রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভিন্নমত দমনের সর্বাত্মক অভিযান

ঢাকা, রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভিন্নমত দমনের সর্বাত্মক অভিযান

চিররঞ্জন সরকার ৫:৪৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

print
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভিন্নমত দমনের সর্বাত্মক অভিযান

সন্দেহ, সংশয় আর অনিশ্চয়তায় দোলাচলে দুলছে দেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ। দেশে কী হবে বা কী হতে যাচ্ছে– এ ব্যাপারে বর্তমানে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। ক্ষমতাসীনরা জোর গলায় বলছেন, যথাসময়ে নির্বাচন হবে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।

এতদিন ক্ষমতাসীনরা আরও বলে এসেছেন, সে নির্বাচনে বিএনপি ঠিকই অংশ নেবে। এখন অবশ্য তারা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়টি আর বলছেন না। তারা বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। সে নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচন হবে।

এদিকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে একটি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ৫ বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। বেগম জিয়া এখন কারাগারে। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা দলের চেয়ারপারসেন মুক্তির জন্য রাজপথে ‘অহিংস আন্দোলন’ ও আইনি লড়াই এক সঙ্গে চালিয়ে যাবেন। যদিও যতটা আশা করা হয়েছিল, বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর রাজপথে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি।

বড় কোনো জমায়েত বা দৃশ্যমান কোনো বিক্ষোভ দেখাতেও বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যর্থ হয়েছেন। রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপির ব্যর্থতা সুবিদিত। এখন প্রশ্ন হলো, আইনি লড়াইয়ে যদি বেগম জিয়া মুক্ত না হন, সে ক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে?

তাছাড়া যে মামলাটিতে বেগম জিয়ার দণ্ড হয়েছে, এটিতে উচ্চ আদালত থেকে রেহাই পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে আরও অনেকগুলো মামলা রয়েছে। সেগুলোতেও তিনি যদি দণ্ডিত হন, এবং শেষ পর্যন্ত আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হন, সে ক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে?

বেগম জিয়াকে ছাড়াই কি নির্বাচনে যাবে? নাকি ‘নো খালেদা নো ইলেকশন’ নীতি গ্রহণ করবে? আর বিএনপির নেতারা যে এতদিন বলে এসেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় বা বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবেন না। তারা তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারেও অংশ নেবেন না। ক্ষমতাসীনরা যদি তাদের দাবি না মানে সে ক্ষেত্রে বিএনপি কি করবে? ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্জন করবে? সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে? আর তাতে কি সাফল্য আসবে?

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাড়ছে পারস্পরিক বিদ্বেষ এবং ঘৃণা। বিএনপি অভিযোগ করছে, ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোরে তাদের দমন করতে পুলিশ-প্রশাসন ও আদালতকে ব্যবহার করছে। আর ক্ষমতাসীনরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পুলিশ-প্রশাসন-আইন-আদালত সব কিছুই ঠিকঠাক মতো চলছে।

বিএনপি তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্য করছে। আসলে ক্ষমতাসীনদের কৌশলের খেলায় বিএনপি অনেকটাই পিছিয়ে। হামলা-মামলা, দমন-পীড়নের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীরা মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারছে না। তাদের সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে মরণ কামড় দিতে বড় কোনো নাশকতার পথে দলটি পা বাড়ায় কি না, সেই আশঙ্কাও অনেকের মনে দানা বাধছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও তিক্ততা বাড়ছে। আর দেশবাসীর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া আচরণ। ক্ষমতাসীনরা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন। সমালোচনা বা ভিন্নমত দেখলেই তেড়েফুড়ে উঠছেন। হয়রানি আর প্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকেই চুপ হয়ে গেছেন। এর প্রভাব পড়ছে বৃহত্তর সমাজে। সব খানে এখন ক্ষমতাসীনদের গুণকীর্তন। তা না হলেই বিপদ।

আমাদের অভ্যাস কিংবা সামাজিক সংস্কৃতিতেও এখন স্বাভাবিক ‘ভিন্নতা’ বা অন্য মত সহ্য না করার প্রবণতা বেড়ে উঠেছে। কৃষি ব্যবস্থা থেকে প্রণয় সম্ভাষণ— বহুত্বের বৈচিত্র্যময়, প্রাণবান সৌন্দর্যের জায়গা নিতে শুরু করেছে ‘একমাত্র’। বিকল্প ভাবনার সৃষ্টিশীল পরিসর ভাগ করা নয়, ‘সমস্তটা’ই দখল করার ভাবনা। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র পর্যন্ত এই ‘কাউকে জায়গা না ছাড়া’র মনোবৃত্তি প্রায় একটা যান্ত্রিক অভ্যাসের ভয়ালরূপ ধরেছে।

এই ব্যাধি অভ্যাস করা হয়েছে অবশ্য গত কয়েক দশক ধরে। নিতান্ত শিশুকাল থেকে ‘শুধু তোমার, আর কারও নয়’ ভাবনাকে প্রায় স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়েছে। এখন সবাই মত্ত ভার্চুয়াল জগতে। এর বাইরে ছোট একটা গোষ্ঠীর জন্য খেলার মাঠ, পাড়ার আড্ডা, পিকনিক, ছুটির দিনের আড্ডার জায়গা নিয়েছে প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, ক্যাফে, বার, এনজিও, পার্টি। এদের সকলেরই চাই সাংগঠনিক ক্ষমতা। আরও ক্ষমতা। একচ্ছত্র ক্ষমতা। যত মত তত পথের দেশে আজকে ‘অন্য মত’ কে মনে হচ্ছে প্রতিস্পর্ধা। এই ভূমিতে যাঁদের আবহমানকালের বাস, সংস্কৃতির পারস্পরিক সহাবস্থানের চিন্তা তাঁদের কাছেও অসম্ভব হচ্ছে ক্রমশ।

এই বীভৎস মহামারীর প্রকোপ এক দিনে এমন প্রাণঘাতী জায়গায় পৌঁছয়নি। ‘মনোকালচার’-এর ভাইরাস রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে একটু একটু করে বাসা বেঁধেছে শিক্ষিত নাগরিক মানুষের ‘সুবিধাজনক’ ভাবনার ভেতরে। পুষ্ট হয়েছে সেখানে। তারপর বাইরে ছড়িয়েছে ওই জীবনযাপনের ধরনকে ‘এক মাত্র’ মডেল ধরে। অদূরদর্শী এক সচেতন ভাবনাবিহীনতাকেই সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য সফলতার পথ বলে মনে করা হচ্ছে। তার মূল্য হিসাবে ক্রমশ বিসর্জনে যাচ্ছে স্বকীয় ভাবনা, নিজস্ব প্রচেষ্টা। এই অবস্থাটা কোনও নির্দিষ্ট স্থান বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সর্বত্রই এর প্রকোপ। সবচেয়ে গভীর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের বিরাট সংখ্যায় মানুষের চেতনাভূষণ।

‘অন্য মত’ কে বলদর্পে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা এর আগেও অনেক বার ঘটেছে। একচ্ছত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী রাষ্ট্রীয় শাসকরা এই কণ্ঠরোধের চেষ্টা, ‘আদার’ বা ‘অন্য’-কে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা বহু বার করেছে এবং ইতিহাস সাক্ষ্মী যে তাদের সকলের নাম হিটলার বা আইয়ুব খান নয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে কেবল রাষ্ট্রীয় শাসকের বদলে এই অসহিষ্ণুতা, এই অধৈর্য বিকেন্দ্রায়িত হয়ে গিয়েছে। সমাজের নানা স্তরে অসহিষ্ণুতার ক্রোধ ও হিংসা প্রায় ফসলখেতের মতো ব্যাপ্ত।

চিন্তার মনোকালচার সযত্নে অভ্যাস করার ফলে ভাবনাবিহীন বহু সাধারণ লোকও ‘ক্ষমতা’র যন্ত্র হিসেবে স্বেচ্ছায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মনে মনে কোথাও সমস্ত মানুষ ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুটি মাত্র অবস্থানে— হয় তুমি আমার পিছনে নয় তো আমার মুখোমুখি। যে কোনও অন্য মতকেই মনে হচ্ছে বিরোধিতা এবং যে কোনও বিরোধিতাই ধ্বংসযোগ্য। অথচ প্রকৃতির নিয়ম এমন নয়। বৈচিত্র্যই প্রকৃতির শক্তি। অসংখ্য বৈচিত্র্যের বিপুল সহাবস্থানের কারণেই নানা প্রতিকূল অবস্থায়ও প্রকৃতি টিকে থাকে। মানুষ প্রকৃতিরই এক সংস্থান, প্রাকৃতিক নিয়মের বিরোধী কোনও অবস্থানে সে রক্ষা পাবে না।

দীর্ঘকাল গড়ে ওঠা একটি সঙ্কটের চূড়ান্ত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে চটজলদি কোনও ক্ষোভপ্রকাশ বা দোষারোপে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সমস্যার গোড়া যতটা গভীরে প্রসারিত, ততখানি গভীরেই ধৈর্য ধরে, সচেতন চিন্তা নিয়ে নিরাময় চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব।

দার্শনিক সক্রেটিস হেমলক বিষ পান করার আগে বলেছিলেন, আমি চললাম মৃত্যুর দিকে। আপনারা চলুন জীবনের পথে। প্রশ্ন থেকে গিয়েছে, সক্রেটিস কি মৃত্যুর পথেই হেঁটেছিলেন? না কি যাঁরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড দিতে তৎপর ছিলেন, তাঁরাই আসলে জীবন থেকে বিচ্যুত ছিলেন?

সক্রেটিসকে যখন জেরা করা হচ্ছিল, তখন মিলেটাস তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন, সক্রেটিস যুবকদের বিপথগামী করছেন। প্লেটো তাঁর ‘অ্যাপোলজি’ গ্রন্থে মিলেটাসের সঙ্গে সক্রেটিসের কথোপকথনের যে নমুনা দিয়েছেন, তাতে আছে, মিলেটাস বলছেন যুবকদের সঠিক পথ চালাতে পারে আইন। সক্রেটিস জিজ্ঞাসা করছেন, আইন ব্যবহারকারী মানুষটি কে? মিলেটাস বলছেন, উপস্থিত শ্রদ্ধেয় জুরিরা। যুবকদের পথনির্দেশক সিনেটের সভ্যরা। বিধান পরিষদের সকল সভ্য।

তখন সক্রেটিস বলেন, মিলেটাস, তোমার কথা অনুসারে আমিই যুবকদের অকল্যাণ করি। আর এথেন্সের সকলে উন্নতির পক্ষে। মিলেটাস: এই কথাটিই তো আমি বলিষ্ঠ ভাবে উচ্চারণ করতে চাই। তখন সক্রেটিস বলেন, তা হলে যুবকদের মহাভাগ্য যে তাঁদের অপকার করার লোক আমি একা। আর সমাজের সকলেই তাঁদের উপকার করতে চাইছেন। তা হলে আমাকে নিয়ে এত সমস্যা কীসের?

আজ থেকে কত কত বছর আগে সক্রেটিস এসেছিলেন। খ্রিস্টের জন্মের ৪৭০ বছর আগে। আর আজও প্রতিটি সমাজের কোণে কোণে পরমত সহিষ্ণুতার অভাব এক চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছেছে।

সক্রেটিসের মত বলতে হয়, সমাজের সবাই যদি কল্যাণ এবং সঠিক পথে থাকেন, তাহলে দুচারজন ভিন্ন মতাবলম্বীকে কেন শায়েস্তা করতে হবে? শক্তি ও ধমক দিয়ে দমাতে হবে? কখনও ৫৭ কখনও ৩২ ধারা দিয়ে ভয় দেখাতে হবে?

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট। 
chiroranjan@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত চিররঞ্জন সরকার এর সব লেখা
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad