বই-পত্রিকার পাতায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫ মাঘ ১৪২৬

বই-পত্রিকার পাতায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ

প্রীতম সাহা সুদীপ ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

বই-পত্রিকার পাতায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ

দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে যখন একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে যাচ্ছে; ঠিক তখনই পরাজয় নিশ্চিত জেনে নবাগত ওই রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করতে উঠে পড়ে লাগে পরাজিত শক্তিরা। শুরু হয় বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ।

যারা আতুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসা নতুন ওই জাতির বিবেককে জাগ্রত করে রাখতে পারতেন, তাদেরই বেছে বেছে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশিয় দোসররা।

মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যারও পরিকল্পনা করা হয়। পাক সেনারা অপারেশন চলাকালে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। তবে পরিকল্পিত এ হত্যাযজ্ঞের ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর।

আর ওই পরিকল্পনার মূল নায়ক ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, যিনি তত্কালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। গভর্নর হাউসে বসে জামায়াতে ইসলামী, রাজাকার ও শান্তি কমিটির নেতাদের সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকা তৈরি করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর দুইদিন পর ১৯ ডিসেম্বর এ দেশের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর ২০ ডিসেম্বর থেকে পত্রিকাগুলোতে একে একে প্রকাশিত হতে থাকে ভয়াবহ ও নির্মমভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সংবাদ।

২১ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে ‘সোনার বাংলায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ- সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীসহ শতাধিক সোনার দুলাল নিহত’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

হত্যাযজ্ঞের মূল নায়ক রাও ফরমান আলী

২৩ ডিসেম্বর ইত্তেফাকের একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল- ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার নায়ক রাও ফরমান আলী’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়- গতকাল মুজিব নগরে বাংলাদেশ সরকারের জনৈক মুখপাত্র বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পূর্বে যে ৩৬ জন বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, অধ্যাপককে দখলদার বাহিনী ও উহার দোসর জামাতে ইসলামীর আল বদর বাহিনী হত্যা করিয়াছে তার জন্য তথাকথিত গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীই দায়ী। বুদ্ধিজীবী ছাড়াও এই ব্যক্তি উচ্চপদস্থ অফিসারদের হত্যারও ষড়যন্ত্র আঁটিয়াছিল। কিন্তু এই ষড়যন্ত্র অফিসারদের বুদ্ধিমত্তার জন্যই ব্যর্থ হয়। অফিসারদের ক্যান্টনমেন্টে দাওয়াত দেওয়া হইলে তাঁহারা সেখানে যান নাই এবং এভাবেই তাঁহারা রক্ষা পান।’

ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ‘বুদ্ধিজীবীদের হত্যার চক্রান্তের আরো দলিল’ নামে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, ‘ঢাকার গভর্নমেন্ট হাউসে বসে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বুদ্ধিজীবীদের হত্যালীলা চালাবার নাটগুরু যে ছিলেন তার আরো প্রমাণ ক্রমশ পাওয়া যাচ্ছে। গভর্নমেন্ট হাউসে তার নির্দিষ্ট কক্ষের টেবিলে ফাইলচাপা যেসব নোটশিট ইতস্ততঃ রয়েছে তার একটিতে বিবিসির ও এসোসিয়েট প্রেস অব আমেরিকার সংবাদদাতা জনাব নিজামউদ্দীন আহমদকে এ দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংকেত রয়েছে। জনাব নিজামউদ্দীন পিপিআইর ব্যুরো চীফ ছিলেন। প্রেসশিটে জনাব নিজামউদ্দীন প্রেরিত সংবাদ সম্পর্কে নাখোশ হওয়ার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। নোটশিটে অন্যান্য ৩টি বিষয় সম্পর্কেও জরুরী সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত রয়েছে। আমরা নোটশিটের পূর্ণ পৃষ্ঠাই ছেপে দিলাম।’

জেনারেল নিয়াজি তার নিজের লেখা— ‘The Betrayal of East Pakistan’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন জেনারেল টিক্কা খান তাকে বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না’। নিয়াজি তার বইয়ে আরো লিখেন— টিক্কা খান পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করেন এবং সেই অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার জানজেব আরবাব হুকুম পালন করেন।

তিনি লিখেন- ২৫ মার্চ রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় ছিলেন এবং তিনি দেখেছেন সেদিন রাতে টিক্কা খান কী করেছেন। সারা রাত ট্যাংক, কামান, মেশিনগানের ভয়ার্ত শব্দ ভেদ করে ভেসে এসেছে ঢাকার অসহায় মানুষের আর্তনাদ।

জেনারেল ফরমান আলী তার টেবিল ডাইরিতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে’।

যেভাবে হয় হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা:

মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভারতীয় লেখক ক্যাপ্টেন এস কে গার্গের ‘Spotlight: Freedom Fighters of Bangladesh’ বইয়ে (পৃ: ১৬৯-১৭০) ভারতীয় স্টেটসম্যান পত্রিকার ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ সংখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন: ‘বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ২৫ মার্চের রাতেই শেষ করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর এই নীলনকশাটি ছিল ঢাকার সাবেক ইউএস এইড কর্মকর্তা ‘কসাই’ রবার্ট জ্যাকসনের তৈরি। কাদের মারা হবে তার তালিকাটি তৈরি করেন কর্নেল তাজ আর তা বাস্তবায়ন করেন ব্রিগেডিয়ার বশীর, কাদের ও হিজাজী। এরা বন্দিদের জেরাও করতেন। আত্মসমর্পণের ঠিক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষকসহ ৩ হাজার বুদ্ধিজীবীর একটি তালিকা তৈরি করা হয়, যাদের জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর দিয়ে দ্রুত নির্মূলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

রবার্ট জ্যাকসনের ঢাকা আসার খবর লন্ডনের ‘অবজারভার’ পত্রিকা ছাপায় ৭ আগস্ট তাদের মস্কো প্রতিনিধির বরাতে। ঢাকায় জ্যাকসনের উপস্থিতি নিয়ে ‘সোভিয়েত রাশিয়া উদ্বিগ্ন’ জানিয়ে প্রতিবেদনে লেখা হয়: Moscow has been even more disturbed than Delhi by reports reaching here that Washington has assigned to Dacca, a Mr. Robert Jackson, a counter-insurgency-expert with wide experience in Vietnam. This suggests to Moscow that Washington is now heading towards the Vietnamisation of East Bengal conflict. Whether or not Mr. Jackson will be anymore successful in East Bengal than in Vietnam, Moscow believes this move foreshadows a prolonged conflict in East Bengal in which China might be tempted to join America in playing a bigger physical role.

বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের রিপোর্টেও সেদিনের ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র ফুটে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের সেই বিখ্যাত প্রতিবেদন ছাপা হয় লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। ওই রিপোর্টের একাংশের বাংলা করলে দাঁড়ায়— ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান ও ধর্মের নামে ঢাকা নগরীকে ধ্বংস করে একটা ভয়ঙ্কর ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে কম করে হলেও শুধু ঢাকায়ই সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ঢাকার অনেক এলাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকান কন্সাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তার নিজের লিখিত ‘ক্রয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ২১৩ পৃষ্ঠায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাছাই করা গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। এই গণহত্যার রিপোর্ট তিনি ২৮ মার্চ ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। একই রকম বাছাইকৃত গণহত্যার বর্ণনা পাওয়া যায় তখন দিল্লিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ‘কেন কিটিংয়ের প্রতিবেদনে, যা আর্চার ব্লাড তার বইয়ের ২১৫ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন।

‘বধ্যভূমির অভিজ্ঞতা’

অন্যদিকে ২০ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ‘বহু লাশ উদ্ধার’ শিরোনামে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরদিন ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বধ্যভূমির অভিজ্ঞতা’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন। ‘রাও ফরমান আলীই দায়ী’ এমন শিরোনামেও একটি খবর প্রকাশিত হয় এতে।

‘বধ্যভূমির অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি মূলত প্রকাশ করা হয়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা গ্রীনল্যান্ড মার্কেন্টাইল কোম্পানী লিমিটেডের চিফ একাউন্ট্যান্ট মোহাম্মদ দেলওয়ার হোসেনের দেয়া সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে।

ওই সাক্ষাতকারে দেলওয়ার হোসেন জানান, ১৪ ডিসেম্বর সকাল নয়টার শান্তিবাগের বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় পাক বাহিনী। তার চোখ মুখ বেঁধে তুলে দেয়া হয় বদর বাহিনীর হাতে। বন্দি করা হয় একটি কক্ষে। সেখানে নয় বছর বয়সী এক ছোট ছেলে তার হাতের বাঁধন খুলে দেয়। ছেলেটির দু হাতের চামড়া কাটা, হাত ফোলা। রক্তে রঞ্জিত জামা ও গেঞ্জি। ওই কক্ষে থাকা প্রত্যেকের শরীর এমন রক্তে রঞ্জিত ছিল। তাদের দেহের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত, আঙ্গুল ও নখ কাটা ছিল। যারা সেখানে ছিলেন তাদের কেউ ডাক্তার, কেউ সাংবাদিক আবার কেউ ছিলেন শিক্ষক।

কক্ষে থাকা প্রত্যেককে রাত ১২টা পর্যন্ত নির্মমভাবে মারধর ও নির্যাতন করে রাজাকাররা। একটার দিকে তাদের কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়। বাসে তাদের নেয়া হয় রায়েরবাজার বিলে। সকলকে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেয় আলবদর বাহিনী। চারিদিকে শুরু হয় মাতম-আহাজারি। সামনে থাকা লোকদের দল বেঁধে খোলা মাঠে নিয়ে যেতে থাকে তারা। সেখানে বেয়নেট দিয়ে হত্যালীলা শুরু করে জল্লাদরা। মাঝে মধ্যে গুলিও ছোঁড়ে। এমন সময় কৌশলে হাতের বাঁধন খুলে দৌঁড়ে পালান দেলওয়ার হোসেন।

তথ্য সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও লন্ডনের অবজারভার, দৈনিক টেলিগ্রাফের ১৯৭১ সালের সংখ্যা।

জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের ‘ক্রয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ বই।

ক্যাপ্টেন এস কে গার্গের ‘Spotlight: Freedom Fighters of Bangladesh’ বই।

জেনারেল নিয়াজির লেখা—‘The Betrayal of East Pakistan’ বই।

পিএসএস/এসবি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও