আগে মেরুদণ্ডটা ঠিক করুন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

আগে মেরুদণ্ডটা ঠিক করুন

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৫:০৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৮

print
আগে মেরুদণ্ডটা ঠিক করুন

এই মুহুর্তে দেশে তুমুল আলোচিত সমালোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারী খালেদা জিয়ার বিরূদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার জন্য অপেক্ষমান রায়, মন্ত্রীসভায় ডিজিটাল আইন ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন, জেষ্ঠতা লংঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং এই ঘটনায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহাব মিঞার পদত্যাগ, চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আবারও একের পর এক ফাঁসের ঘটনা।

উল্লেখিত ঘটনাগুলোর প্রত্যেকটিই বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশী ভাবাচ্ছে অব্যহত প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। কারণ আজকের শিশু কিংবা শিক্ষার্থীরাইতো আগামীর বিচারপতি, রাজনীতিবিদ কিংবা প্রথিতযশা সাংবাদিক। বীজে গলদ রেখে স্বাথ্যবান বৃক্ষ কিংবা ফল কোনটাই সম্ভব নয়।

নেলসন ম্যান্ডেলার একটা বিখ্যাত উক্তি আছে- ‘শিক্ষা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা আপনি বিশ্বকে পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন’। শিক্ষাটা-ই না কি জাতির মেরুদন্ড। আমাদের সেই মেরুদন্ড আজ পুরোপুরি ভেঙে ফেলার পথে। এই কথা বললে কি খুব বেশী বলা হবে?

মেডিকেল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরীর যে কোন নিয়োগ পরীক্ষা, এইচএসসি, এসএসসি, জেএসসি, এমন কি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বাদ যায়নি ফাঁস হওয়ার ঘটনা থেকে কোনটিই। শুধু কি তাই? প্রথম শ্রেনীর একেবারে অবুঝ শিশুদের পরীক্ষার প্রশ্নও এখন মিলে যায় পরীক্ষার আগের রাতে।

দীর্ঘদিন ধরে এ ধরণের ভয়াবহ অভিযোগ এবং তার সত্যতা মিলতে থাকলেও কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষা মন্ত্রনালয় ছিলো উদাসীন। শুধু উদাসীন নয়, ছিলো তা পুরোপুরি অস্বীকার করার এক ধরণের অসুস্থ প্রবণতা। বিষয়টা এমন হয়ে উঠেছিলো যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগগুলো যারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়েছেন তাদেরকেই উল্টো অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছিলো।

রোগটি যখন মহামারী আকার ধারণ করলো এক সময় আমাদের কর্তাব্যক্তিরা অস্বীকারের অপরাধমূলক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিতান্তই বাধ্য হয়ে বলা শুরু করলেন- সরকারকে বিব্রত করতেই এইসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। আর স্বীকার যখন করেই ফেললেন তখন পদক্ষেপতো কিছুটা নিতেই হয়। ডায়াগনোসিসটা জানা থাকলেও মন্ত্রনালয় কিংবা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এখনও পুরোপুরি উড়ে গেলো না। নিলেন হঠকারী কিছু সিদ্ধান্ত।

পরীক্ষা শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকে পরীক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত কোচিং সেন্টারগুলো সাময়িক বন্ধ রেখে, অবস্থা বুঝে সীমিত সময়ের জন্য ফেসবুক বন্ধ রেখে অথবা পরীক্ষা শুরুর আধা ঘন্টা আগে পরীক্ষার্থীদেরকে কেন্দ্রে ঢুকিয়ে যে প্রশ্নফাঁসের মহামারী থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না তা আগেও বলেছি অন্য লেখায়। এবং তা-ই প্রমাণিত হলো।

এবারও পরীক্ষার প্রথম দিন থেকে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের। কোন কোন অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেলো। যথারীতি এবারও শিক্ষামন্ত্রী বললেন, ‘মূলত এর লক্ষ্য হলো সরকার বা মন্ত্রনালয়কে মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা’।

‘কোচিং সেন্টারগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের আখড়া’, একথা শিক্ষামন্ত্রীর নিজের। বছর দুয়েক আগে তিনি এও বলেছেন, “দেশে এখন ৩২ হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে”। প্রায় সাত/ আট বছর আগে আমার নেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকার সব সময় আন্তরিক। তবে একদিনে বা রাতারাতি তা বন্ধ করা যাবে না।” সেই রাত কিংবা দিন আজ অবধি আসেনি।

যেসব কোচিং সেন্টার প্রশ্ন ফাঁস করে আসছে তাদের নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য তাদের কার্যালয় বন্ধ রাখার কোন প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন তাদের হাতে এলে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগ টাকার বিনিময়ে সেগুলো ছড়িয়ে দিতে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়।

পাশাপাশি অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও ফেসবুক বন্ধ রাখার বিষয়টিও সুবিবেচনাপ্রসুত ছিলো না। ফেসবুকের মাধ্যমেতো আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না। ফাঁস হয় যাদের মাধ্যমে সেই অপরাধী চক্রের উৎসমূল স্পর্শ করতে পারেননি উপরওয়ালারা, অপরাধচক্র এবং এর গডফাদারদের এখনও যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে এখন পর্যন্ত হাতে গোনা যে ক’জনকে আটক করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি।

পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় তদারক কমিটির গত রোববারের সভাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বললেন, ‘তারা ধরা পড়বেই। এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র’। সেই ‘সময়’ কবে আসবে আমরা জানি না। আমার মতে, জঙ্গিদের চেয়ে অনেক বেশী ভয়ঙ্কর প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা। তাদের নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত হলেও জঙ্গিদের মতো শক্তিশালী নয় নিশ্চয়। দুর্ধষ জঙ্গিদের আস্তানা যদি একে একে গুড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয় তবে কেনো এতোদিনেও প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী গডফাদারদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। মূল বিষয়টা হলো আন্তরিকতার। সেখানে ঘাটতি থাকলে কোন উদ্দেশ্যই সফল হয় না।

এদেশে শিক্ষা পুরোপুরি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে হয়ে আগেই। মোটা অঙ্কের অর্থে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বা বড় বড় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে বাধ্য হওয়া, টাকা দিয়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষায় সন্তানের অবতীর্ণ হওয়া, অনৈতিক বাণিজ্য করা কোচিং সেন্টারগুলোর দৌরাত্ম, অসাধু শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্তপক্ষের অস্বীকার, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের নৈরাজ্য সৃষ্টি, হালুয়া রুটির উচ্ছিষ্ট ভোগের প্রতিযোগিতায় এক শ্রেণীর শিক্ষকের দালালী আর মাস্তানী, রাজনৈতিক সমীকরণে কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দেয়, আদালতের কাঠগড়া থেকে রেহাই দেয়া হবে কাকে?

এতো কিছুর পরও না কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন সাধন হয়েছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার আর জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তির সূচকের কাটা যে আকাশচুম্বি তাতে আতঙ্কিত শিক্ষাবিদরা। এসএসসি আর এইচএসসির দুটোতেই জিপিএ ফাইভ পেয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দুই নম্বর পায় সেখানে শিক্ষাবিদদের কপালের ভাঁজতো একটু বেশী হওয়ারই কথা।

তারা বারবার বলছেন, জিপিএ ফাইভ এবং পাশের হার এতো বেশী হওয়ার মতো অবস্থায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও পৌঁছায়নি। উপর থেকে পরীক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা থাকে উত্তপত্র মূল্যায়নের সময় যেনো হাত খুলে নম্বর দেয়া হয়, পশের জন্য কেউ প্রয়োজনীয় নম্বর না পেলে তাকে যেনো পাশ করিয়ে দেয়া হয়। তবে এ ধরনের নির্দেশনার কোন লিখিত পত্র দেয়া হয় না, বলা হয় মৌখিকভাবে।

পরীক্ষায় পাশের হার আর ফলের মান বাড়াতে পরীক্ষকদের যে অনৈতিক নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে খোদ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে, সেখানে আদর্শবোধসম্পন্ন শিক্ষক ধাকলেও তাতে জাতির উন্নতি হবে কতোখানি? এককভাবে শিক্ষকদের উপর দোষ চাপিয়ে কোন লাভ হবে না যেখানে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ।

কৃষিতে বাম্পার ফলনের মতো আমরা কি শিক্ষায়ও বাম্পার ফলনের প্রতিযোগিতায় নেমেছি? রাজনীতি কিংবা কৃষিক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ব্যবস্থাতেও হাইব্রীড ফলন যোগ করতে চাইছি? সবকিছুর হাইব্রীড কিংবা বাম্পার ফলন ভাল নয় নিশ্চয়। বরং তা ভয়ঙ্কর অভিশাপ হয়ে উঠছে পুরো জাতির জন্য।

বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বড় বড় সড়ক নির্মাণ, হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যু উৎপাদন, তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন, এর সবকিছুরই আমাদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সবকিছুর আগে প্রয়োজন আমাদের সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা। হাত-পা-চোখ সব ঠিক থাকলেও মেরুদন্ডটাই যদি অকেজো থেকে যায় তবে পথে নামা যাবে কেমন করে?

কেউ কেউ বলেন এদেশে আগে প্রয়োজন কৃষি এবং শ্রমিক বান্ধব একটা সরকার, কেউ বলেন একটি সভ্য আর আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে প্রয়োজন গণতন্ত্র, কেউ বলেন আগে প্রয়োজন মত প্রকাশের স্বাধীনতা। সবকিছুর সমাধানে আর এক পন্ডিত ব্যক্তি জর্জ ওয়াশিংটন বলে গেছেন, ‘শিক্ষা সেই চাবি যা দ্বারা স্বাধীনতার সুবর্ণ দরজা খুলতে হয়’।

মঞ্জুরুল আলম পান্না: সাংবাদিক
monjurpanna777@gmail.com

 

 
মতান্তরে প্রকাশিত মঞ্জুরুল আলম পান্না এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad