‘ফাঁস’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

‘ফাঁস’

শেগুফতা শারমিন ৫:২৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮

print
‘ফাঁস’

আঁটুনি বজ্রই ছিল। কিন্তু গেরো যে ফস্কে গেল! পরীক্ষা হবে পরীক্ষা । তার কতরকম প্রস্তুতি। ঢাক ঢোল কত বাজলো। প্রস্তুতির ঘোষণায়। পরীক্ষার প্রস্তুতি মানে তো পড়াশোনা। কিন্তু না। এ প্রস্তুুতি সে প্রস্তুতি না। শুধু পড়লেই যে এখন আর পরীক্ষা পার হওয়া যায়না। অথবা পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বলা যায়, না পড়লেও পরীক্ষা পাশ হওয়া যায়। কারণ পাশের হার বাড়ানো এক বিরাট দায়িত্ত¡ বড়দের।

ছোটদের পরীক্ষা পার হতে পড়তে হবে না। তাইলে প্রস্তুতি কিসের? প্রস্তুতি বড়দের। পরীক্ষাকে সুষ্ঠুভাবে হতে দেয়ার পরীক্ষায় পার হতে বড়দের প্রস্তুতিরও সীমা ছিলনা। কোচিং বন্ধ, আধা ঘন্টা আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে হবে। এরকম কতশত বুদ্ধি পরামর্শ কাজে লাগিয়েও এ যাত্রা বুঝি পার হওয়া গেলনা। ঘুরেফিরে সেই পুরান খবর। পুরান খবরের প্রথম পর্যায়ে আছি আমরা এখন পর্যন্ত। যেখানে কিনা সচিত্র বর্ণণা দেয়া হচ্ছে যে, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এর পরের পর্যায় খবর আসবে, দায়িত্বশীলরা অস্বীকার করেছেন। এবং তার পরের পর্যায় রিপিট হবে যে, কোথাও প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। সব মিডিয়ার সৃষ্টি।

শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। দু’মাস পরে এইচএসসি। ঘটনাক্রম দুঃখজনকভাবে একই। অন্ততঃ গত কয় বছর তাই চলছে। এর সাথে আছে হালের বাড়তি দুই যন্ত্রণা জেএসসি, পিএসসি। সেখানেও একই ঘটনা। এমনকি ভর্তি পরীক্ষা, চাকুরীর পরীক্ষা সর্বত্র ঘটনা এক। প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রশ্নই যখন ফাঁস হয়। তাইলে এত পরীক্ষারই কি দরকার? শুধু শুধু রাষ্ট্রীয় খরচ বাড়ানো! রাষ্ট্রের খরচ বাড়ে, মানুষের স্ট্রেস বাড়ে, রাস্তায় জ্যাম বাড়ে, শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা বাড়ে, কারো কারো পকেটের সাইজ বাড়ে। বাড়েনা শুধু নৈতিকতা। বাড়েনা দায়িত্ববোধ। বাড়েনা তাদের যারা দায়িত্বে থাকেন।

একটা মানুষের সারা জীবনের কোথায় কাজে লাগে পিএসসি জেএসসি নামক পরীক্ষার প্রহসনের সনদ, জানিনা। কেউ জানলে, জানতে চাই। এসএসসি বা এইচএসসিরই এই গণ জিপিএ ফাইভ পেয়ে কি লাভ হয়, কে জানে! এই যে এত এত পরীক্ষা। এত এত জি পি এ ফাইভ পাওয়া ছেলেমেয়ে। কয়জন এর ভেতর থেকে জীবনের পরীক্ষায় পাশ করার মতো সক্ষম হয়ে গড়ে ওঠে? উঠতে বসতে চলতে ফিরতে যে পরীক্ষার সন্মূখীন হতে হয় প্রতিদিন, সে পরীক্ষায় পাশ করার কৌশল শেখা যায় কোন স্কুলে?

সামগ্রিকভাবেই আমাদের শিক্ষা জীবনমুখী নয়। পরীক্ষার পর কাগজের সনদ পাওয়ার এই শিক্ষার দৌড়ে এখন সবচেয়ে বড় দৌড় পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পত্র পাওয়া। সরকার ব্যর্থ প্রচন্ডভাবে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া ঠেকাতে। এটা দুঃখের। এর চেয়েও বড় দুঃখের, বড় আতঙ্কের জায়গা হলো আমাদের মানসিকতা। অভিভাবকদের নৈতিকতা। হয়তো সবাই নয়, হয়তো গুটিকতক। যারা এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের ক্রেতা।

কেউ স্বীকার করবেনা, প্রশ্ন কেনে। কিন্তু প্রশ্ন বিক্রি হয়, এটা সত্য। ৯০ এর আগে এদেশে পরীক্ষার সময় হতো নকলের উৎসব। পরীক্ষার্থী ভেতরে পরীক্ষা দিত আর অভিভাবকরা বাইরে থেকে ব্যস্ত থাকতেন নকল সাপ্লাই দিতে। সে দিন চলে গিয়েছিল । গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর পর। এরপর আবার গত ৮/৯ বছর যাবৎ চলছে আরেক নতুন জোয়ার। প্রশ্ন পাও, উত্তর মেলাও, পরীক্ষা দাও। এখানেও ছাত্রের সাথে ব্যস্ত অভিভাবক ।

সামগ্রিক শিক্ষার সিলেবাসে নৈতিকতা অনুপস্থিত, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এজন্য কারো কিছু যায় আসেনা। অদৃশ্য গোষ্ঠী প্রশ্ন ফাঁস করে। দৃশ্যমান প্রশ্ন বানিজ্য হয়। মন্ত্রী শান্ত্রীরা দেখেও দেখেনা। অভিভাবকরা প্রশ্ন খোঁজে, প্রশ্ন কিনে। সেই ফাস হওয়া প্রশ্ন মিলিয়ে পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। পাশের হার বাড়ে। এ প্লাস বাড়ে। নৈতিকতা বাড়েনা। দিন দিন হারিয়ে যায়। কোথায় কোন অজানায়।

এরকম এক আমূল অনৈতিক শিক্ষা কাঠামো শেষমেষ কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবে ভেবে না পাই কুল। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের এই সংস্কৃতি আমাদের জাতির জীবনে যে বিরাট ফাঁস পড়িয়ে দিচ্ছে, তা কেটে বের হওয়ার নৈতিক সামর্থ্যটা আর অবশিষ্ট আছে কিনা, সন্দেহ!

শেগুফতা শারমিন: কলাম লেখক, উন্নয়নকর্মী।
shegufta@yahoo.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত শেগুফতা শারমিন এর সব লেখা
 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad