গান্ধীর অহিংসা কি পিছিয়ে পড়ছে? 

ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

গান্ধীর অহিংসা কি পিছিয়ে পড়ছে? 

শুভ কিবরিয়া ৬:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৮

print
গান্ধীর অহিংসা কি পিছিয়ে পড়ছে? 

১৫ মন চন্দন কাঠ

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি অপরাহ্ন ৫-৪০ মিনিটে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয় নয়াদিল্লীর বিড়লা হাউজে । হত্যাকারির নাম নাথুরাম গডসে। মৃত্যুকালে গান্ধীর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর ৩ মাস ২৮ দিন। মহাত্মা গান্ধী হত্যার ৭০ বছর হতে চলল।

গান্ধীর হত্যা সমগ্র ভারত তো বটেই , ভারতের সীমানা ছাড়িয়েও বহু মানুষের হৃদয়ে তখন আলোড়ন তুলেছিল। এমনকি এই নির্মম হত্যাকান্ডের ছায়া পড়েছিল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক তরুণ রাজনৈতিক কর্মির হৃদয়েও। হত্যাকান্ডের বয়ান ,পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুব বিস্তৃতভাবে লিখে রাখেন ২৩ বছর  বয়সী এই তরুণ তাঁর ডায়েরিতে। সেখানেই মেলে গান্ধীর চিতায় দাহ করার এক সুনিপুণ বর্ণণা।

এই তরুণ পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক চরিত্র রুপে আবির্ভূত হন। এই রাজনীতিকের নাম তাজউদ্দীন আহমদ।বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৩১ জানুয়ারি ১৯৪৮, শনিবার তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘‘১১টা ৪৫ মিনিটে, সকালে(আই.এস.টি) মহাত্মার মরদেহকে বিড়লা ভবন থেকে শোভাযাত্রা করে বহন করে আনা হোল। শবাধারটি বহন করেছে সামরিক বাহিনীর অধিনায়কবৃন্দ। কারণ ভারত মহাত্মার শেষকৃত্যকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বলে ঘোষণা  করেছে।

৪-২০ মিনিটে শবাধার যমুনার ধীরে রাজঘাটে এসে পৌছুল। ৪-৩০-এ দেহটিকে চিতায় শায়িত করা হোল। উত্তর দিকে রক্ষিত হোল তার শিরদেশ। দেবদাস গান্ধী দেহটির ওপর চন্দন কাঠের একটি স্তুপকে স্থাপন করলেন। বিকেল ৪-৫৫ মিনিটে (আই.এস.টি) রামদাস গান্ধী চিতায় অগ্নিসংযোগ করলেন। ৫ টার মধ্যে মহাত্মার দেহ ভস্মে রুপান্তরিত হয়ে গেল। মহাত্মার শিয়রে পন্ডিত রামদাস শর্মা মন্ত্র পাঠ করলেন।

মহাত্মার চিতায় ১৫ মণ চন্দন কাঠ, ৪ মণ ঘি, ২ মণ সুগন্ধী, ১ মণ নারকেল এবং ১৫ সের কর্পূরের সমাহার ঘটেছিল।’’

গান্ধী হত্যা পরবর্তি ঢাকা

তরুণ তাজউদ্দীন এই নির্মম হত্যাকান্ডে নিজেও মুষড়ে পড়েছেন।  এক গভীরতর বিষাদের ছায়া তাঁকে ঘিরে ধরেছে। এই শোকের এক বিশদ বয়ান আছে সেদিন ও পরদিনে তাঁর ডায়েরির পাতায়। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা গান্ধী হত্যাকান্ড তখনকার সময়েও  ঢাকার মানুষকে কিভাবে আলোড়িত করেছে তার একটা অন্যরকম  চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা তিনি লিখে রেখেছেন তাঁর ডায়েরিতে। 

তাজউদ্দীন আহমদ লিখছেন,

‘‘২-৩০ মিনিটে রেল স্টেশনে গেলাম খবরের কাগজের জন্য। লোকে খবরের কাগজের জন্য এমনভাবে দৌড়াচ্ছে , ভিড় করছে যে, সে ভিড় ঢাকার সিনেমা হলের থার্ড ক্লাসের কাউন্টারের ভিড়কে ছাড়িয়ে গেছে। মানুষের ওপর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। একজন আর একজনকে চেপে ধরছে। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। একের পায়ের নীচে অপরে চাপা পড়ছে। একজনকে মাড়িয়ে আরেকজন চেষ্টা করছে খবরের কাগজের একটু টুকরাও পেতে পারে কিনা। সেখানে যদি পাওয়া যায় এই লোকটির খবর। লোকটিকে এতদিন কি তারা সত্যই এতো ভালবেসেছিল? কোন কিছু পাওয়ার জন্য মানুষের এমন ভিড় আমি জীবনে আর দেখিনি। কি নিদারুণ চাহিদা কাগজের। আর কাগজের কি দাম!’’

মাত্র সাত বছর আগে মারা গেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই দিনেও ঢাকায় শোকার্ত মানুষের আচরণ মনে আছে তাজউদ্দীন আহমদের। সেই দিনের সাথে গান্ধীজীর হত্যাকান্ডের দিনের তুলনা করে তিনি লিখছেন, ‘‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের দিনের সংবাদপত্রের চাহিদা আর মূল্যের স্মৃতি আমার আছে। যে কাগজে সে দিনের মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত হয়েছিল, তখন পয়সা দিয়ে তার একটা পুরো কাগজ আমরা কিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু আজ পুরো কাগজ নয়। একজন আর একজনের সঙ্গে ভাগ করে কিনছে খবরের কাগজ। এমনি তার চাহিদা। এক ঘন্টার মধ্যে কাগজ সব শেষ হয়ে গেল। কোন কাগজ আর পাওয়া গেল না। তবু লোকের ভিড় কমল না। তারা অপেক্ষা করতে লাগল যেন আবার ট্রেনে কাগজ আসবে। তারই জন্য অপেক্ষা।’

বিড়লা হাউজ

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এবং ভারত নামে দুটি দেশ সৃষ্টির পর অনেক রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে যায়।

উত্তেজনা বিরাজ করে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে।

১৯৪৭ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর শেষবারের মত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী   দিল্লিতে আসেন। তখন শহরের বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থীরা অবস্থান করছিল। তাই তিনি অবস্থান নেন বিড়লা হাউজে। মহাত্মা গান্ধী দিল্লি আসেন কোলকাতা থেকে। সে সময় হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে অশান্তি চলছিল - সেটা থামিয়ে তিনি দিল্লিতে আসেন। কিন্তু দিল্লিতে এসে দেখলেন এখানে মুসলমানদের উপর হামলা হচ্ছে। তখন সিদ্ধান্ত নেন দিল্লিতে তিনি থেকে যাবেন। কলকাতায়  হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে মিল করেছিলেন বলে চেয়েছিলেন দিল্লিতেও  বিবদমান হিন্দু- মুসলমানকে মেলাতে।  শিখ এবং হিন্দুদের তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন মুসলমানদের উপর যেন হামলা না করে।

বিড়লা হাউজে তাঁর অফিস ছিল। রাজনীতিবিদরা ছাড়াও অনেক সাধারণ মানুষ আসতেন তাঁর সাথে দেখা করতে।

দাঙ্গার খবর গান্ধীজি নিজেও পাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর উপর হামলা হতে পারে এই আশঙ্কা করে কখনো তিনি কোন নিরাপত্তা রক্ষী রাখতেন না।

তিনি নিজে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ক্যাম্পে সশরীরে যেতেন পরিস্থিতি দেখতে।

মুসলমানদের উপর হামলা যখন একেবারেই থামছিল না, তখন  জানুয়ারির ১৩ তারিখে (১৯৪৮ সাল) অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন করার ঘোষণা দেন তিনি। ১৮ই জানুয়ারি বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বিড়লা হাউজে এসে তাকে আশ্বস্ত করেন যে মুসলমানদের উপর আর হামলা হবে না।

তাদের কথা বিশ্বাস করে তিনি ১৯ তারিখে অনশন ভঙ্গ করেন। কিন্তু এর দুই দিন পরেই বিড়লা হাউজে এক বোমা হামলা হয়। সেই হামলায় গান্ধীর কোন ক্ষতি হয়নি। এর আগেও কয়েকবার তাঁর ওপর হামলা করা হয়েছিল। কিন্তু গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ৩০শে জানুয়ারির লক্ষ্য ছিল নির্ভুল।

হত্যাকারির নীচু মাথা

সকাল ও সন্ধ্যায় প্রার্থনা সভা করতেন গান্ধীজি। সেখানে সব ধর্মের কথা বলা হতো, প্রতিদিন অংশ নিতেন কয়েক’শ মানুষ।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৪ টা ৫০ মিনিটে গান্ধীজি রুটিন মাফিক সর্বধর্মীয় প্রার্থনা সভায় বক্তব্য দিতে বের হন। তাকে বের করতেন দুজন তরুণী। এদের কাঁধে ভর দিয়ে বের হতেই নাথুরাম গডসে খুব কাছে থেকে গান্ধীজীকে রিভলবার থেকে  ৩টাগুলি করে। গুলি সরাসরি আঘাত করে মহাত্মাকে।  একটা গুলি তাঁর বুক ভেদ করে। দুটো গুলি বিদ্ধ করে তলপেট। নিদারুণ রক্তপাত হয় গান্ধীজির। ৩০ মিনিট পর বিড়লা ভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মহাত্মা।

নাথুরাম এক পাও নড়লেন না। পিস্তলের গুলি যাতে অন্য কাউকেও আহত না করে সেজন্য পিস্তলসহ হাত উঁচু করে ধরে রাখলেন যতক্ষণ না পুলিশ এসে তাকে নিয়ে গেলেন। 

গুলি ছোড়ার আগে গডসে মি. গান্ধীর দিকে ঝুঁকে প্রণাম করেন।

গান্ধী হত্যার দায়ে নাথুরাম গডসেকে ১৯৪৯ সালের ১৫ই নভেম্বর ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয় ।তার এক সহযোগী নারায়ন আপ্তেরও ফাঁসি হয়েছিল একই সঙ্গে।

দিল্লির লালকেল্লায় গান্ধী হত্যা মামলার বিচার চলার সময়ে নাথুরাম গডসে নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে তিনি দেশভাগের জন্য মহাত্মা গান্ধীকেই দায়ী বলে মনে করতেন।

নাথুরাম গডসে আদালতে বলেছিলেন ,‘গান্ধীজী দেশের জন্য যা করেছেন, আমি তাকে সম্মান করি। গুলি চালানোর আগে তাই আমি মাথা নীচু করে তাঁকে প্রণামও করেছিলাম।’

গডসে সমাচার

নাথুরাম গডসে (১৯১০-১৯৪৯) ভারতের বোম্বাই শহরের কাছে পুনায় জন্মগ্রহণ করেন। গডসে ছিলেন একজন উচ্চ শ্রেণির ব্রাহ্মণ এবং মারাঠি। হিন্দু ইতিহাস ও শাস্ত্র এবং তদানীন্তন ভারতীয় রাজনীতি সম্পর্কে ছিল তার গভীর জ্ঞান।  ছিলেন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ পত্রিকার সম্পাদক। কলেজ জীবন থেকেই তিনি  হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস এর ফ্লাটফর্মে কাজ করতন। হিন্দু মহাসভার কর্মীরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেহেরু ও মহাত্মা গান্ধীর নীতির সমর্থন করতো না।

১৯৪০ সালের পর মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে হিন্দু মহাসভার কর্মীরা কংগ্রেসের উপর অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে যাবার মুহূর্তে পুরো উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।এই হিন্দু মন-মানসিকতা ও চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত নাথুরাম গডসের বিশ্বাস, গান্ধী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সায় দিয়ে হিন্দুদের পুণ্যভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন।

গডসে বিশ্বাস করতেন, গান্ধী মুসলিম লীগ ও মুসলমানদের রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছেন। হিন্দু স্বার্থের চেয়ে তিনি মুসলিম স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

নাথুরাম গডসে মৃত্যুর একঘণ্টা আগে একটা উইল করে গিয়েছিলেন , যাতে তিনি বলেছিলেন,তার চিতা ভস্ম যেন গঙ্গায় না ফেলা হয়। যেদিন অখণ্ড ভারত পুনঃস্থাপিত হবে সেদিন যেন তার চিতা ভস্ম সিন্ধু নদীতে বিসর্জন দেয়া হয়। নাথুরামের পরিবারের কাছে এ ভস্ম রক্ষিত আছে। যতদিন অখণ্ড ভারত না হবে ততদিন এই ভস্ম বংশ পরম্পরায় রক্ষিত হবে।

হিংসার আগুন জ্বলছেই !

শিক্ষিত , ধর্মিয় আদর্শবাদি নাথুরামের  চাওয়া অখন্ড ভারত হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত। সেই ভারতেরই আজ জয়জয়কার। রাষ্ট্রক্ষমতায় ধর্মবাদি বিজেপি সরকার। ভোটের বুথ তো বটেই ক্রমশ দখল হয়ে যাচ্ছে বিদ্যায়তন আর চিন্তার জগত ধর্মিয় উম্মাদনায়। শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যাওয়া শক্তিমান হিন্দুত্ববাদি ধ্যান-ধারণাই কথিত প্রগতিশীলতাকে দুর্বল করে ফেলছে । গান্ধীজীর অহিংসার ধারণা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। এটা শুধু ভারতের রোগ নয় , গোটা পৃথিবীই এই হিংসার কর্কট রোগে আক্রান্ত।

ধর্মের নামে , উন্নয়নের নামে, ‘আমিই শ্রেষ্ঠ’-এই বিবেচনার তুলাদন্ডে মূলত হিংসাই এখন শত্রু নির্ধারণ করে তাকে নির্মুল করতেই বদ্ধ পরিকর।

তাই প্রশ্ন থাকছেই, মহাত্মা গান্ধীর অহিংসাবাদ কি তাঁর চন্দন কাঠ-ঘি আর সুগন্ধিমিশ্রিত চিতাভস্মের  সাথেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে!

শুভ কিবরিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
kibria34@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত শুভ কিবরিয়া এর সব লেখা
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad