সরকারের ফাঁদে বিএনপির পা

ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

সরকারের ফাঁদে বিএনপির পা

প্রভাষ আমিন ৩:১১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৮

print
সরকারের ফাঁদে বিএনপির পা

৮ ফেব্রুয়ারি কী হবে দেশে? এই প্রশ্নে এখন উত্তাল রাজনীতি। উত্তর কারোই জানা নেই। বিএনপি নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করবেন তারা। বেগম খালেদা জিয়াও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কথাই বলেছেন।বিএনপির আকাঙ্খা ছিল বেগম খালেদা জিয়া যখন রায় শুনতে আদালতে যাবেন, তখন রাজপথে থাকবে লাখো মানুষ। তারা একটি মরণকামড় দেয়ার চেষ্টাও করবে। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হবে বলে মনে হয় না।

সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। তারা বিএনপিকে মাঠে দাড়াতেই দেবে না। মাঠে দাড়াতে না দিলে বিএনপি কী করবে? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। বর্জন শুধু নয়, ডাক দিয়েছিল নির্বাচন বয়কটের। শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সহিংসভাবে তা ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। মানুষ মেরে, স্কুল পুড়িয়ে, গরু পুড়িয়ে চেষ্টা করেও পারেনি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দোহাই দিয়ে সরকার অনেকটা গায়ের জোরে নির্বাচন করিয়ে নেয়। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম।

প্রার্থীর অভাবে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ হলেও নৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তবু সেই নির্বাচন দিয়ে মেয়াদপূর্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।

আরেকটি নির্বাচন সামনে। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপির ক্ষতি হয়েছে। গায়ের জোরে বয়কটের চেষ্টা করতে গিয়ে বিএনপি আরো শক্তি ক্ষয় করে। বিএনপি ভেবেছিল তাদেও ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সরকারও স্বল্পমেয়াদী হবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে তারা পরের বছর ৫
জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে।

খালেদা জিয়া টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে স্বেচ্ছা অবরুদ্ধ থেকে দেশজুড়ে পেট্রল বোমা সন্ত্রাসের তান্ডবলীলা কায়েম করে। বিএনপি নেতা-কর্মীরা বলার চেষ্টা করেন, পেট্রল বোমা সন্ত্রাস তারা করেনি। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা করে তাদের ওপর দায় চাপিয়েছে। যেই করুক, পেট্রল বোমা সন্ত্রাসের দায় বিএনপিকেই নিতে হবে। কারণ খালেদা জিয়া বাসায় ফিরে যাওয়ার পর পেট্রল সন্ত্রাসীরাও ঘরে ফিরে যায়।

সরকার অনেক কৌশলে বিএনপিকে সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপি বোকার মত সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। পরপর দুইবছর একই ধরনের ভুল করার পর বিএনপির আত্মোপলব্ধি হয়। তারা বুঝতে পারে, সন্ত্রাসের পথ গণতন্ত্রের নয়।

বিএনপি কোনো বিপ্লবী বা গোপন সংগঠন নয়। তাই সন্ত্রাস করে দাবি আদায় করা যাবে না। বরং ধৈর্য্য ধরে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

২০১৫ সালের পেট্রল সন্ত্রাসের ক্ষতি থেকে বিএনপি শিক্ষা নেয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও বিএনপি এরপর থেকে বিএনপি সন্ত্রাসের পথ থেকে সরে আসে। গত তিন বছর তারা সংযমে ও চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছে। এই সময়ে সরকার অনেকবার উস্কানি দিয়েছে। একাধিকবার তাদের সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি।

সরকার হয়তো চেয়েছিল, সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে বিএনপি আবার সহিংসতার পথে ফিরে যাক। বিএনপি সংঘাতের পথে গেলেই সরকারের লাভ। সহিংসতার অজুহাতে বিএনপির ওপর দমন-পীড়ণ চালানো যায়। বিএনপির এই দীর্ঘ সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায় গত ৩০ জানুয়ারি।

গত অনেকদিন ধরেই বেগম খালেদা জিয়া একাধিক হাজিরা দিতে বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালতে যান। বেগম জিয়া আদালত থেকে ফেরার সময় হাইকোর্টসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা মিছিল করে। কিন্তু পুলিশ তাদের দাড়াতেই দেয় না। নিয়মিতই পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে সামনে রেখে এখন দেশজুড়ে প্রবল শঙ্কা। বিএনপি চেষ্টা করছিল সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় জড়ো করে বিশাল শোডাউনের। কিন্তু বিএনপির শোডাউনের চেষ্টা ভন্ডুল করতে নিপুণ ফাঁদ পাতে পুলিশ।

৩০ জানুয়ারি বেগম জিয়া আদালত থেকে ফেরার পথে হাইকোর্ট এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় পুলিশের। অন্যদিন দাড়াতে না দিলেও সেদিন পুলিশ মার খেয়েছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের রাইফেল ভেঙ্গেছে, শেষ পর্যন্ত পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে আটক দুই কর্মীকে ছিনিয়ে নিয়েছে।

অন্যদিন যেখানে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের দাড়াতেই দেয় না, সেদিন কেন পড়ে পড়ে মার খেল, রাইফেল ভাঙতে দিল, কেন প্রিজন ভ্যানে হামলঅ চালানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলো? এই প্রশ্নের উত্তরপ্রথমে বুঝতে পারেনি বিএনপি। প্রাথমিকভাবে বিএনপি পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে কর্মীদের ছিনিয়ে নিতে পারাকে নিজেদের বীরত্ব এবং অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছিল।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ব্রিফিং বিশেষজ্ঞ রুহুল কবির রিজভী বলে দিলেন, তাদের বিক্ষুব্ধ কর্মীরাই আটক কর্মীদের ছাড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিপদটা ঠিকই টের পেলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বললেন, তাদের নেতাকর্মীরা প্রিজন ভ্যানে হামলা চালায়নি।

সরকারের অনুচরেরা এ কাজ করে তাদের ওপর দায় চাপাচ্ছে। মির্জা ফখরুল যখন সরকারের পাতা ফাঁদের বিপদটা টের পেলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে ৬৯ জনকে আটক করা হয়। আর গত এক সপ্তাহে সারাদেশ থেকে কেন্দ্রীয় নেতাসহ এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশকে মারধোর, রাইফেল ভাঙচুর, প্রিজন ভ্যঅন থেকে আসামী ছিনতাই; নিঃসন্দেহে গুরুতুর অপরাধ। পুলিশ এর প্রতিশোধ নেবেই। এখন তাই হচ্ছে।

বিএনপির নেতাকর্মীদের যখন খালেদা জিয়ার রায়ের দিন ঢাকায় জড়ো হওয়ার কথা, তখন তারা আছে দৌড়ের ওপর। তরুণ নেতারা একাধিক অনুষ্ঠানে সিনিয়র নেতাদের মাঠে থাকার অনুরোধ করেছেন। গ্রেপ্তার হলে যেন মাঠ থেকেই হন। কেউ মাঠে না নামলে, এমনকি কেউ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হলেও তাদের চুড়ি পড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন তরুণ নেতারা। কিন্তু ৩০ জানুয়ারির পর পাল্টে গেছে পরিস্থিতি।

গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। অনেকেই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নয়াপল্টনের কার্যালয়ে ব্রিফিঙের সময় রিজভীর পাশে থাকা নিয়ে আগে ধাক্কাধাক্কি হতো। এখন কাউকে খুজে পাওয়াই ভার। টিভি টক শোও এড়িয়ে চলছেন বিএনপি নেতারা।

৩০ জানুয়ারি বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা না করলেই যে ধরপাকড় হতো না তেমন নয়, তখন ধরপাকড়ের অন্য অজুহাত বের করতো। বিএনপির হামলায় পুলিশের কাজটি সহজ হয়ে গেছে। পুলিশের মারমুখী ভূমিকায় ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতাকর্মীরা কতটা মাঠে থাকতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। তবে নিশ্চিতভাবে সেদিন সরকার আরেকটি ফাঁদ পাতবে। এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি সেই ফাঁদে পা দেবে নাকি গত তিনবছর দেখিয়ে আসা সংযম দেখাতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেককিছু।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ। 
probhash2000@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত প্রভাষ আমিন এর সব লেখা
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad