এখন সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের

ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮ | ৫ ভাদ্র ১৪২৫

এখন সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ৩:১৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৮

এখন সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের

সময় খারাপ। বলতে হবে ভয়াবহ খারাপ। সময় এখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের। গত কয়েক বছর শিক্ষাঙ্গনের একমাত্র আলাপ প্রশ্ন ফাঁস। নতুন বছরে তা আরও বেগবান হয়েছে, কারণ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরতে পাঁচ লাখ টাকার পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন। পুরষ্কার ঘোষণা কতটা কাজে দিবে জানা নেই, তবে মানুষ শুধু এটুকু অনুভব করছে, আমাদের শিক্ষা জগতের পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি গভীর অতলে নিমজ্জিত হতে চলেছে।

সরকারকে কঠোর হতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে কারা এসবে সাথে জড়িত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু কোনদিন কি আসলে বোঝা সম্ভভ হবে কেন এমন হলো? কেন বাবা-মা, অভিভাবকরা সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্ন টাকার  বিনিময়ে কিন আনছেন? কি নৈতিক শিক্ষা তাদের ছেলেমেয়েরা পরিবার থেকে পাচ্ছে?

আমাদের শিক্ষা পরিসরের নানা সমস্যা আছে যেমন, শিক্ষণ পদ্ধতি ও পরীক্ষা পদ্ধতি। সেসবের উন্নয়ন নিয়ে ভাবনার সময নেই এখন। শুধু ভাবনা প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে। আমরা বলছি ডিজিটাল মাধ্যম সব সর্বনাশের মূল। ফাসকারীদের হাতে যদি প্রযুক্তি তাকে তবে কী সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা নেই? সামাজিক মাধ্যম নামের এই ‘আপাত কারণের’ পিছনের কারণ আমরা যত্ন করে খুঁজেছি কি?

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও তার কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় আস্বীকার করার পর এখন তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে চলেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, কতিপয় শিক্ষকের কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। তার যুক্তি সরকার বিজি প্রেস হতে প্রশ্ন ফাঁস রোধের বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পর পর শিক্ষকদের হাতে প্রশ্ন তুলে দিয়ে নিশ্চিনস্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু হওয়া সম্ভব হলোনা। শিক্ষামন্ত্রী কোচিং সেন্টারগুলোকেও দায়ি করেছেন এবং চলতি এসএসসি পরীক্ষার সময় কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার বিধান করেছেন। কিন্তু তবুও প্রতিদিনই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে।  

আমরা বুঝতে পারি শিক্ষাবোর্ড, বিজি প্রেস, ট্রেজারি ও পরীক্ষা কেন্দ্র হতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এবং এরা প্রযুক্তির সাহায্যে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয় দেশব্যাপী। এসকল প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে কোচিং সেন্টার, অসাধু শিক্ষক ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের যোগসাজশ আছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন হতে শুরু করে ছাপা ও বিতরণের যে কোনো ধাপে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। তাহলে উপায় কী?

শুধু শিক্ষা সংক্রান্ত পাবলিক পরীক্ষা নয়, চাকুরি ও ভর্তি পরীক্ষার পাশাপাশি এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান হতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সেসব পরীক্ষা বাতিলেরও খবর পাওয়া গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, সরকারকে বিপদে ফেলতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে। এর মধ্যে সত্যতা আছে বলেই ধারণা করি। কারণ শুধু অর্থের লোভে এমন একটি কান্ড হবে বলে ম,নে হয়না। কারন কেউ কেউ ফেসবুকে বিনামূল্যে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওযা ঘোষণা দিচ্ছে। ফলে একথা স্পষ্ট হয় একঠি অসাধু চক্র এখন রাষ্ট্রকেই টার্গেট করেছে এর শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিতে। যে উদ্দেশ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হোকনা কেন, এটি একটি গুরুতর অপরাধ। এর দায়-দায়িত্ব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। যদি এই অপরাধের পেছনে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তাও উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। 

হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একজনকেও যদি ধরে তাৎক্ষনিক বড় শাস্তি দেওয়া যায়, তবে তা অন্য অপরাধীদের জন্য বড় বার্তা। প্রশাসন আছে, আইন আছে, দক্ষ আইন-শৃংখলা বাহিনী আছে। প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

মূলত এখন পর্যন্ত এমন একটি বড় দুষ্কর্ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসলেও, বক্তৃতা-বিবৃতি ছাড়া কর্তৃপক্ষীয কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছেনা। দুষ্কৃতকারীরা শক্তিশালী একথা অনুমেয়। কিন্তু তারা কী সরকারের চেয়েও শক্তিশালী?

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত কোচিং ব্যবসা কঠোর সিদ্ধান্তে বন্ধ করা দরকার। কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির আখড়া। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত প্রশ্নপত্র যে পদ্ধতির ভেতর দিয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত যায় তাকে কিভাবে নিশ্ছিদ্র করা যায় তার উপায় বের করা। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায় অনেক শিক্ষক এর সাথে জড়িত। এসব শিক্ষককে চিহ্নিত করে জাতির সামনে এদের পরিচয় তুলে ধরা হোক। ফেসবুকে যারা প্রচার করছে, তাদের আইডি সনাক্ত করতে প্রযুক্তি বিশেরষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হোক। শিক্ষা সচিব এমসিকিউ প্রথা বাতিলের যে প্রস্তাব রেখেছেন তাও ভেবে দেখা হোক।

দেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় একসময় নকল করে পরীক্ষা দেওয়ার গণঅসুখ থাকলেও বর্তমানে প্রশ্নফাঁস মহামারি আকার ধারণ করেছে। তা ক্রমেই জাতির জ্ঞানবিকাশ ও মেধা ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠছে। বিষয়টি সর্ম্পকে বিভিন্ন মহলের কার্যকরী মনোযোগ ও পরিকল্পনা সহকারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কারণ এ পরিস্থিতি একটি সুশিক্ষিত, প্রকৃত শিক্ষিত জাতি গঠনের পরিপন্থী।

গোটা শিক্ষিত সমাজ সে ক্ষেত্রে নিম্নমান শিক্ষা নিয়েই উচ্চপদে আসীন হতে পারবে। উন্নয়নের বাংলাদেশের জন্য উন্নত মানের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবাদ পাওয়া যাবেনা আগামি দিনগুলোতে যদি এই রোগ আরও বিস্তার লাভ করে। শিক্ষার একটা উদ্দেশ্য জীবনকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার দক্ষতা অর্জন করা। জীবনতো দূরের কথা, আমাদের সমাজ পরীক্ষাই দিতে চায়না বইয়ের পাতা ঘেটে উত্তর অনুসন্ধান করে, নির্ভর করছে চুরি হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের উপর।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি। 
ishtiaquereza@gmail.com