একাত্তরে খবরের পাতায় আমাদের বিজয়

ঢাকা, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

একাত্তরে খবরের পাতায় আমাদের বিজয়

সালাহ উদ্দিন জসিম ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

একাত্তরে খবরের পাতায় আমাদের বিজয়

৯ মাসের গর্ভধারণের পর মা জন্ম দেয় একটি ফুটফুটে নবজাতকের। আর ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে আমরা জন্ম দিয়েছি একটি মা’য়ের। সেই মা হলো- বাংলা মা। স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৬ ডিসম্বের আমাদের সেই খুশির দিন। বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এরপর থেকে পাকিস্তানের শোষন-বঞ্চনার শিকার পূর্ব পাকিস্তান হয়ে যায় স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’। পেয়ে যায় স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন ভূখণ্ড-মানচিত্র। গড়ে উঠে বিশ্বের কনিষ্ঠতম ও অষ্টম বৃহত্তম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

আমাদের বিজয় ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ নিয়ে তৎকালীন পত্রিকাগুলোর সংবাদ নিয়ে বিজয় দিবসের আয়োজন- ৭১ এ পত্রিকার পাতায় আমাদের বিজয়।  

মহাবিজয়ের বার্তা নিয়ে ১৯৭১-এর ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। পত্রিকার আট কলামে মূল শিরোনাম ছিল ‘দখলদার পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ, সোনার বাংলা মুক্ত।‘

ওই খবরে বলা হয়, 'সাবাস মুক্তিযোদ্ধা! বিগত ২৫ শে মার্চের বিভীষিকাময় রাত্রির অবসান ঘটিয়াছে। দখলদার পাক-বাহিনী গতকাল (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ সময় অপরাহ্ন ৫-১ মিনিটের সময় বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছে; জন্ম লইয়াছে বিশ্বের কনিষ্ঠতম ও অষ্টম বৃহত্তম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

বিগত ২৫ শে মার্চ রাত্রির নিরন্ধ্র অন্ধকারে ইতিহাসের বর্বরতম পন্থায় দখলদার পাক-বাহিনী সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধিকার, সার্বভৌমত্ব ও শেষ সত্ত্বাটুকু নিশ্চিহ্ন করার জন্য ঢাকার নিরীহ ও নিরস্ত্র নারী-পুরুষ ও শিশুর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ভয়-বিভীষিকা ও ত্রাসের সৃষ্টি করিয়াছিল—অগণিত অসহায় শিশু ও নারী-পুরুষের রক্তে ঢাকা নগরী ও এদেশের প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তা-ঘাট-মাঠ ও জনপদ রঞ্জিত করিয়াছিল।

পরবর্তী পর্যায়ে গত ৩ ডিসেম্বর প্রায় ১ কোটি বাস্তুত্যাগী বাঙালীকে আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনকে নস্যাৎ করার দূরভিসন্ধি আঁটিয়াছিল, কিন্তু মুক্তিপণ সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সাথে মাত্র ১২ দিন যুদ্ধ চালাইবার পর গতকাল (বৃহস্পতিবার) সশস্ত্র পাক-বাহিনী বিনাশর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

এই আত্মসমর্পণের ভিতর দিয়াই সোনার বাংলা এবং তার সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর জীবন হইতে বিভীষিকাময় তিমিরের অবসান ঘটিয়াছে। রক্তস্নাত বাংলাদেশের পূর্ব দিগন্তে আজ স্বাধীনতার অম্লান সূর্য উদ্ভাসিত। আজিকার এই শুভলগ্নে আমরা স্মরণ করিতেছি সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যাঁরা সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণের দাবী আদায়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়া দিয়াছেন, সান্ত্বনা দিতেছি সন্তানহারা মাকে, স্বামীহারা স্ত্রীকে, পিতৃ-মাতৃহারা এতিম সন্তানদের। এই সঙ্গে স্মরণ করিতেছি। স্বাধীন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি আজকের এই মুহূর্ত পর্যন্তও পাক সেনাবাহিনীর কারাগারের অন্ধ-প্রকোষ্ঠে আটক। সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ তাই তাঁকে কাছে পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।'

ইত্তেফাকের ওই সংখ্যায় ‘ঢাকার রাস্তায় উৎফুল্ল জনতার বিজয়োল্লাস’ শিরোনামে অপর একটি পার্শ্ব-সংবাদ ছাপা হয়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ঢাকা থেকে প্রাণান্তকর চেষ্টার মধ্য দিয়ে সেদিনকার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাই ওই দিনের দুই পৃষ্ঠার পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার অনেকাংশ বাস্তব কারণেই ফাঁকা থেকে যায়। এ ছাড়া ‘ধ্বংসস্তুপ হইতেই বাংলা দেশকে গড়িয়া তোলা হইবে- মুক্ত বাংলার রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম ছাত্রসমাবেশে বলিষ্ঠ শপথ ষোঘণা’ শিরোনামে একটি বক্স আইটেম প্রকাশ হয়।

দৈনিক আজাদী ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের সংখ্যায় ব্যানার লিড করেছে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’ একই সংখ্যায় প্রথম পেইজে বক্স আইটেম ছিল ‘মুক্তি ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর নিকট বাংলাদেশ দখলদার পাক সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ।’ এ ছাড়াও বিশ্ব প্রতিক্রিয়াসহ বিজয়ের নানা নিউজ ছাপে তারা।

দৈনিক পাকিস্তান তার ১৭ ডিসেম্বরের সংখ্যায় খোদ পত্রিকাটির নাম পরিবর্তন করে। ‘পাকিস্তান’ শব্দের যায়গায় ক্রস চিহ্ন দিয়ে পাশে বাংলাদেশ লিখেছে। সেদিন থেকে পত্রিকাটি দৈনিক বাংলাদেশ নামে প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে যার নাম হয় দৈনিক বাংলা। একই সঙ্গে পত্রিকাটির লিড ছবিতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি পাশাপাশি ছেপেছে, যেখানে ইয়াহিয়ার ছবিতে ক্রস চিহ্ন দেয়া। ওইদিন পত্রিকাটির ব্যানার লিড ছিলো, ‘ জয় বাংলার জয়।’ সাব হেড ছিলো- সোনার বাংলা আজ মুক্ত, স্বাধীনঃ জয় সংগ্রামী জনতার জয়।

ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ট্রিবিউন’ তাদের ব্যানার লিড করেছে, `BANGLA DESH FREED’ (বাংলাদেশ মুক্ত)। সাব হেডে তারা বলছে, পাকিস্তানি আর্মির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। 

কলকাতার দৈনিক যুগান্তর-এর ১৭ ডিসেম্বর সংখ্যার সংবাদ ‘রাহুমুক্ত বাংলাদেশ’-এ বলা হয়, ‘যে-মাটিতে পড়েছে শহীদের পূত শোণিতধারা, সে-মাটি নেবে না পিশাচের দূষিত রক্ত। তবে পাইকারী হারে ছাড়া পাবে না দেশদ্রোহী এবং সমাজদ্রোহী ঘাতকের দল। গণআদালতে তাদের বিচার অবশ্য কাম্য। যারা অপরাধী, তারা পেতে পারে না ক্ষমা—পেতে পারে না নিষ্কৃতি। যে-আগুন জ্বলছে আজ বাংলাদেশের বুকে, তা নিভানোর জন্যই দরকার উপযুক্ত বিচার। নইলে শান্ত হবে না বাঙালীর অশান্ত আত্মা। সত্য এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে না সমাজ।’

এসইউজে/আরপি

 

জাতীয়: আরও পড়ুন

আরও