকে। বাইরের দেশে বসে যারা বাংলাসাহ্যি চর্চা করছেন তাদের নিয়ে বিভিন্ন দেশে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। যাতে বিভিন্ন ভাষার কবি-সাহিত্যিক ও প্রকাশকগণ উপস্থিত থাকবেন। সেসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরতে হবে বাংলাসাহিত্যেও শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর অনুবাদ। এভাবে বইমেলার বিশ্বমূখি একটি আদল তৈরী করা সম্ভব হবে। এভাবে বাংলা একাডেমি বইমেলা একটি বাণিজ্যিক শিল্পের আঁকার ধারণ করবে বলে মনে করি।

মিলটন রহমান: কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক
e-mail:milton.rahman07@gmail.com

 
.




আলোচিত সংবাদ