নির্বাচনে দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি পাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৮ সদস্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৭ | ৯ ভাদ্র ১৪২৪

নির্বাচনে দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি পাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৮ সদস্য

মো. হুমায়ূন কবীর ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০১৭

print
নির্বাচনে দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি পাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৮ সদস্য

যেকোনো মূল্যে নিজেদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে চায় কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কোনোভাবেই বিতর্কে জড়াতে চাচ্ছেন না তারা। নিজেদের বিতর্কমুক্ত রাখতে যেকোনো পদক্ষেপ নেবে কমিশন।

জাতীয় বা স্থানীয় যেকোনো নির্বাচনে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ইসি। এমনকি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলোর কোনো সদস্যের গাফিলতিও সহ্য করবে না সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

এরই অংশ হিসেবে মেহেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে দুটি কেন্দ্র দখল ও জোরপূর্বক জালভোট দেওয়ার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৮ জন সদস্যের বিরুদ্ধে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

সূত্র জানায়, ইসির পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছে ইসি।

এছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ও সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার একটি ওয়ার্ডে উপনির্বাচনে সহিংসতার ঘটনাও তদন্ত করছেন কমিশন কর্মকর্তারা।

সূত্র আরো জানায়, বিগত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীনর কমিশনের আমলে যেভাবে ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছিল, চেষ্টা করার পরও সেই সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছে না নতুন কমিশন। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরও মেহেরপুর পৌরসভা নির্বাচনের আগের রাতে দুটি কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটে।

বিষয়টি নিয়ে খুবই চিন্তিত বর্তমান কমিশন এবং এই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজছে তারা। পাশাপাশি আগামী যেকোনো নির্বাচনে যাতে এসব ঘটনা না ঘটে তার জন্য কঠোর হবে কমিশন।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর জেলার মেহেরপুর পৌরসভায় ২৫ এপ্রিল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান (রিটন)। কেন্দ্র দখল ও জোর করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার অভিযোগ এনে ওই নির্বাচন বয়কট করেন বিএনপির প্রার্থী ও পৌর বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস।

ওই নির্বাচনের দিন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটগ্রহণ চলাকালে সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের মেহেরপুর-১ (পুরুষ) এবং একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত মেহেরপুর-২ (মহিলা) কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়। অর্থাৎ ওই দুই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

অভিযোগ ছিল, ভোটের আগের রাতে ওই কেন্দ্র দুটিতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনায় কমিশনের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। এতে ওই দুই কেন্দ্রের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে ‘কর্তব্য পালনে চরমতম অবহেলা প্রদর্শনের’ প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি।


ইসির নির্বাচন পরিচালনা-২ শাখার উপসচিব মো. নুরুজ্জামান তালুকদার স্বাক্ষরিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে রোববার পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘দুই কেন্দ্রে এত বিপুল সংখ্যক ফোর্সের উপস্থিতিতে বহিরাগতরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যালট পেপার ছিনতাই এবং জোরপূর্বক সিল মারার ঘটনায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা কর্তব্যে চরমতম অবহেলা প্রদর্শন করেছেন।’

এতে বলা হয়, ‘যেহেতু নির্বাচনকালীন নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১ অনুযায়ী নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিকট ন্যস্ত ছিল এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব চরমতম অবহেলা প্রদর্শন করেছেন, সেহেতু উক্ত আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী ২৫ এপ্রিল ২০১৭ তারিখ মেহেরপুর পৌরসভার সাধারণ নির্বাচনে বন্ধ ঘোষিত ভোটকেন্দ্র দুটিতে মোতায়েনকৃত পুলিশ সুপার কর্তৃক প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকল পুলিশ সদস্যদের এবং সংশ্লিষ্ট আনসার-ভিডিপি কার্যালয় হতে আনসার সদস্যদের তালিকা সংগ্রহ পূর্বক তাদের সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার জন্য নির্দেশিত হয়ে অনুরোধ করা হলো।’

নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে চাকুরি বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টকে চাকরি থেকে অপসারণ, বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসর বা পদানবতি বা তার বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখতে পারবে।


মেহেরপুর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মেহেরপুর-১ কেন্দ্রে একজন এসআই, তিনজন এএসআইসহ ১৪ জন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য, লাঠিসহ ১৫ জন আনসার (মহিলা-৮ জন, পুরুষ-৭ জন) সব মিলিয়ে ওই কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন ২৯জন।

একইহারে মেহেরপুর-২ কেন্দ্রেও একজন এসআই, তিনজন এএসআইসহ ১৪ জন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য, ১৫ জন লাঠিসহ আনসার (মহিলা-৮ জন, পুরুষ-৭ জন) সদস্যসহ মোট ২৯ জন দায়িত্বে ছিলেন।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে ছোট-বড় সব নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের স্বার্থে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোনো অভিযোগ পেলেই তদন্ত করছি। এরই মধ্যে মেহেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে অনিয়মের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি।

এইচকে/এমএসআই

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad