ইবনে সিনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্তে দুদক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪

ইবনে সিনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্তে দুদক

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৮:০০ পূর্বাহ্ণ, মে ১৯, ২০১৭

print
ইবনে সিনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্তে দুদক

ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালসহ রাজধানীর নামী-দামী ডজন খানেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন, নিম্মমানের টেস্ট, মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহার ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় উচ্চমূল্য আদায়ের অভিযোগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই শোনা যায়।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়ন (র‌্যাব) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযানকালে এসব অনিয়ম বারবার ধরাও পড়েছে। অনিয়ম করার অভিযোগে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে লাখ-লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমান অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগটি অনুসন্ধানের ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। দুদকের উপ-পরিচালক শামসুল আলমকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এবং পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বলেন, রাজধানীর ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালসহ বেশ কয়েক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দুদক জমা পড়েছে। অভিযোগ অনুসন্ধান করতে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধানী টিম অভিযুক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালগুলোর নথিপত্র যাচাই-বাচাই করবেন।

অনুসন্ধানকারী টিম প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের মালিকের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে সকল কার্যাদি সম্পন্ন করবেন। আগামী সপ্তাহ থেকে অনুসন্ধানী টিম অভিযুক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করতে শুরু করবেন। দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে সরকারি কয়েকটি সংস্থার ছাড়পত্র পাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাজধানীর নামী-দামীসহ অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে এবং অনুমোদন না নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল, আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, গ্রিনলাইফ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, লুবনা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিনশিন জাপান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্রিসেন্ট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ উত্তরায় বেশ কয়েকটি নামী-দামী হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার বিভিন্ন বিভাগের ছাড়পত্র জাল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ব্যবসা চালাচ্ছেন।

এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, তাদের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক টেস্ট রিপোর্ট দায়সারাভাবে তৈরি পর চিকিৎসকের সিলমোহর মেরে সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নামে ভুয়া সিল ব্যবহার করে রিপোর্ট দেওয়া হয়। আবার চিকিৎসক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না, শুধুমাত্র মাসোহারার ভিত্তিতে সাদা প্যাডে স্বাক্ষর করে দেন। যা পরবর্তীতে রোগ নির্ণয় পরীক্ষা এসব প্যাড ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া নাম ও পদবী ব্যবহার করে টেকনিশিয়ানরা টেস্ট রিপোর্ট তৈরি করে সরবরাহ করেন এবং মেয়াদোত্তীর্ণক্যামিকেল ব্যবহার করে মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করা হয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে নিজেরা লাভবান হতে চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে মানুষ হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

চিকিৎসার নামে মানুষ অপচিকিৎসার কবলে পড়ছেন। ভুল টেস্টের কারণে মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। অনেক হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিও নেই। ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশে ছুটে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এসব কর্মকাণ্ড চলছে। এসব কার্যকলাপে সহযোগীতা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কোটি-কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের মালিকরা নানা ফন্দিফিকির করে কয়েক বছরের শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল মালিকরা তাদের উপার্জিত কোটি-কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করছেন এবং পাচারকৃত অর্থে দেশের বাইরে বাড়ি-গাড়ি ক্রয় করছেন। অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তারা একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও দামী গাড়ি কিনেছেন।

২০১৫ সাল পর্যন্ত রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার লাইসেন্স চেয়ে স্বাস্ব্য অধিদপ্তরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার আবেদন জমা পড়ে। অবশ্য অনেক আবেদনকারীই পরে আর যোগাযোগ করেননি। স্বাস্ব্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ও এর আশপাশে ৮৭৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ৬১০টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ ১ হাজার ৪৮৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে।

এফএ/এএস

print
 

আলোচিত সংবাদ