বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতিতে কী আছে

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০১৭ | ৮ ভাদ্র ১৪২৪

বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতিতে কী আছে

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০১৭

print
বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতিতে কী আছে

বাংলাদেশ ও ভুটান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সংহত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ ছাড়া পারস্পরিক স্বার্থে বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ খাতে সহযোগিতা জোরদারে দ্বিপক্ষীয় ও উপ-আঞ্চলিকভাবে কাজ করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

ভুটানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষে বৃহস্পতিবার যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এই অঞ্চল ও বিশ্বের বৃহত্তর শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য দুই দেশ একত্রে কাজ করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

২৬-দফা বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাসো তেরেসিং তোবগে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থে বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

১. ভুটানের প্রধানমস্ত্রী শেরিং তোবগের আমন্ত্রণে গত ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুটান সফরে যান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মোহাম্মদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীসহ সরকারের উচ্চ পর্যা্য়ের অন্যান্য কর্মকর্তারা।

২. প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুইদেশের ঐতিহ্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে তাৎপর্যাপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৩. প্যারো আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে আসেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এসময় স্কুলের ১০০ শিক্ষার্থী তাকে অভিনন্দন জানান।

৪. প্রধানমন্ত্রীকে পাহারার মাধ্যমে তাসিচোড জঙ্গ রাজকীয় প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়। তাসিচোড জঙ্গ প্রাসাদের মূল ফটকে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।

৫. এরপর ১৯ এপ্রিল দেশটির রাজা ও রাণীর আমন্ত্রণে লাঙ্কানা প্যালেসে নৈশভোজে অংশ নেন।

৬. ১৮ এপ্রিল ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের শান্তি, সামষ্টিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য জন্য পরস্পরকে অনুপ্রেরণা দেয়া হয়।

৭. বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্তর্জাতিক দেশ হিসেবে প্রথমে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৮. এ সময় তার সরকারের উদ্যোগে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতির জন্য ভুটানের সহযোগিতা কামনা করেন। এ সময় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিতে সম্মতি জানিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেন।

৯. ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের সোনার বাংলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণার কথা স্মরণ করেন।

১০. দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই বাংলাদেশ এবং ভুটানের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকার কথা স্মরণ করেন। যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং দেশটির রাজা জিগমে ডোরজি ওয়াংচুক এই সম্পর্কে নেতৃত্ব দেন। দুই দেশের সরকার প্রধান প্রতিবেশি দেশ হিসেবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় থাকায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ভবিষ্যতে দুই দেশের প্রয়োজনে টিকিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। তারা জলবিদ্যুৎ পানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটন সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি ও কৃষিতে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা করেন।

১১. ভবিষ্যতে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদারের জন্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদেশে তামাবিল-ডাউকি, নাকুয়াগাঁও-ডালু, গোবরাকুরা এবং করইতলি-গাসুয়াপারানডিতে ভূমি কাস্টমস স্টেশন করার জন্য ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেন। এ স্টেশনের মাধ্যমে সরাসরি লাইম স্টোন পাউডার, জিপসাম এবং ক্যালসিয়াম কার্বনেট বাংলাদেশে রপ্তানি করা যাবে যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো মজবুত হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, সিরামিকস, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়ার পণ্য কৃষিপণ্য ভুটানে রফতানির প্রস্তাব দিয়েছে। ভুটান এসব পণ্য নেওয়ার জন্য সম্মতি জানিয়েছে। তারা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্মত হয়েছেন।

১২. দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ট্রান্সপোর্টেশন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পানিপথে কার্গো ব্যবহারের জন্য চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর ব্যবহার করার সমর্থন দেন। এতে করে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরো ক্ষেত্র তৈরি হবে।

১৩. দুই প্রধানমন্ত্রী সাব-রিজিওনাল সমন্বয়ের জন্য এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ, ওয়াটার রিসোর্স এবং দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের গুরুত্বের উপর জোর দেন। তারা বাংলাদেশ, ভুটান এবং ভারতের মধ্যে ফাইবার অপটিক কানেক্টিভিটির বিষয়টি উত্থাপন করেন। ভুটান, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সাব রিজিওনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করা হয়। পরবর্তীতে তিন দেশের প্রধানরা এ বিষয়ে একটি চুক্তি করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

১৪. বিদ্যুৎ, পানি সম্পদ ও পারস্পরিক সুবিধার জন্য সংযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সুবিধার উপর গুরুত্ব দেন দুই প্রধানমন্ত্রী। হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার ফিল্ডে ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটান এর মধ্যে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় এমওইউ-কে দুপক্ষই স্বাগত জানায়। তিন নেতার মধ্যে পরবর্তী সাক্ষাতে এই এমওইউটি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

১৫. দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ভুটান মোটরযান চুক্তির গুরুত্বকে স্বীকার করেছেন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যও দুজন আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন।

১৬. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে ১-৫ এপ্রিল, ২০১৭ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩৬তম আইপিইউ সম্মেলনের সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানান। দুদেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের সংসদ সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও নিয়মিত দেখা সাক্ষাতের বিষয়টাতে আনন্দিত হয়েছেন।

১৭. দুই পক্ষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোট বিমসটেক, সার্ক ও জাতিসংঘে একে অন্যকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেছেন। বৃহত্তর শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে একসাথে কাজ করে যাওয়ার আশাবাদ জানিয়েছেন।

১৮. নিজেদের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যোগাযোগের বিষয়টির কথা উল্লেখ করে দুপক্ষই নিজেদের মধ্যে পর্যটন সেক্টর বিকশিত করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে একমত হন।

১৯. ভুটানের স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন এবং বিনামূল্যে ঔষধ ও টীকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুটানের চতুর্থ রাজার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

২০. বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বিশেষ করে চিকিৎসা খাতে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুটানি ছাত্রদের সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাখাতে সহায়তা অব্যহত রাখাসহ ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

২১. আইসিটি সেক্টরে বাংলাদেশের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন শেরিং তোবগে।আইসিটি সেক্টরে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে দুদেশের প্রধানমন্ত্রী সহমত পোষণ করেন।

২২. অটিজম ও নিউরো-ডেভলপমেন্ট ডিসঅর্ডারস্ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে কথা বলেন। ১৯ এপ্রিল ২০১৭তে অনুষ্ঠিত সে কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন ভুটানের রাণী।

২৩. ভুটানের কূটনীতিক পাড়ায় বাংলাদেশী দূতাবাস নির্মাণের জন্য বাংলাদেশকে ১.৫ একর জমি উপহার দিয়েছে ভুটান। ভুটানের হেজো এলাকাতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দূতাবাস নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় ভুটানের মহামান্য রাজা উপস্থিত ছিলেন।

২৪. ভুটান ও বাংলাদেশ নিম্নোল্লিখিত চুক্তি ও এমওই (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং)  স্বাক্ষর করে:

ক. আয়কর ফাঁকি ও ডাবল ট্যাক্স দেওয়া এড়িয়ে চলার জন্য ভুটানের সরকার ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি হয়।

খ. ভুটানের সরকার ও বাংলাদেশ সরকার সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে চুক্তি সাক্ষর করে।

গ. হেজো কূটনীতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ দূতাবাস নির্মাণের জন্য ভূমি দেওয়া নিয়ে দুদেশের মধ্যে চুক্তি সাক্ষরিত হয়।

ঘ. হেজো সামতেনলিং এলাকাতে ভূমি ব্যবহারের অধিকার দিয়ে একটি দলিল করা হয়। এর মাধ্যমে ভুটানে বাংলাদেশ দূতাবাস নির্মাণ সম্ভব হবে।

ঙ. ভুটানস্ স্ট্যান্ডার্ডস ব্যুরো (বিএসবি) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর মধ্যে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চ. বাংলাদেশ সরকার ও ভুটান সরকারের মধ্যে আন্তঃজলযোগাযোগ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কার্গো চলাচলের ক্ষেত্রে দেশগুলোর জলপথগুলো ব্যবহার বিষয়ে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ছ. রয়াল ইউনিভার্সিটি অব ভুটান (আরইউবি) ও বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভলপমেন্ট (বার্ড), কুমিল্লা, বাংলাদেশ এর মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে।

জ. ভুটানের কৃষি ও খাদ্য বিভাগের সাথে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।

২৫. ভুটান সফরকালে তাকে ও তার প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য ভুটান সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

২৬. যেকোন সুবিধা জনক সময়ে বাংলাদেশ সফর করার জন্য ভুটানের মহামান্য রাজা ও মহামান্য রাণীকে আমন্ত্রণ জানান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণ জানানোর জন্য শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে।

বিএইচ/এসবিআই/এমডি

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad