সচিবালয়ে বসার জায়গা নিয়ে ক্ষুব্ধ ২ শতাধিক কর্মকর্তা

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

সচিবালয়ে বসার জায়গা নিয়ে ক্ষুব্ধ ২ শতাধিক কর্মকর্তা

শাহাদৎ স্বপন ৮:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৭

print
সচিবালয়ে বসার জায়গা নিয়ে ক্ষুব্ধ ২ শতাধিক কর্মকর্তা

ঢাকার বাইরে বিশাল বাংলো, হাজারো প্রটোকল। জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ডিসির সম্মান একটু আলাদাই। সেই তিনিই বদলি হয়ে এখন সচিবালয়ে। অথচ বসবার একটি আসনের জন্য তাকে প্রতিদিন তীর্থের কাকের মতো প্রহর গুণতে হচ্ছে।বাংলাদেশে সচিবালয়ে সহকারী সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব এমনকি সিনিয়র অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বসার জায়গা সংকুলান না হওয়ায় তাদের মাঝে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ।

.

বর্তমানে এ অসন্তোষ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। ক্যাডার ও নন ক্যাডার অফিসারদের মাঝেও বেড়েছে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে এখন বসার আসন নিয়ে অন্তত দুই শতাধিক কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ফাইলও সই হতে লেগে যাচ্ছে মাসের পর মাস।

এসব নিয়ে প্রায় প্রতিদিনিই এক কর্মকর্তার অগোচরে আরেক কর্মকর্তাকে বিষোদগার করতে দেখা যায়।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ডিএস (উপসচিব) পদে বদলি হয়ে আসা মো. জাহেদুল জামান তিন মাসেও তার বসার জায়গা পাননি। অধঃস্তন কর্মকর্তারা বাইরে গেলে সেখানে বসে দাফতরিক কাজ করেন তিনি। সেটিও সম্ভব না হলে মন্ত্রণালয়ের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসতে হচ্ছে এ কর্মকর্তাকে।

একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব কাজী মো. মাইনুদ্দিনও বসার নির্দিষ্ট আসন পাননি। তাদেরই ‘ভাগ্য’ পেয়েছেন সহকারী সচিব পদ মর্যাদার মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রধান বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস, তারও নেই বসার কোনো জায়গা।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধি শাখার দায়িত্বে থাকা ডিএস মো. রবিউল ইসলামের (উপ-সচিব পদ মর্যাদা) অধীনে থাকা দু’জন সহকারী সচিবকে বসার জায়গা দিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। তারা হলেন- তাহমিনা জাকারিয়া ও মনিরুল ইসলাম।

এমনকি এ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক কর্মকর্তা, দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা কোনো রকমে দুটি চেয়ার পেতে বসতে পারছেন।

একই মন্ত্রণালয়ের আইন অধি শাখায় ৭ জন নতুন উপসচিব পদের বিপরীতে যোগদান করেছেন মাত্র একজন। নতুন আসা এই কর্মকর্তার বসার জায়গা নেই উক্ত শাখায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাখাটির এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘একজন আসার পরই ত্রাহি অবস্থা। বাকি ৬ জন যোগদান করলে কি হবে, আল্লাহই ভালো জানেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বিভাগের আরেক কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমি ১৫ বছর আগে এ শাখায় নিয়োগ পাই। তখন এ রুমে একাই বসতাম। এখন খেয়াল করে দেখুন, রুমটিতে আমরা ৮ জন বসি। জনবল বৃদ্ধির সঙ্গে বসার জায়গা না বাড়ায় আমরা বেশ আতঙ্কিতই বলা চলে।’

শিক্ষা মন্ত্রণায়ের অবস্থাও একই। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ হোসেন ও যুগ্ম সচিব জয়নুল বারীকে দীর্ঘদিন বসার জায়গা দিতে না পেরে সম্প্রতি একটি আপদকালীন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক রুমের মধ্যে গ্লাসের পার্টিশানের দু’পাশে তারা বসছেন। সিনিয়র সহকারী সচিব জান্নাতুল ফাতেমা ও আবু কাইসারকেও একই পন্থায় বসার জায়গা করে দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক সময় ক্যাডার কর্মকর্তাদের আগমনে সরিয়ে দেওয়া হয় নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের। সম পদ মর্যাদায় থাকার পরও আসন ছেড়ে দেওয়া নিয়ে দুই ক্যাডার কর্মকর্তাদের সম্পর্কে চিড় ধরে। কখনো কখনো তা প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বসার জায়গা না পাওয়া এক কর্মকর্তার কাছে অফিসের ফাইল প্রশাসন শাখা থেকে স্বাক্ষরে জন্য উপস্থাপন করা হলে তিনি সেই কর্মচারীকে ফিরিয়ে দেন। সঙ্গে এও বলেন, ‘আমি কি রাস্তায় রাস্তায় ফাইল সই করব?’

সচিবালয়ের আসন সমস্যা নিয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর অভিযোগ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অবহেলার কারণেই এই সংকট দিনকে দিন তীব্র হচ্ছে।

কিন্তু, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-সচিব জুবাইদা নাসরিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘কোন কর্মকর্তা কোথায় বসবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। আমাদের ঘাঁড়ে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই।’

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর দায়িত্ব কার?- এমন প্রশ্নের জবাবে বদলি দায়িত্বে থাকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আলিয়া মেহের পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘প্রত্যেক কর্মকর্তার বসার জায়গা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের। তবে এক্ষেত্রে কোনো সহায়তা চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তা করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমি নিজেও ভূমি মন্ত্রণালয়ে থাকতে ৬ মাস বসার জায়গা পাইনি। কিন্তু, দাফতরিক কাজ তো থেমে থাকেনি।’

এ ঘটনায় কর্মকর্তাদের পারস্পারিক সম্পর্কে চিড় ধরছে কিনা এমন প্রশ্নে আলিয়া মেহের বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাইছি না। সম্পর্ক তো নির্ভর করে আপনি আমার সঙ্গে কিভাবে রক্ষা করতে চাচ্ছেন, তার ওপর। তবে বড় বিষয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ডিমান্ড নোট দেওয়ার পরই আমরা তাদের ওখানে জনবল দিয়ে থাকি। বিষয়গুলো সমাধানের জন্য আরো সময় প্রয়োজন।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত তিন মাসে ৩১ সহকারী সচিবকে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। ১২ জনকে ২০১৫ সালের গ্রেড-৬ এ পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে মন্ত্রণালয়গুলোতে ১১ জন সহকারী সচিব পদে সচিবালয়ে নিযুক্ত করা হয়েছে।

গেল তিন মাসে ৯৩ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে অন্তঃমন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক অপেক্ষমাণকাল হিসেবে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের সিনিয়র সহাকারী সচিব মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইনকে। নতুন করে সিনিয়র সহাকারী সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪ কর্মকর্তাকে।

সচিবালয়ে অবস্থিত বেশ ক’টি ভবনে প্রায় ৪৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অফিস রয়েছে, যেখানে মন্ত্রী, সচিবসহ অধঃস্তন কর্মকর্তারা প্রতিদিন দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কিন্তু, দেশের সর্বোচ্চ এ প্রশাসনিক দফতরে এমন গাদাগাদি অবস্থায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।

এসএস/আইএম

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad