বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম শিকার সাংবাদিক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৬ মাঘ ১৪২৬

বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম শিকার সাংবাদিক

প্রীতম সাহা সুদীপ ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম শিকার সাংবাদিক

দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে যখন একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে যাচ্ছে; ঠিক তখনই পরাজয় নিশ্চিত জেনে নবাগত ওই রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করতে উঠে পড়ে লাগে পরাজিত শক্তিরা। শুরু হয় বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ। যারা আতুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসা নতুন ওই জাতির বিবেককে জাগ্রত করে রাখতে পারতেন, তাদেরই বেছে বেছে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশিয় দোসররা।

মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যারও পরিকল্পনা করা হয়। পাক সেনারা অপারেশন চলাকালে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। তবে পরিকল্পিত এ হত্যাযজ্ঞের ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। বিজয় যখন সন্নিকটে ঠিক সেই মুহূর্তে ১০ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশার প্রথম শিকার হন সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন।

রাত তখন তিনটা। ঢাকার শান্তিনগরের ৫নং চামেলিবাগ। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। কে? শাহীন দরজা খোলো। বাড়িওয়ালা ডাক্তার সাহেবের কণ্ঠ। এতো রাতে হয়তো কোনো বিপদে পড়েছেন। দরজা খুলে দিতেই কয়েকটি রাইফেলের সামনে হতবাক হয়ে যান সিরাজুদ্দীন হোসেনের দ্বিতীয় পুত্র শাহীন রেজানূর।

বাড়িওয়ালাকে বন্দুকের নলের সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। সবার মুখে কাপড় বাঁধা। ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন সিরাজ। প্রথমে হানাদাররা সাংবাদিক সিরাজের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। তারপর বলেন, তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে এখনি। পাঞ্জাবী পড়তে চাইলে তাকে সেটাও পড়তে দেয়া হয়নি। গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হয় সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। এরপর আর ফিরে আসেননি তিনি, খোঁজ মেলেনি লাশেরও।

১৯২৯ সালের ১ মার্চ তৎকালীন মাগুরা মহকুমার (বর্তমানে মাগুরা জেলা) শালিখা থানার অন্তর্গত শরুশুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে তার পিতা মৌলভী মোজাহারুল হক মারা যান। চাচা মৌলবী মোহাম্মদ ইসহাক পিতৃহারা ভাইপোদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন।

সিরাজুদ্দীন হোসেনের পড়াশোনার হাতেখড়িও চাচার কাছেই। তিনি ঝিকরগাছা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর যশোর মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। আইএ পাস করার পর তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে বিএ পড়া শুরু করেন। এই কলেজে পড়ার সময়ই তার শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুদ্দীন মোল্লা, আসফউদদৌলা রেজা, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। কলেজ জীবনে বই কেনার মতো আর্থিক সচ্ছলতাও সিরাজের ছিল না।

অন্যের বই আর শিক্ষকদের লেকচারের উপর ভিত্তি করে নোট তৈরি করেই তিনি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন। পিতৃহীন সিরাজুদ্দীন হোসেন বেঁচে থাকার তাড়নায়ই এ সময় সংবাদপত্রে কাজ নিতে বাধ্য হন। ১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি দৈনিক আজাদ-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। কালক্রমে তিনি আজাদ’র বার্তা সম্পাদক হন। সমসাময়িককালে এত অল্প বয়সে বার্তা-সম্পাদকের পদে কাজ করার সৌভাগ্য আর কারো হয়নি।

১৯৫৪ সালে দৈনিক আজাদ’র সঙ্গে সিরাজের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর তিনি ঢাকার ইউএসআইএস অফিসে জুনিয়র এডিটর হিসবে কিছুদিন কাজ করেন। এক বছর পর ১৯৫৫ সালে তিনি ইত্তেফাক-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। মানিক মিয়ার অসাধারণ দূরদৃষ্টি আর সিরাজুদ্দীন হোসেনের টিমওয়ার্ক ‘ইত্তেফাক’কে অল্পদিনের মধ্যেই একটি প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্রে পরিণত করে।

ব্রিটিশ আমলের শেষভাগ থেকে শুরু করে সিরাজুদ্দীনের সাংবাদিকতা জীবন স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত ব্যপ্ত। এই পুরো সময়কালে দেশের সকল আন্দোলনের সঙ্গে তার ছিল সরাসরি যোগাযোগ। তিনি তার ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে এ দেশের বঞ্চিত মানুষের কথা অসাধারণ দক্ষতায় সংবাদপত্রের পাতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ষাট দশকের সব আন্দোলন, জিন্নাহর নির্বাচন, পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালিদের অব্যক্ত কথা ইত্তেফাকের পাতায় মূর্ত করে তুলেছিলেন তিনি। এমনই দরদ-মমত্ব আর পারঙ্গমতার সঙ্গে, যা এ দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক অনন্য সাধারণ অধ্যায়রূপে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ এই দেশে সিরাজুদ্দীন হোসেন সাহসিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে গেছেন। সে সময় তার লেখা ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়, অধূনা রাজনীতির কয়েকটি অধ্যায় ধরনের উপ-সম্পাদকীয় এবং এতদিনে শিরোনামে সম্পাদকীয় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের সাক্ষ্য দেয়। তিনি প্রবাসী সরকারের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের আমেরিকান কনস্যুলেটের গোপন রিপোর্টটি পাঠিয়েছিলেন, যা পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার প্রচারিত হওয়ার পর বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে উঠতে সাহায্য করে। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি ইত্তেফাকেই কর্মরত ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে আট পুত্র সন্তানের জনক শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন বিনয়ী, সদালাপী, পরোপকারী এবং সজ্জন ব্যক্তিত্ব। তার স্ত্রীর নাম নূরজাহান সিরাজী। তাদের ছেলে জাহিদ রেজানূর এবং শাহীন রেজানূরও সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন।

পিএসএস/এসবি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও